X
বুধবার, ০৬ জুলাই ২০২২
২২ আষাঢ় ১৪২৯

পদ্মা সেতুর টোল বিতর্কের মধ্যে আমরা নেই

আপডেট : ২৮ মে ২০২২, ১৬:৪৯

পদ্মা সেতু আমাদের জন্য যেমন গৌরবের তেমনই কিছু মানুষের জন্য গাত্রদাহের বড় কারণ। কেন তাদের গাত্র দাহ’র কারণ? এটি যদি বিচার করেন তাহলে দেখতে পাবেন বিষয়টি একেবারে রাজনৈতিক। কিছু মানুষ চাইতো– যেন কোনোভাবেই পদ্মা সেতু নির্মাণ কাজ শেষ না হয়। কেন চাইতো তাও সবার কাছে স্পষ্ট। এতে দেশবাসীর কাছে আওয়ামী লীগ সরকারকে ব্যর্থ বলার সুযোগ তৈরি হতো। পদ্মা সেতু যদি না হতো, তাতে এসব মানুষের বিন্দু পরিমাণ মন খারাপ হতো না, বরং আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হয়েছে এই খুশিতেই নেচে বেড়াতো।

দেশের একজন পন্ডিত মানুষ এই সেতুর অর্থায়ন যাতে না হয় সে জন্য জোর লবিং করেছিল। বিশ্ব ব্যাংক সরেও গিয়েছিল। এরপর যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় মনোবলে বাংলাদেশ নিজেই হাল ধরলো তখনও অনেকে বলেছেন, ‘এই সরকার বলছে পদ্মা সেতু বানাবে। কিন্তু তারা পারবে না। আমরা ক্ষমতায় গেলে দুটো পদ্মা সেতু বানাবো’। এরপরও যখন নির্মাণ শুরু হলো তখন আবার বলা হলো– ‘সেতু জোড়াতালি দিয়ে বানাচ্ছে। এই সেতুতে কেউ উঠবেন না’।

মানুষ কিছু দিন পর ইতিহাস ভুলে যায়। এজন্যই এইসব হাসি ঠাট্টা আর মশকরার বিষয়গুলোকে বারবার সামনে আনা উচিত।

সাম্প্রতিক সময়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ঘিরে এ ধরনের সমালোচনা শুরু হয়েছে। কিন্তু কথাগুলোতো কাউকে না কাউকে বলতে হবে, মনে করিয়ে দিতে হবে। যাতে বাংলাদেশকে যারা ব্যর্থ প্রমাণ করতে চেয়েছিল তাদের মুখে লোকে চুনকালি মেখে দেয়।

আলোচনা-সমালোচনা রাজনৈতিক বক্তব্য এইসব কিছুর মধ্যে সাম্প্রতিক সময়ে পদ্মা সেতুর টোল নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আচ্ছা এই সমালোচনায় কি আমাদের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষেরা অংশ নিচ্ছেন। আমার মনে হয় যাদের বিবেচনা বোধ তীব্র তারা সমালোচনায় অংশ নিচ্ছেন না। বরং লাভ-ক্ষতির হিসেব করছেন।

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের একজন মানুষ হিসেবে আমি এই লাভ-ক্ষতির হিসেব কীভাবে করছি এবার সেটাই বলছি। আমার বাড়ি নড়াইলের কালিয়া উপজেলায়। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে আমার বাড়ির দূরত্ব ১২০ কিলোমিটার। এক লিটার অকটেনে আমার গাড়ি ১২ কিলোমিটার অতিক্রম করে। অর্থাৎ ১২০ কিলোমিটারের জন্য ১০ লিটার জ্বালানির প্রয়োজন। প্রতি লিটার অকটেনের এখনকার বাজার দর ৮৯ টাকা হিসেবে প্রয়োজন ৮৯০ টাকা। এবার সেতুর টোল এক হাজার ৩০০ টাকা যোগ করলে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছাতে আমার প্রয়োজন হবে ২ হাজার ১৯০ টাকা। অর্থাৎ বাড়ি যাওয়া এবং ঢাকায় ফিরে আসার জন্য আমার প্রয়োজন চার হাজার ৩৮০ টাকা। 

এবার গত ঈদের পর বাড়ি থেকে ফেরার একটা আর্থিক হিসেব দেই। ড্রাইভার আরিচা ফেরি পার হয়ে ফরিদপুর-যশোর ঘুরে নড়াইলের কালিয়া গিয়েছিল। এই পথে দূরত্ব বেশি অতিক্রম করায় জ্বালানি খরচ অনেকটা বেশি। সব মিলিয়ে যাওয়া এবং আসাতে জ্বালানি এবং দুবারের ফেরি ভাড়ার জন্য আমি আগে থেকে ড্রাইভারকে ৭ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। ঢাকায় ফিরে আমার ড্রাইভার বলেছিলেন ২০০ টাকা সাশ্রয় হয়েছে।

টোল নিয়ে এত কথা হচ্ছে বলেই এবার এই হিসেব নির্মোহভাবে করতে হচ্ছে। 

এবার দুটো হিসেব একটু নিজেরাই মিলিয়ে দেখুন। আমি তো মনে করছি আগামী ২৫ জুন থেকে আমার বাড়ি যাওয়া এবং আসাতে আগের তুলনায় ২ হাজার ৪২০ টাকা খরচ কম হবে। বিষয়টি কি আমার জন্য লাভজনক নয়।

এবার একটু অন্য হিসেবে আসি। মাওয়া ফেরিঘাট হয়ে ফেব্রুয়ারিতে নড়াইল থেকে ফেরার বর্ণনা দেই। সকাল আটটার আমার স্ত্রী জানায় তারা বাড়ি থেকে বের হয়েছে, ঢাকায় ফিরবে আমার সন্তানদের সহ। পথের বিড়ম্বনার কথা আর না বলি, মাওয়া হয়ে ওরা যখন ঢাকায় ফিরলো রাত তখন চারটা বাজে। একবার চিন্তা করুনতো ছোট ছোট বাচ্চারা ২০ ঘণ্টার এই জার্নির ধকল কীভাবে নেয়। সেবার ফেরিঘাটে না হয় অনেক জ্যাম ছিল; একটি ব্যতিক্রম বিষয় বলে এই আলোচনা বাদ দেওয়াই যেতে পারে। কিন্তু গত ঈদের পরে বাড়ি থেকে সকাল সাতটায় রওনা দিয়ে ঢাকায় পৌঁছাতে রাত ন’টা বেজেছিল। এখন বোঝা উচিত আর্থিক ক্ষতির বাইরে আমরা কতটা নাজেহাল হতাম।

এই বিড়ম্বনা শুধু আমাদের একার নয়। দক্ষিণ পশ্চিমের ২১ জেলার মানুষের জন্যই অভিশাপ হয়ে উঠেছিল। বহু বছর ধরে আমরা কেবল পদ্মা পাড়ি দেওয়ার সময় ভেবেছি কবে এই নদীর ওপর একটি সেতু হবে আর আমরা মুক্তি পাবো। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে কেবলমাত্র রাজবাড়ি, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুরের এবং ঝিনাইদহের দূরত্ব বেশি। অন্য ১৬ জেলার মানুষের জন্য দূরত্ব গড়ে ১০০ কিলোমিটার কমে আসবে। অর্থাৎ জ্বালানি খরচ কমবে। এতে সব ধরনের পরিবহন ব্যয় কমবে। তবে এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। একবার যশোরগামী ফ্লাইটে আমার সঙ্গে এক যাত্রীর পরিচয় হলে জানতে চেয়েছিলাম বাড়ি কোথায়। তিনি জানিয়েছিলেন চুয়াডাঙ্গাতে। আমি বলেছিলাম, তাহলে যশোরে এসে আবার চুয়াডাঙ্গা যেতে আপনার বেশি সময় লাগবে কিনা। তিনি উত্তর দিয়েছিলেন– এখান থেকে রাস্তা দিয়ে দু’ঘণ্টা লাগে। ঘণ্টার পর ঘণ্টাতো আর ফেরিতে বসে থাকতে হয় না।

আপনারা যারা সাম্প্রতিক সময়ে ওদিকে গিয়েছেন তারা নিশ্চয়ই দেখেছেন গোপালগঞ্জ থেকে যশোর বেনাপোল পর্যন্ত দেশের প্রথম ছয় লেনের সড়কের কাজ শুরু হয়েছে। এজন্য মধুমতি নদীর ওপর একটি ছয় লেনের সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। 

সব চাইতে বড় সুবিধা হলো– আমদানি রফতানি খরচ কমে আসবে। দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে তিনটি বড় বন্দর রয়েছে। এরমধ্যে দুটি সমুদ্র বন্দর মোংলা এবং পায়রা। একটি স্থল বন্দর বেনাপোল। ঢাকা থেকে মাত্র তিন ঘণ্টায় মংলা বন্দরে পৌঁছানো সম্ভব হবে। এতে যে পরিবহন ব্যয় বাঁচবে টোলের থেকে কি ঢের বেশি নয়?

সঙ্গত কারণে টোল নিয়ে চিন্তা না করে ব্যয় নিয়ে চিন্তা করা দরকার। ধরুন আগে আপনি যেখানে ২৫০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে গন্তব্যে পৌঁছাতেন এখন সেখানে ১৫০ কিলোমিটার পাড়ি দিলেই সেখানে পৌঁছে যাচ্ছেন। তাহলে বাসেও যদি যান সেক্ষেত্রে ২৫০ কিলোমিটারের ভাড়া আর ১৫০ কিলোমিটারের ভাড়াতো আর এক হবে না নিশ্চয়ই কম হবে। 

কাজেই বিতর্ক না বাড়িয়ে পদ্মা সেতুর অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে চলুন একদিন আমার বাড়ি নড়াইলে যাই। ইলিশ মাছ দিয়ে নাইলের ছালুন খাওয়াবো। সঙ্গে চিত্রা, মধুমতি আর নবগঙ্গায় পূর্ণিমা রাতে ডিঙ্গি নৌকায় ঘুরাবো। গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি রাতের এমন সৌন্দর্য আপনি জীবনেও দেখেননি। আর সকাল বেলায় নরম সূর্যের আলো যখন স্রোতের ওপর পড়ে ওটা আপনার জন্য একেবারে ফ্রি।

জানেন নিশ্চয়ই বঙ্কিম সেই কবেই বলে গেছেন ওটা নাকি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সুন্দর জিনিস।

লেখক: সাংবাদিক ও নাট্যকার

 [email protected]

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
হাসপাতালের লিফটে ওঠা নিয়ে মারধর, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা
হাসপাতালের লিফটে ওঠা নিয়ে মারধর, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে মামলা
শোসিত-বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে দেশে ফিরেছিলাম: প্রধানমন্ত্রী
শোসিত-বঞ্চিত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে দেশে ফিরেছিলাম: প্রধানমন্ত্রী
ঈদে বাড়ি যাওয়ার পথে সড়কে নিহত মা-মেয়ে
ঈদে বাড়ি যাওয়ার পথে সড়কে নিহত মা-মেয়ে
চিংড়ির ঘের থেকে উঠছে গ্যাস, পরীক্ষা করবে বাপেক্স
চিংড়ির ঘের থেকে উঠছে গ্যাস, পরীক্ষা করবে বাপেক্স
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ