আর্থিক অন্তর্ভুক্তির জন্য কৃষকের সহজ ঋণ ব্যবস্থা

Send
রিয়াজুল হক
প্রকাশিত : ১৫:২৫, মে ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২৯, মে ০৩, ২০১৮

রিয়াজুল হকদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য সব শ্রেণির মানুষকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কাউকে বাদ দিয়ে উন্নয়ন সম্ভব নয়। আর বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কৃষক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। তবে একথা সত্য, এখন আর কৃষকের সন্তান কৃষক হয় না। কৃষি জমির পরিমাণও কমে আসছে। তবে কৃষির ওপর ভিত্তি করে আজও  আমরা আমাদের সুখ-দুঃখের হিসাব নিকাশ করে থাকি। দেশে কৃষির উৎপাদন কমে গেলে সারাদেশের মানুষের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে যায়। সমস্যাটি যেন শুধু কৃষকদের থাকে না, সবার মাঝেই ছড়িয়ে পড়ে। কৃষি দেশের অর্থনীতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। দেশের মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগ এবং শ্রমশক্তির ৫৫ ভাগ কোনও না কোনোভাবে কৃষিতে নিয়োজিত। এ কারণেই কৃষকের সুযোগ সুবিধার কথা চিন্তা করেই সরকার কৃষিতে ভর্তুকি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের সহায়তা প্রদান করে থাকে।
তৃণমূল পর্যায়ে আমাদের দেশের অধিকাংশ কৃষক অশিক্ষিত। যে কারণে তারা সব সময় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কাজগুলো এড়িয়ে চলতে ভালোবাসেন। কোনও মৌসুমে ফসল ভালো হলে, হাতে বেশ কিছু টাকা আসে। কিন্তু সঞ্চয়ের মাধ্যম না থাকায় সেই টাকা খরচ করে ফেলেন। আবার কোনও মৌসুমে ফসল না হলে, দুঃখ যেন অক্টোপাসের মতো ঘিরে ধরে। কৃষকদের মধ্যে সঞ্চয়ের প্রবণতা বৃদ্ধির জন্য স্বল্প আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একইভাবে এই হিসাবের মাধ্যমে তারা ব্যাংক থেকে ঋণও নিতে পারছেন। যে কারণে মহাজনের থাবা থেকে অনেক অসহায় কৃষকই রক্ষা পাচ্ছেন। নির্যাতনের হারও হ্রাস পাচ্ছে। কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালায়, কৃষি ঋণ বিতরণের জন্য যে পদ্ধতি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি অত্যন্ত কৃষি এবং কৃষকবান্ধব। নীতিমালায় বর্ণিত কৃষি ঋণ বিতরণের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয় সকলের অবগতির জন্য উল্লেখ করা হলো:

ক) ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লি ঋণের আবেদনকারীদের জাতীয় পরিচয়পত্র ও কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডের ভিত্তিতে প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করবে। কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ডের বিপরীতে মাত্র ১০ টাকা জমা গ্রহণপূর্বক খোলা অ্যাকাউন্টধারী কৃষকদের ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পাসবই-এর ভিত্তিতেই প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করা যেতে পারে। জাতীয় পরিচয়পত্র আছে কিন্তু কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড নেই সে ক্ষেত্রে প্রয়োজনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা স্থানীয় স্কুল/কলেজের প্রধান শিক্ষক অথবা ব্যাংকের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তির দেওয়া প্রত্যয়নপত্রও প্রকৃত কৃষক শনাক্তকরণের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।

খ) কৃষি কাজে সরাসরি নিয়োজিত প্রকৃত কৃষকগণ কৃষি ঋণ প্রাপ্তির জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। পল্লি অঞ্চলে আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডে জড়িতরাও কৃষি ও পল্লি ঋণের সংশ্লিষ্ট খাতে ঋণ সুবিধা পেতে পারেন।

গ) বাংলাদেশের সাধারণ কৃষকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা, ফরম পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সময়, ফরমে যাচিত তথ্যের ব্যবহার তথা উপযোগিতা ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনে ব্যাংকসমূহ কৃষি ঋণের, বিশেষ করে শস্য/ফসল ঋণের আবেদন ফরম সহজীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করবে। আবেদন ফরম পূরণসহ আনুষঙ্গিক কাজে যাতে কালক্ষেপণ না হয় সে জন্যে আবেদন ফরম গ্রহণের সময়ই গ্রাহককে এতদ্সংক্রান্ত সকল প্রকার নির্দেশনা প্রদান করতে হবে। সহায়ক কোনও তথ্যের প্রয়োজন হলে একটি মাত্র বৈঠকেই সব তথ্য গ্রাহককে জানাতে হবে।

ঘ) সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখা নির্ধারিত ঋণ নিয়মাচার অনুযায়ী আবেদনকারীর বার্ষিক প্রয়োজনীয় ফসল ঋণ ও অন্যান্য ঋণ এককালীন মঞ্জুর করবে। তবে, সংশ্লিষ্ট ফসল উৎপাদনের মৌসুম শুরু হওয়ার অন্তত ১৫ দিন পূর্বে ঋণ বিতরণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখাসমূহ কৃষকদের বার্ষিক ফসল উৎপাদন পরিকল্পনাসহ আবেদনপত্র গ্রহণ করবে। প্রয়োজনবোধে, পরবর্তীতে কৃষকদের বার্ষিক উৎপাদন পরিকল্পনায় যুক্তিযুক্ত পরিবর্তনের সুযোগ দেওয়া যাবে। গ্রাহকের আবেদনপত্রের প্রাপ্তি স্বীকার করতে হবে। আবেদনপত্র প্রাপ্তির পর ঋণ মঞ্জুরি ও বিতরণের মধ্যে সময়ের ব্যবধান যৌক্তিকীকরণ এবং গ্রাহকের কোনও অভিযোগ থাকলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে শস্য ও ফসল চাষের জন্য ঋণের আবেদন দ্রুততম সময়ে নিষ্পত্তি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে ঋণের আবেদন নিষ্পত্তিকরণের সময়সীমা হবে আবেদনপত্র জমার দিন হতে সর্বোচ্চ ১০ কর্মদিবস।

ঙ) কৃষকের আবেদনের প্রেক্ষিতে মাত্র ১০ টাকা প্রাথমিক জমার বিনিময়ে হিসাব খোলা যাবে। হিসাবসমূহের লেনদেন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এসব হিসাবের ওপর সুদহার সাধারণ সঞ্চয়ী হিসাবের চেয়ে ১-২ শতাংশ বেশি হারে দেওয়ার বিষয়টি ব্যাংকগুলো বিবেচনা করবে। ব্যাংক শাখাগুলো এ ধরনের হিসাবে রক্ষিত সঞ্চয়ের ৯০ শতাংশ পর্যন্ত স্বল্পসুদে ঋণ সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। এ হিসাবগুলোতে ন্যূনতম ব্যালেন্স রাখার কোনও বাধ্যবাধকতা এবং কোনোরূপ চার্জ বা ফি আরোপ করা যাবে না। এ ধরনের হিসাবে ১ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্থিতির ক্ষেত্রে আবগারি শুল্ক/লেভি কর্তন রহিত করা হয়েছে।

চ) ফসল উৎপাদনের জন্য একজন কৃষককে সর্বোচ্চ ১৫ বিঘা (৫ একর বা ২ হেক্টর) জমি চাষাবাদের জন্য নিয়মাচারে নির্ধারিত হারে ঋণ প্রদান করা যাবে।

ছ) শুধুমাত্র শস্য/ফসল চাষের জন্য সর্বোচ্চ ২.৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি কৃষি ঋণের ক্ষেত্রে সিআইবি রিপোর্টের প্রয়োজন পড়বে না। তবে খেলাপি ঋণগ্রহীতা যাতে কৃষি ঋণ না পান সে ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ঋণ বিতরণকারী ব্যাংককে নিশ্চিত হতে হবে। সাধারণভাবে ৫ একর পর্যন্ত জমিতে চাষাবাদের জন্য ফসল ঋণের ক্ষেত্রে শুধু সংশ্লিষ্ট ফসল দায়বন্ধন-এর বিপরীতে ঋণ প্রদান করা যাবে। তবে ৫ একরের বেশি জমি চাষাবাদের জন্য ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে জামানত গ্রহণ করা/না করার বিষয়টি ব্যাংক/অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ নিজের প্রচলিত শর্তে ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে। কৃষি ও পল্লি ঋণ কর্মসূচির আওতায় আয় উৎসারী কর্মকাণ্ডে ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে গ্রুপ/ব্যক্তিগত গ্যারান্টি গ্রহণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। বছরান্তে দেখা গেছে এই খাতে ঋণ বিতরণ হয়েছে ২০ হাজার ৯৯৯ কোটি টাকা। চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা আগের অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৬ শতাংশ বাড়ানো হচ্ছে। ব্যাংকগুলোর জন্য লক্ষ্যমাত্রা মাত্রা ধরা হচ্ছে ২০ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা।

একথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে কৃষকের জন্য নির্ধারিত ঋণ প্রকল্পসমূহ। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য অনেকাংশে হ্রাস পাচ্ছে। একুশ শতকের এ বিশ্বায়নের যুগে বিশ্ব পরিবেশ আজ মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন। অথচ বেঁচে থাকতে হলে খাদ্যের বিকল্প নেই। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার জন্য কৃষকের সমস্যার সমাধান সবকিছুর আগে প্রয়োজন। আমাদের কৃষি ও পল্লি ঋণ নীতিমালা অত্যন্ত কৃষিবান্ধব এবং কৃষকবান্ধব। কৃষকের সমস্যা সমাধানের জন্য ব্যাংক আজ  কৃষকের দোড়গোড়ায়। তবে প্রকৃত কৃষকরা যেন ঋণ পায় এবং ঋণের যেন সদ্ব্যবহার করে, সেদিকে ঋণ প্রদানকারী সংস্থাকে অবশ্যই তদারকি করতে হবে। প্রতিনিয়ত সহজ করা হচ্ছে ঋণ প্রদান প্রক্রিয়া। সমন্বিত উদ্যোগের কারণে কৃষি ঋণের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে। তারপরেও কৃষি ও পল্লি ঋণসহ ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সেবা পেতে গ্রাহকগণকে হয়রানির হাত থেকে রক্ষা করা কিংবা তাদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে গ্রাহক স্বার্থ সংরক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। কৃষকগণ যেকোনও ফোন থেকে ১৬২৩৬ হটলাইন নম্বরে ফোন করে সরাসরি তাদের অভিযোগ জানাতে পারবেন। কোনও ধরনের সেবা থেকে কৃষক যেন বঞ্চিত না হয়, সেজন্যই এত পদক্ষেপ। দিনশেষে কৃষক যেন আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় এসে নিজেদের সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে পারে, সেজন্যই বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে। আর কৃষকরা যখন আর্থিক দিক থেকে ব্যক্তিগতভাবে সমৃদ্ধ হবে, সেটা যে দেশের মোট উন্নয়নেরই একটা অংশ বিশেষ, তা বলাই বাহুল্য।

লেখক : উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক

[email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ