বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলনের সমস্যা প্রসঙ্গে

Send
দিলশানা পারুল
প্রকাশিত : ১৪:৫৪, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৬, ফেব্রুয়ারি ২৬, ২০১৮

দিলশানা পারুলব্যক্তি নারী যে লৈঙ্গিক বৈষম্যের শিকার, সমাজ এবং পরিবারে তার প্রাপ্য অধিকার থেকে যে সে বঞ্চিত– এই সামগ্রিক বিষয়টা বোঝার জন্য অন্তত একটা নির্দিষ্ট স্তর পর্যন্ত শিক্ষার প্রয়োজন। নিজের ওপর ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলো সমাজ এবং পরিবারে প্রথা হিসেবে প্রথিত থাকায়, একটা সুনির্দিষ্ট স্তরের সচেতনতা ছাড়া যে কোনও স্তরের ব্যক্তি নারীর সেটা চিহ্নিত করতে পারাটা কঠিন। আমাদের দেশের মধ্যব্ত্তি যে নারী সমাজ, সামাজিক অবস্থানগত কারণেই অন্যান্য নারীদের চেয়ে তারা শিক্ষাদীক্ষায় তুলনামূলকভাবে আগানো। কাজেই লিঙ্গবৈষম্যের যে সংস্কৃতি সেটা মধ্যবিত্ত নারী সমাজই চিহ্নিত করতে পারবে এবং তার বিরুদ্ধে কথা বলবে অথবা বলতে চাইবে এইটা স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশিত।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লিঙ্গবৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং নারীবাদের পক্ষের বর্তমানে যে কণ্ঠস্বরগুলো শোনা যায় সেইটা কিন্তু মধ্যবিত্ত নারীদেরই কণ্ঠস্বর। কাজেই মধ্যবিত্ত নারীরা যখন কথা বলবে স্বাভাবিকভাবেই তাদের কথায়, দাবিতে, বক্তব্যে তার শ্রেণি অবস্থান প্রকটভাবে প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন এই স্বাভাবিকতা দোষে দুষ্ট। এখানে নারীবাদী আন্দোলনে যারা প্রতিনিধিত্ব করছেন তারা সবাই মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে ওঠে আসা, কিন্তু সেটা সমস্যা হওয়ার কথা ছিল না। সমস্যা হলো তাদের বক্তব্য, চিন্তা এবং দাবি-দাওয়া যখন মধ্যবিত্ত ঘেরাটোপ টপকাতে পারে না। সমস্যা হলো নারীবাদীদের বক্তব্যে যখন সার্বজনীনতা থাকে না। কোনও আন্দোলনের বক্তব্যে যখন সাবর্জনীনতা থাকে না সেইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা এবং এই সমস্যা চিহ্নিত করতে না পারাটা আরও বড় সমস্যা। বর্তমানে নারীবাদী আন্দোলনের নামে বাংলাদেশে যেটা হচ্ছে সেইটা আসলে একধরনের ‘হাউকাউ’ করা। যে কোনও আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায় এই ‘হাউকাউ’ প্রয়োজন আছে। সমস্যা চিহ্নিত করে জানান দেওয়ার জন্যই এই আওয়াজটার প্রয়োজন। সমাজ এবং রাষ্ট্রকে জানিয়ে দেওয়া যে দেখ আমার ওপর তোমরা যে অন্যায় করছো আমি সেটা জেনেছি, বুঝেছি এবং তার প্রতিবাদ করছি। কিন্তু প্রাথমিক স্তরটা পার হওয়ার পর নারীবাদী আন্দোলনে যারা শরিক আছেন তাদের ওপর আরও কিছু দায়িত্ব বর্তায়। সেটা কী রকম? আন্দোলনের বক্তব্যকে একটা সার্বজনীন রূপ দেওয়া। বক্তব্যের মধ্যে রাজনীতিটা নিয়ে আসা। আন্দোলনের পক্ষে লোক বাড়ানো। কিন্তু বাংলাদেশের নারীবাদীদের বক্তব্যগুলো শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়ের বক্তব্য হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। এখানে নারীবাদী বক্তব্যে ব্যক্তিগত রাগ, ক্ষোভ, দুঃখ, ঘৃণা যে পরিমাণ প্রভাব বিস্তার করে আছে ঠিক ততখানিই উপস্থিত নেই সামগ্রীক নারী সমাজের কথা। লিঙ্গের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে যত কথা আছে, তত কথা অনুপস্থিত লৈঙ্গিক রাজনীতি নিয়ে। বাংলাদেশে তসলিমা নাসরিনের মতো প্রথিতযশা নারীবাদীদের বক্তব্যও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ওপরে উঠতে পারছে না। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাগুলো আমার সমস্যা চিহ্নিত করার চোখ খুলে দেবে, কিন্তু রাজনৈতিক চেতনা আমাকে সহযোগিতা করবে এই সমস্যাগুলোকে দাবি-দাওয়ায় রূপ দিতে। যদি এই পরের ধাপে আমরা পৌঁছতেই না পারি তাহলে ব্যক্তিগত তিক্ত অভিজ্ঞতাগুলো দশজনের সঙ্গে শেয়ার করে লাভ কী হচ্ছে?

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মেয়েদের যেকোনও ধরনের সমস্যাকে মেয়েলী সমস্যা হিসেবেই দেখা হয়। এই সমস্যার যে একটা রাষ্ট্রীয় ভিত্তি আছে, সামাজিক ধারণা আছে, সেই চিন্তাটাই সামগ্রিকভাবে এখানে অনুপস্থিত। সেখানে নারীবাদীরা একটা জোরালো ভূমিকা রাখতে পারতেন। আসলে মেয়েদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে গেলে এখানেই কাজ করতে হবে। একটা হচ্ছে সামাজিক সমস্যা চিহ্নিত করে নারী এবং পুরুষ উভয়েরই মাঝে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য সমাজ পর্যায়ে কাজ করা এবং একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এই সমস্যাগুলোকে সমাধানের জন্য পলিসি লেভেলে যেন কাজ হয় তার জন্য ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করা। বর্তমানে নারীবাদী আন্দোলনকর্মীরা এই দুইটার কোনটা করছি আসলে? সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করতে পারছি, না রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করতে পারছি? এটা গেলো আন্দোলনের কৌশল প্রসঙ্গে। এবার আমি আসতে চাচ্ছি নারীবাদ বিষয়ে আমাদের বোঝাপড়ার বিষয়ে। বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা আমার কাছে মনে হয় পশ্চিমা নারীবাদী আন্দোলনের প্রভাব। এই দেশের মেয়েদের সমস্যা নির্বাচনের ক্ষেত্রে, আন্দোলনের ভাষা নির্বাচনের ক্ষেত্রে, দাবি-দাওয়া নির্বাচনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটকে বিশ্লেষণ করতে আমরা ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থ হয়েছি। ব্যর্থ যে হয়েছি তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ নারীবাদী বক্তব্যের অগ্রহণযোগ্যতা।

বাংলাদেশের নারীবাদী আন্দোলন সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে পরিমাণ বাধার সম্মুখীন হচ্ছে তার পুরোটাই কি শুধুমাত্র সমাজের পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার ফলে? যারা এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত আছেন তাদের কি কোনই দায় নেই?

পশ্চিমের ‘মাই বডি মাই রাইট’ এটা এই দশকের নারীবাদী আন্দোলনের সবচেয়ে জনপ্রিয়  স্লোগান। আমাদের দেশেও নারীবাদীরা এই স্লোগানের আঙ্গিকেই তাদের বক্তব্যগুলো তুলে ধরেন। কেন? আমার দেশের গ্রামের স্বল্পশিক্ষিত, অশিক্ষিত শতকরা ৮০ ভাগ নারীর কথাতো বাদই দিলাম, এমনকি শহুরে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীই এই বক্তব্যের সঙ্গে একাত্মতা অনুভব করতে পারেন কিনা? এই দেশের সব মেয়েরাই যখন দিনের ১৮ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে বাধ্য হন ঘরের রান্নাবান্না করতে, বাচ্চা পালতে এবং বাড়ির সকলের সার্ভিস প্রোভাইড করতে, আপনি তখন ব্ক্তব্য নিয়ে আসছেন শরীরের স্বাধীনতা কেন্দ্রিক। এটার মানে আমাদের মেয়েরা আসলে কী বুঝবে?

একটা উচ্চশিক্ষিত মেয়ে শুধুমাত্র ভালো ডে-কেয়ারের অভাবে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর অসম্ভব উজ্জ্বল ক্যারিয়ার ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়। এখন এই সমস্যাটা কার, মাতৃত্বের না রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার? নারীবাদ কাকে দোষারোপ করবে? মাতৃত্বকে নাকি রাষ্ট্রকে?

নারীবাদী আন্দোলন এই ইস্যুকে সামনে রেখে কি দাবি তুলবে ‘মা হওয়া বন্ধ করো’ না ‘ডে-কেয়ারের ব্যবস্থা করো’? রাষ্ট্রীয়ভাবে যখন মেয়েদের বিয়ের বৈধ বয়স ১৬ করে দেওয়া হচ্ছে তখন আদপে ‘মাই বডি মাই রাইট’ এই স্লোগান আমার দেশের জন্য বুমেরাং হয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে নারীবাদীদের বক্তব্যে পোশাকের স্বাধীনতা এবং ধর্ম যতখানি গুরুত্ব পায় এবং পেয়েছে ততখানি গুরুত্ব আর কোনও কিছুকেই দেওয়া হয়নি। অথচ বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীবাদের জন্য এই দুটো হচ্ছে সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা। পাঁচ দশক আগেও ধর্ম যেভাবে নারীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারতো এখন সেটা করতে পারে কিনা? গণমাধ্যমের কল্যাণে একটি টিভিসি কিংবা বিউটি প্রেজেন্ট প্রতিযোগিতা নারীকে জনসাধারণের সামনে যতখানি পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষমতা রাখে, একটি মসজিদের ইমাম অথবা একজন পুরোহিত বর্তমান সময়ে সেই ক্ষমতা রাখে কিনা? যদি না হয় তাহলে আসলে নারীবাদের আক্রমণের টার্গেট পয়েন্ট কে হওয়া উচিত? নারীর পোশাকের স্বাধীনতা বলতে আসলে আমরা কি বোঝাচ্ছি? যেখানে নারী কেমন ধরনের পোশাক পরবে, কী ধরনের চুল কাটে তাকে গ্ল্যামারস দেখাবে সেইটা নির্ধারণ করে দিচ্ছে কনজিউমার ওয়ার্ল্ড, রঙিন চুলে আপনি ভালো বোধ করবেন এই বোধ তৈরি করে দিচ্ছে লরিয়ালের মতো কনজিউমার প্রডাক্ট, সেখানে আপনার পোশাকের স্বাধীনতার স্লোগান আসলে কার পারপাস সার্ভ করবে? এই জায়গাগুলোতে নারীবাদীদের চিন্তার স্বচ্ছতা জরুরি। দুঃখজনক হলেও সত্যি, আমাদের বেশিরভাগ নারীবাদে বিশ্বাসীরাই তাত্ত্বিকভাবেই মনে করেন পুরুষতন্ত্রের অবস্থান পুরুষের লিঙ্গ। যৌনতা জৈবিক বিষয়,লিঙ্গ জৈবিক বিষয় কিন্তু পুরুষতন্ত্র মনস্তাত্বিক বিষয়। পুরুষতন্ত্রেরে অবস্থান পুরুষের লিঙ্গে না। পুরুষতন্ত্রের অবস্থান নারী এবং পুরুষ উভয়ের মস্তিষ্কে। পুরুষতান্ত্রিকতা কোনও একক ব্যক্তি পুরুষের দোষ বা অপরাধ না,এইটা একটা সামাজিক কাঠমো। যার ধারক এবং বাহক নারী এবং পুরুষ উভয়ই। রাষ্ট্র নিজের স্বার্থেই এই কাঠামোকে জিইয়ে রাখে। আমার কাছে মনে হয় আমাদের সমাজে পুরুষতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী প্র্যাকটিশনার হচ্ছেন মা এবং শাশুড়ি এই দুইটি চরিত্র।

সেক্সুয়াল এবিউজ এই অংশটা বাদ দিলে, প্রতিটা মেয়ে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয় তার মা এবং শাশুড়ির কাছ থেকে। একটা মেয়ে কি পোশাক পরবে, কীভাবে চলবে, কতটুকু পড়াশোনা করবে, কাদের সঙ্গে মিশবে, খেলবে কী খেলবে না, প্রেম করবে কী করবে না এই সমস্ত সিদ্ধান্ত নেন একজন মা আর বিয়ের পর একজন শাশুড়ি। এইটা কোন একক মা বা শাশুড়ির চরিত্রের দোষ না। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পরিবারের মধ্যে তার যে পাহারাদার বসিয়েছে সেইটা এই দুই নারী চরিত্রের মধ্যে দিয়ে রূপায়ণ করেছে। পুরুষতন্ত্র পুরো বিষয়টা সামগ্রিক, এটাকে দেখতে হবে সামগ্রিকতার দৃষ্টি ভঙ্গিতে। এটাকে বিশ্লেষণ করতে হবে সামগ্রিকতায়। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সামাজিক কাঠামো এবং বিদ্যমান লিঙ্গ রাজনীতিকে ঠিকঠাক মতো বুঝতে পারা ছাড়া, বিশ্লেষণ ছাড়া নারীমুক্তি আন্দোলন সঠিক পথে এগুতে পারবে না।             

লেখক: শিক্ষা বিষয়ক গবেষক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ