X
রবিবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২
৯ আশ্বিন ১৪২৯

মার্কিন নির্বাচনে বিদেশি শক্তির হাত

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৫:৫৭আপডেট : ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১৬:০০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী ১৯৭৬ সালের কথা। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী জিমি কার্টার নিউইয়র্কের এক নির্বাচনি সমাবেশে বলেছিলেন তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে চিলির সালবাদোর আলেন্দে বা বাংলাদেশের শেখ মুজিবের মতো কোনও রাষ্ট্রপ্রধানকে হত্যা করে আমেরিকার চলার পথ মসৃণ করবেন না। গত শতাব্দীর ষাট/সত্তর দশকে এশিয়া এবং আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোতে যখনই সামরিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শাসক বদল হয়েছে তখনই আমেরিকার সিআইএ’র অদৃশ্য হাতের কারসাজির প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। আমেরিকা বিশ্বের অন্যতম সুপার পাওয়ার। নিজের প্রয়োজনে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত এশিয়া ও আফ্রিকার রাষ্ট্রগুলোতে শাসক বদলানো তার একটি রুটিন কাজে পরিণত হয়েছিল।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সর্বপ্রথম সামরিক শাসন জারির মধ্য দিয়ে প্রেসিডেন্ট ইসকান্দর মির্জাকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেনারেল আইয়ুব খান রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ইসকান্দর মির্জাকে লন্ডনগামী উড়োজাহাজে তুলে দিয়ে সামরিক বাহিনীর জেনারেলরা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কব্জা করে নিয়েছিলেন। ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত মীর্জা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আর ১ নভেম্বর থেকে মির্জা লন্ডনের এক হোটেলের ম্যানেজার। সকাল বেলা রাজারে ভাই ফকির সন্ধ্যা বেলা!
আমেরিকার সিআইএ অনুরূপ বহু কাণ্ড সংঘটিত করেছে। কিন্তু গত ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন থেকে উল্টোকথা শোনা যাচ্ছে যে, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন অদৃশ্য বিদেশি খেলায়। ওই নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প নাকি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন রাশিয়ার হস্তক্ষেপে। এ বিষয়ে কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সে কমিশনও হস্তক্ষেপের আলামত পেয়েছে। আসন্ন ৩ নভেম্বর, ২০২০ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও নাকি রাশিয়া হস্তক্ষেপ করতে পারে। শুধু রাশিয়া নয়, চীন আর ইরানও আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হস্তক্ষেপের চেষ্টায় আছে। বলা হচ্ছে ট্রাম্প পুনরায় নির্বাচিত হোক রাশিয়া তাই কামনা করে, আর চীন চায় ডেমোক্র্যাট দলীয় প্রার্থী জো বাইডেন নির্বাচিত হোক। ইরানের অবস্থান তো সব সময় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে। ট্রাম্প অবশ্য এক নির্বাচনি সমাবেশে বলেছেন, তিনি নির্বাচিত হলে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।
গত আগস্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড সিকিউরিটি সেন্টারের প্রধান উইলিয়াম ইভানিনা চীন, রাশিয়া এবং ইরানের নাম উচ্চারণ করে হুঁশিয়ার করেছেন যে, এরা ‘গোপনে এবং প্রকাশ্যে’ আমেরিকান ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। ওই বিবৃতিতে বলা হয়েছে, চীন চাইছে না ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার জিতে হোয়াইট হাউসে থাকুক, অন্যদিকে রাশিয়া ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জো বাইডেনের ক্ষতি করতে চাইছে। মানে মার্কিন গোয়েন্দারা মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন যে, ২০১৬ সালের নির্বাচনের মতো রাশিয়া ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনে কাজ করছে। অবশ্য রাশিয়া সবসময় বলে এসেছে তারা মার্কিন নির্বাচনে বা যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কখনও মাথা গলায়নি।
অবশ্য মার্কিন কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স প্রধান একইসঙ্গে বলেছেন, ‘ভোটের ফলাফল নির্ধারণে আমাদের শত্রুরা খুব বেশি কিছু করতে পারবে না।’
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বিশ্বের একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। যুদ্ধ, মহামারি বা জলবায়ু পরিবর্তনের মতো কোনও আন্তর্জাতিক সংকটে মার্কিন প্রেসিডেন্ট কী ভূমিকা রাখেন সেদিকে সবাই লক্ষ রাখেন। সেই কারণেই চার বছর পরপর যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘনিয়ে আসে তখন এর ফলাফল নিয়ে সারা পৃথিবীতে প্রবল আগ্রহ সৃষ্টি হয়। এবারের নির্বাচনে বিদেশি হস্তক্ষেপের অভিযোগ প্রবল থেকে প্রবলতর হচ্ছে এবং উভয় প্রার্থীর মধ্যে এই নিয়ে বাক-বিতণ্ডাও শুরু হয়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে এবারের নির্বাচনের জয় পরাজয় নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে বিদেশি শক্তি।
দুই পরাশক্তির নির্বাচনে কলকাঠি নাড়ানোর কথা কখনও শোনা যায়নি। কিন্তু বিশ্বের দুই পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর রাশিয়া বহু দেশের নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে। কোনও কোনও গবেষক দেখিয়েছেন ১৯৪৬ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৮২টি বিদেশি নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করেছে আর রাশিয়া হস্তক্ষেপ করেছে ৩৬টি নির্বাচনে। আমেরিকার হস্তক্ষেপ ছিল বিশ্বব্যাপী আর রাশিয়ার হস্তক্ষেপ ছিল ইউরোপে সীমাবদ্ধ।
এবারের নির্বাচনে আমেরিকায় প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষদ্বয় তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর মতো পরস্পরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপন করছে। তারা তৃতীয় বিশ্বের দেশের নেতাদের মতো ব্যক্তিগত আক্রমণেও কেউ পিছিয়ে নেই। ট্রাম্প বলছেন, বাইডেন নির্বাচিত হলে আমেরিকার স্বাধীনতা হুমকির মুখে পড়বে। অথচ আমেরিকার স্বাধীনতাকে হুমকির মুখে ফেলতে আরেকটা বিশ্বযুদ্ধের প্রয়োজন। প্রার্থীরা প্রচারণায় এতো নিচে নামলেন কেন বুঝা মুশকিল।
এবারের নির্বাচনে কে জিতবে কে হারবে বিষয়টা এখনও সুস্পষ্ট হয়নি। জনমত জরিপ যদিওবা শতভাগ নির্ভর করা যায় না, তবু এখন পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে বাইডেনের পাল্লা ভারী। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থীকে বিরাট নির্বাচনি খরচ সামাল দিতে হয়। অবশ্য আমেরিকার ধনীরা তাদের কন্ট্রিবিউশন নিয়ে প্রস্তুত থাকে কারণ একটা কন্ট্রিবিউশন যে দিতে হবে সে বিষয়টা অবধারিত। এবারের কন্ট্রিবিউশনের পাল্লা নাকি বাইডেনের দিকে ভারী। এটা শুভ লক্ষণ।
কিন্তু নির্বাচনি প্রচারণার টেকনিকে ট্রাম্পও কম দূরদর্শী নয়। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ট্রাম্প জনমত জরিপে হিলারির চেয়ে বহু পিছিয়ে ছিল কিন্তু বর্ণবাদী প্রচারণায় শ্বেতাঙ্গদের মন তিনি জয় করেছিলেন। যে কারণে তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এবারও বর্ণবাদী অস্ত্রটাকে ট্রাম্প ভোঁতা হতে দেননি। তবে বেকারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এবং করোনা সামলানোর ব্যাপারে ট্রাম্পের অগোছালো ম্যানেজমেন্ট ট্রাম্পকে বিপদে ফেলবে বলে মনে হয়। অবশ্য আমেরিকান ভোটাররা একজন প্রেসিডেন্টকে দুইবার নির্বাচিত করার একটা সংস্কৃতিকেও লালন করে আসছে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
পরীক্ষায় বসে ফেসবুকে লাইভ, দুই শিক্ষার্থী বহিষ্কার
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
দুই গ্রুপের কোন্দলে মধ্যরাতে উত্তপ্ত ইডেন কলেজ
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
রামনাথ বিশ্বাসের বসতভিটা পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণে ১০০ নাগরিকের বিবৃতি
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
এতদিন কোথায় ছিলেন রহিমা?
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ