X
বৃহস্পতিবার, ৩০ জুন ২০২২
১৬ আষাঢ় ১৪২৯

শান্তির দূত বঙ্গবন্ধু ও জুলিও কুরি পদক

আপডেট : ২৪ মে ২০২২, ০০:৫২
জুলিও কুরি পদক হচ্ছে বিশ্ব শান্তি পরিষদের নোবেল খ্যাত একটি অতি সম্মানজনক পদক। ১৯০৩ সালে ফরাসি পদার্থবিজ্ঞানী মেরি কুরি ও পিয়ের কুরি দম্পতি যৌথভাবে পদার্থবিদ্যায় এবং মেরি কুরি ১৯১১ সালে এককভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞানী দম্পতি বিজ্ঞান সাধনা ও বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় যে অবদান রেখেছিলেন, তা অবিস্মরণীয় করে রাখতে ‘জুলিও কুরি’ পুরস্কারের প্রবর্তন করা হয়। বিশ্ব শান্তি পরিষদ ১৯৫০ সাল থেকে ফ্যাসিবাদবিরোধী, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামে, মানবতার কল্যাণে, শান্তির সপক্ষে বিশেষ অবদানের জন্য স্মরণীয় ব্যক্তি ও সংগঠনকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদকে ভূষিত করে থাকে।

১৯৭৩ সালের এই দিনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জনক বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদান করা হয়। পদক পরিয়ে দেওয়ার সময় বিশ্ব শান্তি পরিষদের সভাপতি রমেশ চন্দ্র বলেন, ‘শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, বিশ্ববন্ধুও।’ এর আগে ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে চিলির রাজধানী সান্টিয়াগোতে বিশ্ব শান্তি পরিষদ বিশ্ব শান্তি ও জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে অনন্য অবদানের জন্য বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জুলিও কুরি শান্তি পদক’ প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়। পৃথিবীর ১৪০টি দেশের শান্তি পরিষদের ২০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে ‘জুলিও কুরি’ শান্তি পদক প্রদানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এটি আকস্মিক কোনও বিষয় ছিল না।

বঙ্গবন্ধুকে যখন জুলিও কুরি শান্তি পদক প্রদান করা হয় তখনও বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হয়নি। হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র দেশ সেই সময় বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দরিদ্র দেশের সরকার প্রধানকে বৈশ্বিক শান্তি পদক প্রদান বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর নিরলস প্রচেষ্টা, তাঁর কর্ম ও দর্শনের স্বীকৃতি।

বঙ্গবন্ধুর শান্তির দর্শনের অন্যতম উপাদান ছিল– যুদ্ধ পরিহার করে যেকোনও বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান, সকল প্রকার বঞ্চনা ও শোষণমুক্তির মাধ্যমে ন্যায়ভিত্তিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সমাজ প্রতিষ্ঠা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ বিনির্মাণ। বঙ্গবন্ধু সবসময় যুদ্ধের বিপক্ষে ছিলেন। তাই তিনি বলেছেন, ‘আমরা চাই, অস্ত্র প্রতিযোগিতায় ব্যয়িত অর্থ দুনিয়ার দুঃখী মানুষের কল্যাণের জন্য নিয়োগ করা হোক। তাহলে পৃথিবী থেকে দারিদ্র্যের অভিশাপ মুছে ফেলার কাজ অনেক সহজসাধ্য হবে।’

১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে প্রদত্ত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণ, শান্তি প্রতিষ্ঠা ও আন্তর্জাতিক সমঝোতার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। বঙ্গবন্ধু যুদ্ধের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান কেবল ওষ্ঠসেবায় সীমিত রাখেননি, বাস্তব জীবনে তিনি তার প্রয়োগ ঘটিয়েছেন। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তর বিশ্ব সোভিয়েত ইউনিয়ন আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোড়লিপনায় প্রত্যক্ষ দুটো ব্লকে বিভক্ত হয়ে যায়। নিজেদের প্রভাব বলয় সৃষ্টি করতে গড়ে তোলে সামরিক জোটও। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কোনও সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। তিনি স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘আমরা সর্বপ্রকার অস্ত্র প্রতিযোগিতার পরিবর্তে দুনিয়ার সকল শোষিত ও নিপীড়িত মানুষের কল্যাণে বিশ্বাসী বলেই বিশ্বের সব দেশ ও জাতির বন্ধুত্ব কামনা করি। সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের এই নীতিতে আমরা আস্থাশীল। তাই সামরিক জোটগুলোর বাইরে থেকে সক্রিয় নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি আমরা অনুসরণ করে চলেছি।’ বিশ্ব শান্তি, নিরাপত্তা ও সংহতির প্রতি অঙ্গীকার হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদে ঘোষণা করা হয়– ‘জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও সমতার প্রতি শ্রদ্ধা, অন্যান্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করা, আন্তর্জাতিক বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং আন্তর্জাতিক আইনের ও জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এই সকল নীতি হইবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি এবং এই সকল নীতির ভিত্তিতে রাষ্ট্র (ক) আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শক্তিপ্রয়োগ পরিহার এবং সাধারণ ও সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণের জন্য চেষ্টা করিবেন; (খ) প্রত্যেক জাতির স্বাধীন অভিপ্রায় অনুযায়ী পথ ও পন্থার মাধ্যমে অবাধে নিজস্ব সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্ধারণ ও গঠনের অধিকার সমর্থন করিবেন; এবং (গ) সাম্রাজ্যবাদ, ঔপনিবেশিকতাবাদ বা বর্ণবৈষম্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বের সর্বত্র নিপীড়িত জনগণের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামকে সমর্থন করিবেন।’

বঙ্গবন্ধুর শান্তির দর্শনে নিরপেক্ষতা মানে কি নির্লিপ্ততা নয়। দেশ বা বিদেশ যেখানেই মানবাধিকারের লঙ্ঘন দেখেন, মানুষের ন্যায্য স্বাধীনতা খর্ব হয়েছে, সেখানেই প্রতিবাদের ঝড় তুলেছেন বঙ্গবন্ধু। যেখানেই মানবতার অবক্ষয় দেখেছেন; সেখানেই তিনি মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন, সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন, বিশ্ব বিবেককে জাগানোর চেষ্টা করেছেন। বিশ্বসভায় তাদের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, অ্যাঙ্গোলা, মোজাম্বিক, গিনি বিসাউসহ দুনিয়ার সব উপনিবেশবিরোধী সংগ্রামের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনের ন্যায়সঙ্গত সংগ্রামে সক্রিয় সমর্থন, সাহায্য ও সহযোগিতা করেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বিশ্বের সকল স্থানের বর্ণভেদবাদী নীতির বিরুদ্ধে দ্বিধাহীন চিত্তে নিন্দা করেছেন। শান্তি প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধুর সহজ-সরল উচ্চারণ, ‘বিশ্ব শান্তি আমার জীবনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনও স্থানেই হোক না কেন, তাঁদের সঙ্গে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।’

বঙ্গবন্ধু দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, রাষ্ট্রসমূহের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ব্যতিরেকে কখনোই বিশ্বে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। তাই ১৯৭২ সালে কলকাতায় তাঁর সম্মানে প্রদত্ত নাগরিক সংবর্ধনায় তিনি পাকিস্তানের প্রতি ইঙ্গিত করে বলেছিলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি না প্রতিশোধ গ্রহণে কোনও মহৎ কর্তব্য পালন করা যায়।’ তিনি বলেছিলেন, ‘আমার একান্ত কামনা, উপমহাদেশে অবশেষে শান্তি ও সুস্থিরতা আসবে। প্রতিবেশীদের মধ্যে পারস্পরিক বিরোধিতার বন্ধ্যা নীতির অবসান হবে। আমাদের জাতীয় সম্পদের অপচয় না করে আমরা যেন তা দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যবহার করি। দক্ষিণ এশিয়াকে একটি শান্তিপূর্ণ অঞ্চলে পরিণত করায় আমরা সচেষ্ট রইবো, যেখানে আমরা সুপ্রতিবেশী হিসেবে পাশাপাশি বাস করতে পারি এবং যেখানে আমাদের মানুষের মঙ্গলার্থে আমরা গঠনমূলক নীতিমালা অনুসরণ করতে পারি। যদি আমরা সেই দায়িত্বে ব্যর্থ হই, ইতিহাস আমাদের ক্ষমা করবে না।’ উপমহাদেশের উত্তেজনাময় পরিস্থিতিতে বঙ্গবন্ধু যখন শান্তির এই অমিয়বাণী উচ্চারণ করেন, তখনও রণাঙ্গন থেকে রক্তের দাগও মুছে যায়নি, আঞ্চলিক সহযোগিতা বিকাশের এই উদাত্ত আহ্বান, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের একজন রাষ্ট্রনায়কের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর শান্তির প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকারের পরিচায়ক।

মানবতাবাদী বঙ্গবন্ধুর শান্তির নীতির একটি অন্যতম দিক ছিল এই যে কেবল যুদ্ধের অনুপস্থিতি শান্তির নিশ্চয়তা দিতে পারে ন। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘A hungry man is an angry man.’ মানুষকে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত রেখে কখনোই কোথায়ও শান্তি প্রতিষ্ঠা হতে পারে না। একটা কথা বঙ্গবন্ধু প্রায়ই বলতেন, ‘আমার সারা জীবনের স্বপ্ন হচ্ছে দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো।’ ১৯৭৩ সালে জোটনিরপেক্ষ আন্দোলনের মঞ্চে তাই তিনি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বিশ্ব প্রতিষ্ঠার উদাত্ত আহ্বান জানিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন, ‘বিশ্ব আজ দুই ভাগে বিভক্ত- শোষক আর শোষিত, আমি শোষিতের পক্ষে।’ ’৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে প্রদত্ত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্বের সব দেশের কল্যাণের কথা তুলে ধরেছিলেন। বলেছিলেন ন্যায়সঙ্গত আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কথা। শান্তির অনুষঙ্গ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে বঙ্গবন্ধু নিজস্ব স্টাইলের সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে বেছে নিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘আমি নিজে কমিউনিস্ট নই, তবে সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি এবং পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে বিশ্বাস করি না। একে আমি শোষণের যন্ত্র হিসেবে মনে করি। এই পুঁজিপতি সৃষ্টির অর্থনীতি যত দিন দুনিয়ায় থাকবে, তত দিন দুনিয়ার মানুষের ওপর থেকে শোষণ বন্ধ হতে পারে না।’ বঙ্গবন্ধু তাঁর বিশ্বাসে ও কর্মে সৎ ছিলেন। তাই বাংলাদেশের সংবিধানে সমাজতন্ত্র রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূলনীতি হিসেবে গৃহীত হয়েছে। কৃষক-শ্রমিকের মুক্তি, গ্রামীণ উন্নয়ন, মৌলিক চাহিদা পূরণ, অবৈতনিক বাধ্যতামূলক শিক্ষা, জনস্বাস্থ্য ও সুযোগে সমতার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের দায়-দায়িত্বের ঘোষণা প্রদান করা হয়েছে।

সংবিধান প্রণয়নের বহু আগে থেকেই সমাজতন্ত্রের প্রতি বঙ্গবন্ধুর দৃঢ় অঙ্গীকারের প্রতিফলন দেখতে পাই। দ্বিতীয়বার চীন সফরের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘১৯৫৭ সালে আমি পাকিস্তান পার্লামেন্টারি ডেলিগেশনের নেতা হিসেবে চীন দেশে যাই।’ প্রসঙ্গত, উল্লেখ্য এর আগে ১৯৫২ সালে অনুষ্ঠিত এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে বঙ্গবন্ধু চীন সফর করেছিলেন। দ্বিতীয়বার চীন সফরে গিয়ে বঙ্গবন্ধু চীন সরকারের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘আপনি, আপনার সরকার ও জনগণ আমাকে ও আমার দলের সদস্যদের যথেষ্ট আদর আপ্যায়ন করেছেন এবং আমাকে আপনাদের পার্লামেন্টে বক্তৃতা দিতে দিয়ে যে সম্মান দিয়েছিলেন তা আজও আমি ভুলিনি। আমি আপনাদের উন্নতি কামনা করি। নিজের দেশে যে নীতি আপনারা গ্রহণ করেছেন, আশা করি অন্য দেশে অন্য নীতি গ্রহণ করবেন না। আপনারা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করেন আর আমার দেশে চলেছে ধনতন্ত্রবাদ, আর ধনতন্ত্রবাদের মুখপাত্রকে আপনারা দিতেছেন সার্টিফিকেট। আপনারা আমেরিকান সরকারের মতো নীতিবহির্ভূত কাজকে প্রশ্রয় দিতেছেন। দুনিয়ার শোষিত জনসাধারণ আপনাদের কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করেছিলেন। যেমন, আমেরিকানরা নিজের দেশে গণতন্ত্রে বিশ্বাস করেন, আর অন্যের দেশে নিজেদের স্বার্থ রক্ষার জন্য গণতন্ত্রকে হত্যা করে ডিক্টেটর বসাইয়া দেয়।’(কারাগারের রোজনামচা ১৩৪ ও ১৩৫ পৃষ্ঠা)।

বঙ্গবন্ধু জীবনের পাঠশালা থেকে শিক্ষা নিয়ে ক্রমাগত নিজেকে অতিক্রম করেছেন। যা বিশ্বের সব শান্তিকামী মানুষের কাছে অনুকরণীয়। তিনি বলেছেন, ‘শান্তির প্রতি যে আমাদের পূর্ণ আনুগত্য, তা এই উপলব্ধি থেকে জন্মেছে যে একমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশেই আমরা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, রোগ-শোক, অশিক্ষা ও বেকারত্বের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করার জন্য আমাদের সব সম্পদ ও শক্তি নিয়োগ করতে সক্ষম হবো।’ বঙ্গবন্ধুর বক্তব্যের সারকথা হলো, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ছাড়া উন্নয়ন নিশ্চিত করা তথা ক্ষুধা, দারিদ্র্য, অশিক্ষা, রোগ, বেকারত্ব ইত্যাদি দূর করা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর এই নীতির প্রতিফলন দেখতে পাই ১৯৯৪ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বুট্রোস বুট্রোস ঘালির এজেন্ডা ফর ডেভেলপমেন্ট প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদনে উন্নয়নের অন্যতম উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে শান্তিপূর্ণ পরিবেশকে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘Development activities yield their best results under condition of peace. Absence of peace has a negative impact on development as military expenditures take priority. Lack of peace induces budget cut for development activates. Non-availability of sufficient resources, among others, seriously disrupt development initiatives at both national and international levels.’

বঙ্গবন্ধুর শান্তি দর্শন অসাম্প্রদায়িকতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন সাম্প্রদায়িকতা শান্তির শত্রু। বঙ্গবন্ধুর কর্মকাণ্ড এবং রাজনৈতিক চিন্তাধারায় ছিল শুধু মানুষের কল্যাণ; মানবমুক্তি, অসাম্প্রদায়িক বিশ্ব, ভ্রাতৃত্বের বন্ধন ও শান্তির বার্তা। যার পরিচয় আমরা তার কর্মকাণ্ডে দেখতে পাই।

কলকাতায় ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বঙ্গবন্ধু মুসলমান ও হিন্দু উভয় সম্প্রদায়ের লোককেই উদ্ধার করেছেন। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ছিল অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি। তিনি সারা জীবন ধর্মের অপব্যাখ্যা, ধর্মের নামে সহিংসতা, ধর্ম নিয়ে রাজনীতির বিরোধিতা করেছেন। অসাম্প্রদায়িকতা বলতে যে তিনি সব সম্প্রদায়ের সহ-অবস্থানের কথা বলেছেন শুধু তা-ই নয়, সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুদের রক্ষা করার যে বিশেষ দায়িত্ব রয়েছে, সেই কথাও স্মরণ করিয়ে দেন এবং সে উদ্দেশ্যে তিনি সারা জীবন কাজ করেন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণেও জনগণকে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সতর্ক করে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘দেখবেন, আমাদের যেন বদনাম না হয়।’ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অসাম্প্রদায়িকতা তথা ধর্মনিরপেক্ষতা নীতিকে কেবল সংবিধানেই ঠাঁই দেননি, বরং সাম্প্রদায়িকতা তথা ধর্মের নামে রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিলেন।

শিরায় শিরায় মানবতার জন্য ভালোবাসা আর শান্তির প্রতি ব্যাকুলতা ছিল জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর। রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্যও তিনি শান্তিপূর্ণ পথকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। তিনি শুধু বাঙালির পিতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন বিশ্বমানবতার তরে নিবেদিত। নিজের জীবন দিয়ে হলেও মানবকল্যাণকে তিনি ধারণ করতেন। মানব সেবাই ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন। বঙ্গবন্ধু তাঁর ঘোর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিপদেও সাহায্যের হাত বাড়িয়েছেন। পাকিস্তানি মালিকানার পত্রিকা ‘মর্নিং নিউজ’-এর সম্পাদক এস জি এস বদরুদ্দিন অহর্নিশ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে কুৎসা প্রচার করতেন। আগরতলা মামলার সময় তাঁর ফাঁসি দাবি করেছিলেন এ সাংবাদিক। অথচ স্বাধীনতার পর বদরুদ্দিনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন বঙ্গবন্ধু বিহারি হিসেবে পরিত্যক্ত বদরুদ্দিনের বাড়ি বিশেষ ব্যবস্থায় বিক্রির ব্যবস্থা করে বিক্রীত অর্থ বিদেশি মুদ্রায় রূপান্তর করে নেপাল হয়ে পাকিস্তান ফেরত যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দর্শন আজ বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। শান্তির দূত বঙ্গবন্ধু তাই বিশ্ববন্ধু হিসেবে সবার কাছে স্মরণীয়। বঙ্গবন্ধুর জুলিও কুরি শান্তি পদক লাভকে বিস্মৃত হওয়া মানে শান্তির প্রতি আমাদের উদাসীনতারই নামান্তর।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]
/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ইউক্রেনকে আরও অস্ত্র সহায়তার ঘোষণা বাইডেনের
ইউক্রেনকে আরও অস্ত্র সহায়তার ঘোষণা বাইডেনের
চট্টগ্রাম কাস্টমসে ৫৯ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়
চট্টগ্রাম কাস্টমসে ৫৯ হাজার ২৫৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়
বিশেষ ঋণ সুবিধা পেলেন চামড়া ব্যবসায়ীরা
বিশেষ ঋণ সুবিধা পেলেন চামড়া ব্যবসায়ীরা
বন্যায় সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ে টিআইবির উদ্বেগ
বন্যায় সৃষ্ট মানবিক বিপর্যয়ে টিআইবির উদ্বেগ
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ