বেপরোয়া গণপরিবহন ও আমাদের ‘বেওয়ারিশ হাত-পা’!

Send
রাহমান নাসির উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৬:৪৮, এপ্রিল ৩০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৩, এপ্রিল ৩০, ২০১৮

রাহমান নাসির উদ্দিনজর্জ আগামবেন বলে একজন সমাজতাত্ত্বিক আছেন, যিনি মানুষের জীবনের চরম অনিশ্চয়তা এবং অস্তিত্বহীনতার সংকটকে একটি তত্ত্ব দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, যা বিদ্যায়তনিক পরিসরে bare life বা খালি-জীবন নামে পরিচিত। তিনি বলার চেষ্টা করেছেন, যখন মানুষের জীবন আইনের দৃষ্টিতে কোনও জীবনই নয়, যে জীবনের সঙ্গে যার যা ইচ্ছা তা করতে পারে, অত্যাচার-নির্যাতন এবং এমনকিও হত্যা করতে পারে, এবং সেসব অত্যাচার-নির্যাতন এবং হত্যার কোনও আইনি বিচারের ব্যবস্থা নাই, কোনও প্রতিকারের ব্যবস্থা নাই, তখন তাকে ‘খালি জীবন’ বলে (দেখুন, Agamben, Giorgia, Homo Sacer: Sovereign Power and Bare Life [trans. by D. Heller-Roazen], Stanford, CA:  Stanford University Press, ১৯৯৮)। যার কোনও পরিচয়  নেই, জানাশুনা নেই, যার জন্য কখনও কেউ কোনও কথাবার্তা বলে না, কান্নাকাটি করে না, তাকে ‘খালি জীবন’ বলা যায়। মৃত্যুর পর আমরা এ ধরনের লাশকে বলে থাকি বেওয়ারিশ লাশ। আগামবেনের সেই bare life -ই আমাদের বেওয়ারিশ জীবন, যা মৃত্যুর পর হয়ে যায় বেওয়ারিশ লাশ। অর্থাৎ মৃত্যুর পর যে লাশের কোনও পরিচয় থাকে না, তখন তাকে সাধারণত আমরা বেওয়ারিশ লাশ বলে থাকি। সম্প্রতি গণপরিবহনের তুঘলকি আচার-আচরণে যে মাত্রায় আমাদের হাত-পা বিচ্ছিন্ন হচ্ছে, তা দেখে বারবার আমার মনে হয়েছে, আমাদের হাত-পা গুলো ক্রমান্বয়ে বেওয়ারিশ হাত-পা হয়ে উঠছে। বিশেষ করে যখনই দুই বাসের মাঝখানে রাজীব হোসেনের বিচ্ছিন্ন হওয়া হাত চোখের সামনে ভেসে উঠে, তখনই আগামবেনের ‘খালি জীবন’ ওরফে বেওয়ারিশ জীবনের তত্ত্বের মতো একটা ‘বেওয়ারিশ হাত’র ধারণা মাথার মধ্যে কাজ করে। অর্থাৎ যে হাত যেকোনও সময় যেকোনও কেউ আমার-আপনার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে পারে। যার কোনও বিচার নেই, সালিশ নেই, কোনও প্রতিকারের ব্যবস্থা নেই। কোনও প্রতিষেধকের ব্যবস্থা  নেই। তখন সেটা ‘বেওয়ারিশ হাত’ কিংবা ‘বেওয়ারিশ পা’ হয়ে যায়। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের হাত-পাগুলো কেমন জানি বেওয়ারিশ হাত-পা হয়ে যায়। অবস্থা এমন একটা জায়গায় গিয়ে ঠেকেছে, এখন আপনার-আমার হাতে-পায়ে যে হাত-পা আছে সেটা যে কোনও সময় বেওয়ারিশ হয়ে যেতে পারে। 

রাজীবের হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ঘটনা আমাদের যে কারও হাতের ক্ষেত্রে ঘটতে পারতো। সরকারি তিতুমীর কলেজের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র রাজীব হোসেন রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিআরটিসির একটি বাসে করে কলেজে যাচ্ছিল। আরেকটি বাসের সঙ্গে রেষারেষি করে, কার আগে কে যাবে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে দু’টি বাসের মধ্যে ঘষাঘষি লাগে। দুই বাসের ঘষাঘষির একপর্যায়ে সার্ক ফোয়ারার কাছাকাছি জায়গায় আসতেই রাজীবের হাত রাজীবের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। আর বাসের দরজায় ঝুলে থাকে রাজীবের হাত। মিডিয়ার সুবাদে আমরা সেই বিচ্ছিন্ন হাতের একটি বীভৎস ছবি দেখেছি। এ ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সারা বাংলাদেশে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় এবং বাংলাদেশের গণপরিবহনের সার্বিক অব্যবস্থাপনার একটা চিত্র এর ভেতর দিয়ে নতুন করে প্রতিভাত হয়। আমরা মনে করেছি, এবার মনে হয় কিছু একটা হবে। গণপরিবহনে যে নৈরাজ্য চলছে, তার ‘রাজ্য’ মনে হয় খানিকটা ঠিকঠাক হবে। কেননা, দুই বাসের গায়ে গা লেগে থাকা অবস্থায় মাঝখানে ঝুলে থাকা রাজীবের হাত দেখে অনেকেরই নিজের হাত শরীরের সঙ্গে লেগে আছে কিনা একবার পরখ করে দেখেছে। কেননা, গণপরিবহনে চড়ে বাসে-বাসে ঠেলাঠেলি-ঠুসাঠুসির অভিজ্ঞতা এদেশের হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ মানুষের আছে। তাই, মানুষের মধ্যে একটা চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু মানুষের এ ক্ষোভ, সহানুভূতি, এবং উত্তেজনার যবনিকা না-হতেই রোজিনা বেওয়ারিশ ‘পা’ নিয়ে নতুন উপক্রমনিকা আমাদের সামনে হাজির হয়। রাজীবের হাত বিচ্ছিন্ন হয় এপ্রিলের ৪ তারিখ আর তার দুই সপ্তাহ পরই গত ২০ এপ্রিল রাতে বনানীর চেয়ারম্যানবাড়ি এলাকায় একটি বিআরটিসি বাস রোজিনার ডান পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেলে রোজিনার পা হাঁটু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। রোজিনার পা তখন আর রোজিনার শরীরে থাকে না, ‘রেওয়ারিশ পা’ হয়ে ওঠে। মিডিয়ার বরাত দিয়ে এ খবর রাষ্ট্র হয় আর আমরা আমাদের ‘পা’ শরীরের সঙ্গে আছে কিনা একবার সবাই হাত বুলিয়ে নিই। রাজীবের হাত আর রোজিনার পা, আমাদের গণপরিবহনের অব্যবস্থাপনার একটা বিলবোর্ড হয়ে আমাদের চোখের সামনে ঝুলতে থাকে। ঠিক তার এক সপ্তাহের মাথায় গত ২৯ এপ্রিল ফ্লাইওভারের ওপর একটি প্রাইভেট গাড়ির চালক রাসেল সরকারের পায়ের ওপর দিয়ে গ্রিন লাইনের একটি বাস চলে যায়। সাথে সাথে রাসেলের পা তার শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তখন রাসেলের পা আর রাসেলের থাকে না, ‘বেওয়ারিশ পা’ হয়ে আমাদের ক্রমবর্ধমান বেওয়ারিশ হাত-পা’র মিছিলে শামিল হয়। আমরা মিডিয়া-ভোক্তা শহুরে শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্ত আবার আমাদের হাত-পাগুলো একটু হাতিয়ে দেখি ঠিক আছে কিনা। নিশ্চিত হই যে, আমাদের  হাত-পা গুলোর এখনও ওয়ারিশদার আছে! 

বাংলাদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর/পঙ্গুত্বের ঘটনা খানিকটা আরব্য রজনীর কাহিনির মতো। হাজার বছরেও এর গল্প বলে শেষ করা যাবে না। প্রতিদিন কোনো না কোনো জায়গায় সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে; শত শত মানুষ দুর্ঘটনাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করছে কিংবা শত শত মানুষ পঙ্গুত্ব বরণ করছে কিন্তু এসবের কোনও কার্যকর প্রতিকার নেই। সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশান এ- রিসার্চ (সিআইপিআর,বি)-এর এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় প্রায় ৬৪ জন। আর প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয় প্রায় ২৩ হাজার ১৬৬ জন। যদিও এ পরিসংখ্যান ২০১৬ সালের কিন্তু ২০১৭ সালে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে এমন কোনও আলামত আমরা দেখিনি। বরং পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এসব সড়ক দুর্ঘটনার পর কিছু মামলা হয় কিন্তু সে মামলার কপাল কোন মোহনায় গিয়ে নোঙ্গর ফেলে তার কোনও খবর আমরা জানি না। কিছু সেলিব্রেটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হওয়ার পর চারদিকে হৈ চৈ পড়ে যায়, এসবের প্রতিকার চেয়ে সংবাদপত্রে বিবৃতি প্রকাশিত হয়, শাহবাগ কিংবা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন হয়, মামলা মোকদ্দমা হয় কিন্তু সড়ক, দুর্ঘটনা এবং ব্যবস্থাপনার কোনও উন্নতির কোনও আলামত আমরা দেখি না। আর ঢাকাসহ বড় বড় শহরগুলোর গণপরিবহন ব্যবস্থার যে চরম অব্যস্থাপনা তা এখন সামাজিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। কোনও তথ্য-উপাত্ত দিয়ে প্রমাণ করার প্রয়োজন নাই, কেননা মানুষ তাদের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েই তা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা প্রতিষ্ঠান এআরই-এর হিসাব অনুযায়ী, যা গত মার্চে প্রকাশিত, গত দশ বছরে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা ২৯ হাজার ৪৩২টি; প্রাণ হারিয়েছে প্রায় ২৬ হাজার ৬৬৮ জন; এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছে ২১ হাজার ৫৪৮ জন। যদিও এ সংখ্যা যে বাংলাদেশের বিগত দশ বছরে সংঘটিত সকল সড়ক দুর্ঘটনার একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র দেয়, সেটা বলা যাবে না; তথাপি এ সংখ্যাই বলে দেয় এদেশের সড়ক ব্যবস্থাপনার চরম অব্যবস্থাপনার একটা ভয়াবহ চিত্র। 

তাই পরিশেষে বলবো, বেওয়ারিশ লাশের মতো ইদানীং আমাদের হাত-পা গুলোও ‘বেওয়ারিশ হাত-পা’ হয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ রাসেলের পা হারানোর ঘটনা আমাদের হাত-পা গুলোর রেওয়ারিশত্বের অগ্রযাত্রাকে আরো ত্বরান্বিত করেছে! দুই বাসের ঘষাঘষির মাঝখানে রাজিবের ঝুলে থাকা হাত আমাদের ভোঁতা চেতনায় খানিকটা নাড়া দিয়েছিল। রাজীবের বিচ্ছিন্ন হাত চোখ থেকে সরার আগেই এসব বেয়াড়া বাসের বাড়াবাড়িতে রোজিনার পা হয়ে গেলো ‘বেওয়ারিশ পা’। রোজিনার পা আমাদের আর অতোটা নাড়া দেয়নি, কেননা ততদিনে আমাদের চোখ সওয়া হয়ে গেছে, অনুভূতি এবং চেতনা খানিকটা অভ্যস্ত হয়ে উঠতে শুরু করেছে। হাতের শোকে এবং হাত হারানোর যন্ত্রণায় রাজীব দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলো। পায়ের শোকে রোজিনাও পাড়ি জমালেন পরপারে। কিন্তু ক্রমান্বয়ে বেওয়ারিশ হওয়ার পথে আমাদের ‘চেতনা’য় কোনও হেরফের হলো না। এরই মধ্যে ‘বেওয়ারিশ হাত-পা’র মিছিলে যুক্ত হলো রাসেলের পা। কিন্তু আমাদের হাত-পা ওয়ালা সরকার ও রাষ্ট্রের কোনও মাথাব্যথ্যা নাই। গণপরিবহনের বেয়াড়াপনার কাহিনি যে নতুন নয়, সেটা কারোই অজানা নয়। বেওয়ারিশ লাশ বানাতে পটু এসব গণপরিবহন এখন আমাদের হাত-পা গুলোকে বেওয়ারিশ বানিয়ে ছাড়ছে। দুই বাসের মাঝখানে যখন-তখন ঝুলে আপনার-আমার হাত-পাও হঠাৎ বেওয়ারিশ হাত-পা হয়ে যেতে পারে। জর্জ আগামবেনের ভাষায় বলতে হয়, আমাদের ওয়ারিশদার ‘হাত-পা’ এখন যেকোনও সময় হয়ে যেতে পারে ‘বেওয়ারিশ হাত-পা’!

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ