কোটার বদলে মেধায় নজর দিন

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৮:৫৩, এপ্রিল ০৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৬, এপ্রিল ০৯, ২০১৮

শুভ কিবরিয়াএকেকটা সময় আসে, যখন মন না চাইলেও বাস্তব পরিস্থিতির মূল্যায়ন করতেই হয়। তখন ব্যক্তিগত ইগো, রাজনৈতিক অভিসন্ধি কিংবা ‘দলদাস’ বিবেচনা স্থগিত করেই পরিস্থিতির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হয়। এটা ব্যক্তি বা পরিবারের জন্য যেমন সত্য, রাষ্ট্রের জন্য আরও বড় সত্য। রাষ্ট্র খুব বড় ক্ষেত্র। এখানে যত সংকীর্ণ বিবেচনা দিয়ে সমস্যাকে মোকাবিলা করা যায় তা তত বৃহৎ আকারে ঘোলাটে পরিস্থিতি তৈরি করে। রাষ্ট্র যারা চালান তাদের সুবিবেচনা তাই খুব জরুরি।
রাষ্ট্রের যেকোনও সংকটে শক্তি প্রয়োগের নীতি নিয়ে এগিয়ে এলে তাই বিপদ আরও ঘনীভূত হয়। কারণ, সরকার যারা চালান, তারা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পর্কিত হলে এই রকম বিবেচনা দীর্ঘমেয়াদে আরও বড় বড় সংকট তৈরি করে। কারণ সমস্যা সমাধানের রাষ্ট্রীয় দৃষ্টিভঙ্গির ওপরে সরকারি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করে। যে দল সরকার চালায় তার যেকোনও সহিংস দৃষ্টিভঙ্গি দলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে যেমন সংকটে ফেলে, অতীত সম্পর্কেও তেমনি পুনর্বিবেচনা তৈরি করে।

সরকারি চাকরিতে কোটাপ্রথা সংস্কারের দাবি নিয়ে চলমান আন্দোলন যে রক্তপাত ও সহিংসতার সূচনা করেছে, তা এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েই বিবেচনা করতে হবে। কারণ সরকার এই দাবির ব্যাপারে এখন পর্যন্ত যে ব্যবস্থা নিয়েছে তা খুবই পশ্চাৎমুখীন এবং ইগোনির্ভর। আন্দোলন দমাতে দমননির্ভরতা খুবই সেকেলে প্রথা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের এই দমনমুখী শাসন তাদের জনগণ থেকে ক্রমশ যোজন যোজন দূরে নিয়ে যাচ্ছে। বিপদ হচ্ছে, এই ‘বিপদ’কে বোঝার ক্ষমতাও সরকারের দ্রুত কমে যাচ্ছে।

২.

এখন দেখা দরকার, এই আন্দোলনকারীদের দাবি কী?

‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র সংরক্ষণ পরিষদ’-এর ব্যানারে যে পাঁচটি বিষয়ে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চলছে, সেগুলো হলো–

ক. কোটা-ব্যবস্থা ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা (আন্দোলনকারীরা বলছেন ৫৬ শতাংশ কোটার মধ্যে ৩০ শতাংশই মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য বরাদ্দ। সেটিকে ১০ শতাংশে  নামিয়ে আনতে হবে)

খ. কোটায় যোগ্য প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধাতালিকা থেকে শূন্য পদে নিয়োগ দেওয়া

গ. সরকারি চাকরিতে সবার জন্য অভিন্ন বয়স-সীমা-(মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের ক্ষেত্রে চাকরির বয়সসীমা ৩২ কিন্তু সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য ৩০। সেখানে অভিন্ন বয়সসীমার দাবি আন্দোলনরতদের)।

ঘ. কোটায় কোনও ধরনের বিশেষ পরীক্ষা নেওয়া, যাবে না (কিছু ক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চাকরি আবেদনই করতে পারেন না কেবল কোটায় অন্তর্ভুক্তরা পারে)।

ঙ. চাকরির নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিকবার কোটার সুবিধা ব্যবহার করা যাবে না।

এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা প্রজ্ঞাপন অনুসারে দেখা যাচ্ছে, শেষপর্যন্ত কোটা থেকেই কোটা পূরণ করা হবে।

ফলে সমস্যার সমাধান না হয়ে তা সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত তরুণদের ওপরে ঢাকার শাহবাগে পুলিশের হামলা দুর্ভাগ্যজনক, মর্মান্তিক। সরকারি এই বলপ্রয়োগের নীতি ভ্রান্তিমূলক ও বিপজ্জনক।

৩.

যেসব তরুণ ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের একটা অংশ প্রত্যক্ষভাবে এই আন্দোলনে জড়িত। অন্যদিকে একটা বড় অংশের তরুণসমাজ এই কোটাবিরোধী আন্দোলনে মৌন সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে। আবার তরুণদের একটা অংশ সরকারি চাকরিতে অংশগ্রহণের বয়স ৩৫ বছর করার দাবি নিয়ে মাঠে সরব থাকছে। বোঝা যায়, তরুণরা সরকারি চাকরিতে ঢোকার ক্ষেত্রে কোটাপ্রথা দ্বারা বঞ্চিত হচ্ছে, এই ভাবনা তাদের তীব্রভাবে তাড়িত করছে। অন্যদিকে নানাকারণে পড়ালেখা শেষ করতে তাদের সময় বেশি লাগছে, সে কারণেও তারা সরকারি চাকরিতে ঢোকার বয়সসীমা বাড়ানোর মতো বিষয় নিয়ে হৈচৈ করছে। এই দুই প্রবণতা প্রমাণ করছে আমাদের তরুণদের শিক্ষিত অংশ রাষ্ট্রের আচরণে সন্তুষ্ট নয়। ‘মেধার বদলে কোটা’ তাদের হতাশা বাড়াচ্ছে। আবার চাকরির যেকোনও নিয়োগের ক্ষেত্রে দুর্নীতিকরণ ও রাজনীতিকরণ প্রক্রিয়া চলমান থাকায় তাদের রুষ্টতা কমছে না। সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর এর নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়তে বাধ্য।

১৯৭৪ সালের বাজেট বক্তৃতার সমাপনী অনুষ্ঠানে এরকম একটা বিষয় উত্থাপন করেছিনে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। তিনি লিখেছেন,

‘সেখানে ৩০ জন লোক নিয়োগের কথা ছিল। এর মধ্যে শতকরা ৩০ ভাগ আবার মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সংরক্ষিত। এই ৩০ জন থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের কোটা হিসাবে আটজন চলে যায়। বাকি ২২ জনের মধ্যে ১৯ জেলায় একজন করে পড়ে। আর তিনজন হাতে থাকে। এখন শতকরা ২০ জন সাধারণ মেধার ভিত্তিতে ৩০ জনের মধ্যে ছয়জন যায়। এভাবে মেধা অনুসারে এক জেলায় বেশিও চলে যায়। ফলে দেখা গেছে কুমিল্লা, ময়মনসিংহ ও ঢাকা থেকে ১৫তম স্থান অধিকারিও চাকরির জন্য নির্বাচিত হতে পারেনি। অথচ একজন যে ৪৭তম স্থান অধিকার করেছে, যার বাড়ি দিনাজপুরে, সেও চাকরি পেয়েছে। এতে করে এ ব্যবস্থায় মেধার মর্যাদা দেওয়া হয়নি। তাতে সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয় তথা চাকরিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার মেধা জাতি ব্যবহার করতে পারত। জাতি তা থেকে বঞ্চিত হলো। এখন যে ছেলেটি পঞ্চম স্থান অধিকার করেও চাকরি পেলো না, সে যখন দেখল ২১তম স্থান অধিকারী কোটার ভিত্তিতে চাকরি পেলো, তখন তার মনে হতাশা সৃষ্টি হওয়ার স্বাভাবিক কারণ রয়েছে। কারণ সে মেধা অনুসারে চাকরি পেলো না; অথচ স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো স্থান অধিকার করেছে, চাকরিতে নিয়োগের জন্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায়ও ভালো স্থান অধিকার করেছে। অথচ তার জন্য চাকরি নেই। তার মনে স্বভাবতই হতাশার সৃষ্টি হবে। এ হতাশা দূর করার কোনও পথ আমি দেখছি না। এখন এই হতাশাগ্রস্ত ছেলেটি যদি জাতির প্রতি, সারা সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়ে এবং তার জন্য যদি সে প্রতিহিংসা নিতে চায়, তবে জনাব ডেপুটি স্পিকার, এটাকে স্বাভাবিক বলা চলে।’ (তাজউদ্দীন আহমদের সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা)

৪.

যেকোনও রাজনৈতিক দল ভাবে রাষ্ট্রের বিভিন্ন পদে নিজেদের লোক বসালে তার সুফল মিলবে। কোটার নামে হোক আর রাজনৈতিক আনুগত্যের নামে হোক, নিজেদের লোক, নিজেদের মতবাদের অনুসারী নিয়োগের এই নীতি যে ভ্রান্ত, তা অতীতে প্রমাণিত হয়েছে। তবু রাজনৈতিক দলগুলো এই নীতি থেকে সরেনি। সরার কোনও লক্ষণ এখনও নেই। একটি উদাহরণ আলোচনা করা যেতে পারে। স্বাধীনতার পর তৎকালীন বিডিআর-এর মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মেজর জেনারেল এম খলিলুর রহমান। তিনি তার ‘কাছ থেকে দেখা ১৯৭৩-১৯৭৫’- শীর্ষক বইয়ে লিখেছেন, ‘‘১৯৭৮ সালের গোড়াতে আমি আওয়ামী লীগের যোগদান করি এবং বেশ সক্রিয়ভাবে রাজনীতি শুরু করি। সে নির্বাচনে জেনারেল ওসমানী রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের প্রার্থী ছিলেন। তাঁর জন্য প্রচার অভিযানে চলেছি ভোলায়, তোফায়েল সাহেবের এলাকায় জনসভা হবে। আমরা ওঁরই মেহমান। লঞ্চে বসে গল্প। আমি, তোফায়েল ও রাজ্জাক।  কথা হচ্ছিল জিয়াউর রহমানের আমলে জেল খাটার সময়ে তাঁরা দুজন কেমন  লাঞ্ছনা ভোগ করেছেন এবং কার হাতে। সেদিন একটা দামি কথা বলেছিলেন তোফায়েল। বলেছিলেন, ভাই, সবচাইতে বেশি খারাপ ব্যবহার পেয়েছি ওইসব অফিসারের কাছ থেকে, যাদের আমি নিজের হাতে ভর্তি করেছিলাম ১৯৭২ সালে। এরা আমাদের মনোভাবপন্ন, এটাই ছিল তাদের যোগ্যতার একমাত্র মাপকাঠি। তাদের চাইতে শিক্ষাগত ও মেধাগত দিক থেকে বেশি যোগ্য কিন্তু ‘আমাদের চিন্তাধারার অনুসারী নয়’ এমন অনেক প্রার্থীকে বাদ দেওয়া হয়। কাজটা বোধ হয় ভুল হয়েছে খলিল ভাই, তাই না?’ আমি হেসেই বলেছিলাম, ‘মারাত্মক ভুল হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে অযোগ্য লোকের কোনও নীতি-আদর্শ থাকে না। থাকলেও চাকরি রক্ষার্থে তা বিসর্জন দিতে তার একমিনিটও সময় লাগে না। অন্যদিকে সত্যিকার অর্থে যারা যোগ্য, তাদের হাতে সবাই নিরাপদ, মিত্ররাও যেমন, তেমনি শত্রুরাও। তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক মত বা বিশ্বাস সাধারণত তার কর্তব্যকর্মকে প্রভাবিত করবে না। এমনকি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অবৈধ আদেশ সে মানে না।’ এর ফলে যদি তার চাকরির ক্ষতি হয়, তবু। সুতরাং, আমলাতন্ত্র যোগ্য লোকদের দিয়েই গঠিত হওয়া উচিত । কোনও রাজনৈতিক চিন্তাধারার ভিত্তিতে নয়।’ তারপর উচ্চ হেসে বলেছিলাম, যদি তা না হয়, তবে নিয়োগকারী তার হাতে লাঞ্ছিত তো হতেই পারেন।’

তোফায়েল কিন্তু আমার সে ঠাট্টায় যোগ দিতে পারলেন না। তখন তিনি অন্যমনস্ক। হয়তো তাঁর মন চলে গিয়েছিল সেই ফেলে আসা অতীতে।’’

৫.

কোটাবিরোধী আন্দোলনে সহিংসতা আর পুলিশি অ্যাকশনের সঙ্গে ছাত্রলীগের অ্যাকশন জড়িত হয়েছে। এখন খোঁজা হচ্ছে এর ভেতরে সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের উপাদান কী আছে!

মনে রাখতে হবে, পুলিশ দিয়ে আন্দোলন দমন হবে না। বরং ওটা দেশব্যাপী আরও ছড়িয়ে পড়বে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী—এই টোটকাও ফেল করবে।

তাই সময় এখন আলোচনার। আর বাস্তব পরিস্থিতি অনুধাবনের। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে, সরকার আর প্রশাসনের ভেতর এমন মানুষরা বসে আছেন, যারা চাইছেন নির্বাচনের আগে সরকার আরও অজনপ্রিয় হয়ে উঠুক। সরকার ও আওয়ামী লীগের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসে থাকা কট্টরপন্থীরা আওয়ামী লীগকে মধ্যপন্থী উদারনৈতিক দল থেকে কট্টরপন্থী রাজনৈতিক দলে পরিণত করতে চাইছে।

এই বিপজ্জনক পথ থেকে আওয়ামী লীগের সরে আসা দরকার, নিজের ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থেই।

পুনশ্চ: শিক্ষার্থীদের রক্তের ওপর বসে হলেও আলোচনা চলুক। দেয়ালে কান পাতুন। মানুষের মনের আওয়াজ শুনুন।

তথ্যসূত্র:

[১] তাজউদ্দীন আহমদের সমাজ ও রাষ্ট্রভাবনা- নির্বাচিত বক্তৃতা, প্রতিভাস,জুলাই ২০১১, পৃষ্ঠা  ১৪৮-১৪৯ ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ