X
সোমবার, ০৫ ডিসেম্বর ২০২২
২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৯

করোনার চতুর্থ ঢেউ, সরকারি নির্দেশমালা এবং বাস্তবতা

সালেক উদ্দিন
০২ জুলাই ২০২২, ১৯:৪০আপডেট : ০২ জুলাই ২০২২, ২০:৫২
করোনার চতুর্থ ঢেউ শুরু হয়ে গেছে দেশে। জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও সেই বিষয়টি এসেছে। বলার অপেক্ষা রাখে না, ভয়ংকর করোনাভাইরাস আবারও দুরন্ত গতিতে ধেয়ে আসছে। অন্তত স্বাস্থ্য অধিদফতরের দেওয়া তথ্য সেটাই বলে। এর আলোকে বলা যেতে পারে– অতি দ্রুত করোনা ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকাসহ সারা দেশে। ঢাকায় এর বিস্তারের হার অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে অনেক বেশি।

দেশে এখন প্রতিদিন করোনা শনাক্ত হচ্ছে দুই হাজারের ওপরে। মাসখানেক আগেও চিত্রটা এই সংখ্যার ধারেকাছে ছিল না। গত একসপ্তাহে করোনা শনাক্ত বেড়েছে ৩০০ শতাংশ! বুস্টার ডোজ নেওয়ার পরও করোনায় মারা যাচ্ছে মানুষ। দেশে গত ২০ জুন থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত করোনায় মারা যাওয়া ৯ জনের মধ্যে চারজনই বুস্টার ডোজ নিয়েছিলেন।

শুধু আমাদের দেশেই করোনার চতুর্থ ঢেউ এসে লেগেছে তা নয়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে এখন দৈনিক সংক্রমণের পরিমাণ ১৭ হাজার ছাড়িয়েছে। অর্থাৎ আবারও শুরু হতে যাচ্ছে করোনার ক্রান্তিকাল।

গত বছর প্রথম ডোজ টিকা নেওয়ার পরও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলাম। প্রচণ্ড কষ্টের পর অনেক ভাগ্যবান ব্যক্তির মতো সেরে উঠেছিলাম। তারপর বুস্টার ডোজ নিয়েছি।

ক’দিন ধরে ঠাণ্ডা-মাথা ব্যথাসহ আগেরবার করোনা আক্রান্তের সময় শরীরে যেসব লক্ষণ ছিল তেমনটাই লাগছিল। স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনার নমুনা সংগ্রহ বিভাগে ২৬ জুন দুপুর ১২টার দিকে ফোন করি। একজন চিকিৎসক ফোন ধরে জানান, স্বাস্থ্য অধিদফতরের করোনার নমুনা সংগ্রহ বিভাগের কার্যক্রম আগামী তিন দিনের জন্য বন্ধ। কারণ নমুনা সংগ্রহ বিভাগের অধিকাংশ কর্মী করোনা আক্রান্ত। ২৮ জুনের পর এসএমএসের মাধ্যমে পুনরায় নমুনা সংগ্রহ বিভাগে অনুরোধ পাঠানোর জন্য বলে দিলেন তিনি। করোনা যে আবারও ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে, এই ঘটনাই এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

করোনার দ্রুত বিস্তৃতির প্রধানতম কারণ– স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ধারাবাহিকতা বজায় না রাখা। গত মার্চে আক্রান্তের সংখ্যার অনেক কমে গিয়েছিল। মার্চ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রতিদিন করোনা শনাক্তের সংখ্যা ছিল ১০০’র নিচে। এজন্য আমরা বলা যায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বেমালুম ছেড়ে দিয়েছিলাম। এখন আর অফিস-আদালতে ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ বিধির কার্যকারিতা নেই। সামাজিক দূরত্বকে পাঠানো হয়েছে বনবাসে! যানবাহন, জনসমাগমের স্থান ও মার্কেটে মাস্ক ছাড়াই মানুষ ফ্রি-স্টাইলে গাদাগাদি করে চলছে। মসজিদ-মন্দিরে মাস্ক পরা ও ন্যূনতম দূরত্ব বজায় রেখে প্রার্থনা করার চিত্র দেখা যায় না। আমরা কেউ কারও কথা শুনি না। কেউ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার অনুরোধ করলেও উল্টো ধমক দেই। ‘করোনার টিকা নিয়েছি, এখন আবার ভয় কীসের’– এমন আত্মবিশ্বাস কিংবা ভ্রান্ত ধারণাও করোনার নতুন বিস্তারে দায়ী।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, করোনার ছোবল এবারও ভয়াবহ হতে পারে। কারণ উত্তরাঞ্চলের বন্যায় সেখানে স্বাস্থ্যবিধি রক্ষা করা কোনোভাবে সম্ভব হচ্ছে না। আরেকটি কারণ– তিন-চার দিনের মধ্যে কোরবানির হাট বসবে, মার্কেট জমজমাট হয়ে উঠবে, ঢাকাসহ বিভিন্ন শহরাঞ্চল থেকে বাড়ির উদ্দেশে ঈদযাত্রার অপ্রতিরোধ্য মিছিল যাবে। আবারও ঈদ শেষে একইভাবে লাখ লাখ মানুষ শহরে ফিরবে। সব মিলিয়ে ঈদের সময় স্বাস্থ্যবিধি গৌণ হয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে একমাত্র স্বাস্থ্য সচেতনতাই করোনা মহামারির হাত থেকে আমাদের সুরক্ষা করতে পারে।

আমাদের ওপর কিছু চাপিয়ে না দিলে আমরা নিয়ম মানতে চাই না, এজন্যই হয়তো ২৮ জুন কোভিড-১৯ জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির সুপারিশমালা বাস্তবায়নের কথা বলেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। সেই অনুযায়ী আবারও দোকান, শপিং মল, কাঁচাবাজার, হোটেল-রেস্টুরেন্টসহ সবক্ষেত্রে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক। ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ নীতি প্রয়োগ, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা ও জনসমাগম যথাসম্ভব বর্জনের কথা বলা হয়েছে। মাস্ক না পরলে আইনানুগভাবে শাস্তির মুখে পড়তে হবে। মসজিদ-মন্দির-গির্জায় মাস্ক পরে ও নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে প্রার্থনার জন্য বলা হয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি পরিপালন ও মাস্ক পরার বিষয়ে মসজিদে জুমআর নামাজে খুতবায় ইমামদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য অনুরোধ জানিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ। করোনা থেকে রক্ষা পাওয়ার ক্ষেত্রে এসব সময়োপযোগী নির্দেশের জন্য সাধুবাদ জানাই। এগুলো বাস্তবায়িত হবে এবং করোনার বিস্তার রোধ হবে সেই প্রত্যাশা করি।

তবুও বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে বলতে হচ্ছে– করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতির পক্ষকালের বেশি সময় পেরিয়েছে এবং কঠোর স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের জন্য সরকারি নির্দেশমালার অর্ধসপ্তাহ অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু একটি ক্ষেত্রেও উল্লেখ করার মতো নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি পরিপালনের লক্ষণ চোখে পড়ছে না।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাশাপাশি ধর্ম মন্ত্রণালয় থেকে জারি করা নির্দেশনা অনুযায়ী মসজিদসহ সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা পরিপালন হচ্ছে বলে দেখিনি এবং শুনিনি। বরং স্বচক্ষে দেখছি, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন হাসপাতালগুলোতে অধিকাংশ রোগী, দর্শনার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা মাস্ক পরছেন না। এমনকি হাসপাতালের নিরাপত্তা কর্মীরাই মাস্ক পরছেন না। এসব মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।

করোনার চতুর্থ ঢেউয়ের ম্যারাথন দৌড় থামাতে হলে সর্বস্তরের মানুষকে অবশ্যই সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ থাকতে হবে। সরকারি নির্দেশমালা গৃহবন্দি হয়ে থাকলে চলবে না। সবক্ষেত্রে এর যথাযথ প্রয়োগ হওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, করোনার চতুর্থ ঢেউয়ের ছোবল থেকে আমাদের নিজে বাঁচা ও অন্যকে বাঁচানোর এখনই সময়।


লেখক: কথাসাহিত্যিক
/এসএএস/জেএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
রাশিয়ার জন্য ন্যাটো গুরুতর হুমকি: ল্যাভরভ
রাশিয়ার জন্য ন্যাটো গুরুতর হুমকি: ল্যাভরভ
৭ ডিসেম্বর গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপির বৈঠক
৭ ডিসেম্বর গণতন্ত্র মঞ্চের সঙ্গে বিএনপির বৈঠক
ইউক্রেনজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন
ইউক্রেনজুড়ে বিমান হামলার সাইরেন
১০ ডিসেম্বর আ.লীগের দখলে থাকবে রাজপথ: বাণিজ্যমন্ত্রী
১০ ডিসেম্বর আ.লীগের দখলে থাকবে রাজপথ: বাণিজ্যমন্ত্রী
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ