X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

গ্রাহক একটু সুবিধা পাওয়াতেই এত দুশ্চিন্তা?

মো. আবুল কাশেম
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০০:০৪

গ্রাহক একটু সুবিধা পাওয়াতেই এত দুশ্চিন্তা? মোবাইল ব্যাংকিংয়ের উত্থান নিয়ে দেশে নানা আলোচনা চলছে। গত এক দশকে এই খাত গ্রাহকের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে অতি দ্রুত গ্রাহকের পাশে পৌঁছে গেছে বেশ কয়েকটি মোবাইল ব্যাংকিং সুবিধা। এরমধ্যে অন্যতম নগদ।
স্বল্প সময়ে গ্রাহকের আস্থা অর্জনকারী প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে চারদিকে নানা কথা, আলোচনা-সমালোচনা শুনছি আর ভাবছি, পেছনের আসল কারণটা কী? পরিস্থিতি দেখে যেটা বুঝতে পারছি, তাতে অবাক না হয়ে পারছি না। সত্যিই বিস্মিত হয়ে যাচ্ছি।
সব দেখে-শুনে, মোদ্দা কথা আমার কাছে যে অর্থ দাঁড়াচ্ছে তা হলো, টাকা লেনদেন, বিল পেমেন্ট এসব জায়গায় গ্রাহক যখন খানিকটা সুবিধা পেতে শুরু করলো, তখন একটি পক্ষের উদ্বেগ শুরু হয়ে গেলো।
ঝোপ বুঝে কোপ মারা, ছোটবেলায় এমন একটা প্রবাদ পড়েছিলাম। সেটা আজ খুব মনে পড়ছে। সন্দেহজনক লেনদেন দেখে ডাক বিভাগের মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শরণাপন্ন হওয়ায় সাধুবাদ পাওয়ার কথা। অথচ বুঝে না বুঝে অনেকেই তাদের সমালোচনা শুরু করেছেন। কেউ কেউ বিনা কারণে যোগ দিচ্ছেন সেই মিছিলে। কেউ আবার মধুর সন্ধানে ওই কাতারে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছেন।
কেন এমনটি ঘটছে তা একটু-আধটু বুঝতেই পারি। এটা বুঝতে একটু পেছনে যেতে হবে। মূল সমস্যাটা হলো, গত এক দশকে একটি পক্ষ মনোপলির যে দৌরাত্ম্য তৈরি করেছে তা খানিকটা ধাক্কা খেয়েছে। এতে তাদের নখ-দন্ত সব বেরিয়ে পড়েছে। একইভাবে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস চালু করা বেশিরভাগ উদ্যোগ তারা বাজার ছাড়া করতে পেরেছেন আগে। ফলে একসময়ের ৩০টি এমএফএস লাইসেন্সের সংখ্যা নেমে এসেছে অর্ধেকে। এরমধ্যে বলার মতো সেবা তো কেউ চালিয়ে রাখতে পারেনি। ফলে এই সেবায় প্রতিযোগিতা থাকার বিষয়টি মানুষ ভুলতেই বসেছিল।
ব্যতিক্রম কেবল নগদ। সমস্যাটা এখানেই। এর আগে ভেতর থেকে দেখেছি, এখন বাইরে থেকেও দেখছি। এতে সবকিছু পরিষ্কার বুঝতে পারছি।
এবার একটু অঙ্কের হিসাব কষি। নগদ থেকে টাকা পাঠাতে খরচ নেই। আবার এক হাজার টাকা ক্যাশ-আউটে খরচ ৯ টাকা ৯৯ পয়সা। ভ্যাটসহ সাড়ে ১১ টাকা। অথচ মনোপলি গোষ্ঠী দশ বছর আগে যে সাড়ে ১৮ টাকা ক্যাশ-আউট চার্জ করেছিল, সেটাই এখনও বহাল আছে। সেখানে আবার টাকা পাঠাতেও খরচ ৫ টাকা। তাহলে এক হাজার টাকা লেনদেনেই পার্থক্য দাঁড়ায় ১২ টাকার বেশি। এ হিসাব যাদের রাখার, যাদের দেখার কথা, তারা তো ঘুমিয়ে আছেন।
কেউ কি জানে এই হাজারো কোটি  টাকার কতটা দেশে থাকছে  আর কতটা পাচার হয়ে যাচ্ছে? এ ক্ষেত্রে  শেষ বিচারে গ্রাহকই ঠিক করতে পারেন, এই হাজারো কোটি টাকা দেশে থাকবে নাকি বিদেশি কোম্পানিকে লুটে নিতে দেবেন?
মঙ্গলবার কালেরকণ্ঠ-এর একটা রিপোর্টে বলা হয়েছে, গত এক বছরে নগদ গ্রাহকরা এক হাজার কোটি টাকার সুবিধা পেয়েছে। ব্যাংকিং খাতের একজন সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে দেখতে ভালো লাগে, বাজারে অন্তত কিছুটা প্রতিযোগিতা হচ্ছে। তাছাড়া নগদ-এর প্রতিযোগিতা চাপে মনোপলিরা যখন কিছুটা ছাড় দিতে শুরু করে, তখন ভালো লাগাটা আরও বাড়ে।
ভালো লাগাটা আবার উবেও যায় যখন দেখি রেফারি নিজেই একটি পক্ষ নিয়ে নেন। মঙ্গলবারই একটি কাগজে দেখলাম ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলার বিষয়ে একটি হুঁশিয়ারি। আমার জানা মতে, এটি উদাহরণহীন একটি ঘটনা। পত্রিকা মারফত জেনেছি, নগদ এবং ডাক বিভাগের গাঁটছড়াকে কোম্পানি কাঠামোর আনুষ্ঠানিকতা দিতে এটি করা হচ্ছে। সেটি নিয়ে পানি ঘোলা হচ্ছে।
সুবিধাবাদী ওরাই কথা বলছেন নগদের বন্ড ছাড়া নিয়ে। রীতিমতো কড়া সমালোচনায় নেমেছেন। গাত্রদাহ তো বুঝি, প্রতিদ্বন্দ্বী যাতে বড় হওয়ার শক্তি জোগাতে না পারে, তার জন্যে সব পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে হবে।
নগদ একটা বন্ড ছাড়ার অনুমতি পাচ্ছে, যা পাবলিক বন্ড না। জনগণের কেনার জন্যে নয়। টাকাটা আসবে বিদেশ থেকে। কেউ কি প্রশ্ন করবে না যে অনেকে যখন বিদেশে অর্থপাচারে মত্ত তখন নগদ বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনছে – এর ভেদ করার কি কেউ নেই?
কেউ কি চিন্তায় আনবে না যে একটি কোম্পানি বাংলাদেশে সব গ্রাস করার মচ্ছবে মেতেছে। একের পর এক কোম্পানি কিনে, নিজেদের যোগসাজশে প্রভাব বিস্তারে নেমেছে। এগুলো ভাবার সময় চলে গেলে কিন্তু কোনও কূলকিনারা পাওয়া যাবে না।
কেউ কি একবার জানতে চাইবেন, এমএফএসগুলোর মধ্যে যারা টানা কয়েক বছর লাভে ছিল, সেখান থেকে লোকসানে নেমে আসল কীভাবে? সবার তো গ্রাহক বেড়েছে; তাদেরও বেড়েছে। লেনদেন বেড়েছে এবং আয়ও বেড়েছে। তারপরেও লাভ থেকে লোকসানে? রেগুলেটর বা অডিটর কি নির্মোহভাবে তা দেখছে?
এসব প্রশ্ন করার লোক পাওয়া যায় না বলেই দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থ বিকিয়ে যায়। ঠিক এ কারণেই আমাদের দেশে সরকারি কোনও সেবা কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারে না। নতুন কিছু করতে দেখলেই তা পিষে মারার আয়োজন চলে।
তারপরও আশাবাদী, ভেতর থেকে কোনও শুভবুদ্ধির উদয় হবে হয়তো। নীতিনির্ধারকরা বিষয়টি বুঝতে পারবেন আশা করি। গ্রাহক-জনগণও বুঝতে পারবেন তারা কারও ক্রীড়নক হবেন, নাকি দেশের পক্ষে দাঁড়াবেন?
লেখক: বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর।

/এফএএন/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
বিমানের ২ উড়োজাহাজে সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন
বিমানের ২ উড়োজাহাজে সংঘর্ষের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন
ট্রাকচাপায় প্রাণ গেলো অটোরিকশার ২ যাত্রীর
ট্রাকচাপায় প্রাণ গেলো অটোরিকশার ২ যাত্রীর
কারাগারে পাঠানোর পরদিন মন্ত্রীর জামাইয়ের জামিন
কারাগারে পাঠানোর পরদিন মন্ত্রীর জামাইয়ের জামিন
গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে আগুনে মা-ছেলে দগ্ধ 
গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে আগুনে মা-ছেলে দগ্ধ 
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ