X
বৃহস্পতিবার, ০৭ জুলাই ২০২২
২৩ আষাঢ় ১৪২৯

প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার পথ ধরে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন

আপডেট : ২১ অক্টোবর ২০২০, ১৪:০৮

স ম মাহবুবুল আলম বাংলাদেশের বিশৃঙ্খল, বেহাল স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় একজন হতদরিদ্র মানুষ একান্ত প্রয়োজনীয় মানসম্মত চিকিৎসা পাবে, এ এক অলীক স্বপ্ন। প্রতি বছর দেশে ৫২ লাখ মানুষ দরিদ্র হয়ে পড়ছে নিজের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয় মেটাতে গিয়ে।  জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন স্তরের বিপুল সংখ্যক মানুষ যে শুধু চিকিৎসা পেতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছে তা নয়, আধুনিক চিকিৎসার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত থাকছে। সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা এখন বৈশ্বিক স্বাস্থ্যনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দাবি। প্রতিটি নাগরিকের মানসম্মত, নিরাপদ প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত থাকবে তার আর্থিক অসামর্থ্যতার ঊর্ধ্বে। স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে কারও আর্থিক বিপর্যয় ঘটবে না। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট লক্ষ্যমাত্রা (SDG) বাস্তবায়নে জনগোষ্ঠীকে আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার (UHC) আওতায় আনতে বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। কোন পথে অর্জিত হবে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা?
প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা (PHC) সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জনের কর্মসূচিভিত্তিক চালিকাশক্তি, যা প্রাপ্য সম্পদের মধ্যে সবচেয়ে সাশ্রয়ীভাবে কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সক্ষম। সঠিক অগ্রাধিকার নির্ধারণ করে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার সোপানে পৌঁছে দেবে। কমিউনিটি ক্ষমতায়ন ও দায়বদ্ধতার মাধ্যমে একটি বহুমুখী সেবাকেন্দ্র হিসেবে প্রাথমিক চিকিৎসার সঙ্গে পুষ্টি মানোন্নয়ন, নিরাপদ পানীয় জল, পয়নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনা, শিশু ও  মাতৃস্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা, টিকাদান, স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা ইত্যাদি (প্রমোটিভ, প্রিভেনটিভ, কিউরেটিভ এবং রিহ্যাবিলিটেটিভ) সেবা সমন্বিতভাবে প্রদানে সক্ষম। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যক্তি ও পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করে। সমতার ভিত্তিতে চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করে। একটি শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ প্রাথমিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থা বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবায় কাঙ্ক্ষিত কার্যকর ‘রেফারেল সিস্টেম’ গড়ে দেবে।
প্রাইমারি হেলথ কেয়ারের ধারণার একশ’ বছর পূর্তির (১৯২০-২০২০) এই বছরেও পৃথিবীর অনেক দেশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার যথাযথ গুরুত্ব অনুধাবন ও সঠিক মানে উন্নীত করার পথে যেতে পারেনি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে অনেক নিম্ন ও মধ‌্যম আয়ের দেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামোর ঘাটতির কারণে স্বাস্থ্য সূচকে খারাপ অবস্থা। স্বাধীনতার সপ্তম বছরে (১৯৭৮) বাংলাদেশ আলমা আতা ঘোষণায় স্বাক্ষর করে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদান ও সবার জন্য স্বাস্থ্য অর্জনে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। গত ৪২ বছরের অগ্রযাত্রা, উল্টাঘোরা ও শ্লথ গতির মধ্যে দিয়ে বাংলাদেশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো গড়ে উঠেছে। যার সর্বশেষ সংযোজন ২০০৯ সালে পুনর্জীবিত প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক। স্বাধীনতা-উত্তরকাল থেকে NGO-কর্তৃক নিয়োজিত বিপুল সংখ্যক কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করে যাচ্ছে, যা সরকারি কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীর দ্বিগুণেরও বেশি।  প্রান্তিক মানুষের স্বাস্থ্যসেবার জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক একটি গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি। তবে এই কর্মসূচিকে বৈজ্ঞানিকভাবে শক্ত ভিত্তি দেওয়ার চেয়ে রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহারে উৎসাহ অধিক। কমিউনিটি ক্লিনিকের প্রতি একমুখী আচরণ কি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার অন্যান্য স্তরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না? তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা গড়ে তুলতে পারার জন্য ন্যূনতম বাজেট বরাদ্দ রেখেও বাংলাদেশ স্বাস্থ্যের বিভিন্ন সূচকে প্রতিবেশী অনেক দেশের তুলনায় উচ্চ সাফল্যের স্বীকৃতি পেয়েছে আন্তর্জাতিক মহল থেকে। আমরা সেই তালি বাজাতে ব্যস্ত। পিছিয়ে থাকা, বিদ্যমান ব্যবধান খুঁজে বের করতে আগ্রহী নই। আমাদের সাফল্য ভারসাম্যমূলক নয়। স্বাস্থ্যসূচকে অনেক জায়গায় আমরা পিছিয়ে আছি প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় (যেমন মাতৃ প্রসবকালীন যত্ন ব্যবহার, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের সুবিধা-নির্ভর প্রসব, শিশু অপুষ্টি ইত্যাদি)।
এতক্ষণ বাংলাদেশের যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কথা বলা হলো তা পুরোপুরি গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জন্য। নগর প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দ্রুত নগরায়ণের প্রক্রিয়ায় এখন মোট জনসংখ্যার ২৫ শতাংশ অর্থাৎ ৪ কোটি মানুষ বর্তমানে বাংলাদেশের নগর এলাকাগুলোতে বসবাস করছে।  নগরে স্বাস্থ্যকেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্ব এলজিআরডি মন্ত্রণালয়ের। তাদের সেই সামর্থ্য বা অদূর ভবিষ্যতে তা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত উন্নত করতে হলে চিহ্নিত আন্তঃমন্ত্রণালয় প্রতিবন্ধকতা দূর করতে হবে। সরকারি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার এই তীব্র শূন্যতা পূরণে নগরে গড়ে উঠেছে অনিয়ন্ত্রিত বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা, যা শেষ পর্যন্ত রোগীদের লাগামহীনভাবে সরাসরি ওষুধ ফার্মেসি অথবা টারসিয়ারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে ধাবিত করেছে।
আমরা আমাদের প্রাথমিক স্বাস্থ্য অবকাঠামোর পর্যাপ্ততা নিয়ে প্রশ্ন আপাতত  স্থগিত রেখে যদি জানতে চাই বিদ্যমান প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামো প্রতিশ্রুত স্বাস্থ্যসেবার কতটুকু দিতে পারছে, তার উত্তর কি জানা আছে আমাদের? প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কর্মক্ষমতা কি পরিমাপ করতে পারি? যা পরিমাপ করা যায় না তা উন্নত করার সুযোগ নাই। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পারফরম্যান্স ইনিশিয়েটিভ (PHCPI) কনসেপচুয়াল ফ্রেমওয়ার্ক গঠিত হয়েছে বিল অ্যান্ড মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন, বিশ্ব ব্যাংক ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায়। তারা প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান ঘাটতি পরিমাপ ও অগ্রাধিকার নির্ধারণের জন্য কার্যকরী পদ্ধতি বা টুল তৈরি করছে। অনেক দেশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে পারলেও, তারা ব্যাপক ডাটার সমন্বয়ে তাদের দুর্বলতাকে চিহ্নিত করতে পারেনি, পারেনি তার কারণ নির্ধারণ করতে, ঠিক করতে পারেনি কৌশলগত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন খাতে তাদের সম্পদের সমাবেশ করা উচিত। PHCPI- এর টুল নিম্ন ও মধ্য আয়ের দেশগুলোর জাতীয় নীতিনির্ধারক ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা গড়ে তুলতে উন্নত পরিমাপক, জ্ঞান আদান-প্রদান ও তথ্য-উপাত্তের প্রয়োগের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।  আমাদের সঠিক ডাটার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার কর্মক্ষতার ঘাটতি নিরূপণ প্রথম প্রয়োজন। বাংলাদেশে তথ্য (Data) বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের অনুশীলন নেই,  তথ্যের প্রাপ্যতা নেই। হেলথ ইনফরমেশন সিস্টেম (Electronic Health Records)-কে এতটাই বলিষ্ঠ করে তৈরি করা প্রয়োজন যেন দৈনন্দিনের কর্মকাণ্ডের প্রতিটা ধাপ সহজ কিন্তু অনুপুঙ্খ তথ্য হিসেবে থাকে।
PHCPI এর পরিমাপক টুলের (সিস্টেম-ইনপুট-সার্ভিস ডেলিভারি-আউটপুট-আউটকাম) সিস্টেম ডোমেইনের প্রথম দুটি উপাদান— নেতৃত্ব ও ব্যবস্থাপনা এবং অর্থায়ন-কে সহজেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা উন্নত করার পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে চিহ্নত করা যায়। আমরা ইতোমধ্যে দেখেছি, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের অপ্রতুল বরাদ্দের কারণে জনগণের নিজের পকেট থেকে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬৭ শতাংশ দিতে হচ্ছে। এই উচ্চহারে অর্থ গরিব জনগণকে দিতে হলে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা অর্জন সম্ভব হবে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিটি দেশকে অতিরিক্ত জিডিপির কমপক্ষে ১ শতাংশ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় অবশ্যই বিনিয়োগ করতে বলছে। আমাদের এখনই আগামী বাজেটের আগে দাবি তুলতে হবে প্রাথমিক স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দের।

সার্বজননীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা দেশের যেকোনও প্রান্তের যেকোনও মানুষের জন্য বাস্তবায়নযোগ্য লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। সার্বজননীন স্বাস্থ্যসেবা কোনও ধনী দেশের বিলাসী স্বপ্ন নয়। এটা রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয়। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে সর্বতোভাবে শক্তিশালী করার মধ্য দিয়ে সার্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার লড়াইয়ে আমাদের জয়ী হতে হবে।

 

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল। সিনিয়র কনসালটেন্ট ও ল্যাব কোঅর্ডিনেটর, প্যাথলজি বিভাগ, এভার কেয়ার হাসপাতাল

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল, শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
নড়াইলে অধ্যক্ষকে লাঞ্ছনাঅভিযুক্ত শিক্ষার্থীর ছাত্রত্ব বাতিল, শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা
বিয়ে করছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী, কনে সম্পর্কে যা জানা গেছে
বিয়ে করছেন পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী, কনে সম্পর্কে যা জানা গেছে
আম দিয়ে ঈদ ডেসার্ট
ঈদ রেসিপিআম দিয়ে ঈদ ডেসার্ট
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ২৫ কিলোমিটারে যানজট
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের ২৫ কিলোমিটারে যানজট
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ