X
সকল বিভাগ
সেকশনস
সকল বিভাগ

রাজনৈতিক চর্চা বাদ দিয়ে ক্ষমতার চর্চা সংঘাত বাড়ায়

আপডেট : ১৭ নভেম্বর ২০২১, ১৬:২৪

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপি নেই, তাই ধানের শীষ প্রতীকও নেই। আছে কেবল নৌকা। তাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের ঘণ্টা ঠিকঠাক বাজার আগেই অনুষঙ্গ হিসেবে হাজির নির্বাচনি সন্ত্রাস। তারপর সরকারি দল আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা, বড় নেতাদের সঙ্গে দরকষাকষি, লবিং, রমরমা মনোনয়ন বাণিজ্য এবং পরিণতিতে সহিংসতা, খুন ও জখম।

এবার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চিত্রটা এমনই এবং বলতে গেলে সব স্থানীয় সরকার নির্বাচনেই পরিবেশটা গত কয়েক বছর ধরে এমন এক রূপ নিয়েছে। দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় প্রতীক পেতে সবাই মরিয়া। বিএনপির মতো বড় দল না থাকায় তৃণমূলের ঘরে ঘরে আওয়ামী লীগ প্রার্থী এবং প্রান্তিক পর্যায়ে ঘরে ঘরে বিবাদ। নির্বাচনি হিংসার বহুবিধ ঘটনার কোনটার পেছনে কে বা কারা, তা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যে জনগণ যেন এক গোলক ধাঁধায় নিক্ষিপ্ত। এগুলোর কোনটা রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের ফল বা ক্ষমতা দখলের প্রকাশভঙ্গি, বা কোনটা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার রূপ বা কোনও দলের কোন্দলের ফসল, কোনটা আবার একেবারেই রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন আর্থিক স্বার্থের লড়াই, তা সার্বিকভাবে বোঝা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। উত্তরগুলো হয়তো বদলে যায়।

তবে ভোটের আগে, ভোটের সময় এবং ভোটের পরের খুন-জখমকে ধরে নির্বাচনি সন্ত্রাসের সার্বিক চালচিত্র বুঝতে পারা যায় ভোটের পরিবেশ দিয়েই। কেন্দ্র দখল, অস্ত্রের প্রকাশ্য প্রদর্শনী, হামলা, রক্ত – সবই ভোটের পরিবেশ। কেউ ভোটের ফল ঘোষণার পর বিজয়ী হয়ে বাড়ি ফিরে খুন হয়েছেন, কেউ বা মনোনয়ন পেয়ে যেতে পারেন এমন সম্ভাবনায় খুন হয়েছেন। আর কর্মী সমর্থকদের রক্ত ঝরাতো স্বাভাবিক ঘটনা যেটা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষায় ‘স্থানীয় পর্যায়ের ঝগড়া-ফ্যাসাদ’।

সংবেদনশীলতার অভাব তীব্র হলে বহু কিছু নজরে আসে না। বুঝতে পারা যায় না যে ইউনিয়ন পরিষদসহ সব ধরনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ে চরম বিশৃঙ্খলা চলছে। কোনোভাবেই বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। মনোনয়ন বাণিজ্য নিয়ে দলের সব পর্যায়েই এখন আলোচনা হচ্ছে। ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ এবং এর পরিণতিতে ঘাঁটি বলে পরিচিত এলাকায়ও নৌকা হেরে যাচ্ছে।

অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের পাশাপাশি সংঘাত, হানাহানি ও প্রাণহানির ঘটনা নিয়মিত বাড়ছে। ভোটের আওয়াজ উঠলেই শুরু হয় রাজনৈতিক সংঘর্ষ। প্রাণহানির ঘটনা এখন আর কাউকে বা সিস্টেমকে হয়তো নাড়া দেয় না। গ্রামে গ্রামে বহু মানুষ আজ রাজনৈতিক হিংসার জেরে ঘরছাড়া। মৃত্যু, হানাহানি নষ্ট করছে গ্রামীণ পরিবেশ। সবাই আজ জানতে চায়– এর শেষ কোথায়?

দলীয় প্রতীকে এ নির্বাচন হলেও এখন আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহের ভোট দলীয়ভাবে না করার দাবি জোরালো হচ্ছে। যিনি নৌকা পাচ্ছেন, তিনি যেন এলাকার মালিকানা পেয়ে যাচ্ছেন এবং সে কারণে এটা পেতে সবাই মরিয়া। এর জন্য যা করা দরকার সেটা করতে কেউ কার্পণ্য করছে না। জায়গা মতো টাকা পয়সা প্রদান করে নৌকা পাওয়ার প্রচেষ্টায় মনোনয়ন বাণিজ্যের বড় অভিযোগ খোদ দলের ভেতর থেকেই উচ্চারিত। কোথাও কোথাও এমন ঘটনাও ঘটছে যে যাকে নৌকা প্রতীক দেওয়া হয়েছে তার সঙ্গে কর্মী ও এলাকার ভোটার নেই। যাকে বঞ্চিত করা হলো তিনি ত্যাগী এবং তার তুমুল জনপ্রিয়। ফলে সংঘাত অনিবার্য হয়ে উঠেছে। আর তাই নৌকা প্রতীকের প্রার্থীকে হারাতে দলের ভেতরেই একটি অংশ উঠেপড়ে লেগে যায়।

এমন পরিস্থিতিতে দলের নীতিনির্ধারকেরা কতটা বিব্রত তা তারাই বলতে পারবেন। তবে দেখা গেছে এমন এলাকা আছে যেখান থেকে উঠে আসা কেন্দ্রীয় নেতারা যাদের নৌকা দিয়েছেন তারা হেরে গেছেন। দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনে ৮৩৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৩৪১টিতে নৌকা প্রতীক হেরে গেছে। এরমধ্যে ১৩১টি ইউনিয়নে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতাতেই ছিলেন না দলের প্রার্থীরা। অথচ বিএনপি আনুষ্ঠানিকভাবে এবার ইউপি নির্বাচনে নেই।

যে উদ্দেশ্য নিয়ে সরকার আইন করে ইউপিসহ সব স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তা সরকারি দলের জন্য তো বটেই, দেশের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের জন্যই ভালো হয়নি। বরং দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের কারণে তৃণমূল পর্যায়ে সংঘাত-সহিংসতা আগের চেয়ে বেড়ে গেছে। এখন ঘরে ঘরে নিজেদের মধ্যে গ্রুপিং আর কোন্দল। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সরকারি দল আওয়ামী লীগ। আর স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের পছন্দমতো, এলাকায় উজ্জ্বল ভাবমূর্তি আছে এমন মানুষকে নির্বাচিত করে আনার প্রক্রিয়াটাই বন্ধ হয়ে গেছে। গ্রামে আর জনপদে নির্বাচন এক আতঙ্কের নাম।

দল ক্ষমতায় টানা তৃতীয়বারের মতো গত বারো বছর ধরে। অথচ যেকোনও স্তরের আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীর সাথে কথা বললেই শুনতে হয় তাদের বঞ্চনার কাহিনি, শুনতে হয় কোন্দল আর দ্বন্দ্বের কথা। সবাই ক্ষমতার চর্চা করছে, দলের ভেতর সামান্যই আছে রাজনৈতিক চর্চা। এত বড় এবং ঐতিহ্যবাহী দলের ভেতর রাজনৈতিক চর্চার ভিত মজবুত না হওয়ায় হিংসা বাড়ছে, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তিকে মোকাবিলা করার অঙ্গীকারও দৃশ্যমান নয়।

এত অস্ত্রের প্রদর্শনী, এত সহিংসতা, এত মৃত্যু, এত জখম। সংবেদনশীল মানুষ বুঝতে চায় রাজনীতির জন্য এই সহিংসতা নাকি সহিংসতার জন্যই রাজনীতি? নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা কাম্য নয়। সরকার, নির্বাচন কমিশনকে এই সহিংসতা বন্ধে দায়িত্ব নিতে হবে। সাধারণ মানুষ এটাই আশা করে। প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকেই জেলায় জেলায় বার্তা পাঠানো উচিত। প্রশাসনকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার অধিকারও দিতে হবে। তাহলেই সংঘাত নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে হয়। ভোট হলো উৎসব,  একটা দল জিতবে আর বাকিরা হারবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ভোটে জেতার জন্য প্রতিপক্ষের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, খোদ প্রার্থীকে খুন করা মেনে নেওয়া যায় না। এই রাজনৈতিক চর্চা মানুষ চায় না।

লেখক: সাংবাদিক    

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

র‌্যাগিংয়ে জড়িত থাকায় যবিপ্রবির ৩ শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার
র‌্যাগিংয়ে জড়িত থাকায় যবিপ্রবির ৩ শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার
অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ: ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
অস্ট্রেলিয়ার নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবেনিজ: ঐক্যের প্রতিশ্রুতি
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ জনের
যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেলো ২ জনের
কুড়িগ্রামে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার আশঙ্কা
কুড়িগ্রামে বাড়ছে নদ-নদীর পানি, বন্যার আশঙ্কা
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ