X
সোমবার, ২৭ জুন ২০২২
১২ আষাঢ় ১৪২৯

সরকারি কর্মকর্তাদের কী নামে সম্বোধন করা হবে?

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২১, ১৯:৪০

ডা. জাহেদ উর রহমান ‘আপা-ভাই ডাকা হইতে সাবধান’– দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের অফিসের বাইরে কি এখন থেকে এমন সতর্কবাণী লিখে রাখা উচিত হবে? সাম্প্রতিক একটি ঘটনার কথা মিডিয়ায় পড়ে আমার মনে ঠিক এই প্রশ্নটাই জেগেছে।  

ঘটনাটি ঘটেছে কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায়। বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে ঘটনার ভুক্তভোগী জামাল উদ্দিনের বয়ানে ঘটনা জেনে নেওয়া যাক– “সোমবার দুপুরে আমার এক আত্মীয়ের জন্ম নিবন্ধন সংশোধনের জন্য ইউএনও কার্যালয়ে যাই। স্যার সম্বোধন করে ওনার সঙ্গে আমার কথা শুরু হয়। কথা বলার একপর্যায়ে অপ্রত্যাশিতভাবে আমার মুখ থেকে আপা শব্দটি বের হয়। এ সময় তিনি রেগে গিয়ে বলেন, ‘এটা তো অফিসিয়াল ভাষা না। তাহলে আপা না ডেকে মা ডাকেন।’ বিষয়টি নিয়ে আমি বিব্রত। ঘটনার সময় কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা ও রাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উপস্থিত ছিলেন।”

বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. মোস্তফা বলেন, ‘ওই দিনের ঘটনা সত্য। স্যার না বলায় ইউএনও ক্ষেপে যান।’

এই ধরনের খবর মোটেও নতুন না, আগেও চোখে পড়েছে। এই লেখার সূত্রে আবার গুগল করে দেখলাম। তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া মূলধারার জাতীয় দৈনিক এবং নিউজ পোর্টালের কয়েকটি সংবাদের শিরোনাম পড়ে নেওয়া যাক–

‘ম্যাডাম না বলায় উত্তেজিত ইউএনও’, ‘ইউএনওকে স্যার না ডাকায় ব্যবসায়ীকে লাঠিপেটা!’, ‘স্যার ডাকেনি বলে এক সাংবাদিকের ওপর ক্ষেপে গেলেন ইউএনও!’, ‘স্যার না ডাকলে রেগে যাওয়া ইউএনও যাচ্ছেন মহম্মদপুরে’, “ইউএনওকে ‘স্যার’ না বলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে হেনস্তা করেন ওসি”।

আগের ঘটনাগুলোও কোনোভাবেই ঘটতে পারে না, কিন্তু এবারের ঘটনার একটা নতুন মাত্রা আছে। ‘সরকারি কর্মকর্তাদের স্যার বা ম্যাডাম বলে সম্বোধন করতে হবে, এমন কোনও নীতি নেই।’

গত ৮ সেপ্টেম্বর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে কথাগুলো বলেছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন। বুড়িচংয়ের ঘটনাটি ঘটেছে প্রতিমন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর। যে মন্ত্রণালয়ের অধীনে এই ইউএনও কাজ করেন, তিনি সেই মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর বক্তব্যকে থোড়াই কেয়ার করেছেন। শুধু সেটাই নয়, এরপর তিনি চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ জবাব দিয়েছেন।

বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টে দেখা যায়- সেদিনকার ঘটনাটি সম্পর্কে ইউএনও মোছাম্মৎ সাবিনা ইয়াছমিন বলেন, ‘একজন বয়স্ক লোক এসে আমাকে আপু ডেকেছে। আমি তাকে বলেছি, আপনি আমার বাবার বয়সী, মা ডাকেন। বয়স্ক লোক মা ডাকবে এটা স্বাভাবিক। আপু ডাকলে বুঝতে হবে তার চরিত্রে সমস্যা আছে। যার চরিত্রগত সমস্যা আছে, সে মেয়ে দেখলেই আপু ডাকে। এটা বুঝতে হবে। যার এক পা কবরে চলে গেছে, সে আমাকে আপু ডাকলে অবশ্যই আমার আপত্তি আছে।’

বিভিন্ন কারণে মানুষকে একধরনের গৎবাঁধা চারিত্রিক সনদপত্র দেওয়ার প্রচলন আমাদের দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের আছে। কিন্তু এখানে তিনি আমাদের সামনে হাজির করলেন মানুষের চরিত্র নির্ণয়ের নতুন তত্ত্ব। তার ভাষ্যমতে, কোনও পুরুষ মেয়েদের আপু ডাকার মানে হচ্ছে তার চরিত্রগত সমস্যা আছে। শুধু সেটাই নয়, মানুষটি সম্পর্কে তিনি ‘এক পা কবরে চলে গেছে’ ধরনের বাক্য ব্যবহার করেছেন। যার সঙ্গে এই ঘটনা ঘটেছে সেই জামাল উদ্দিনের বয়স বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে ৪৫। টিভি চ্যানেলেও তাকে নিয়ে রিপোর্ট হয়েছে এবং সেখানেও দেখেছি তার বয়স এর আশপাশেই হবে। নিশ্চিতভাবেই এই ভদ্রলোকের বয়স এক পা কবরে চলে যাওয়ার মতো নয়। আর কারও বয়স যদি সত্যি সত্যিও সেরকম হয়ে থাকে এমন নোংরা কথা কি বলতে পারেন কোনও ইউএনও?

বাংলাদেশের একজন মানুষের ইউএনও হতে তার বয়স কত হতে হয় আমাদের ধারণা আছে। সেই ধারণা থেকে বলতে পারি জামাল উদ্দিনের বয়স একজন ইউএনওকে ‘মা’ ডাকার মতো ছিল না। তিনি মা ডাকার কথা বলেছেন আসলে তার ভেতরের তীব্র ক্ষোভ থেকে, কারণ তাকে ‘স্যার-ম্যাডাম’ ডাকা হয়নি। এটুকু বোঝার কাণ্ডজ্ঞান আমাদের আছে।

কলামের এই পর্যায়ে জেনে নিই জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সেই সংবাদ সম্মেলনে বলা আরও কয়েকটি জরুরি কথা। তিনি বলেন, ‘আমি বারবার বলেছি, দুর্ব্যবহার দুর্নীতির শামিল। কোনোভাবেই এটা করা যাবে না। আপনি অত্যন্ত সুন্দরভাবে সাবলীলভাবে কথা বলুন।’ ঘটা করে, প্রকাশ্যে জনগণের সামনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর এই কথাগুলোর নিশ্চয়ই তাৎপর্য আছে। কোনও তাড়না থেকে নিশ্চয়ই তিনি কথাগুলো বলেছেন। আমরা যারা চোখ-কান খোলা রাখি, তারা হয়তো বুঝবো জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর তাড়নাটা কী। দেশের সরকারি আমলারা গত কয়েক বছর ধরেই নেতিবাচক কারণে নিয়মিত বিরতিতে খবরের শিরোনাম হচ্ছেন। 

বুড়িচংয়ের ইউএনও যে আচরণ করেছেন, এই রাষ্ট্রের একজন নাগরিকের সঙ্গে এমনকি এরপরে যে ভাষায় তিনি তার প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন তা নিশ্চিতভাবেই প্রচন্ড দুর্ব্যবহার। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এটা ‘দুর্নীতির শামিল’। এই দুর্নীতির জন্য তাৎক্ষণিকভাবে এই ইউএনওকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া উচিত।

শাস্তি থেকে আমলারা যেমন শিখবেন তেমনই দেশের নাগরিকদেরও দেখতে হবে তার করের টাকায় বেতনভুক্ত আমলারা তার সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে পার পায়নি। 

এইমাত্র যে অনুচ্ছেদটি লিখলাম তা আসলে কথার কথা। আমি নিশ্চিতভাবেই জানি, বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটতে যাচ্ছে না। যা ঘটতে যাচ্ছে সেটা আশঙ্কার।

বাংলাদেশের আমলারা সুদূর অতীত থেকেই বহু ক্ষেত্রে তাদের জন্য নির্ধারিত সাংবিধানিক এবং আইনি চৌহদ্দির বাইরে গিয়ে ক্ষমতার চর্চা করে আসছেন। কলোনিমুক্ত হলেও আমলাদের মধ্যে কলোনিয়াল ‘হ্যাংওভার’ চলেছে। এমনকি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরেও।

গত কয়েক বছরে এই প্রবণতা বেড়েছে কয়েক গুণ। সাংবিধানিকভাবে নির্ধারিত ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী’ না হয় তারা এখন জনগণের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা সেজে বসেছেন।

আমলাদের এই অতি বাড়াবাড়ির পেছনের দায় রাজনৈতিক সরকারের। জনবিচ্ছিন্নতার কারণে আমলাদের ওপর নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে সরকারের। এ কথা এখন শুধু সরকারবিরোধীরাই নয়, বলছে সরকারের জোটের সদস্যরাও। এমনকি এই প্রসঙ্গ সংসদে তুলে ধরে হতাশা প্রকাশ করেছেন সরকারি দলের প্রভাবশালী নেতা তোফায়েল আহমেদও।

দেশের সার্বিক যে অবস্থা, তাতে আমি অন্তত আশাবাদী নই যে, অদূর ভবিষ্যতে আমলারা সত্যিকার অর্থেই প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী হয়ে উঠবেন। বরং সরকারের আমলা-নির্ভরতা আরও বাড়তে দেখছি আমি দিব্যচোখে অর্থাৎ তাদের আচরণ আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবে। উপজেলা, জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত একেকজন কর্মকর্তা কার্যত হয়ে উঠবেন ওই এলাকার সম্রাট-সম্রাজ্ঞী। স্যার-ম্যাডাম ডাকও হয়তো তাদের কাছে আর যথেষ্ট মনে হবে না, মনে মনে ভাববেন তাদের ‘জাহাঁপনা’ সম্বোধন করা হচ্ছে না কেন?

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

/এসএএস/জেএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
২৭ জুলাই থেকে টরন্টো যাবে বিমান
২৭ জুলাই থেকে টরন্টো যাবে বিমান
পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত ২ যুবকের মৃত্যু
পদ্মা সেতুতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত ২ যুবকের মৃত্যু
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা
ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা
সেতু চালুর প্রথম দিনেই কমে গেছে লঞ্চযাত্রী
সেতু চালুর প্রথম দিনেই কমে গেছে লঞ্চযাত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ