X
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২
১১ আষাঢ় ১৪২৯

‘মা’ তুমি এমন কেন?

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০২২, ১৯:২৯

রাজন ভট্টাচার্য এক অক্ষরের বর্ণমালায় বহুল বিস্তৃত শব্দ হলো ‘মা’। ছোট্ট এই শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সব মায়া, মমতা, অকৃত্রিম স্নেহ, আদর ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

সময় ও বাস্তবতার কারণে এখন নানা অঘটন ঘটছে। বাড়ছে সামাজিক অপরাধ। এসব অপরাধে কমবেশি মায়েরা জড়িয়ে যাচ্ছেন বা জড়ানো হচ্ছে। প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে মাতৃত্বের মমতা আর ‘মা’ ডাকের বিশুদ্ধ উচ্চারণ।

গত ২৫ এপ্রিল সোমবার পত্রিকার পাতায় মাকে জড়িয়ে দুটি ঘটনা প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় সমাজের সব মানুষকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়েছে।

টাঙ্গাইলে পারিবারিক কলহের জের ধরে দুই শিশুকে হত্যার পর মায়ের যখন আত্মহত্যার চেষ্টার ঘটনা খবরের কাগজে পড়েছি ঠিক তখন রাজধানীর কলাবাগানের তেঁতুলতলা খেলার মাঠে থানা নির্মাণের প্রতিবাদে মায়ের সঙ্গে ১৬ বছরের সন্তানকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। তাদের থানা হাজতে রাখা হয়। মামলা শেষে ১২ ঘণ্টা পর  মুচলেকা দিয়ে দুজনের মুক্তি মিলে।

সম্প্রতি দুই শিশুকে বিষ খাইয়ে হত্যার পর ‘মা’ গুজব রটিয়েছিলেন প্যারাসিটামল সিরাপে সন্তানদের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তদন্তে বেরিয়ে আসে মায়ের অভিযোগ সত্য নয়। তিনি ব্যক্তিগত সম্পর্কে নিজেকে জড়িয়ে কৌশলে দুই সন্তানকে হত্যা করেছেন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই টাঙ্গাইলে মায়ের হাতে আরও দুই শিশুর প্রাণ গেলো!

এত কথার অবতারণা এই কারণেই, ধানমন্ডিতে মায়ের সঙ্গে সন্তানকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে দীর্ঘ সময় আটকে রাখা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ, মাঠে থানা নির্মাণের প্রতিবাদে ২৪ এপ্রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাইভে এসে কথা বলছিলেন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মা ও ছেলেকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ।

অপ্রাপ্ত বয়স্ক একজন কিশোরকে দীর্ঘ সময় থানা হাজতে রাখা আইনের দৃষ্টিতে পুরোপুরি বেআইনি ও সংবিধান লঙ্ঘন। তেমনি মামলা, অভিযোগ বা গ্রেফতারি পরোয়ানা ছাড়া মা সৈয়দা রত্নাকে আটকে রাখার বৈধতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নেই।

রাতে যখন মা ও ছেলেকে মুক্তি দেওয়া হয় এর আগেই হাজতে থাকা প্রিয়াংশুর ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে যায়। তেমনি সকাল থেকেই রত্নাকে আটক করার ঘটনা নিয়েও সোশাল মিডিয়ায় পুলিশের বিরুদ্ধে ব্যাপক ট্রল হচ্ছিল।

থানা হাজত থেকে মুক্তির পর দেখা গেছে মা রত্না ছেলের কপালে চুমো খাচ্ছেন। পরম মমতায় ছেলেকে বুকে জড়িয়ে নিয়েছেন তিনি। অর্থাৎ মায়ের স্বভাবসুলভ যে কাজটি করার কথা তিনি তা-ই করেছেন। এটিই স্বাভাবিক। মায়ের কাছে সন্তানের চেয়ে আর বড় কী হতে পারে। সন্তানের জন্য মা কত ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন তা আর নতুন করে বলার কিছু নেই। গোটা পৃথিবীজুড়ে যদি পরিবারে ভালোবাসা গল্প লেখার প্রতিযোগিতা হয় সেখানেও ‘মা’ হবেন সেরা।

তাই রত্না দীর্ঘ সময় থানায় থেকে নিজের কথা চিন্তা করেননি। ছেলেকে নিয়ে ভেবেছেন বেশি। কারণ, ছেলেটির বোঝার বয়স হলেও সে কার্যত নাবালক। অপরাধীকে পুলিশ ধরে, থানায় নেয়, জেলে পুরে। কিন্তু তার ছেলে তো কোনও অপরাধ করেনি। মাঠে থানা নির্মাণের প্রতিবাদে তো ধানমন্ডির বহু নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে পরিবেশবাদী লোকজন শামিল হয়েছিলেন। একজন সচেতন নারী হিসেবে বা পরিবেশের সুরক্ষার পাশাপাশি এলাকার শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের কথা ভেবে তিনিও মাঠ রক্ষার আন্দোলনে নিজের যুক্ত করেন।

মায়ের সঙ্গে ছেলেও প্রতিবাদে শামিল হয়। সবার প্রতিবাদের ভাষা ছিল এক ও অভিন্ন। কিন্তু পুলিশের নজরে পড়েছে রত্না ও তার ছেলের দিকে। বিনা অপরাধে থানায় নিয়ে দীর্ঘ সময় জিজ্ঞাসাবাদ ও আটকে রাখায় ছেলের ওপর শারীরিক ও মানসিক বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে, এই ভেবে মায়ের বেশি চিন্তিত হওয়ার কথা। তাছাড়া সমাজে তো ভালো কাজকে সুন্দর দৃষ্টিতে না দেখার প্রবণতা আছে।

ছেলেটি সকাল হলেই বাসা থেকে বের হবে, বন্ধুদের সঙ্গে মিশবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাবে। থানা হাজতে থাকায় সামাজিকভাবে তাকে যদি হেয় প্রতিপন্ন হতে হয়, কেউ যদি তাকে নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করে, এই ভেবে মায়ের দুশ্চিন্তা হওয়া অমূলক নয়।

তাই হয়তো মুক্তির পর ছেলেকে আদরে আদরে মা সাহস জোগাচ্ছিলেন। মায়ের বার্তাটি এরকম ছিল- তুমি কোনও অপরাধ করোনি। ভেঙে পড়ার কিছু নেই। ভালো কাজকে মা যদি সমর্থন করেন তাহলে কথা একটাই, পাছে লোকে কিছু বলে।   

একদিকে সমাজে রত্নার মতো মায়েরা সঠিক অবস্থানে থেকেই নীরবে নিভৃতে নারী ও মাতৃত্বকে আগলে রাখছেন। অপরদিকে খুব ছোট্ট পরিসরে ‘মা’ ডাকটি নানা কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। যদিও এর পেছনে সামাজিক নানা বৈষম্য, অপরাধ, লোভ, আর্থিক, নির্যাতনসহ বহু কারণ রয়েছে। এসব বাস্তবতায় হয়তো মায়েরা অনেক সময় মাতৃত্বের ভূমিকা ভুলে গিয়ে অন্যরকম আচরণ করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সত্যিই দুঃখজনক। কোনও মা এমন পরিস্থিতির দিকে যাক, আমরা তা কখনোই চাই না।

যারা নারী সমাজ ও মায়েদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি ঠেলে দিচ্ছেন তাদের বিষয়টি অনুধাবন করা উচিত। কারণ, মা যদি কোনও অপরাধ করেন, তবে পুরো মাতৃত্ব নিয়ে টান দেওয়া হয়। যদিও মাতৃত্বের বিষয়টি এত ঠুনকো নয়। দেশের সামাজিক বাস্তবতায় মাকে ‘খারাপ’ বলতে বেশি সময় লাগে না। যাদের কারণে অনেকে আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছেন, তাদের অনেকেই কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে। 

পার্থিব উপন্যাসে শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন, ‘মানুষ যখন ভয় পায়, যখন বিপদে পড়ে, যখন মনে হয় একা, তখন ভয়ার্ত শিশুর মতো মাকেই আঁকড়ে ধরে।’

তাই আমরা কেউ চাই না ‘মা’ শব্দের নিষ্পাপ উচ্চারণের সঙ্গে সন্তান হত্যার কলঙ্ক জড়িয়ে যাক। সব সন্তান মাকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাক এটাই কাম্য। মায়ের হাতে কোনও সন্তান হত্যা হতে পারে আজ থেকে হাজার বছর আগে হয়তো কেউই চিন্তা করেননি। গৌতম বুদ্ধ বলেছেন, ‘মা যেমন তার নিজ পুত্রকে নিজের জীবন দিয়ে রক্ষা করে তেমনি সব প্রাণীর প্রতি অপরিমেয় মৈত্রীভাব পোষণ করবে।’

সমাজ পরিবর্তনশীল, অনেক কিছুর পরিবর্তনের হাওয়া মায়েদের গায়েও লেগেছে।  তেঁতুলতলা মাঠটি নিয়ে জেলা প্রশাসন ২০২০ সালের ২৪ আগস্ট এক নোটিশে জানায়, ডিএমপির কলাবাগান থানার নিজস্ব ভবন নির্মাণের জন্য এই সম্পত্তি অধিগ্রহণের প্রস্তাব করা হয়েছে। নোটিশ দেওয়ার পর থেকেই স্থানীয় লোকজন জায়গাটিকে মাঠ হিসেবেই রাখতে প্রতিবাদ করে আসছিলেন। কারণ, এখানে শিশুদের জন্য খেলার মাঠ নেই। বয়স্কদের জন্য হাঁটার জায়গাও নেই।

প্রতিবাদের কারণেই রত্না তার সন্তানকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় রীতিমতো তোলপাড় সৃষ্টি হয়। মঙ্গলবার দিনভর এ ঘটনার প্রতিবাদে পরিবেশবাদী সংগঠন মানবাধিকার কর্মী থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজন তেঁতুলতলা মাঠে দিনভর নানা কর্মসূচি পালন করেছেন। তেমনি মা রত্নাকে বাহবা জুগিয়েছেন। মা হিসেবে সন্তানকে প্রতিবাদে শামিলের সাহস জোগানোর চুমো খাওয়া ছবিও ফেসবুকে ভাইরাল।

সমাজে মায়েরা সন্তানকে একদিকে যেমন আগলে রাখছেন তেমনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জে মিষ্টির সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দুই শিশুকে মায়ের হত্যা ঘটনা সত্যিই কষ্টদায়ক। পরকীয়ার জের ধরে এই ঘটনাটি ঘটেছে।

এর আগে খুলনার তেরখাদা উপজেলার কুশলা গ্রামে ২ মাস বয়সী যমজ শিশু মনি ও মুক্তাকে হত্যা করে তার মা কানিজ ফাতেমা কনা। এরপর মরদেহ বাড়ির পাশের পুকুরে ফেলে দিয়ে বাচ্চা উধাও হওয়ার নাটক সাজান তিনি। সামাজিক বিরোধের জেরে প্রতিবেশীকে ফাঁসাতে পুকুরে ফেলে মা নিজের সন্তানকে হত্যার রহস্য সম্প্রতি উন্মোচন করেছে পিবিআই। এ রকম ঘটনা এখন বেশ ঘটছে।

মায়ের কোমল হাত কীভাবে একজন সন্তানকে হত্যা করতে পারে? আমরা এমন হত্যার খবর আর শুনতে চাই না। আবারও বলছি প্রতিটি অঘটনের পেছনে অন্য কোনও রহস্য থাকে। এসব রহস্য যদি উন্মোচন করা সম্ভব হয় এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে মায়ের হাতে হয়তো আর কোনও সন্তানের প্রাণ যাবে না।

রত্নার মতো সবসময় মায়েরা সন্তানের পাশে থাকবেন, দেশও মানুষের প্রয়োজনে প্রতিবাদে-ভালো কাজে নিজের সঙ্গে সন্তানকে যুক্ত রাখবেন। আপদে বিপদে মানসিক শক্তি জোগাবেন। তাহলে বিচ্ছিন্ন দু-একটি অঘটনের কারণে কেউ আর বলবে না ‘মা’ তুমি এমন কেন?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সমাবেশস্থলে জনস্রোত
রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে সমাবেশস্থলে জনস্রোত
এই সেতু দিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো: পিয়া জান্নাতুল
গৌরবের পদ্মা সেতুএই সেতু দিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো: পিয়া জান্নাতুল
পদ্মা সেতু: অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
পদ্মা সেতু: অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ