X
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২
১১ আষাঢ় ১৪২৯

একটি মহৎ প্রাণের মহাপ্রয়াণ

আপডেট : ০১ মে ২০২২, ১৬:৩৩
আবদুল মান্নান আবুল মাল আবদুল মুহিত, বাংলাদেশের সাবেক অর্থমন্ত্রী শুক্রবার দিবাগত রাত একটা নাগাদ রাজধানীর একটি হাসপাতালে ৮৮ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। করোনাকালে দেশের আর একটি নক্ষত্রের বিদায়।  মুহিত সাহেবের প্রয়াণের সময়টা তাৎপর্যপূর্ণ। মাসটি পবিত্র রমজান মাস,  বরকতের মাসে। পূর্বেও দিনটি  জামাতুল বিদা’র দিন ছিল। রাজনীতি হতে অবসর নেওয়ার পর মুহিত সাহেব কিছুটা শারীরিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। করোনায়ও আক্রান্ত হয়েছিলেন। শেষের দিকে অপ্রত্যাশিতভাবে নিজের কাছের কিছু মানুষের কারণে পেরেশানিতেও পড়েছিলেন। যথারীতি সেখানেও প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে তার সমাধান হয়। এই দেশ এখন একজন শেখ হাসিনাই হয়ে উঠেছেন সকলের ‘মুশকিল আহসানে’র শেষ ভরসা।  শেখ হাসিনার পাশে থেকে তাঁর হাতকে শক্তিশালী করেছেন যারা তাঁদের মধ্যে মুহিত সাহেব অন্যতম। তেমন মানুষের সংখ্যা এখন দ্রুত কমে যাচ্ছে। তাঁদের স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন উল্টো চরিত্রের মানুষরা, যারা অনেকেই মধ্য মেধার বা অতিথি রাজনীতিবিদ। এরা রাজনীতির জগৎটাকে ইতোমধ্যে কলুষিত করে দিয়েছেন। অথচ মুহিত সাহেব প্রচলিত অর্থে কোনও রাজনীতিবিদ ছিলেন বলে আমার কখনও মনে হয়নি। ছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র। নিয়েছেন বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয় হার্ভার্ডের অর্থনীতি বিষয়ে ডিগ্রি।
 
দেশ বা সমাজের মঙ্গল করতে সবসময় রাজনীতিবিদ হতে হবে তা যে সঠিক নয় তিনি তা প্রমাণ করেছেন। রাজনীতির বাইরে থেকেও মানুষের যে সেবা করা যায় মুহিত সাহেব তার বড় উদাহরণ। মুহিত সাহেব কর্মজীবনে ছিলেন আমলা, ছিলেন ভাষা সৈনিক, প্রবাসী মুক্তিযোদ্ধা। ছিলেন একজন সফল অর্থমন্ত্রী, ভালোবেসেছিলেন দেশটাকে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে জাতীয় সংসদে মোট ১২ বার বাজেট পেশ করে রেকর্ড করেছেন। তাঁর পেশ করা প্রথম বাজেটের তুলনায় তাঁর শেষ বাজেট ছিল ৯৮ গুণ বেশি। বাংলাদেশের মতো একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির দেশের বাজেটও যে হাজার কোটি টাকা হতে লাখ কোটি টাকার হতে পারে তিনি তা দেখিয়ে দিয়েছেন। প্রমাণ করেছেন দেশের অর্থমন্ত্রীদের বাজেট প্রস্তুত করার আগে প্যারিসে ধনী দেশ ক্লাব ‘এইড কনসোর্টিয়ামে’র দরজায় ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বসে থাকার মধ্যে কোনও গৌরব নেই, গ্লানি আছে। তার জন্য নিজ দেশের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তিনি তা বাড়িয়েছিলেন। দেশের মানুষের মনে নিজ দেশের জন্য একটি আস্থার জায়গা করে নিয়েছিলেন। সামষ্টিক  ও ব্যাস্টিক অর্থনীতিকে নিয়ে গেছেন একটি স্বস্তির জায়গায়।  মুহিত সাহেব স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে ‘মুহিত সাহেব’ বলে সম্বোধন করতেন বলেছেন তিনি তাঁর সাক্ষাৎকারে। তাঁর মতো আর একজন সাবেক আমলা মন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছিলেন। শিক্ষামন্ত্রী এএইচকে সাদেক। প্রধানমন্ত্রী  তাঁকে ডাকতেন ‘পণ্ডিত মন্ত্রী’  হিসেবে। বছর কয় আগে সাদেক সাহেবের এক স্মরণসভায় বক্তব্য রাখতে  গিয়ে মুহিত সাহেব বলেছিলেন, তাঁর আমলে তাঁর মন্ত্রণালয় যেমন দুর্নীতিমুক্ত ছিল তা আর কখনও হয়নি। এখন তো প্রায় সব ক্ষেত্রে ‘বেড়ায় ক্ষেত খাচ্ছে’।  

মুহিত সাহেবের সাথে আমার প্রথম দেখা তাঁর বনানীর বাসায় ১৯৯৫ সালের প্রথম দিকে। আগের বছর চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো মেয়র নির্বাচনে চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচিত হন মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তিনি ছিলেন নাগরিক সমাজের প্রার্থী। তাঁর নির্বাচনের পর এই নির্বাচনকে নিয়ে একটি বিস্তারিত দালিলিক সংকলন প্রকাশ করে তা আমি মুহিত সাহেবের হাতে দেওয়ার জন্য তাঁর বাসায় সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি প্রথম দেখাতেই আপন করে নেন এবং সংকলনটির পাতা উল্টে আমাকে এমন একটি ব্যতিক্রমী প্রকাশনার জন্য ধন্যবাদ জানান। মনে হলো বনানীর বিরাট বাসায় তিনি একাই থাকেন। পরে জেনেছি সাথে তাঁর স্ত্রীও থাকতেন। বিরাট ড্রয়িং রুমের আসবাবপত্র কাপড় দিয়ে ঢাকা। জানালেন বই সংগ্রহ তাঁর একমাত্র শখ। নিজ বাড়িতে পঞ্চাশ হাজার বইয়ের গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন। বর্তমান সময়ের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ তো দৈনিক পত্রিকাও পড়েন বলে মনে হয় না। মুহিত সাহেব সংগীত শুনতেও ভালোবাসতেন। ভালোবাসতেন খেলাধুলা। সৎ ছিলেন আপাদমস্তক। জানালেন অবসর জীবনটা বই পড়ে কাটিয়ে দেবেন। জীবনের শেষ দিনগুলো নিজ জেলা সিলেটে কাটানোর ইচ্ছা ছিল। শেষবারের মতো তিনি শনিবার সিলেটে ফিরে গেছেন। ঢাকায় অনুষ্ঠিত শাস্ত্রীয় সংগীত অনুষ্ঠানে তিনি সামনের কাতারে বসে রাতভর সংগীত উপভোগ করতেন। প্রতিবছর একুশে বইমেলায় তিনি সময় পেলেই ছুটে যেতেন। সম্ভবত সর্বশেষ তিনি গিয়েছিলেন ২০১৯ সালে। তখন তিনি হুইল চেয়ারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই ছবি প্রকাশিত হলে কেউ কেউ ট্রল করে লিখেছিলেন ‘একসময় এই মানুষটির আগে পিছে কত প্রটোকল ছিল, ছিল কত ক্ষমতা। এখন তাঁর পাশে হুইলচেয়ার ঠেলার মানুষটি ছাড়া কেউ নেই’। তারা ভুলে যান সমাজে বর্তমান নষ্ট সময়ে ভালো মানুষের পাশে তেমন একটা কেউ থাকে না। থাকে তাঁর কাজের খ্যাতি, আত্মসম্মানবোধ আর নিজের জীবনের অর্জন নিয়ে তৃপ্তি, যার সবটাই ছিল মুহিত সাহেবের।

তখন আমি বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান। মঞ্জুরি কমিশন বাংলাদেশ সরকার আর বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে দুই হাজার কোটি টাকার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি উচ্চ শিক্ষা মানোন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। প্রকল্পটি নানা কারণে ধুঁকছিল, যার মধ্যে আমলাতন্ত্র একটি।  প্রকল্প শেষ করার সময় বাড়ানো হয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর দুই বছরের মধ্যে সকলের সহযোগিতা প্রকল্পে গতি আসে। প্রকল্পের প্রায় আশিভাগ যখন শেষ, বিশ্বব্যাংক মনে করে এই প্রকল্পের সাফল্য নিয়ে একটি বড় অনুষ্ঠান করা প্রয়োজন। রাজি হই। প্রকল্পের পরিচালক, যিনি নিজেও একজন আমলা (বর্তমানে অবসরে), তাঁকে প্রস্তুতি নিতে বলি। একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। সিদ্ধান্ত নিই অর্থমন্ত্রী মুহিত সাহেব এই অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি হবেন। তাঁকে সচিবালয়ে গিয়ে অনুরোধ জানালে তিনি রাজি হন। তাঁকে আরও বলি শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ সাহেবও থাকবেন। উত্তরে তিনি বলেন, অবশ্যই থাকবেন, উনার মন্ত্রণালয়েরই তো ব্যাপার। অনুষ্ঠানের কয়েক দিন আগে প্রকল্প পরিচালক এসে  বলেন ‘স্যার একটা সমস্যা হয়েছে। দুজন মন্ত্রী একই মঞ্চে। কাকে প্রধান অতিথি করা হবে?’ প্রকল্প পরিচালককে বেশ বিচলিত মনে হলো। শিক্ষা জগতে কত সমস্যারই তো মুখোমুখি হয়েছি। তার সমাধানও খুঁজেছি। এ আর তেমন কী সমস্যা! তাঁকে বলি কোনও সমস্যা নেই। মুহিত সাহেব হবেন প্রধান অতিথি। শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আর আমি স্বাগত বক্তব্য রাখবো। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করবেন প্রকল্প পরিচালক। আমার প্রকল্প পরিচালক যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন। বঙ্গবন্ধুর করা আইন অনুযায়ী সকল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আর্থিক বরাদ্দ ও তার বিলিবণ্টন হবে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে। একবার এক অজানা কারণে মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নিলো এখন সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন বরাদ্দ বিলি করবে মন্ত্রণালয়। বছরে কয়েক শত কোটি টাকা। মতলব ভালো মনে হলো না। চিঠি লিখে তা পাঠিয়ে ছুটলাম অর্থমন্ত্রীর কাছে। তাঁর সচিব আমার সরাসরি ছাত্র। ডাকলেন তাঁর সচিবকে। জানতে চাইলেন এটি কীভাবে হলো? তাঁর সচিব, আমার ছাত্রের হস্তক্ষেপে তা বন্ধ হলো। বঙ্গবন্ধু কর্তৃক নিজের নির্ধারিত স্থানে বহাল রইলো কমিশন। কমিশনের স্বার্থ রক্ষার জন্য কতবার মুহিত সাহেবের শরণাপন্ন হয়েছি। কখনও তিনি হতাশ করেননি।
 
মুহিত সাহেবের শেষ মেয়াদ। আমার মেয়াদের শেষ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জানাই মঞ্জুরি কমিশন আইনকে পরিবর্তন করে তাকে আরও শক্তিশালী করা জরুরি। তিনি আমাকে এ ব্যাপারে পদক্ষেপ নিতে বললেন। শুরু হলো মঞ্জুরি কমিশনকে হায়ার এডুকেশন কমিশনে রূপান্তর করার প্রক্রিয়া। মন্ত্রী পরিষদে সভায় আমার পত্রের সূত্র ধরে বিষয়টি এজেন্ডায় যুক্ত করা হলো। মন্ত্রী পরিষদের মন্ত্রী মুহিত সাহেবকে সভার আগে বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত করার পর জানতে চাইলেন বিস্তারিত। জানালাম। মন্ত্রিসভার মিটিংয়ের রেওয়াজ অনুযায়ী প্রস্তাব সচিব কমিটিতে গেলো। যাওয়ার আগে মুহিত সাহেব সতর্ক করে দিলেন, বঙ্গবন্ধুর করা কমিশনের আইনের চিন্তাধারার বাইরে কোনও কিছুই যেন সংশোধিত আইনে অন্তর্ভুক্ত করা না হয়। কমিশন হতে একজন সিনিয়র কর্মকর্তাকে এই প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত করা হলো।  সব সভার পর সেই কর্মকর্তা হতাশ হয়ে ফেরেন। একদিন খসড়া প্রস্তুত হলো যা ছিল সচিব পুনর্বাসনের একটি উৎকৃষ্ট দলিল। বোঝা গেলো আমলাতন্ত্র কাকে বলে ও কত  প্রকার।  ছুটলাম মুহিত সাহেবের কাছে। জানালাম অবস্থা হয়েছে এমন যে এখন বলতে হয় ‘ভিক্ষা চাই না মা, কুত্তা সামলান’। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ছুটে যাই। বলি এই খসড়া আইন হিসেবে পাস হলে পরদিনই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকরা পথে নামবেন। মুখোমুখি হবেন সরকারের। ষড়যন্ত্রের গন্ধও পাওয়া গেলো।  তিনি আশ্বাস দিলেন তিনি তা দেখবেন। ধরনা দিই সংসদে যুক্তি দিয়ে কথা বলেন এমন চার পাঁচ জন সংসদ সদস্যের কাছে। সম্ভবত মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপে আর মুহিত সাহেবের অনুরোধ সেই খসড়া আর সংসদের মুখ দেখেনি।

বিদায় বেলায় এই অসম্ভব ভালো মানুষটির জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা । আমাদের সকলের প্রচেষ্টায় লালিত বঙ্গবন্ধুর করা আইনটিও এখন বাক্সবন্দি। কেউ আর কোনও আইনের তোয়াক্কা করে না। যাদের করার কথা তারাও না। সকলে নিজের ধান্দায় ব্যস্ত। ভাগ্য আমার ভালো সেই সব জিনিসকে আগলে রাখার এখন আমার দায়িত্ব নেই। ছুটে যেতে হয় না মুহিত সাহেবদের মতো মানুষের  কাছে। আল বিদা দেশের একজন সূর্য সন্তান আবুল মাল আবদুল মুহিত। যেখানেই থাকুন ভালো থাকুন। ভালো মানুষদের মৃত্যু নেই। আপনার কর্মের মাঝেই আপনি বেঁচে থাকবেন । আপনার বড় সমালোচকরাও আপনাকে স্মরণ করবেন ।

সব পাঠককে ঈদের শুভেচ্ছা ।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি: হানিফ
পদ্মা সেতু বাংলাদেশের সক্ষমতার প্রতিচ্ছবি: হানিফ
‘স্বাধীনতার পরে আরেকটি বিজয় পদ্মা সেতু’
‘স্বাধীনতার পরে আরেকটি বিজয় পদ্মা সেতু’
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন জাফরুল্লাহ ও কাদের সিদ্দিকী
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন জাফরুল্লাহ ও কাদের সিদ্দিকী
আমরা অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি: ওবায়দুল কাদের
আমরা অপমানের প্রতিশোধ নিয়েছি: ওবায়দুল কাদের
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ