X
বৃহস্পতিবার, ০১ ডিসেম্বর ২০২২
১৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

শহীদ আসাদ  এবং সে সময়ের ছাত্র রাজনীতি

সালেক উদ্দিন
২০ জানুয়ারি ২০২২, ১০:৫৮আপডেট : ২০ জানুয়ারি ২০২২, ১০:৫৮
সালেক উদ্দিন আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান আসাদ ছিলেন তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনের ছাত্রনেতাদের একজন, যিনি ১৯৬৯ সালে ২০ জানুয়ারি মিছিলের মধ্যে পুলিশের গুলিতে শহীদ হন এবং ৬৯-এর গণ-আন্দোলনের পথিকৃৎ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে যান। সেই থেকে প্রতিবছর ২০ জানুয়ারি পালিত হয় শহীদ আসাদ দিবস হিসেবে।

শহীদ আসাদ ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পূর্ব ছাত্রনেতাদের একজন। মেধাবী ছাত্র রাজনীতিক আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামানের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে শহীদ আসাদ হিসেবে। ১৯৪২সালের ১০ জুন নরসিংদী জেলার অন্তর্গত শিবপুর উপজেলার ধানুয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ১৯৬০ সালে শিবপুর থেকে মাধ্যমিক, ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং ১৯৬৭ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। দ্বিতীয়বার স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের লক্ষ্যে ১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের স্নাতকোত্তর শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিতপ্রাণ এই ছাত্রনেতা পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের (ইপসু- মেনন গ্রুপ) ঢাকা শাখার সাধারণ সম্পাদক এবং একই সঙ্গে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শহীদুল্লাহ হল অর্থাৎ সে সময়ের ঢাকা হল শাখার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। ছাত্রাবস্থায়ই তিনি শিবপুরে একটি নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন এবং একটি কলেজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে স্থানীয় শিক্ষা অনুরাগীদের নিয়ে আর্থিক তহবিল গড়ে তোলেন।

১৯৬৭ সালে  ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি এবং কৃষক সমিতির সভাপতি মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর নির্দেশনায় ছাত্রনেতা  আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান কৃষক সমিতিকে সংগঠিত করার লক্ষ্যে শিবপুর -মনোহরদী- রায়পুরা - নরসিংদী  এলাকায় নিজেকে সম্পৃক্ত রাখেন। ১৯৬৯ সালে হাতিরদিয়া বাজারে মাওলানা  ভাসানীর ডাকা ‘হাট হরতাল’ করতে গিয়ে পুলিশের নির্যাতনে মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন আসাদুজ্জামান আসাদ। সেই অবস্থায় মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে ঢাকায় এসে অংশ নিয়েছিলেন স্বৈরাচার আইয়ুব খান বিরোধী আন্দোলনে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে  ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ ও এনএসএফ-এর অংশ নিয়ে যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়েছিল সেই পরিষদের যারা নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আমানুল্লাহ মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান। সেই নেতৃত্বে ১৪ জানুয়ারি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে ঐতিহাসিক ১১ দফা কর্মসূচি ঘোষিত হয়েছিল। ১৭ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবেশ হয়েছিল। ২০ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম কমিটির ডাকে পূর্ব পাকিস্তানের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ ধর্মঘট চলেছিল। সরকারের ১৪৪ ধারা ভেঙে ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে একত্রিত হয়েছিল। দুপুরে বটতলায় এক সংক্ষিপ্ত সভা শেষে হাজার হাজার ছাত্রের মিছিল চানখারপুলের কাছে এলে পুলিশ  হামলা চালিয়েছিল। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের পর আসাদসহ কয়েকজন ছাত্রনেতা মিছিলটিকে ঢাকা হলের পাশ দিয়ে শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। এ সময় একজন পুলিশ অফিসার খুব কাছ থেকে আসাদকে গুলি করলে শেষ হয় ছাত্র রাজনীতিতে সংগ্রামী নেতা আমানুল্লাহ মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান আসাদের অধ্যায়। সেই সূত্র ধরেই ২০ জানুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে পালিত হয়ে আসছে শহীদ আসাদ দিবস।

ক্ষণজন্মা ছাত্রনেতা শহীদ আসাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সে সময়ে ছাত্র রাজনীতির চিত্র পাওয়া যায়। সে সময়ের ছাত্ররাজনীতি ছিল শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। মোটকথায় দেশপ্রেম, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা  এবং অধিকার নিশ্চিতের রাজনীতিই ছিল তখনকার ছাত্র রাজনীতি। দল ও মতের ভিন্নতা তখনও ছিল, তবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ছাত্ররা ছিল একজোট।

রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিবেদিতপ্রাণ  শহীদ আসাদের ছোট্ট জীবনে দেখা যায় গরিব ও অসহায় ছাত্রদের শিক্ষার অধিকারের ব্যাপারে  সুস্পষ্ট সজাগতা। ওই সময়ে তিনি শিবপুরে নৈশবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। শিবপুর কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য আর্থিক তহবিল গড়ায় অবদান রেখেছিলেন। আসাদসহ যারা সরাসরি আওয়ামীপন্থী ছাত্র রাজনীতি করেননি তারাও সর্বদলীয় ছাত্রজোট হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফা দাবির সপক্ষে আন্দোলন করেছেন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামিদের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করেছেন। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধু যখন জেলে ছিলেন তখন তাকে জেল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে ১৯৬৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ডাকে দেশের গ্রামগঞ্জে যে ‘হাট হরতাল’ হয়েছিল, আসাদসহ সব দলের ছাত্র সংগঠনের ছাত্ররাও অংশ নিয়েছিলেন তাতে।

ছাত্র রাজনীতিক আসাদের শাহাদতবরণের পরও বঙ্গবন্ধুর ডাকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে দল-মত নির্বিশেষে ছাত্রসমাজ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন এবং বাংলাদেশ স্বাধীন করেছিলেন। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মূল শক্তিই ছিল ছাত্র-জনতা।

ইতিহাস বলে, সে সময়ের ছাত্র রাজনীতিতে হিংসার রাজনীতি ছিল না। ছিল কল্যাণের রাজনীতি-কল্যাণের জন্য একাত্মতার রাজনীতি। ৫২’র ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার অর্জনের  ৬ দফা ও ১১ দফা, ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০-এর নির্বাচন এবং ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ- সব অর্জনের মধ্যেই সে সময়ের ছাত্র রাজনীতির গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ভূমিকা লক্ষণীয়।

বলার আর অপেক্ষা রাখে না যে শহীদ আসাদের সময়ের ছাত্র রাজনীতিতে কাজ করতো প্রগতিশীল  দর্শন, জীবনবোধ ও সৃজনশীলতা। ‌ সে সময়ের ছাত্র রাজনীতিতে চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, মাদক-বাণিজ্য, ভর্তি বাণিজ্য, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, মতবিরোধে হত্যা, অস্ত্রের ঝনঝনানি ছিল না বলেই হয়তো তাদের লক্ষ্য ব্যক্তিস্বার্থ ছিল না, ছিল শিক্ষার আলো ছড়ানো, ছিল জাতীয় স্বার্থ, ছিল বৃহৎ জনগোষ্ঠীর স্বার্থ। সে সময়ের ছাত্র রাজনীতিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,  ছাত্র রাজনীতির লক্ষ্যই ছিল অন্ধকার পৃথিবীকে আলোকিত করা, শোষকের শোষণের অবসান ঘটানো, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়,পরাধীনতার বিরুদ্ধে বিপ্লব। পৃথিবীর যা কিছু কল্যাণকর অর্জন তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই  ছাত্র রাজনীতির ভূমিকা যে অপরিসীম তা প্রমাণ করে গেছে সে সময়ের ছাত্র রাজনীতি।

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, ১৯৪৮ সালে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার বিপ্লবের মূলশক্তি যেমন ছিল সে দেশের  ছাত্র রাজনীতি। তেমনি বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, সর্বোপরি একাত্তরের  স্বাধীনতা অর্জনে গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছিল এ দেশের ছাত্র রাজনীতি। এর সবই সম্ভব হয়েছিল এ কারণেই যে শিক্ষার আলোয় আলোকিত ছাত্রসমাজ ব্যক্তিস্বার্থের অন্ধকার বলয়ে আবদ্ধ হয়নি তখনও। তখনও মেধাবী ছাত্ররাই ছাত্র রাজনীতি করতো।

সময় এসেছে  সে সময়ের ছাত্ররাজনীতি ও রাজনীতিকদের সঙ্গে বর্তমান ছাত্র রাজনীতি ও রাজনীতিকদের মিলিয়ে দেখার। ছাত্র রাজনীতির চরম অবক্ষয়ের কারণ উদঘাটন করা এবং আমাদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ছাত্র রাজনীতির পদাঙ্ক অনুসরণের উপযোগী প্রেক্ষাপট তৈরির পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
 
লেখক: কথাসাহিত্যিক
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
আর্জেন্টিনার সঙ্গে হেরেও ম্যাচ শেষে হাসলো পোল্যান্ড
আর্জেন্টিনার সঙ্গে হেরেও ম্যাচ শেষে হাসলো পোল্যান্ড
আর্জেন্টিনার জয়ে উৎসবমুখর পুরান ঢাকা
আর্জেন্টিনার জয়ে উৎসবমুখর পুরান ঢাকা
নয়া পল্টনে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে দুই বার চিঠি দিয়েছে বিএনপি
আইজিপির সঙ্গে সাক্ষাৎ করবে প্রতিনিধি দলনয়া পল্টনে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে দুই বার চিঠি দিয়েছে বিএনপি
পোল্যান্ডের গোলরক্ষক যা করেছেন, গত ৪ বিশ্বকাপেও তা কেউ করতে পারেননি
পোল্যান্ডের গোলরক্ষক যা করেছেন, গত ৪ বিশ্বকাপেও তা কেউ করতে পারেননি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ