X
শনিবার, ২৫ জুন ২০২২
১১ আষাঢ় ১৪২৯

নিরাপদ সড়কের জন্য দুটি সিদ্ধান্তই আত্মঘাতী!

আপডেট : ১৬ মে ২০২২, ১৭:৪৭

এবারের ঈদ যাত্রায় সবচেয়ে বেশি আলোচনা মোটরসাইকেল নিয়ে। মহাসড়ক থেকে শুরু করে ফেরীঘাটগুলোতে বিপজ্জনক এই যানের রীতিমতো স্রোত দেখা গেছে। যা আগে কখনও দেখা যায়নি। গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে অনেকেই এবারের ঈদে মোটরসাইকেল চালিয়ে বাড়ি গেছেন, তেমনি ফিরেছেনও।

কিন্তু মোটরসাইকেল কি কখনও গণপরিবহনের বিকল্প হতে পারে? মোটেও না। তাছাড়া দুনিয়ার কোথাও কি এভাবে দূরপাল্লার রাস্তায় খোদ মহাসড়ক মাড়িয়ে ভয়ঙ্কর গতিতে মোটরসাইকেল চলতে পারে? কারো গাড়ির কাগজ নেই, কারো নেই লাইসেন্স! অনেকে সরকারি নিষেধ অমান্য করে তিনজন নিয়ে কোনও রকম নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও ট্রাফিক আইনের অভিজ্ঞতা ছাড়াই মোটরসাইকেল চালিয়ে বিনা বাঁধায় বাড়ি গেছেন!

ফলাফল কী হলো? একের পর এর মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা, মৃত্যু ও আহতের খবর এসেছে। আহতদের একটি অংশ পঙ্গুত্বের শিকার হলেন। দুর্ঘটনার কারণে কেটে ফেলতে হয়েছে পা সহ শরীরের মূল্যবান অঙ্গ! রাজধানী পঙ্গু হাসপাতাল ও ঢাকা মেডিক্যাল সহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ঈদ উপলক্ষে দুর্ঘটনার রোগীর সংখ্যাই বেশি। এটি একমাত্র হয়েছে ইচ্ছেমত মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে।  

দেশে নিবন্ধিত ৫১ লাখের বেশি যানবাহনের মধ্যে সাড়ে ৩৬লাখই মোটরসাইকেল। অর্থাৎ মোট যানবাহনের চার ভাগের প্রায় তিনভাগই মোটরসাইকেল। এতেই প্রমাণ হয় অবাধে প্রাণঘাতি এই যানের নিবন্ধন দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এর পরিণতি সম্পর্কে কিছুই ভাবা হচ্ছে না।

বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ গণপরিবহন বাড়িয়ে মোটরসাইকেল ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করছে। এরমধ্যে বাংলাদেশ পুরো বিপরীত পথে হাঁটছে। দুর্ঘটনার কারণে আমেরিকা, ব্রিটেন ও ফ্রান্সে মোটরসাইকেল তুলে দেওয়া হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়েছে। প্রশ্ন হলো তাহলে কি কোনও দেশে বা উন্নত শহরে মোটরসাইকেল নেই? মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনামে আমাদের দেশের চেয়ে মোটরসাইকেল বেশি। কিন্তু সেখানে দুর্ঘটনা এত নয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এটা কীভাবে সম্ভব? সেখানে সবাই আইন মেনে চলে। গাড়ির লাইসেন্স ও লাইসেন্স প্রাপ্ত চালক সমান। দক্ষ করে তোলার পরই গাড়ি চালানোর অনুমতি মিলে। সেইসঙ্গে নিরাপত্তা সরঞ্জাম নিশ্চিত করার বিষয়টি তো আছেই। মূলত এসব কারণেই সেসব দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা কম।

আমাদের দেশে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা দুর্যোগের মধ্যেও মোটরসাইকেলকে সহজলভ্য করা হয়েছে। মোটরসাইকেল ব্যবহারকে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। ইঞ্জিনক্ষমতা (সিসি) বাড়ানো হচ্ছে। এই দুটিই আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। এতে দুর্ঘটনার শঙ্কা আরও বাড়বে, সড়ক-মহাসড়ককে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে। ইতোমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। সবচেয়ে আতঙ্কের কথা যেটি সেটি হলো, দুর্ঘটনায় আহতদের ৯০ভাগই তরুণ। দুটি সিদ্ধান্তটি যে সঠিক ছিল না, তা প্রমাণিত।

এবারের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মোটরসাইকেলচালক ও আরোহীদের বড় অংশের বয়স ১৫ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। যারা দেশের মূল জনশক্তি। এদের অধিকাংশের লাইসেন্স ছিল না। তাদের তো সড়ক-মহাসড়কে যানবাহন চালানোরই কথা না। সড়ক পরিবহন আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে হেলমেট ব্যবহার করেনি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগা দিয়ে উঠতি বয়সীরা বেপরোয়াভাবে মোটরসাইকেল চালিয়েছে। কিন্তু তারা আইনের প্রয়োগ করেনি। তাছাড়া ঈদের সময় সড়ক ফাঁকা থাকে। ফাঁকা রাস্তায় বেপরোয়া গতিতে যানবাহন চলাচলে দুর্ঘটনা বাড়ে। তাই ঘটেছে।

মূল কথা হলো একটি দেশের মূল কর্মক্ষম জনশক্তি ১৫-৪০ এর মধ্যে। এই জনশক্তি অর্থনীতির মূল চালিকা বলে ধরা হয়। তাদের একটি অংশের দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে এ ক্ষতি অপূরণীয়। যা কোনোভাবেই পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। ভবিষ্যতে দেশের অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ক্ষতিগ্রস্থ হবে পরিবারগুলো। অসহায় অবস্থায় জীবন পার করতে হবে অনেকের। তাই কর্মক্ষম জনশক্তিকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া এখনই জরুরি।

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় এতবেশি মানুষ মারা যাচ্ছে। প্রতি বছর দীর্ঘ হচ্ছে হতাহতের তালিকা। অথচ কারও কোনও বিকার নেই। নিয়ন্ত্রণে এখন পর্যন্ত কোনও পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। যা সত্যিই হতবাক করার মতো ঘটনা। এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না।

গবেষণায় দেখা গেছে, গুণগত মানসম্পন্ন হেলমেট সঠিকভাবে ব্যবহার করলে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার ঝুঁকি ৭০ শতাংশ এবং মারা যাওয়ার ঝুঁকি ৪০ শতাংশ কমে। বাজারে যেসব হেলমেট পাওয়া যায়, সেগুলোর মান যাচাইয়ের কোনও ব্যবস্থা নেই। নিম্নমানের হেলমেট পরলে ঝুঁকি থেকেই যায়। তাই ঝুঁকি কমাতে হেলমেটের মান ও হেলমেট পরা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধবে কে?

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান বলছে, দেশের জেলা শহর ও গ্রামীণ এলাকায় অনিবন্ধিত অন্তত ১৫ লাখ মোটরসাইকেল চলে। অনিবন্ধিত এসব যান কারা কখন চালাচ্ছে এর কোনও ঠিক নেই। এগুলো তো আরও বেশি বিপজ্জনক। একজনের গাড়ি দেখা যায় শত বন্ধুর হাতে। ধার নিয়ে বান্ধবিকে পেছনে বসিয়ে উঠতি বয়সী তরুণরা বেপরোয়া গতিতে চালায়। এতেই বিপত্তি। অনেকেই তারুণ্য দেখাতে গিয়েও বেসামাল চালানো চালায়। কঠোর আইন প্রয়োগে ও জনসচেতনতা সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এই অবস্থা থেকে হয়ত কিছুটা হলেও পরিত্রাণ মিলা সম্ভব।

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য বলছে, ২০২১ সালে মোট ২ হাজার ৭৮টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মারা যান ২ হাজার ২১৪ জন, যা সড়ক দুর্ঘটনায় মোট মৃত্যুর ৩৫ ভাগ। ২০২১ সালে আগের বছরের চেয়ে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ৫০ শতাংশ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ৫১ শতাংশ বেড়েছে। এ তথ্য স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপের আশঙ্কা রয়েছে?

এদিকে ২৫ এপ্রিল থেকে ৫ মে পর্যন্ত সারাদেশে ১৭৮টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে নিহতের সংখ্যা ২৪৯ জন। নিহতদের মধ্যে মোটরসাইকেল আরোহী ৯৭ জন। যা মোট দুর্ঘটনার ৩৮ দশমিক ৫৯ শতাংশ। নিহত ৫১ জনের বয়স ছিল ১৫ থেকে ২০ বছরের মধ্যে। অর্থাৎ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় নিহত ৫৭ শতাংশই অপ্রাপ্তবয়স্ক। এছাড়া ১ মে থেকে ৫ মে পর্যন্ত ১১২টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। এতে ১৩৯ জন নিহত হয়েছেন। একই সময় ৫৬ জন মোটরসাইকেল আরোহী নিহত হয়েছেন। যা মোট মৃত্যুর ৪০ দশমিক ২৮ ভাগ।

অব্যাহতভাবে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রেক্ষিতে গত সোমবার রাষ্ট্রীয় পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা বিভিন্ন সংবাদপত্রে সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে। গঠনগতভাবে মোটরসাইকেল একটি অপেক্ষাকৃত অনিরাপদ বাহন একথা উল্লেখ করে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল সাধারণত যুবক বা উঠতি বয়সীরা ব্যবহার করে থাকে, যাদের মধ্যে দ্রুতগতিতে গাড়ি চলানোর প্রবণতা খুব বেশি।

খোদ বিআরটিএ বলছে, দেশে রেজিস্ট্রেশনপ্রাপ্ত মোটরসাইকেলের সংখ্যা ৩৬ লাখ ৫০ হাজার। পক্ষান্তরে মোটরসাইকেল ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের সংখ্যা সাড়ে ২৩ লাখ। অর্থাৎ গাড়ির বিপরীতে ১৩ লাখ বৈধ মোটরসাইকেল চালক কম। বিজ্ঞপ্তিতে সন্তানদের মোটরসাইকেল ব্যবহার নিরুৎসাহিত করতে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। স্বল্প দূরত্বে একজন আরোহী নিয়ে চলা- মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম সহ ট্রাফিক আইন মেনে গাড়ি চালানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বিআরটিএ পক্ষ থেকে।

প্রশ্ন হলো রাষ্ট্রীয় এই পরিবহন নিয়ন্ত্রণ সংস্থা কি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেই খালাস। এর মাধ্যমেই কি তারা নিজেদের দায়িত্ব শেষ করতে চায়? এই বিজ্ঞপ্তি ক’জন দেখবে? যাদের জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ১০ ভাগও দেখবে বলে মনে হয় না। যারা দেখবেন তারা কি মানবেন? এ নিশ্চয়তা কোথায়। তাহলে উদ্দেশ্য সফল হবে না এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

বিআরটিএ মোটরসাইকেলের ব্যবহারকে সহজলভ্য না করে দুর্ঘটনা কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। এজন্য রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার পাশাপাশি সড়ক পরিবহন, বাণিজ্য ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মিলিত সিদ্ধান্ত প্রয়োজন হবে। আলোচনা করে বিআরটিএ মোটরসাইকেলের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক আরোপ করতে পারে।

সরে আসতে হবে মোটরসাইকেলের সিসি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত থেকে। হাইওয়ে পুলিশকে আইনের প্রয়োগে কঠোর হতে হবে। বাণিজ্যিকভাবে দূরপাল্লার মোটরসাইকেল চালানো বন্ধ করার বিকল্প নেই। হাইওয়েতে মোটরসাইকেল চলাচল নিরুৎসাহিত করার বিকল্প নেই। এর আগে দ্রুত গণপরিবহন বাড়াতে হবে।

সড়ক পরিবহন আইনের যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ছাড়া দুর্ঘটনা কমানো ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো সম্ভব হবে না। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। উঠতি বয়সী কিশোর-তরুণদের মোটরসাইকেল দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের নিরাপত্তার কথাও অভিভাবকদের চিন্তা করতে হবে। সর্বোপরী এ ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টি সবার জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
এই সেতু দিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো: পিয়া জান্নাতুল
গৌরবের পদ্মা সেতুএই সেতু দিয়ে নিজের গাড়ি নিয়ে বাড়ি যাবো: পিয়া জান্নাতুল
পদ্মা সেতু: অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
পদ্মা সেতু: অসম্ভবকে সম্ভব করার রূপকথা
টিভিতে আজ
টিভিতে আজ
এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী
এ সেতু স্পর্ধিত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ