X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

আইন পরিপালন নাকি উদ্যোক্তা তৈরি: কোনটা জরুরি?

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২, ১৯:৪৭

মোহাম্মদ সিরাজ উদ্দিন বৈশ্বিক পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় অর্থনীতির মেরুকরণ হচ্ছে নানা দিক দিয়ে। কোভিড-১৯ এর নানা রূপ যেমন ধারণ করছে, তেমনি অর্থনীতিতে প্রতিযোগিতার রূপও পরিবর্তন হচ্ছে নিত্যদিন। দেশে দেশে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার, নীতিনির্ধারণী মহল, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিদ, শিক্ষাবিদ, ডাক্তার, বিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্লেষকসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ আছেন, যার যার অবস্থান থেকে কিছু একটা বিহিত করার কাজে ব্যস্ত।

বাংলাদেশের অবস্থানও একই রকম। এখানে অর্থনীতি দৃশ্যমান অবস্থান ভালো হলেও এর অনেক চ্যালেঞ্জ সামনে রয়েছে। শিক্ষা ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতিপূরণ যেমন কঠিন, তেমনি কঠিন হবে বেকার সমস্যা সমাধান। বছর বছর ২ থেকে আড়াই লাখ শিক্ষিত অথচ অদক্ষ বেকার যোগ হচ্ছে চাকরির বাজারে। এই বাস্তবতা ভবিষ্যতের বাংলাদেশের জন্য মোটেই শুভকর নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করে কর্মমুখী শিক্ষার দিকে দ্রুতগতিতে এগোতে হবে। একই সঙ্গে দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করতে হবে যুব সমাজকে। দক্ষতা কেবলই ‘কেরানি কাজে’ দক্ষতা নয়, প্রতিটি যুবককে তৈরি করতে হবে এক একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে। উদ্যোক্তা তৈরি করতে গেলে যুবকদের উৎসাহ জোগানো যেমন জরুরি, তেমনই আইনের বাধাগুলো চিহ্নিত করা এবং তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

কিন্তু এই কাজটা সহজ নয়। আইন তৈরি করা যেমন সহজ, আইন সংশোধন করা তেমনই কঠিন।

এবার শিরোনামের দিকে মনোযোগ দেওয়া দরকার। আমাদের তরুণ সমাজ নানা দিক দিয়ে হতাশ হলেও তারা কিন্তু কিছু একটা করতে চায়। তাই নতুন নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করে। কিন্তু এ উদ্যোগগুলো নিয়মের বলি হয়ে মুখথুবড়ে পড়ে শুরুতেই। শুধু তা-ই নয়, আমাদের আইন-কানুন এত বেড়ে গেছে তা দেখে অনেক বিদেশি কোম্পানি, এনজিও বাংলাদেশ থেকে ধীরে ধীরে তাদের কার্যক্রম  গুটিয়ে নিতে শুরু করেছে। এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য শুভ খবর নয়। আবার অনেক স্থানীয় উদ্যোক্তা নিয়মিত হতাশ হচ্ছেন। আইনের ফাঁদে পড়ে নানা হয়রানির শিকার হয়ে নিরাশ হয়ে পড়েন। এটাও আমাদের অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতিকর সংবাদ। আমার জানা মতে, বেশ কয়েকজনকে দেখেছি তারা আইনের বাধা ও সরকারি অফিসের কর্মকর্তাদের সেবায় হতাশ হয়ে নিজের ব্যবসায় উদ্যোগ বন্ধ করে বিভিন্নভাবে জীবিকা নির্বাহ করছেন। কেউ কেউ ধারদেনা করে বিদেশ পাড়ি দিচ্ছেন।

আসুন না একটু নজর দেই কী আইন? কী বাধা রয়েছে নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে?

অর্থ আইন ২০২১, কোম্পানি আইন-১৯৯৪, আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪, প্রস্তাবিত আয়কর আইন ২০২২ সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা যা দেখি, প্রতিটি আইনের মূল উদ্দেশ্য দুষ্টের দমন, সৃষ্টের পালন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে আসল বিষয় দেখার আগেই সৃষ্টিকে দুষ্ট মনে করে শাসন করার অভ্যাস গড়ে উঠেছে। এমন পরিবেশ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে, যা আমরা সহজে অনুধাবন করতে পারছি না।

অর্থ আইন ২০২১ (১১ নং আইন) সেকশন ৩৩ উপধারা (৫) বলা হয়েছে, “কোন স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বা এনজিওতে সেবা গ্রহণকারী প্রতিবন্ধী ব্যক্তিগণের সেবাস্থলে গম্যতার ক্ষেত্রে এবং সেবা প্রদানে দেশে বলবৎ আইনি বিধান অনুযায়ী উপযুক্ত ব্যবস্থা না রাখিলে ২০২১ সালের ১ জুলাই তারিখে আরম্ভ কর বৎসর হইতে উক্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করের ৫ (পাঁচ শতাংশ) অতিরিক্ত কর ধার্য করা হবে।”

এছাড়া সংঘগুলোর বর্তমান আয়কর হার ৩০%। এনজিওগুলোকে সংঘের আওতায় ট্যাক্সভুক্ত করা হয়েছে।

যৌক্তিকতা কতটুকু: করের হার নির্ধারণ ও অতিরিক্ত কর আদায়ের ক্ষেত্রে এনজিও’র আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় আনা দরকার। আমাদের দেশে এনজিও’র মানসিকতা গড়ে উঠেছে অধিকাংশ স্বেচ্ছাশ্রমের ওপর ভিত্তি করে। শিক্ষিত বেকার অথচ সমাজ সচেতন এমন তরুণরা এই স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান বা এনজিও বা সংঘগুলো গড়ে তোলে। দেশি-বিদেশি নানা সোর্স থেকে বিচ্ছিন্নভাবে তহবিল সংগ্রহ করে এই উদ্যোগগুলো সমাজে অনগ্রসর নারী-পুরুষদের স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার কাজে নিয়োজিত থাকে। সরকারের গৃহীত কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গে এসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কর্মকাণ্ডের ফলাফল জাতীয় অর্থনীতির মানদণ্ডে ব্যাপক অবদান রেখে চলছে। বর্তমানে  যেসব এনজিও ক্ষুদ্র ঋণের সঙ্গে জড়িত তারা ছাড়া প্রায় সব এনজিওই তহবিল সংকটে রয়েছে। গুটিকয়েক এনজিওকে বিবেচনা করে আইনের বিধিবিধান তৈরি করা বা পরিপালন করা সিদ্ধান্ত যৌক্তিক হয় না। এটা অবশ্যই খেয়াল রাখা প্রয়োজন, আইনের যেকোনও সুযোগে যেন স্বেচ্ছাশ্রমের বিশাল ক্ষেত্রটি বাধাগ্রস্ত না হয়।

কোম্পানি আইন-১৯৯৪: কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর অধীন গঠিত যেকোনও লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে বার্ষিক রিটার্ন জমা ও  অডিট প্রতিবেদন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায় অধিকাংশ ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা কয়েকজন ছোট ছোট বিনিয়োগকে একত্রিত করে বিনিয়োগ করার উদ্দেশ্যে কোম্পানি আইনে রেজিস্ট্রেশন গ্রহণ করেন। কিন্তু মূলধন জোগান দিতে তাদের অনেকটা সময় লেগে যায়। হয়তো উদ্যোক্তাদের মূলধন সংকট বা ঐক্যের অভাবে তারা মূলধন দিয়ে ব্যবসা শুরুই করতে পারছেন না। কিন্তু ব্যবসা শুরু করুন বা নাই করুন, বার্ষিক অডিট রিপোর্ট ও রিটার্ন ফাইল করতেই হবে। আইনে আছে, না করলে জরিমানার মধ্যে পড়তে হবে। এখানেই শেষ নয়, আয়কর অফিস থেকে কোম্পানির মালিককে না জানিয়ে ই-টিআইএন তৈরি করে এবং আয়কর রিটার্ন জমা করার জন্য নোটিশ প্রেরণ করে থাকে।

পরবর্তী সময়ে দেখা যায়, উক্ত কোম্পানির শেয়ারহোল্ডারদের নোটিশের জবাব দিতে গেলে নানাভাবে হয়রানির মধ্যে পড়তে হয়। এমন পরিস্থিতিতে নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে একটি ভুল বার্তা চলে যাচ্ছে। যা আমাদের পরবর্তী প্রজন্মের উদ্যোক্তা তৈরির জন্য বড় বাধা হয়ে দেখা দিচ্ছে। এইটা আইনের একটা অপচর্চা। এটা বন্ধ করা জরুরি। অন্তত কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন গ্রহণের ৫ বছরের জন্য সব  প্রকার রিটার্ন দেওয়া বা অডিট রিপোর্ট জমা দেওয়া থেকে অব্যাহতি দেওয়া দরকার। কারণ, কোম্পানি ব্যবসায় বিনিয়োগ নিয়ে দাঁড়াতে পারলে সরকারের আয় রাজস্ব আয় যেমন বেড়ে যাবে, তেমনি বেকারত্ব হ্রাসে ব্যাপক অবদান রাখবে।

আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ ও প্রস্তাবিত আয়কর আইন ২০২২: আয়কর অধ্যাদেশ ১৯৮৪ সালের প্রায় অনুবাদ কপি হচ্ছে প্রস্তাবিত আয়কর আইন ২০২২। নতুন আইনি আয়কর ব্যাপক হারে পর্যালোচনা দরকার। আইনের ফাঁদে পড়ে যেন করদাতার নিশ্বাস বের না হয়ে যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। নতুন আইনটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, করদাতা ও কর কর্তাদের মাঝে দূরত্ব আগের মতোই থেকে যাচ্ছে। অভিজ্ঞ নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণ ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দসহ অভিজ্ঞ মেম্বার অব পার্লামেন্টকে সংযুক্ত করে আইনি তৈরি করা জরুরি। আমাদের দেশের প্রায় আইনই আমলানির্ভর হয়ে থাকে; যার কারণে বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আইনটিতে সর্ব অংশীজনের যেন অংশগ্রহণ থাকে, সেদিকে নজর দেওয়া জরুরি।

নতুন আইনটিতে যেসব বিষয় জরুরি ভিত্তিতে সংযোজন করা প্রয়োজন:

১. ছোট কোম্পানি বা উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে সহায়ক কর ব্যবস্থাপনা, যেখানে একজন নতুন উদ্যোক্তাকে ব্যবসা পরিচালনার শুরু থেকে কমপক্ষে ৫ বছর কোনও করের ফাইল করতে হবে না;

২. ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিট আয়ের কর অব্যাহতি;

৩. এনজিও কর্মীদের ইউনিক আইডি প্রদান;

৪. সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবীদের একই নিয়মে কর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা;

৫. সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানদের সরকারি স্কুল, কলেজে না পড়ালে ১০০% বেশি কর পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা; একইভাবে সরকারি স্কুল, কলেজে সন্তানদের পড়ানো অভিভাবকদের ৫০% কর ছাড় দেওয়া;

৬. ব্যাপক হারে করদাতা নির্বাচনের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কার্যক্রম ইউনিয়ন পর্যন্ত সম্প্রসারণ করা;

৭. করদাতাদের হয়রানি বন্ধ করা; ইত্যাদি।

তবে সবই নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর। সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে কর ব্যবস্থাপনার মান উন্নয়ন করবে কিনা। কেবল তখনই সম্ভব হবে এর ইতিবাচক দিকগুলো করদাতা তথা দেশের নাগরিকদের কাজে আনা।

লেখক: আয়কর আইনজীবী

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পারিবারিক সহিংসতায় বেড়েছে মাদকসেবন ও আত্মহত্যার প্রবণতা: ফ্লাড
পারিবারিক সহিংসতায় বেড়েছে মাদকসেবন ও আত্মহত্যার প্রবণতা: ফ্লাড
বন্যাকবলিত মানুষের পাশে আমিরাত প্রবাসীরা
বন্যাকবলিত মানুষের পাশে আমিরাত প্রবাসীরা
ভিজিএফের চালে পাথর, সুবিধাভোগীদের মাঝে ক্ষোভ
ভিজিএফের চালে পাথর, সুবিধাভোগীদের মাঝে ক্ষোভ
এডিট করা ছবি ভাইরালের হুমকি, যুবকের ৮ বছর জেল
এডিট করা ছবি ভাইরালের হুমকি, যুবকের ৮ বছর জেল
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ