দিল্লির দরবারে – পর্ব ২

Send
জুলফিকার রাসেল
প্রকাশিত : ২০:২৯, অক্টোবর ০৯, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫০, ডিসেম্বর ০৩, ২০১৬

জুলফিকার রাসেলসেপ্টেম্বরের এক শেষ বিকেলে হাজার নিরাপত্তার কড়াকড়ি পেরিয়ে দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে যেদিন দেখা করতে গেলাম, এক গাল হেসে অভ্যর্থনা জানালেন রাষ্ট্রপতির প্রেসসচিব বা মুখপাত্র ভেনু রাজামণি। মি. রাজামণি আসলে ভারতের ফরেন সার্ভিসের কর্মকর্তা, বহু বছর ওয়াশিংটন-জেনেভা-আবুধাবিতে ভারতীয় কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব সামলেছেন, এখন ডেপুটেশনে সে দেশের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর টিমে কাজ করছেন।
বাংলাদেশ থেকে মি. রাজামণির জন্য উপহার হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলাম একটা ছোট্ট মিনিয়েচার রিক্সা, যে যানটি এখন বহির্বিশ্বে একরকম ঢাকার আইকন হিসেবেই সবাই চিনে গেছে। ঢাকা মানেই তাদের কাছে রিক্সার শহর!
কেরালার মানুষ মি. রাজামণি রিক্সাটা নেড়েচেড়ে দেখে ভীষণ খুশি হলেন, জানালেন তাদের কেরালায় এরকম রিক্সাই নেই। সেই সঙ্গে খুব আন্তরিকভাবে যোগ করলেন, ‘আপনি বাংলাদেশ থেকে আসা অতিথি। বিশ্বাস করুন, বাংলাদেশের বন্ধুদের কাছ থেকে আমরা কোনও উপহার প্রত্যাশা করি না। এখানে সম্পর্কটা একেবারে আলাদা, মনের টানটাই যথেষ্ট!’
এটাকে নিছক কথার কথা হিসেবে নিলেই চলত, কিন্তু দিল্লি সফরে সাউথ ব্লক-রাষ্ট্রপতি ভবন বা জওহর ভবন, যে তল্লাটেই সরকারি কর্মকর্তা বা মন্ত্রিদের সঙ্গে কথা হয়েছে তারা সবাই দেখেছি খুব জোরের সঙ্গে বারবার বলেছেন ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কটা আলাদা’।

ভুটানকে হিসেবের বাইরে রাখলে বাংলাদেশই যে এই মুহূর্তে ভারতের সবচেয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী– এটা নিয়ে দিল্লিতে এখন যেন আর কোনও সংশয়ই নেই, ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জমানায় দুদেশের সম্পর্ক যে তলানিতে ঠেকেছিল, সবাই সেটা দেখলাম প্রায় ভুলতে বসেছেন।

বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক নিয়ে অ্যাকাডেমিক কাজকর্মও হচ্ছে বিস্তর। অবজার্ভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন বা ইকরিয়ের-এর মতো দিল্লির প্রথম সারির থিংট্যাংকগুলো ইদানিং বাংলাদেশ নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করছে, অনেক সেমিনার-আলোচনা আয়োজন করছে বা স্টাডি পেপারও প্রকাশ করছে। জামিয়া মিলিয়া ইউনিভার্সিটিতে কিছুদিন আগে শুধুমাত্র বাংলাদেশ-সংক্রান্ত গবেষণার জন্য চালু হয়েছে একটি পুরোদস্তুর বাংলাদেশ স্টাডি প্রোগ্রাম, যার দায়িত্বে আছেন ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার বীনা সিক্রি। মাত্র কয়েক বছর আগেও দিল্লিতে কিন্তু বাংলাদেশের এতটা গুরুত্ব ভাবাই যেত না।

পাশাপাশি ভারত সরকারের নীতিনির্ধারকরাও যেন বাংলাদেশকে অন্য চোখে দেখতে শুরু করেছেন। রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বঙ্গসন্তান প্রণব মুখার্জী প্রথম যে বিদেশ সফরে গেছেন, সেটা বাংলাদেশ। এমন কী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও এককভাবে প্রথম যে বিদেশ সফরে গেছেন, সেটাও বাংলাদেশ। ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় ঢাকায় গেছেন নরেন্দ্র মোদিও – নিজের দেশের পার্লামেন্টে স্থল সীমান্ত চুক্তি পাস করানোর পরেই। চুক্তিটা আগে পাস হলে মোদিও হয়তো আরও আগেই যেতেন।

যে কথাটা বলতে চাইছি তা হল স্বাধীন বাংলাদেশ তৈরি হওয়ার চার দশকেরও বেশি সময় পর এসে ভারত যেন এখন তার পূর্বের প্রতিবেশীকে নতুন ভাবে আবিষ্কারের চেষ্টা শুরু করেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের দাদাগিরি বা আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে ছোট ছোট প্রতিবেশীদের মধ্যে যে অসন্তোষের ধিকি ধিকি আগুন আছে, সেটাকে নিভিয়ে ভারত এখন চাইছে একুশ শতকে তাদের সত্যিকারের ‘পার্টনার’ বা অংশীদারের মর্যাদা দিতে। সেই এক্সপেরিমেন্ট শুরু হয়েছে বাংলাদেশকে দিয়েই।

‘‘কিন্তু তার পরেও আমরা জানি বাংলাদেশকে আমরা কোনও দিনই খুশি করতে পারব না। ভারত যতই যা-ই দিক না কেন, বাংলাদেশে চিরকালই আমাদের বিরুদ্ধে একটা ক্ষোভ-বিক্ষোভ থাকবেই!’’

একটু চমকে গেলেন তো? হ্যাঁ, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রীর এই ঘোর সুসময়েও ওপরের মন্তব্যটা কিন্তু শুনতে পেলাম শাসক বিজেপি-র এক ডাকসাইটে নেতার কন্ঠেই। কথাটা বলার সময় তাঁর কন্ঠস্বর এতটুকুও কাঁপল না, কিন্তু আমিই যেন একটু অপ্রস্তুত বোধ করলাম। তবু পাল্টা জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, কেন এমন মনে করছেন?

উত্তরে তিনি বললেন, ‘দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাই হল অন্য প্রতিবেশীদের চেয়ে ভারত আকারে, জনসংখ্যায়, অর্থনীতির বহরে বা সামরিক শক্তিতে অনেক এগিয়ে। ভারতের কাছ থেকে বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশীদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি। তারাও অনেক সময় অনুধাবন করেন না ভারতেও দারিদ্র-শোষণ-জাতপাত-প্রাদেশিকতার মতো বহু সমস্যা আছে, যেগুলোর উর্ধ্বে উঠে ভারতের পক্ষে সব সময় উদারতা দেখানো সম্ভব নয়।’

‘যৌথ পরিবারে যদি এক ভাইয়ের উপার্জন-প্রভাব প্রতিপত্তি বেশি হয়, তাহলে সে অন্য ভাইদের জন্য যতই করুক না কেন একটা চাপা মনোমালিন্য কিন্তু থাকেই’, সংসারের উপমা টেনেও বোঝাতে চেষ্টা করেন তিনি।

এই প্রসঙ্গে বলতে হয় তিস্তা চুক্তির কথাও। দিল্লিতে বিজেপির নেতামন্ত্রীরা কিন্তু অনেকেই মনে করছেন বাংলাদেশে তিস্তা ইস্যুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তাদেরই একজন বলছিলেন, ‘তিস্তা চুক্তির জন্য আমরা শেষ পর্যন্ত লড়ব, এই কথা দেওয়ার পরও কিন্তু বলব তিস্তা কিন্তু বাংলাদেশের জন্য মরণ-বাঁচনের প্রশ্ন নয়। হ্যাঁ, ফারাক্কা নিয়ে বললে সেটা বাংলাদেশের মানুষের বাঁচা-মরার ব্যাপার। কিন্তু তিস্তা কি আদৌ ততটা গুরুত্বপূর্ণ?’

এই কথাটাই একবার বাংলাদেশে কেউ বলে দেখুন – শুধু উত্তরবঙ্গ কেন, গোটা দেশেই বোধহয় আগুন জ্বলে যাবে।

একটা ছোট্ট গল্প দিয়ে শেষ করি। আমি যখন দিল্লিতে, তখন অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট দলের বাংলাদেশ সফর বাতিল করা নিয়ে তুলকালাম চলছে। বিজেপির এক মন্ত্রী রসিকতা করে বলছিলেন, ‘আপনি কি জানেন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রসচিব, যিনি নিজে ক্রিকেট দলের সফরের ব্যাপারটা তদারক করছেন, তিনি একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত? ওনার নাম পিটার ভার্গিস, ওর বাবা-মা কেরলের লোক কিন্তু! এই খবরটা বাংলাদেশের মিডিয়ায় বেরোলে আপনাদের অর্ধেক লোক কিন্তু সফর বাতিল হওয়ার পেছনে ভারতীয় ষড়যন্ত্রের অ্যাঙ্গেল খুঁজে পাবেন!’

এতক্ষণ ধরে তুমুল তর্ক চালিয়ে এলেও এবার কিন্তু আমার হাসিতে গড়িয়ে পড়ার পালা। জুৎসই জবাব দিতে পারলাম না, কারণ আমিও মনে মনে জানি কথাটা বোধহয় পুরোপুরি মিথ্যে নয়।

আর এটাও বুঝলাম, বাংলাদেশ-ভারতের ইদানিংকার মাখামাখি আর ঘনিষ্ঠতা যেমন সত্যি, তেমনি সেই সম্পর্কে একটু সন্দেহ-অবিশ্বাসের আঁচটাও কিন্তু সত্যি!

আরও পড়ুন:

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ