X
রবিবার, ১৪ এপ্রিল ২০২৪
১ বৈশাখ ১৪৩১

যে নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের গোড়াপত্তন

আনিস রায়হান
০৮ নভেম্বর ২০২৩, ২১:০৮আপডেট : ০৮ নভেম্বর ২০২৩, ২১:০৮

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়েছে মাত্র। সময়টা ১৯৪৮ সাল। পৃথিবী তখনও ক্ষতবিক্ষত। ঘনিয়ে এসেছে ব্রিটিশ সরকারের স্বঘোষিত প্যালেস্টাইন সনদ সমাপ্তির দিন। তখনও তিন মাস বাকি। ব্রিটিশ সৈন্যরা ফিরে যাবে নিজ দেশে। কিন্তু এর মধ্যেই নিরস্ত্রপ্রায় ফিলিস্তিনিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়লো জায়নবাদী ইহুদিদের সেনাবাহিনীর পঞ্চাশ হাজার সৈন্য। সামরিক ফরমানে সৈন্যদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, দেশজুড়ে সন্ত্রাস ও আতঙ্ক সৃষ্টি; গ্রাম ও জনবহুল জায়গাগুলো অবরোধ এবং সেখানে বোমাবর্ষণ; বাড়িঘর, সম্পত্তি এবং মালপত্রে অগ্নিসংযোগ; বাসিন্দাদের জোর করে তাদের বাড়িঘর থেকে বের করে দেওয়া; আবাসস্থল ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া এবং সেই সবশেষে সেই ধ্বংসস্তূপে মাইন বসাতে হবে, যাতে বহিষ্কৃত বাসিন্দারা আর ফিরে আসতে না পারে। প্রতিটি সামরিক ইউনিটের উচ্ছেদ অভিযানের আওতায় কোন কোন গ্রাম-শহর-জনপদ থাকবে তারও বিশদ বিবরণ ওই ফরমানে উল্লেখ করা হয়। এই নির্দেশনা প্রদানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ১১ জন প্রবীণ জায়নবাদী নেতা। ‘ড্যালেট পরিকল্পনা’ বা ‘ডি-পরিকল্পনা’ নামে অভিহিত এই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ডেভিড বেন গুরিয়ন, যিনি কিছু দিনের মধ্যেই ওই ধ্বংসস্তূপের ওপর প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আসীন হন।

‘ডি-পরিকল্পনা’র চতুর্থ পরিশীলিত সংস্করণের প্রয়োগ শুরু হয় ১০ মার্চ ১৯৪৮, বুধবার। পরবর্তী মাত্র একমাসে আড়াই লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের আবাসস্থল থেকে উচ্ছেদ ও দেশ থেকে চিরতরে বের করে দেওয়া হয়। জায়নবাদী সশস্ত্র উচ্ছেদ অভিযান যখন শুরু হয় তারপরও আরও তিন মাস প্যালেস্টাইন ব্রিটিশ শাসনের অধীন ছিল এবং সেখানে ব্রিটিশ সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ছিল। তাদের হাতেই ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব। কিন্তু সশস্ত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ফিলিস্তিনি-আরবদের তাদের মাতৃভূমি থেকে জাতিগতভাবে মুছে ফেলার জায়নবাদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্রিটিশ শাসকরা বা তাদের বাহিনী কোন বাধা দেয়নি। তাদের চোখের সামনেই ফিলিস্তিনের অধিকাংশ শহর সশস্ত্র জায়নবাদীরা দখল করে নিয়েছিল, ফিলিস্তিনিদের নির্মমভাবে হত্যা ও নিজভূম থেকে উৎখাত করা হয়েছিল।

ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন দখল করেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯১৭ সালের ৯ ডিসেম্বর তার প্রতিপক্ষ তুরস্কের কাছ থেকে। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ফিলিস্তিনের শাসনক্ষমতা নিজেদের হাতে রাখতে ব্রিটেন ওই সনদ প্রণয়ন করে। ১৯২২ সালে লিগ অব নেশনসে তারা সনদটি অনুমোদন করিয়ে নেয়। এই সনদের ঘোষণায় বলা হয়, ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনের উদ্দেশ্য হলো, ১৯৪৮ সালের মধ্যে প্যালেস্টাইনে একটি ইহুদি রাষ্ট্র গড়ে তোলার সমস্ত প্রস্তুতি সুসম্পন্ন করা। ‘ইহুদি সমস্যা’ ছিল ইউরোপের নিজস্ব সংকট এবং তাদের বড় আবাসস্থল ছিল যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে ইহুদি জাতিরাষ্ট্রের কোনও প্রয়োজনীয়তা থাকলে তা হওয়া উচিত ছিল ইউরোপ বা আমেরিকায়। কিন্তু তা না করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ জায়নবাদীদের বিশ্বাস অনুযায়ী আরব ফিলিস্তিন ভূমিতে ইহুদি রাষ্ট্র্র প্রতিষ্ঠায় তৎপর ছিল। তাদের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতায় ব্রিটিশ দখলকৃত ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং তাদের সামরিক শক্তি তৈরি হতে থাকে।

ফিলিস্তিনে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে অর্থের বিনিময়ে ফিলিস্তিনিদের জমি কিনে ইহুদি বসতি সৃষ্টির জন্য তৎপর ছিল জিউয়িশ ন্যাশনাল ফান্ড, জেএনএফ। অভিবাসী ইহুদিরা আরবদের কাছ থেকে জমি কিনে নেওয়ার ফলে ফিলিস্তিনি ভূমিহীন ও দরিদ্রের সংখ্যা বাড়তে থাকে। পরিণতিতে ফিলিস্তিনি-আরব জনগণের সঙ্গে ইহুদিদের বিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। শুরু হয় সংঘাত। ইহুদি বনাম ফিলিস্তিনি জনগণের দ্বন্দ্ব ১৯২০, ১৯২১ এবং ১৯২৯ সালে পরপর কয়েকটি বড় আকারের সশস্ত্র সংঘর্ষের আকারে ফেটে পড়ে। 

এসব সংঘাতে ইহুদি ও ফিলিস্তিনি উভয় পক্ষের লোকজনই হতাহত হয়। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর প্রত্যক্ষ মদতে এ সময় জায়নবাদীদের নেতৃত্বে ইহুদি জনগোষ্ঠীর সশস্ত্র প্যারামিলিটারি বাহিনী গড়ে উঠতে শুরু করে। তখন এর মূল উদ্দেশ্য ছিল ফিলিস্তিনি আরব-অধ্যুষিত গ্রামগুলোর মধ্যে অবস্থিত ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের প্রতিরক্ষা। ব্রিটিশ সামরিক কর্মকর্তা অর্ড উইনগেইট এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি প্রচার করেন যে ফিলিস্তিনে ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র উপায় হচ্ছে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলা এবং ফিলিস্তিনি আরবদের সশস্ত্র উপায়ে উচ্ছেদ করে দেশটিকে দখল করে নেওয়া।

এ সময় ফিলিস্তিনে ইহুদিদের জমি, জনসংখ্যা, শক্তি এবং অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফিলিস্তিনিরা তাদের ঊর্বর ভূমি হারাচ্ছিলেন এবং বঞ্চিত হচ্ছিলেন কর্মসংস্থান থেকে। দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দুটোই গ্রাস করছিল ফিলিস্তিনি জনগণকে। প্রতিক্রিয়ায় ফিলিস্তিনি আরব জনগণের এক বিপুল বিস্ফোরণ ঘটে ১৯৩৬ সালে। ব্রিটিশ শাসন ও জায়নবাদীদের আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশাল গণবিদ্রোহে ফেটে পড়েন ফিলিস্তিনি কৃষকরা, যাদের ‘ফালাহ’ নামে অভিহিত করা হতো। ব্রিটিশ শাসকরা এই ন্যায়সঙ্গত বিদ্রোহকে নির্মূল করার জন্য চরম দমন-নিপীড়ন ও হত্যাযজ্ঞের আশ্রয় নেয়। উইনগেইট তখন জায়নবাদী সশস্ত্র সংগঠন হাগানাহকে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত করে যৌথভাবে আরব বিদ্রোহ দমনে সামরিক আক্রমণ পরিচালনা করেন।

জায়নবাদী অপর এক সশস্ত্র সন্ত্রাসবাদী সংগঠন ইরগুন আরব গ্রামগুলোতে বোমা হামলা চালাতে থাকে। তারপরও দীর্ঘ তিন বছর লেগে যায় বিদ্রোহ দমন করতে। ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ বাহিনী আরব বিদ্রোহকে পর্যুদস্ত করতে সক্ষম হয়। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে পুরো ফিলিস্তিনি আরব জনসাধারণকে নিরস্ত্র করে ফেলে এবং প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতাদের ও তাদের সশস্ত্র সামর্থ্যকে সম্পূর্ণ নির্মূল করে দেয়। বিপরীতে এর মধ্য দিয়ে বিকশিত করে তোলে হাগানাহ, ইরগুন, লেহির মতো জায়নবাদী সশস্ত্র বাহিনীগুলোকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হাগানাহ সদস্যরা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ-তৎপরতায় অংশ নেয়।

ইতোমধ্যে বেন গুরিয়নসহ জায়নবাদী নেতারা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে সশস্ত্র বলপ্রয়োগের মধ্য দিয়েই ফিলিস্তিনিদের তাদের মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ করতে হবে। গুরিয়ন নিজে নিয়মিত দিনপঞ্জি লিখতেন। ইতিহাসবিদরা সেখান থেকেই আবিষ্কার করেছেন ভয়াবহ নির্মমতার সব দলিল। তিনি ১৯৩৮ সালেই ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি প্যালেস্টাইন থেকে আরবদের বলপূর্বক বের করে দিতে চাই এবং আমি মনে করি এতে অনৈতিকতার কিছু নেই।’ তার নেতৃত্ব ও পরিকল্পনা অনুসারে তৈরি হতে থাকে জায়নবাদী সেনাবাহিনী, গবেষক, প্রচারক ও বিজ্ঞানী দল।

১৯৪০-এর দশকের শুরুতে জেএনএফ-এর উদ্যোগে প্যালেস্টাইনে এক ব্যাপক বিস্তৃত জরিপ কাজ পরিচালনা করা হয়। এর মধ্যে থাকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের জনসংখ্যা, বিভিন্ন অংশের ভৌগোলিক অবস্থা, জমির পরিমাণ, জমির মালিকানা ও তার প্রকৃতি, অধিবাসীদের সম্পর্কে তথ্যাবলি, আরব গ্রামসমূহের কাঠামো, গ্রামগুলোর জনসাধারণ ও তাদের সম্পত্তি সম্পর্কিত বিস্তৃত তথ্যাদি। এই জরিপের অধীনে প্যালেস্টাইনের বিভিন্ন অংশের মানচিত্রও প্রণয়ন করা হয়। এই জরিপ ছিল ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদে জায়নবাদীদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার। এই জরিপে অংশ নিয়েছিলেন মোশে পাসতারন্যাক। তিনি পরবর্তীতে লিখেছিলেন, ‘আমরা আরব গ্রামসমূহের মূল কাঠামো পর্যালোচনা করেছিলাম। এই কাঠামো পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আমরা ঠিক করেছিলাম কীভাবে সর্বোত্তম পন্থায় এগুলোকে আক্রমণ করা যায়।... আমাদের আরব গ্রামসমূহ আক্রমণের শ্রেষ্ঠ উপায়টাকে উদ্ভাবন করতে হয়েছিল।’

সামরিক বাহিনীগুলোর সঙ্গে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার রাজনীতি কীভাবে যুক্ত ছিল তা বোঝা যায় ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ইতিহাস থেকে। হাগানাহ’র অন্যতম নেতা ছিলেন এরিয়েল শ্যারন, ইরগুন নেতা ছিলেন উন্মাদ আরববিরোধী মেনাখেম বেগিন, স্টার্ন গ্যাংয়ের নেতা ছিলেন ইজহাক সামির, সশস্ত্র কমান্ডো দল প্যালম্যাকের নেতা ছিলেন বর্ণবাদী ইজহাক রবিন। এরা প্রত্যেকেই পরবর্তীকালে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকালে এদের নির্দেশ ও অংশগ্রহণেই ঠান্ডা মাথায় মেশিনগানের বেপরোয়া গুলিতে নির্বিচার খুন, বাড়িঘর-গ্রাম-ফসল ধ্বংস করে দেওয়া, ধর্ষণ, নারী-শিশু হত্যাসহ এমন কোনও অপরাধ নেই যার আশ্রয় গ্রহণ করা হয়নি।

ছয় মাসব্যাপী সুপরিকল্পিত এই উচ্ছেদ অভিযানের মধ্য দিয়ে ৫৩১টি গ্রাম নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়, ১১টি শহর করা হয় জনশূন্য, ফিলিস্তিনি জনসাধারণের প্রায় অর্ধেক অর্থাৎ ৮ লাখের বেশি মানুষকে তাদের স্বদেশ থেকে পরিপূর্ণভাবে উৎখাত করা হয়। এ ছিল মানব ইতিহাসের এক বৃহত্তম জাতিগত সশস্ত্র উচ্ছেদ অভিযান। তখন প্যালেস্টাইনের মোট লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লাখ, যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম ছিল ইহুদি এবং দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি ছিল ফিলিস্তিনি-আরব। জায়নবাদীরা ফিলিস্তিনিদের বিতাড়িত করে দেশটির ৮০ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নেয় এবং ব্রিটিশ সৈন্যদের বিদায় দেওয়ার দিন, ১৯৪৮ সালের ১৪ মে সেখানে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। এভাবেই ভয়াবহ নিষ্ঠুরতার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বুকে গোড়াপত্তন ঘটে ইসরায়েল রাষ্ট্রের এবং সেই নিষ্ঠুর নৃশংসতা আজও চলমান।

[উদ্ধৃত তথ্যসমূহ ইসরায়েলি ইতিহাসবিদ ইলন প্যাপের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দি এথনিক ক্লিনজিং অফ প্যালেস্টাইন’ থেকে সংগৃহীত।]

 

লেখক: সাংবাদিক ও গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঈদের চতুর্থ দিন: টিভি পর্দায় যা থাকছে
ঈদের চতুর্থ দিন: টিভি পর্দায় যা থাকছে
বিএনপি দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিশ্বস্ত ঠিকানা: কাদের
বিএনপি দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিশ্বস্ত ঠিকানা: কাদের
গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রধান দাবিতে অটল হামাস
গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রধান দাবিতে অটল হামাস
‘সাম্প্রদায়িকতা, ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে হবে’
‘সাম্প্রদায়িকতা, ষড়যন্ত্র ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়িয়ে দিতে হবে’
সর্বশেষসর্বাধিক

লাইভ