সৃজনশীল বনাম পিইসির ভুলে ভরা প্রশ্নপত্র

Send
দিলশানা পারুল
প্রকাশিত : ১৬:৫৪, নভেম্বর ২৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৫, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮

দিলশানা পারুলপিইসির ভুলে ভরা ‘বাংলাদেশ অ্যান্ড গ্লোবাল স্টাডিজ’ প্রশ্নপত্রটি অনেকে দেখেছেন নিশ্চয়ই। আমার প্রফেশনাল এক্সপারটিজ হচ্ছে প্রাথমিক স্তরের প্রশ্নপত্র ডিজাইন করা। সেই জায়গা থেকে প্রশ্নপত্রটি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাই। প্রথমত এই প্রশ্নপত্র ইংরেজিতে হওয়ায় শুধুমাত্র যে ব্যাকরণগত ভুল এবং বানান ভুল আছে বিষয়টি কিন্তু এরকম নয়। এই প্রশ্নপত্র কন্সট্রাকশনে মৌলিক কিছু ভুল রয়েছে। সেই বিষয়গুলো একটু খতিয়ে দেখতে চাই।
সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি হচ্ছে একটি শিক্ষার বিজ্ঞান-নির্ভর মান যাচাই প্রক্রিয়া। বিশ্বে এটা গ্রহণযোগ্য এবং সাদরে আমন্ত্রণ জানানো প্রক্রিয়া। বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরির মূল উদ্দেশ্য ছিল আমাদের মুখস্ত নির্ভর যে শিক্ষাব্যবস্থা সেখান থেকে বেরিয়ে এসে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবনাকে জাগিয়ে তোলা। সেইটা কী রকম? গতানুগতিক পরীক্ষা পদ্ধতিতে প্রশ্নগুলো এমন করা হতো যা শিশুকে পাঠ্যবই মুখস্ত করতেই উৎসাহিত করতো। সেই জায়গা থেকে ভাবা হলো প্রশ্নগুলো এমন করা উচিত যেন শিশুকে ভেবে উত্তর দিতে হয়। ভেবে উত্তর দিলে কী হবে? এই প্রক্রিয়া শিশুর চিন্তা করার ক্ষমতাকে বাড়াবে, শিশুকে চিন্তা করতে উৎসাহিত করবে। এই প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে শিশুর মেমোরাইজেশন ছাড়াও চিন্তার যে বাকি পাঁচটি স্তর আছে বুঝতে পারা, প্রয়োগ করতে পারা, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন এবং সৃষ্টিশীলতা এই জায়গাগুলো ধারালো হবে। এখন এই প্রত্যেকটি স্তরে শিশু কেমন পারে বা পারে না- সেটা বোঝার জন্য যে যাচাই প্রশ্নপত্র করা হয় সেটাই সৃজনশীল প্রশ্নপত্র হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে আসলে সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের নামে কী তৈরি করা হচ্ছে সেইটার জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে পিইসি বোর্ড পরীক্ষার বাংলাদেশ এবং গ্লোবাল স্টাডিজ প্রশ্নপত্রটি।

সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের প্রধান শর্ত হচ্ছে জ্ঞানমূলক প্রশ্ন করা যাবে না। অথচ এই প্রশ্নপত্রের প্রথমে যে ৫০টি মাল্টিপল চয়েস প্রশ্ন করা হয়েছে তার ৩৫টি সরাসরি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন। ‘সার্ক কত সালে গঠন করা হয়েছিলো? কোন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী তিব্বত থেকে এসেছে? কোনটি প্রধান অর্থকরী ফসল? আর্ন্তজাতিক নারী দিবস কবে?’ এই সবগুলোই সরাসরি জ্ঞানমূলক প্রশ্ন। মানে আগে জানা থাকলে অথবা পড়া থাকলে আপনি এর উত্তর মনে করে তারপর দিতে পারবেন।  

২ নম্বর প্রশ্নে ১৫ নম্বরের ১৫টি প্রশ্ন করা হয়েছে সম্পূর্ণ মেমোরাইজেশন নির্ভর। তিন নম্বর প্রশ্নে ১০টি প্রশ্ন করা হয়েছে যেগুলো প্রত্যেকটা শুরু হয়েছে জ্ঞানমূলক প্রশ্ন দিয়ে এবং শেষে চেষ্টা করা হয়েছে চিন্তামূলক প্রশ্ন করতে কিন্তু সেই চেষ্টাটাও ভীষণ দুর্বল। জ্ঞানমূলক প্রশ্ন করার বা বোঝার একটা সহজ উপায় আছে। যে প্রশ্নগুলো কী, কোথায়, কে এই শব্দগুলো দিয়ে করা হয় সেইগুলার উত্তর সাধারণত জ্ঞানমূলক হয়। মোটা দাগে আমি যেটা বলতে চাইলাম তা হলো এই প্রশ্নপত্রটি সৃজনশীল প্রশ্নের কন্সট্রাকশন বিচারে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ। এটা কোনও সৃজনশীল প্রশ্নপত্র হয়নি। এবার আসেন সাধারণ প্রশ্ন তৈরিরও কিছু নিয়ম-কানুন আছে সেটা এখানে মানা হয়েছে কিনা?

১. এমসিকিউ প্রশ্নপত্রের প্রথম শর্ত হচ্ছে একই রকম উত্তর বা হতেও পারে এই জাতীয় কোনও উত্তর রাখা যাবে না। যদি রাখেন তাহলে একাধিক উত্তর এই অপশনটি রাখতে হবে। যেটা এই প্রশ্নপত্রের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মেইনটেইন করতে ব্যর্থ হয়েছেন প্রশ্নকর্তারা।  

২. যাচাই প্রশ্নে শিশুর বয়স এবং শ্রেণি অসম্ভব গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যেই জায়গা থেকে এই প্রশ্নের শতকরা আশিভাগ প্রশ্ন আমার কাছে মনে হয়েছে শিশুর বয়স উপযোগী হয়নি।

৩. সৃজনশীল প্রশ্ন মানে আউট অব দ্য কনটেস্ট না। আপনাকে অবশ্যই শিশু একই বিষয় পড়েছে বা এই ধরনেরই অন্য কোন বিষয় পড়েছে এবং তার বিষয় বস্তুর প্রেক্ষাপট জানা আছে, সেখান থেকে তার বুদ্ধিমত্তার স্তর মাপার জন্য প্রশ্ন করতে হবে। এই প্রশ্নপত্রে সেটা কতখানি মানা হয়েছে সেইটা একটা বড় প্রশ্ন।

৪. যাচাই প্রশ্ন করার সময়ও আমাদের কিছু নৈতিক অবস্থান থাকে। যেমন শিশু কনফিউসড হয়ে যায় এরকম কোনও প্রশ্নই করা যাবে না। এইটা হচ্ছে যাচাই বা পরীক্ষার একটা নৈতিক অবস্থান। একই প্রশ্ন একভাবে বললে যদি শিশু সামান্যও কনফিউসড হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তাহলে সেটা সেভাবে না বলে অন্য কোনোভাবে বলতে হবে যেন শিশু বোঝে। সেই জায়গা থেকে এই প্রশ্নপত্রটি সম্পূর্ণ অনৈতিক একটি প্রশ্নপত্র। মুজিব নগর গঠন না হলে কী হতো অথবা ডিভাইড অ্যান্ড রুল পলিসির ফলে এই দেশের মানুষের কী হলো এই ধরনের যে প্রশ্নগুলো করা হয়েছে এবং তারপর যে উত্তরগুলো দিয়ে দেওয়া হয়েছে সেটা শিশুকে কনফিউসড করার বাইরে আর কিছু করবে না।

৫. প্রত্যেকটি যাচাই প্রশ্নের পেছনে একটি হিডেন অবজেকটিভ থাকে। মানে এই প্রশ্নটি দিয়ে আপনি শিশুর কোন যোগ্যতা পরিমাপ করতে চাচ্ছেন সেটি স্পষ্ট হতে হবে। সেই জায়গা থেকে এই প্রশ্নপত্রটি আরও বড় কনফিউশনের সৃষ্টি করেছে। একটি প্রশ্নেও আমি অন্তত সুনির্দিষ্ট কোনও লার্নিং অবজেকটিভের আভাস পাইনি।
এবার আমার প্রশ্ন হলো– একটা প্রশ্নপত্র পিইসি’র মতো পরীক্ষায় কিভাবে ছাড়পত্র পেলো? যে কোনও বোর্ড পরীক্ষার প্রশ্নপত্র কিন্তু এত সহজ না। সেটা তৈরি করা এবং পাস করার জন্য সরকারেরই একটা সুনির্দিষ্ট নীতিমালা আছে। বোর্ড পরীক্ষার প্রত্যেকটি বিষয় ভিত্তিক প্রশ্ন করার জন্য প্রথমে একটি কমিটি করা হয়। সেটা কী রকম? মানে ধরেন পিইসির বাংলা প্রশ্ন করা হবে সেই কমিটিতে প্রাথমিক স্তরের বাংলা পড়ান এরকম কয়েকজন শিক্ষক থাকবেন এবং বাংলা বিষয়ে বিশেষজ্ঞ সরকারের এক বা দুইজন কর্মকর্তা থাকবেন। এই প্রশ্নপত্র তৈরির সার্বিক দায়িত্বে থাকে- ন্যাশনাল একাডেমি অব প্রাইমারি এডুকেশন সংক্ষেপে যাকে আমরা ন্যাপ বলি। তারপর সেই প্রশ্নপত্রটি বিভিন্ন স্তরে পাস হতে হয় এবং আমি যদি ভুল না হই প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের পরিচালকের স্বাক্ষর ছাড়া এই প্রশ্নপত্র সারা দেশে ডিস্ট্রিবিউট হওয়ার কথা না। এখন কথা হলো এরকম একটা প্রশ্নপত্র এতগুলো স্তর পার হয়ে পরীক্ষা হলে কেমন করে ঢুকলো? এই প্রশ্নপত্রটি কি আসলে এতগুলো লোকের দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ফল না অযোগ্যতার ফল?

লেখক: শিক্ষা গবেষণা এবং বাস্তবায়ন প্রফেশনাল

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ