X
মঙ্গলবার, ০৫ জুলাই ২০২২
২১ আষাঢ় ১৪২৯

‘সব কামাই তো ঢাকায় মামা’

আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২২, ১৭:৩৫

ডা. জাহেদ উর রহমান সম্পূর্ণ আমদানি করা পণ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হওয়া সম্পূর্ণ রফতানিমুখী শিল্প গার্মেন্ট ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জে হওয়ার কোনও যুক্তি ছিল না। এটা দুই দফা পরিবহন ব্যয় যোগ করে আরও বেশি খরুচে হয়ে ওঠে। শুধু সেটাই না, এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে যায় অনেক। সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলে এই শিল্প হওয়ার কথা ছিল সমুদ্রবন্দরের আশপাশের জেলাগুলোতে। শুধু মালিকদের আবাসস্থলের কাছে রাখার জন্য এই শিল্প দিয়ে একটা সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। এটা শুধু একটি উদাহরণ, কিন্তু এই শহরকে ঘিরে এমন অপরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, হচ্ছে একের পর এক।

অপরিকল্পিত পদক্ষেপের মাশুল হিসেবে বর্তমানে এক অচল নগরীতে পরিণত হয়েছে ঢাকা। ঢাকায় যানবাহনের গড় গতি এখন হাঁটার চাইতে কম। আর সব অপরিকল্পিত পদক্ষেপের সঙ্গে পরিবহন খাতের চরম অব্যবস্থাপনা এই সংকটকে ভয়ংকর পরিস্থিতিতে নিয়ে যাওয়ার পেছনে দায়ী, কোনও সন্দেহ নেই।

ঢাকা স্ট্রাকচারাল প্ল্যানের ২০১৭ সালের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে মোট ট্রিপ হয় প্রায় সাড়ে তিন কোটি। এরমধ্যে ৭ দশমিক ২২ শতাংশ হয় ব্যক্তিগত গাড়িতে, যদিও রাস্তার ৭০ শতাংশের বেশি দখলে রাখে ব্যক্তিগত গাড়ি। এই একটা তথ্যই স্পষ্ট করে ব্যক্তিগত গাড়ি আর বাড়ানো দূরেই থাকুক, কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে কমিয়ে আনতে না পারলে এই শহর সচল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ঢাকা স্ট্রাকচারাল প্ল্যানে খুব স্পষ্টভাবেই বাসভিত্তিক গণপরিবহনকে ভিত্তি করে ঢাকার পরিবহন পরিকল্পনা করার কথা বলা হয়েছিল।

কিন্তু আমরা সেদিকে যাইনি, গেছি ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল বানানোর দিকে। এখন আবার নেওয়া হচ্ছে পাতাল রেলের পরিকল্পনা। অবকাঠামো প্রকল্প মানেই দৃশ্যমান উন্নয়ন, আর তার চাইতে বড় কথা, এমন প্রকল্প মানেই কপাল খুলে যাওয়া বেশ কিছু মানুষের। তাই এসবই চলছে এই শহরে।

ধরে নেওয়া যাক ঢাকা শহরের পরিবহন নিয়ে যাবতীয় সব পরামর্শ কার্যকর করা হলো। তাহলে তারপর কি এই শহর পুরোপুরি বাসযোগ্য হয়ে যাবে? এতে কোনও সন্দেহ নেই প্রস্তাবিত সব পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে অনেকটা। কিন্তু এটুকু করলেই কি সেটা আদৌ টেকসই হবে?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ঢাকায় আসেন কেন নিজ জেলা ছেড়ে? এই প্রশ্নটা দীর্ঘদিন আমার মাথায় ঘুরপাক খেয়েছে। এটা কি এই কারণে যে ঢাকার একটা ভালো কলেজে পড়লে যে বিষয়ে তিনি পড়ছেন সেই বিষয়ে তিনি অনেক ভালো জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন?

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বাদ দেই, দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশিরভাগ বিষয়ের শিক্ষার্থীদের নিজের বিষয়ের জ্ঞান অর্জনের প্রতি আগ্রহ প্রায় তলানিতে। এটা শিক্ষার্থীদের দোষ না। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আমরা এমন সব বিষয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর তৈরি করছি, যেগুলোর সঙ্গে বাস্তবের চাকরির বাজারের ন্যূনতম কোনও মিল নেই। এমন সব বিষয় শিক্ষার্থীরা পড়েন যেগুলো আসলে তাদের পছন্দ ছিল না, মেধা তালিকায় অবস্থান তাদের সেই বিষয় পড়তে বাধ্য করেছে।

বাংলাদেশের গত বেশ কয়েক বছরে কর্মসংস্থানের একটি মাত্র ক্ষেত্র আছে যেটার পেছনে শিক্ষার্থীরা উন্মত্তের মতো দৌড়াচ্ছে। সেটি হলো বিসিএস। দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দেখা যায় তাদের অনেকেই ডিপার্টমেন্টের পড়াশোনা শিকেয় তুলে বিসিএস গাইড পড়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে। মূলত বিসিএস’র  পড়াই যেহেতু আমাদের স্নাতক শিক্ষার্থীদের অনেকের কাজ, তাহলে সেটা তো জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা তাদের নিজ জেলা কিংবা আশপাশের জেলার কলেজে পড়েই করতে পারেন। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমার মাথায় প্রশ্ন এসেছিল, কেন তারা ঢাকার কলেজে পড়তে আসেন?

পরে আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের কাছে বিষয়টা নিয়ে জানতে চাই। তখন বেরিয়ে আসে এর আসল কারণ। এসব শিক্ষার্থী খুবই অভাবী পরিবারের সন্তান। পড়াশোনার খরচ নিজেদের জোগাতে তো হবেই, কারও কারও ক্ষেত্রে পরিবারকে সাহায্য করার দায়ভারও আছে। তাদের এলাকায় যথেষ্ট টিউশনি পাওয়া যায় না এবং পেলেও তাতে উপার্জন হয় খুব কম। ঢাকায় থাকলে মেসে থাকা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেশি হলেও টিউশনের উপার্জন দিয়ে সেটা মিটিয়ে বাড়িতেও টাকা পাঠাতে পারেন তারা। তাদের প্রায় সবার শিক্ষা জীবনের সঙ্গে ঢাকায় থাকার আসলে তেমন কোনও যোগাযোগ নেই। যোগাযোগ আছে উপার্জনের।

কয়েক দিন আগেই একটি রিকশা ঠিক করার সময় রিকশাচালক বললেন তাকে দেখিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এমন কথা বলার অর্থই হচ্ছে তিনি ঢাকার একেবারে ভিন্ন কোনও এলাকায় থাকেন অথবা ঢাকায়ই নতুন এসেছেন। তার কাছে জানতে চাইলাম, তার ক্ষেত্রে কোনটা সত্যি। জানালেন তিনি ঢাকায় নতুন এসেছেন।

রিকশায় উঠে কথা বলছিলাম তার সঙ্গে। জানতে চাইছিলাম তার বাড়ি কোথায়, আগে কি করতেন। জানালেন তার বাড়ি দিনাজপুরে, আগেও রিকশা চালাতেন। জিজ্ঞেস করলাম, তিনি কেন ঢাকায় চলে এলেন। বললেন, গ্রামে ‘কামাই নাই’, তাই পরিবার নিয়ে চলতে পারছেন না।

এর আগেও আর এলাকার অন্য রিকশাচালকরা তাকে ঢাকায় আসতে বলেছেন বারবার। স্ত্রী-সন্তান, বাবা-মা ছেড়ে তার আসতে ইচ্ছে করেনি। কিন্তু ঢাকায় আসার পর একদিনের মধ্যেই তিনি বুঝে গেছেন, তিনি এর আগে ঢাকায় না এসে ভুল করেছেন। কারণ জিজ্ঞেস করতেই বললেন, ‘সব কামাই তো ঢাকায় মামা’।

ওই রিকশাচালক যে জেলা থেকে এসেছেন সেই দিনাজপুর কুড়িগ্রামের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় দরিদ্রতম জেলা। এই জেলায় করোনার আগেই দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী মানুষের হার ছিল ৬৪ শতাংশ, যা কুড়িগ্রামের ক্ষেত্রে ৭২ শতাংশ। শুধু তা-ই নয়, রংপুর বিভাগের ৮ টি জেলার মধ্যে ৬টিই আছে বাংলাদেশের সবচেয়ে দারিদ্র্যপ্রবণ ১০টি জেলার মধ্যে।

ওদিকে করোনার আগে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ জেলায় দারিদ্র্যের হার ছিল ১ থেকে ৩ শতাংশের মধ্যে। পশ্চিম পাকিস্তানের কাছ থেকে আলাদা হয়ে পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাদেশ হয়ে ওঠার পেছনে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল দুই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য। দুই পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যকে ভিত্তি করেই ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অতি আলোচিত ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শিরোনামে পোস্টারটি করা হয়েছিল। আজকের বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকার মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে কিছু এলাকা এখন আবার শ্মশানের সঙ্গে তুলনীয় হতে পারে।

দেশের সবকিছুকে ঢাকায় কেন্দ্রীভূত করে ফেলা হয়েছে। ভালো চিকিৎসা, শিক্ষা, সরকারি-স্বায়ত্তশাসিত অফিস, সর্বোচ্চ আদালত সবকিছুর জন্য মানুষকে ঢাকায় আসতে হয়। এসব কিছুর চাইতে আরও অনেক বেশি সমস্যা তৈরি করেছে মানুষের উপার্জনের সংকট।

এটুকু আমরা বুঝি একটা দেশের রাজধানী কেন্দ্রিক অর্থনীতি দেশের অন্যান্য এলাকার চাইতে বেশি বিকাশমান হবে। ঠিক একই বিষয়ে ঘটবে আরও কিছু বড় শহরকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সেটা কখনও এমন হয়ে উঠতে পারে না যে মানুষ টিকে থাকার জন্য হলেও তাকে ঢাকায় এসে হাজির হতে হবে।

প্রতিটি ঈদের ছুটির সময় ঢাকা ছেড়ে যাওয়া মানুষদের তাদের স্বজনদের সঙ্গে ঈদ করা নিয়ে মিডিয়ার সংবাদে একটা কথা বলা হয় সবসময়– নাড়ির টানে ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছে মানুষ। যেখানে মানুষের নাড়ি পোঁতা থাকে, সেখান থেকে অনেকটা দূরে এক বাস অযোগ্য শহরে থেকে যেতে নিশ্চয় ইচ্ছে করে না অসংখ্য মানুষের। তাদের জীবিকা যদি হতো নাড়ি পোঁতা স্থানটির কাছেই, তাহলে বেঁচে যেতেন তারা, বেঁচে যেত এই শহরটি।

মানুষের কামাইকে যদি সারা দেশে সুষমভাবে ছড়িয়ে দেওয়া না যায়, তাহলে পরিবহন কেন্দ্রিক আর যত পদক্ষেপ নেওয়া হোক না কেন, এই শহর ক্রমাগত অচল হয়ে উঠবে। মানুষের ইচ্ছে থাকুক বা না থাকুক, মানুষকে আসতে হবেই। কারণ, সব কামাই তো ঢাকায়।

লেখক: শিক্ষক ও অ্যাকটিভিস্ট

      

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
কাঠগড়ায় তারকারা: দেশ মানে না আপনি মোড়ল!
কাঠগড়ায় তারকারা: দেশ মানে না আপনি মোড়ল!
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শপথবাক্য ঠিকমতো পড়ানো হয় না
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শপথবাক্য ঠিকমতো পড়ানো হয় না
‘প্রবাসী ফুটবলারদের বাঁকা চোখে দেখা হয়’
‘প্রবাসী ফুটবলারদের বাঁকা চোখে দেখা হয়’
ফারিয়ার ঈদ এবার কলকাতায়
ফারিয়ার ঈদ এবার কলকাতায়
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ