X
শনিবার, ২০ এপ্রিল ২০২৪
৭ বৈশাখ ১৪৩১

উকিল সাত্তার-হিরো আলম: কার জয়, কার পরাজয়!

প্রভাষ আমিন
০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০:২০আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ২০:২০

বিএনপির এমপিদের পদত্যাগে শূন্য হওয়া ৬টি আসনের উপনির্বাচন যে নিরুত্তাপ, ভোটারবিহীন, একতরফা হবে তা অনুমিতই ছিল। একে তো প্রধান বিরোধী দল নেই, বিরোধী দল থাকা না থাকার চেয়ে বড় কথা হলো মাত্র এক বছরের জন্য জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ থাকার কোনও কারণ নেই। তারপরও যে ২৫ শতাংশ মানুষ ভোটকেন্দ্রে গিয়েছেন; নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপর তাদের আস্থা দেখে, গণতন্ত্রের জন্য তাদের দরদ দেখে আমি মুগ্ধ, অভিভূত। অর্থহীন এ উপনির্বাচনে যারা কেন্দ্রে গিয়েছেন, নির্বাচন কমিশনের উচিত তাদের সবার বাসায় ফুলের তোড়া পাঠানো। তবে এই প্রার্থীহীন, ভোটারবিহীন নির্বাচনেও এজেন্ট নিয়োগে বাধা, ভোটকেন্দ্র থেকে পোলিং এজেন্ট বের করে দেওয়া, ভোটারদের কেন্দ্রে যেতে বাধা দেওয়া, ভোটকেন্দ্র দখল, গোপন কক্ষে অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের উপস্থিতি, সংঘর্ষ ও ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা ঘটেছে।

যতই একতরফা হোক, এসব অনিয়ম বাংলাদেশের নির্বাচনি ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে যেন। বিরোধী দল না থাকায় সরকারি দল নিজেরা নিজেরাই এসব অনিয়ম করেছে।

অর্থহীন হলেও এ উপনির্বাচন অনুষ্ঠানে কিন্তু নির্বাচন কমিশনকে অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। বিএনপি না থাকলেও এই উপনির্বাচনের দায় কিন্তু তাদের নিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করলো বিএনপি। পরিস্থিতি পরিবর্তন না হলেও ২০১৮ সালের নির্বাচনে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নিলেও ভরাডুবি ঘটলো বিএনপির। প্রশ্নবিদ্ধ সেই নির্বাচনে বিএনপি পেলো সাকুল্যে ৬টি আসন।

দিনের ভোট রাতে হয়েছে, কারচুপি হয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি অভিযোগ করে শেষ দিনে সুরসুর করে সংসদে যোগ দিলো। কেন বিএনপি ২০১৮ সালের নির্বাচনে এলো, নির্বাচনের পর ফলাফল বর্জন করলো, কেন আবার সংসদে যোগ দিলো, কোনও পরিষ্কার ব্যাখ্যা নেই। সরাসরি ভোটে ৬টি, সংরক্ষিত একটিসহ ৭ এমপি নিয়ে সংসদে যোগ দিয়ে অবশ্য বিএনপি ভালোই করেছিল। সংখ্যায় ৭ হলেও রুমিন ফারহানা আর হারুনুর রশিদ- এই দুই জনই সংসদ গরম করে রাখতেন। বাইরের মাঠের আন্দোলন যেমন তেমন সংসদে বেশ সরব ছিল বিএনপি। আর সংসদের বক্তব্যের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে, মিডিয়া থেকে শুরু করে সবার নজর থাকে সংসদে। সংসদের বাইরে রুমিন ফারহানা আর হারুনুর রশীদ এখন যত কথাই বলেন, কারও নজর কাড়বে না। বিএনপি কীসের আশায় এমন চমৎকার একটি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে দিলো, বোঝা মুশকিল। এমন যদি হতো, বিএনপির এই ৭ এমপির পদত্যাগে সংসদ অচল হয়ে গেছে, সরকারের ভিত নড়ে গেছে, আন্দোলনে জোয়ার এসেছে; তাহলেও না হয় কথা ছিল। কিছুই হয়নি। শুধু বিএনপির ৭ এমপি সাবেক হয়ে গেছেন, প্রতিবাদ করার সবচেয়ে ভালো প্ল্যাটফর্মটি খুইয়েছে বিএনপি আর দেশ পেয়েছে বহু অর্থ ব্যয়ে ৬ আসনে অর্থহীন উপনির্বাচন।

তবে এই উপনির্বাচনে কিছুটা চাঞ্চল্য আনতে পেরেছিলেন দুজন প্রার্থী– উকিল আবদুস সাত্তার ভুঁইয়া আর হিরো আলম। উকিল সাত্তারও পদত্যাগী ৭ এমপির একজন ছিলেন। কিন্তু পদত্যাগ করেই তিনি ‘পল্টি’ মারেন। দলের সিদ্ধান্তের বাইরে স্বতন্ত্র হিসেবে উপনির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হন তিনি। তবে উকিল সাত্তারের ‘পল্টি’র পেছনে সরকারি দলের বড়সড় ইন্ধন আছে। আর আছেন রুমিন ফারহানা। উকিল সাত্তার ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসন থেকে বিএনপির মনোনয়নে পাঁচবার এমপি হয়েছেন। তুমুল জনপ্রিয়তা থাকলেও আগামীতে আর তিনি বিএনপির মনোনয়ন পাবেন না, এটা প্রায় নিশ্চিত। এলাকায় জনপ্রিয়তা থাকলেও ৮৬ বছর বয়সী উকিল আবদুস সাত্তার সংসদে বড্ড ম্লান। সংসদে তার ভয়েস শোনাই যায় না। বিপরীতে রুমিন ফারহানা এখন বিএনপির মুখপাত্র হয়ে উঠছেন। দেশে-বিদেশে কূটনীতিতে, টকশো’তে রুমিন এখন বিএনপির বড় ভরসা। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে আগামীতে রুমিন ফারহানার মনোনয়ন নিশ্চিত। এটা বুঝতে পেরেই উকিল সাহেব ‘পল্টি’টা মেরেছেন।

সরাসরি নৌকায় না উঠলেও আওয়ামী লীগ বিএনপির এই সাবেক এমপিকে জিতিয়ে আনতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছিল। একজন স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মিসভায় যোগ দিতে ঢাকা থেকে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একজন সাংগঠনিক সম্পাদক ছুটে গিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সেখানে প্রার্থী তো দেয়ইনি, বরং দলের তিন বিদ্রোহী প্রার্থীকে চাপ দিয়ে বসিয়ে দেওয়া হয়। নির্বাচনের চারদিন আগে থেকে নিখোঁজ বা আত্মগোপনে চলে যান বিএনপির আরেক বিদ্রোহী প্রার্থী। সব মিলিয়ে সরকার, সরকারি দল উকিল সাত্তারের জন্য মাঠ একদম ফাঁকা করে রাখে, যাতে তিনি নিশ্চিন্তে গোল দিতে পারেন। সেটা পেরেছেন উকিল সাহেব। তবে আগের পাঁচবার ভরা মাঠে খেলে গোল দেওয়ার যে আনন্দ, ফাঁকা মাঠে গোল দেওয়াতে যে সে আনন্দ নেই; সেটা নিশ্চয়ই রাজনীতির ঝানু খেলোয়াড় উকিল সাত্তার বুঝেছেন। ষষ্ঠবার এমপি হওয়াটা নিশ্চয়ই তার জন্য গ্লানির। কোনও কোনও জয় আছে, পরাজয়ের চেয়েও বেশি গ্লানি বয়ে আনে। উকিল আবদুস সাত্তার ভুঁইয়া নিশ্চয়ই এখন মুখ লুকানোর জায়গা খুঁজছেন।

উকিল সাত্তারের মতোই আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী হিরো আলমকে নিয়েও ব্যাপক আলোচনা ছিল। শুরুতে নির্বাচন কমিশন তার মনোনয়নপত্র বাতিল করে দিলেও হাইকোর্টে আদেশে তিনি ফিরে পান। নিজেকে সিংহের সঙ্গে তুলনা করা হিরো আলম সিংহ মার্কা নিয়েই লড়তে চেয়েছিলেন। পরে অবশ্য সেটা পাননি। হিরো আলম বগুড়া-৪ ও ৬ আসনে লড়াইয়ে নামেন। দুপুরের মধ্যেই বগুড়া-৬ আসনের হাল ছেড়ে দিয়ে বলেন, বগুড়া-৪ আসন থেকে তিনিই এমপি হচ্ছেন। সবাই তার এই কথাবার্তাকে বাগাড়ম্বর বলেই ভাবছিলেন। কিন্তু ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেলো ক্ষমতাসীন মহাজোটের প্রার্থী জাসদ নেতা এ কে এম রেজাউল করিম তানসেন পেয়েছেন ২০ হাজার ৪০৫ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হিরো আলম পেয়েছেন ১৯ হাজার ৫৭১ ভোট। ব্যবধান মাত্র ৮৩৪ ভোট! হিরো আলম অবশ্য পরাজয় মেনে নেননি। তার দাবি, তাকে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। তিনি সংবাদ সম্মেলনে ফলাফল চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা দিয়েছেন।

৮৩৪ ভোটে হিরো আলমের পরাজয়টা অবশ্য জয়ের চেয়েও বেশি। সারাক্ষণ সাংবাদিক আর ইউটিউবাররা তাকে ঘিরে থাকছে। হেরেও সত্যিকারের হিরোই যেন। আর ষষ্ঠবার জিতেও মন ভালো নেই উকিল সাত্তারের। আসলে জীবনটাই এমন। কোনটা জয়, কোনটা পরাজয় বোঝা মুশকিল। কোনও কোনও পরাজয় হয় আনন্দের। কোনও কোনও জয় হয় গ্লানির।

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ইরাকি ঘাঁটিতে হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের
ইরাকি ঘাঁটিতে হামলায় জড়িত থাকার কথা অস্বীকার যুক্তরাষ্ট্রের
উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগ সভাপতির সাহসী পদক্ষেপ
উপজেলা পরিষদ নির্বাচন ও আওয়ামী লীগ সভাপতির সাহসী পদক্ষেপ
‘তীব্র গরমে’ চু্য়াডাঙ্গা ও পাবনায় ২ জনের মৃত্যু
‘তীব্র গরমে’ চু্য়াডাঙ্গা ও পাবনায় ২ জনের মৃত্যু
ডাগআউট থেকে রিভিউ নিতে বলায় ডেভিড, পোলার্ডের শাস্তি
ডাগআউট থেকে রিভিউ নিতে বলায় ডেভিড, পোলার্ডের শাস্তি
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ