X
বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪
১ শ্রাবণ ১৪৩১

নৈতিকতা শিক্ষাদান: ভিন্ন পদ্ধতির সন্ধানে

মো. সামসুল ইসলাম
২৪ জুন ২০২৪, ১৭:২৬আপডেট : ২৪ জুন ২০২৪, ১৮:৫৭

আমার অফিসের গাড়ি আমাকে যেখানে নামিয়ে দেয় সেখান থেকে রিকশায় বাসায় যেতে হয়। ব্যাগ, ল্যাপটপ ইত্যাদি নিয়ে আমি বাসায় ফেরার রিকশা দেখি এবং পরবর্তীতে ভাড়া নিয়ে জটিলতা এড়ানোর জন্য রিকশাওয়ালাকে ভাড়া জিজ্ঞেস করি। রিকশাওয়ালা আমাকে ভালোমতো পরিমাপ করে, বোঝার চেষ্টা করে আমি এলাকায় নতুন কিনা! সে যদি বোঝে আমি নতুন, তাহলে ভাড়ার পরিমাণ বেশ বাড়িয়ে দেয়, আবার যদি বোঝে আমি এই এলাকারই, তখন সে প্রকৃত ভাড়া চায়! সবাই হয়তো নয়। কিন্তু অনেকেই এরকম করে।

সুতরাং রিকশাওয়ালাও দুর্নীতির চেষ্টা করে। তার পক্ষে যতটুকু সম্ভব ততটুকু। নিজের স্বার্থে তারও নৈতিকবোধ লোপ পায়। হয়ে পড়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। আমরা প্রতিনিয়তই দেশে অর্থনৈতিক দুর্নীতি নিয়ে একের পর এক রোমহর্ষক সংবাদে মর্মাহত হচ্ছি। বিশিষ্ট আমলা বা রাজনীতিবিদদের দুর্নীতির সংবাদে আমাদের মনে হতে পারে, শুধু তারাই যত অনৈতিক কাজ করছেন, তাদেরই নৈতিক জ্ঞান নেই। আর বাকি সবার ঠিক আছে।

প্রকৃতপক্ষে তা নয়। জাতি হিসেবে আমরা এক ভয়াবহ নৈতিক সংকটকাল অতিক্রম করছি। ধীরে ধীরে সব পেশার মানুষকে তা গ্রাস করছে।

তবে এ কথা বলার মাধ্যমে আমি রাজনৈতিক সততা, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করতে চাই না। সেসব দেখার জন্য রাজনীতিবিদরা আছেন। কিন্তু একজন শিক্ষক হিসেবে আমি বলতে চাই, রাজনৈতিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি আমাদের শিক্ষা কারিকুলামে নৈতিকতা শিক্ষা প্রদানের পদ্ধতিগত পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে আমাদের নৈতিকতা শিক্ষাদানের সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হচ্ছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নৈতিকতা শিক্ষাদানের ভিন্নপথ অবলম্বন করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে ‘hero worship’-এর মাধ্যমে সনাতন পদ্ধতিতে ছোটবেলা থেকে যে নৈতিক জ্ঞানদানের চেষ্টা করা হয় বা নৈতিক চরিত্রকে সততা, দয়া, ধৈর্য ইত্যাদির একটি ‘bag of virtues’ হিসেবে মুখস্থ করানো হয়, তা ফলাফল অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। সমাজের উঁচুতলা থেকে নিচুতলা পর্যন্ত নৈতিকতার অবক্ষয় আমরা দেখছি।   

উচ্চপদস্থ আমলা, রাজনৈতিক বা বিজনেস এলিটদের ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি, প্রতারণার ঘটনা মিডিয়ার কল্যাণে বহুল আলোচিত। যেটা আলোচিত নয় তা হলো সমাজের সর্বস্তরে নৈতিকতার অধঃপতন। একজন সৎ বা নৈতিকবোধসম্পন্ন মানুষের পক্ষে এ সমাজে টিকে থাকা ভয়ানক কষ্টকর বটে। কিছু কিনতে গেলে আপনি ওজনে ঠকতে পারেন, অনলাইনে কেনাকাটায় হতে পারেন প্রতারিত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে টাকা দিতে সন্তানকে ভর্তি করাবেন কিন্তু পড়াশোনার জন্য প্রাইভেট পড়াতে হবে বা দিতে হবে কোচিং সেন্টারে। দুর্নীতি সর্বব্যাপী, সব ক্ষেত্রে। তাই টিআইবির দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আমরা থাকি বছরের পর বছর।

এবার আবার আমরা আমাদের মূল প্রসঙ্গে আসি। নৈতিকতা শিক্ষাদানের তত্ত্ব প্রদান করতে গিয়ে হার্ভার্ড প্রফেসর লরেন্স কোলবার্গ দেখিয়েছিলেন যে মরাল রিজনিং বা নৈতিক বিবেচনার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ মানুষ একটা পর্যায়ের বেশি যেতে পারে না। তিনি একটি চমৎকার উদাহরণের মাধ্যমে যাদের ওপর গবেষণা করেছেন তাদের নৈতিক বিকাশের স্তর নির্ধারণ করেছেন।

বোঝার স্বার্থে আমি খুব সংক্ষেপে উদাহরণটি বলছি। প্রফেসর লরেন্স কোলবার্গের সুবিখ্যাত এই উদাহরণটি Heinz dilemma বা হেইনজের উভয় সংকট হিসেবে পরিচিত। তিনি তার সাবজেক্টদের কাছে হেইনজের এই উভয় সংকটের  ঘটনাটি বলে তাদের মতামত চাইতেন।

ইউরোপে হেইনজ নামে একজন ব্যক্তির স্ত্রী একটি মারাত্মক ক্যানসারে ভুগছিলেন। একজন ওষুধ বিজ্ঞানী একটি ওষুধ আবিষ্কার করেছিলেন, যা তার স্ত্রীর জীবন বাঁচাতে পারতো, তবে তিনি ২০০ ডলার দিয়ে তৈরি ওষুধের দাম চাইছিলেন ২০০০ ডলার। অপরদিকে দরিদ্র হেইনজ ১০০০ ডলার পর্যন্ত জোগাড় করতে পেরেছিলেন। হেইনজ বিজ্ঞানীর কাছে এই দামে ওষুধটি চান, কারণ তার স্ত্রীর জীবন বাঁচানো প্রয়োজন আর ওষুধটির প্রকৃত মূল্য অনেক কম। কিন্তু বিজ্ঞানী রাজি হননি এই বলে যে যেহেতু তিনি ওষুধটি আবিষ্কার করেছেন তাই তিনি সেটি থেকে লাভ করতে চান। উপায়ন্তর না দেখে হেইনজ ওষুধের দোকান ভেঙে ওষুধটি চুরি করেন।

প্রফেসর কোলবার্গ এই ঘটনাটি উল্লেখ করে হেইনজের ওষুধ চুরি করা উচিত কিনা এই প্রশ্নের উত্তর সবাইকে দিতে বলেছিলেন। এরপর তিনি তাদের যুক্তিতর্ক বিশ্লেষণ করে তাদের নৈতিক বিকাশের স্তর নির্ধারণ করেছিলেন। কে হেইনজের চুরি সমর্থন করেছেন বা বিরোধিতা করেছেন তিনি উত্তরগুলো সেভাবে না দেখে কে কি কারণে সমর্থন বা বিরোধিতা করেছেন এভাবে উত্তরগুলো বিশ্লেষণ করেছেন। আমি বিস্তারিত ব্যাখ্যায় যাচ্ছি না, কিন্তু প্রফেসর কোলবর্গ দেখিয়েছেন বেশিরভাগ মানুষ নৈতিকতার সর্বোচ্চ স্তর, যেমন- সর্বজনীন নীতি, ন্যায়বিচার এবং সমাজের জন্য সর্বোত্তম ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম।

আমার এ তত্ত্বের উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে যে আমি যখন সোশ্যাল মিডিয়ায় আমাদের দেশের মানুষের লেখা পড়ি বা রাস্তাঘাটে মানুষের সাথে কথা বলি আমি বুঝতে পারি যে আমাদের দেশের মানুষরা নৈতিকতার সর্বোচ্চ স্তর তো দূরের কথা,  খুব সাধারণ বা প্রাথমিক স্তরে অবস্থান করছেন। আমাদের নৈতিক শিক্ষাদান উন্নত ও আধুনিক হলে এ অবস্থা হওয়ার কথা ছিল না।  

আমি উদাহরণ দিতে পারতাম। কিন্তু বিতর্ক এড়াতে আমি উদাহরণের সাহায্য নিচ্ছি না।

দুর্নীতির প্রসঙ্গ বা যেকোনও ধরনের নৈতিক অবক্ষয় নিয়ে আমাদের দেশের সাধারণ মানুষের মতামত খুব প্রাথমিক স্তরের। তারা গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করে না। প্রফেসর কোলবার্গের মতে, এই স্তরের মানুষেরা শাস্তি এড়ানো, পুরস্কার পাওয়া বা কর্তৃপক্ষের নিয়মকানুন মেনে চলার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন।

যে কথা আমি বলতে চাইছি যে নৈতিকতার এই সাধারণ স্তরে থাকা মানুষদের নৈতিকতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া বেশ কঠিন। ‘Hero Worship’ বা নৈতিকতাকে bag of virtues হিসেবে শুধু শিক্ষার্থীদের সামনে উপস্থাপনা না করে প্রফেসর কোলবার্গ নৈতিকতার ইস্যুগুলোকে ক্লাস আলাপ আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে শিক্ষাদানের কথা বলছেন। তিনি Socratic teaching method বা দার্শনিক সক্রেটিসের পদ্ধতিতে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর বিতর্কের মাধ্যমে নৈতিকতা শেখাতে উৎসাহিত করছেন, যার ফলাফল হবে দীর্ঘস্থায়ী।

বিশেষজ্ঞরা আরও অনেক আধুনিক পদ্ধতির কথা বলেন। এর মধ্যে একটি আছে সেবার মাধ্যমে শেখা বা সমাজকর্ম, যাকে বলা হয় Service Learning। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কমিউনিটিতে কাজ করার সুযোগ করে দিতে হবে। কিছু প্রতীকী ব্যবহার থাকলেও আমাদের দেশে এর প্রচলন খুবই কম।

এছাড়া প্রযুক্তির মাধ্যমে নৈতিকতা শিক্ষাদান করা যেতে পারে। সিমুলেশন, অনলাইন গেম ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ইন্টারঅ্যাকটিভ পদ্ধতিতে নৈতিকতা শিক্ষাদান এখন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।

উপরোক্ত পদ্ধতিসমূহ ছাড়াও নৈতিকতা শিক্ষাদানের আরও বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। শুধু প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য নয়। শিক্ষার সব স্তরেই নৈতিকতা শিক্ষাদানের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। রাজনৈতিক পদক্ষেপের পাশাপাশি যথাযথ নৈতিক শিক্ষাই পারে এ জাতিকে নৈতিকতার চরম অধঃপতন থেকে রক্ষা করতে।

লেখক: কলামিস্ট, বিভাগীয় প্রধান, সাংবাদিকতা বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

ইমেইল [email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

বাংলা ট্রিবিউনের সর্বশেষ
ঢাবিতে গুলি ছোড়া যুবককে খুঁজে বের করবে পুলিশ
ঢাবিতে গুলি ছোড়া যুবককে খুঁজে বের করবে পুলিশ
শূন্য কার্যালয়ে মাঝরাতে নাটক করতেই ডিবির অভিযান: রিজভী
শূন্য কার্যালয়ে মাঝরাতে নাটক করতেই ডিবির অভিযান: রিজভী
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডিবি, শতাধিক ককটেল ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি
বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ডিবি, শতাধিক ককটেল ও অস্ত্র উদ্ধারের দাবি
রোকেয়া হল ছাত্রলীগের নেত্রীর কক্ষে হামলা, মারধর
রোকেয়া হল ছাত্রলীগের নেত্রীর কক্ষে হামলা, মারধর
সর্বশেষসর্বাধিক