মশা আছে, মেয়র নাই

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৫:২৯, মার্চ ০৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৬, মার্চ ০৭, ২০১৮

শুভ কিবরিয়াক.
গেরামে ছিলাম;
মশা কামড়াইত শুধু রাইতে।।
ঢাকায় থাকি, কামড়ায়
দিনে রাইতে।।
রাজধানী’র রক্তচোষকদের এতবেশি খিদা ক্যান!!
রাজমশা বলে কী?

খ.

মশা ও ছিনতাই দুটোই বেড়েছে।
অতএব ব্যবস্থা নিন।

দু’জনের ফেসবুক স্ট্যাটাস থেকে নেওয়া ওপরের লেখা দুটি। ঢাকায় মশারা এখন অপ্রতিরোধ্য। বলা চলে মশার দাপট কমাতে আমাদের কর্তাব্যক্তিরা শুধু অসহায়ই নন, প্রায় অসাড়। গত বছর যখন মশার প্রকোপে চিকুনগুনিয়ার আক্রমণে ঢাকা নগরবাসীর জীবনে নাভিশ্বাস উঠছিল, তখন এ নিয়ে ঢাকার দুই মেয়র বেশ তোপের মুখে পড়েন। ঢাকা উত্তরের মেয়র প্রয়াত আনিসুল হক জনগণের এই তোপের মুখে সক্রিয় ছিলেন তার কথা ও কাজ দিয়ে। জনরোষের বিপক্ষে মশা নিধনের কিছু ব্যবস্থা নিয়ে মাঠে নেমেছিলেন তিনি। জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে তার কিছু কথা, পদক্ষেপ মানুষকে কিছুটা হলেও আশ্বস্ত করেছিল। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের দেখাদেখি সক্রিয় হয়েছিলেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন। তখন তিনি বলেছিলেন, ড্রেনে যেখানে মশা উৎপন্ন হয় সেখানে মশার লার্ভা খেয়ে ধ্বংস করার জন্য গাপ্পি মাছ ছাড়া হবে। ঢাকা দক্ষিণের মেয়রের আওতাধীন সিটি করপোরেশন এলাকার ৪৫০ কিলোমিটার ড্রেন ও সুয়ারেজ লাইনে এই গাপ্পি মাছ ছাড়ার কথা বলেছিলেন মেয়র সাঈদ খোকন। ২০১৭ সালের সেই গাপ্পি মাছ ছাড়ার গল্প নিজেই হাপিশ হয়ে গেছে। এখন ঢাকার সর্বত্র শুধু মশা আর মশা।

মশার প্রকোপ এমনই বেড়েছে যে ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সের এমএইচ-১৭৯ ফ্লাইট ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নির্ধারিত সময়ের ১৫ মিনিট পর ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ঢাকার মশা সকল প্রতিরোধ ব্যুহ ভেদ করে প্লেনের ভেতরে ঢোকায় সে মশা বের করেই ওই ফ্লাইট ছাড়তে হয়েছে। এক হিসাবে এই ঘটনা গিনেজ বুকে জায়গা পাওয়ার মতো। বাংলাদেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হচ্ছে তখন মশা নিধনে এই ব্যর্থতা কতখানি তার সুনামের সঙ্গে যায় সেটা বিবেচ্য।

২.

মশা বাড়ছে কেন? প্রথম কথা, মশা যেখানে উৎপন্ন হচ্ছে সেই উৎপাদন স্থলকে মশার লার্ভাসহ ধ্বংস করা যায় নাই। একদিকে মশার উৎপাদন বন্ধ করা যাচ্ছে না সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতায়। অন্যদিকে সত্যিকার অর্থে মশা নিধনের সক্রিয় কোনও ব্যবস্থা চালু নেই। বলা হচ্ছে দুই সিটি করপোরেশনের ২ হাজার ৭ শত বিঘা জলাধার মশার আবাস ও জন্মস্থল হয়ে সগর্বে বিরাজ করছে। সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে বর্তমান অর্থবছরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ২৫.৬ কোটি টাকা এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ২০ কোটি টাকা মশা নিয়ন্ত্রণ কাজে ব্যবহার করেছে। দুই সিটি করপোরেশনের কর্তাব্যক্তিদের ভাষায়, এর বড় অংশ গেছে মশা নিধনের ওষুধ কিনতে। সেই ওষুধ আদৌ কেনা হয়েছে কিনা, কেনা হলেও তা মানসম্পন্ন কিনা সে প্রশ্ন আছে। আবার মশা নিধনের ওষুধ কেনা হলেও সেই ওষুধ সঠিকভাবে, সঠিক জায়গায় ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা তা নিয়েও যথেষ্ট সন্দেহ আছে। কেননা, ঢাকা শহরে মশার বিস্তার এতটাই প্রবল হয়েছে যে বস্তি থেকে সুউচ্চ ফ্ল্যাট কোথাও মশার আক্রমণ থেকে রেহাই নেই। উত্তরা থেকে গেন্ডারিয়া, ধানমন্ডি থেকে মতিঝিল, বস্তি থেকে সুরম্য অট্টালিকা, সর্বত্রই সমানতালে মশা তার কাজ নির্বিঘ্নেই চালিয়ে যাচ্ছে।

৩.

মশার বিস্তার যত বাড়ছে তত বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে। মশার এই বিস্তার অব্যাহত থাকলে অচিরেই ডেঙ্গু এবং চিকুনগুনিয়া শহরবাসীকে বিপদে ফেলতে পারে। গত বছর যারা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছিলেন কেবল সেই ভুক্তভোগী ও তার পরিবার জানে এর বিপদের মাত্রা কী? অন্যদিকে মশাবাহিত এসব রোগের ব্যয় নগরবাসীর জন্য মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা হিসাবে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে মশার কারণে মশারি, কয়েল, স্প্রে জনিত ব্যয় বেড়ে চলেছে। মশার কারণে মানুষের নির্বিঘ্নে কাজের ব্যাঘাত ঘটছে। নষ্ট হচ্ছে মূল্যবান কর্মঘণ্টা। শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে সামনেই এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে মশার এই বিস্তার। অন্যদিকে মশা মারতে যেসব রাসায়নিক ব্যবস্থাদি নিতে হচ্ছে কয়েল, স্প্রের মাধ্যমে, এর প্রত্যেকটাই তৈরি করছে দারুণতর স্বাস্থ্যঝুঁকি। বিশেষ করে শিশুরা এই স্বাস্থ্যঝুঁকির বড় শিকার হচ্ছে।

৪.
মশা আছে, মশা নিত্যদিন বাড়ছে অথচ মশা নিধনে মেয়রদের আওয়াজ-কাজ কোনোটাই নেই। মেয়রদের কোনও সক্রিয় উদ্যোগ নেই। দেখা নেই মশানিধনে মেয়রদের কোনও লক্ষণীয় তৎপরতা। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন দীর্ঘদিন ধরেই মেয়রশূন্য। প্যানেল মেয়র নামে আছে কিন্তু তার কোনও নড়াচড়া নেই। আমলারাই এখন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মা-বাপ। তৎপরতা নেই কাউন্সিলরদেরও। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন দলীয় কাজে যত তৎপর, মশার কারণে জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে তেমনই তৎপরতাহীন।

বলা বাহুল্য, জনবহুল এই নগরীর মশা নিধন কাজ অত সহজ নয়। মশার উৎপাদনস্থল এখানে এতটাই সুবিস্তৃত যে শুধু সিটি করপোরেশনের তৎপরতা দিয়েও পুরো কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। দরকার সিটি করপোরেশনের বাইরে আরও অনেক সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করা। ঢাকা শহরজুড়ে যেসব, বিশেষ বিশেষ বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক স্থাপনা আছে (যেমন, সংসদ ভবন, বিমানবন্দরসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান) তার বেশ কটি সুরক্ষিত এবং জনগণের প্রবেশাধিকার সেখানে সংরক্ষিত। মানুষকে এখানে ঠেকিয়ে রাখা গেলেও মশাকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এসব জায়গায় যেখানে যেখানে মশার জন্ম হয় সেই জন্মস্থলে নিয়মিত আঘাত হানতে হবে। এসব স্থানের জল-জলা-জলাশয়-ড্রেন-অপরিচ্ছন্ন জায়গায় নিত্যদিন মশা বংশবিস্তার করে চলেছে। এটা একটা চলমান প্রক্রিয়া। তাই প্রতিরোধ ব্যবস্থাও হতে হবে চলমান। সিজনভিত্তিক বা নির্দিষ্ট সময়কালীন ব্যবস্থা নিয়েই ক্ষান্তি দিলেই হবে না। এসব জায়গায় নিয়মিত মশা নিধন কর্মসূচি হাতে নিতে হবে।

সিটি মেয়রদের ভূমিকা এখানেই। নিজ প্রতিষ্ঠানের বাইরে এসব প্রতিষ্ঠানে যাতে মশা বিংশবিস্তার করতে না পারে তার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য এসব প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে তুলতে হবে। কখনও কখনও এসব প্রতিষ্ঠানে সবার মধ্যে সচেতনা বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকা মহানগরের যেসব ভাগাড় আছে, ময়লার ডাম্পিং স্টেশন আছে, সেখানেও যাতে মশার বংশ না বাড়তে পারে তার পদক্ষেপ নিতে হবে। নগরবাসী নিজে যাতে সচেতন হয় সে বিষয়েও প্রচারণা দরকার। নগরের স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীরাও এই প্রচারণা, সচেতনতা সৃষ্টি কাজের আওতায় আসতে পারে। সেখানেও ভূমিকা রাখতে পারেন সিটি মেয়ররা।

৫.

মনে রাখতে হবে, মশা সহজেই এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায়  চলাচল করতে পারে। এজন্য তার পাসপোর্ট -ভিসা বা অনুমতি লাগে না। কাজেই দুই সিটি করপোরেশনের একটি মশা নিধনে, মশার বংশবিস্তার রোধে খুব ভালো কাজ করল আর একটি হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলো, তাহলে কারোরই লাভ হবে না। এজন্য দরকার ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কাজের মধ্যে সমন্বয়। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

এখন বিবেচনার বিষয় মশার এই ভয়াবহ বিস্তার রোধকে মেয়ররা গুরুত্ব দিয়ে ভাবছেন কিনা?

ভোট আর জনরায়ের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলে কিংবা জনরায় আর ভোট প্রয়োজন হলে জনপ্রতিনিধিরা তার গুরুত্ব বুঝতেন। হালে সেই ভোটের প্রয়োজনীয়তার সংস্কৃতি অনেকাংশেই বিলীন। এখন নির্বাচনের চাইতে মনোনয়নই গুরুত্ব বহন করে। সরকারি দলের মনোনয়ন পেলেই হলো, ভোট তো আর আজকাল খুব দরকারও হয় না। সম্ভবত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রদ্বয় তা বুঝতে পেরেছেন। সে কারণেই মশা নগরময় এত দাবড়ে বেড়ালেও আড়ালে চলে গেছেন মেয়র।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ