বিজ্ঞান সাক্ষরতা

Send
ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী
প্রকাশিত : ১৩:০১, জুলাই ২৮, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৪, জুলাই ২৮, ২০১৮

ফারসীম মান্নান মোহাম্মদী‘বিজ্ঞানভিত্তিক সাক্ষরতা’ বা ‘সায়েন্টিফিক লিটারেসি’–এ যুগের মানুষের জন্য আবশ্যকীয় দক্ষতা। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ইস্যুতে কথা বলতে গেলে কিংবা স্রেফ কী বলা হচ্ছে, তার অর্থ করতে গেলেও এই সাক্ষরতার দরকার। শিক্ষাগত সাক্ষরতার পরেই বিজ্ঞান সাক্ষরতার প্রয়োজন এ কারণে যে, আধুনিক মানুষ এখন সুপেয় পানি, পুষ্টিকর খাদ্য, রোগ প্রতিরোধ, জরুরি ও প্রয়োজনীয় শক্তির জোগান খোঁজা এবং তার পরিবেশবান্ধব নিষ্কাশন/উত্তোলন/স্থানান্তর;  সর্বোপরি পরিবর্তনশীল জলবায়ুতে টিকে থাকার নানামুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। আজকের তরুণ-তরুণীর জীবনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যে নানা রকম কৃৎকৌশল ব্যবহৃত হচ্ছে, সে বিষয়ে একটা সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান থাকা দরকার, আর এজন্যই বিজ্ঞান সাক্ষরতাকে বলা হচ্ছে ‘জীবনের জন্য প্রস্তুতি’ (ইউরোপীয় কমিশন ১৯৯৫:২৮)।
বিজ্ঞান সাক্ষরতা কী? এটা একরকমের সক্ষমতা। নিজের বিষয়ে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে (যেমন: কোন ল্যাপটপটি ভালো কিংবা কোন মুঠোফোনটি আর্থিকভাবে লাভজনক এমনসব বিষয়েও বিজ্ঞানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব), অনেকের সঙ্গে কথা বলায়, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক কাজেকর্মে অংশ নিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কিছু জ্ঞান ও দক্ষতা থাকা দরকার। এমনকী গার্মেন্ট কারখানায় কাজ করতেও প্রযুক্তি জানা লাগে। এই যোগ্যতা বা সক্ষমতাই বিজ্ঞান সাক্ষরতা বা সায়েন্টিফিক লিটারেসি। অবশ্য বিজ্ঞান সাক্ষরতা বোঝাতে আমরা একটি বিশদ পটভূমিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক অনুধাবন বুঝে থাকি, কেবল গার্মেন্ট কারখানা চালানো নয়।

আপনি কি বিজ্ঞানসাক্ষর? সেটা বোঝার একটি উপায় হলো কিছু নির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর জানা। এটা কোনও সাধারণ জ্ঞানের প্রতিযোগিতা নয়। এই প্রশ্নগুলো ডিজাইন করা হয়েছে এমনভাবে, যেন বিজ্ঞানের ভৌত শাখার কয়েকটি বিষয়য়ের ওপর এবং আধুনিক বিজ্ঞানের কিছু আপ্ত তথ্যের ওপর ব্যক্তির গভীর জ্ঞান যাচাই করা সম্ভব হয়। এই প্রশ্নের উত্তর জানার অর্থ শুধু এটা নয় যে, আপনি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কিছু তথ্য জানলেন, এটা আরও কিছু অতিরিক্ত দক্ষতার নির্ণায়কও বটে। যেমন দৈনন্দিন ঘটে যাওয়া বিষয়, যেমন রাতের আকাশ কালো কেন (এটি ‘অলবার্সের হেঁয়ালি’ নামে পরিচিত) নিয়ে কৌতূহল দেখানো, প্রশ্ন করা, প্রশ্ন খুঁজে বের করা ও প্রশ্নের উত্তর পেতে সক্ষম হওয়া।

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জানা বিষয়গুলো (যেমন পড়ন্ত বস্তুর সূত্র কিংবা নিউটনের গতিসূত্র) সম্পর্কে আপনি জানবেন: এদের অর্থ কী, সেটা জানতে হবে, পরখ করে দেখতে হবে, বৈজ্ঞানিক অনুসিদ্ধান্তের ভিত্তিতে যৌক্তিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারতে হবে এবং সিদ্ধান্ত ব্যাখ্যা করতেও পারতে হবে।

প্রাকৃতিক ঘটনা (যেমন জোয়ার-ভাঁটা কিংবা সূর্যগ্রহণ, বন্যা কিংবা টাইফুন) সম্পর্কে সাধারণ জ্ঞান থাকতে হবে, এগুলো ব্যাখ্যা করতে পারতে হবে এবং কিছু ক্ষেত্রে আগাম খবর দেওয়ারও সামর্থ্য থাকতে হবে। 

যেকোনও সুলিখিত বিজ্ঞান জনবোধ্য গ্রন্থ (যেমন আমার লেখা ‘অপূর্ব এই মহাবিশ্ব’ (প্রথমা, ২০১১) কিংবা ‘থাকে শুধু অন্ধকার’ (প্রকৃতি-পরিচয়, ২০১৬) পড়ার ক্ষমতা থাকতে হবে, তাতে যতটুকু বিজ্ঞান থাকে সেটুক বোঝার ক্ষমতা আয়ত্তে থাকতে হবে এবং এইভাবে লব্ধ জ্ঞানের ভিত্তিতে আপনি সামাজিক আলোচনায় বা বিতর্কে অংশ নিতে পারবেন।

জাতীয় ও আঞ্চলিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোয় (যেমন কয়লা উত্তোলন কিংবা পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন) অন্তর্নিহিত বৈজ্ঞানিক ভিত্তি বা তথ্য চিহ্নিত করে ওই বিষয়ে সুচিন্তিত এবং তথ্যভিত্তিক অবস্থান নিতে পারবেন।

উৎস এবং পদ্ধতি যাচাই করে এবং পর্যাপ্ত সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যেকোনও বৈজ্ঞানিক তথ্যের অথবা যেকোনও প্রস্তাবনার (যেমন ফ্ল্যাট আর্থার বা সমতল-পৃথিবীবাদীদের দাবি) গুণগত মান যাচাই করতে পারতে হবে। এর মাধ্যমে বিজ্ঞান-সাক্ষর ব্যক্তির পক্ষে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।

অন্যভাবে বলা যায়, [OECD PISA Framework 2015] বৈজ্ঞানিক সাক্ষরতা হলো সেই ক্ষমতা যার সাহায্যে একজন সচেতন নাগরিক বৈজ্ঞানিক ধারণা, সূত্র ও বিষয়গুলোর ওপর আলোচনা করতে সক্ষম হন। ফলে তিনি যেকোনও বিজ্ঞানভিত্তিক আলোচনায় অংশ নিতে পারবেন ও সেইজন্য তার থাকবে-

১. যেকোনও ঘটনার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার সামর্থ্য

২. বিজ্ঞান-ভিত্তিক অনুসন্ধান ডিজাইন করা ও তার ফল যাচাইয়ের সামর্থ্য

৩. তথ্য ও প্রমাণ বৈজ্ঞানিকভাবে বিশ্লেষণ করার সামর্থ্য

৪. এই কাঠামোয় বিজ্ঞানভিত্তিক সাক্ষরতার দু’টি দক্ষতা থাকতে হবে:

ক) যেকোনো প্রপঞ্চের বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা দেওয়ার সামর্থ্য ও প্রবণতা

খ) বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধান নকশা করা এবং যাচাই করা

৫. ডেটা ও প্রমাণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে পারা 

এ পর্যায়ে আপনার বিজ্ঞান সাক্ষরতা পরীক্ষার জন্য নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর (সত্য/মিথ্যা) দেওয়ার চেষ্টা করুন।
১) পৃথিবীর কেন্দ্র খুব উত্তপ্ত থাকে।

২) যে মহাদেশগুলোর ওপর আমাদের বাস, সেগুলোর অবস্থান লক্ষ-কোটি বছরব্যাপী বদলেছে। ভবিষ্যতেও বদলাবে।

৩-ক) পৃথিবীর চারদিকে সূর্য ঘোরে, নাকি সূর্যের চারদিকে পৃথিবী ঘোরে?

৩-খ) সূর্যের চারদিকে একবার ঘুরে আসতে পৃথিবীর কত সময় লাগে?

৪) সব ধরনের  তেজস্ক্রিয়তা মানবসৃষ্ট।

৫) ইলেক্ট্রনের আকৃতি পরমাণুর চেয়ে ছোট।

৬) লেজার কাজ করে শব্দতরঙ্গ ঘনীভূত করে।

৭) মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে ভীষণ এক বিস্ফোরণের মাধ্যমে।

চেষ্টা করে দেখুন এই ৮টি প্রশ্নের কয়টির উত্তর জানা আছে। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে, আপনার বিজ্ঞান-বিষয়ক সাক্ষরতা কতটুকু। অর্থাৎ আধুনিক বিজ্ঞানের কতটুকু আপনি আত্মস্থ করতে পেরেছেন।

এই প্রশ্নমালাটি তৈরি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন। ওপরে শুধু ভৌত বিজ্ঞানের অংশটুকু দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আছে জীববিজ্ঞানের ওপর প্রশ্ন। একজন মানুষ বিজ্ঞান সম্পর্কে কতটুকু জানে, এটা তার একটি অন্যতম পরিমাপ মাত্র।

সরল ভাষায়, বিজ্ঞান সাক্ষরতা থাকলে আপনি প্রাকৃতিক ঘটনাবলি (ভৌত, রাসায়নিক, জৈবনিক, পারিবেশিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ইত্যাদি) সম্পর্কে অনুসন্ধিৎসু হবেন, ব্যাখ্যা করতে ইচ্ছুক হবেন, সম্ভাব্য সমাধান পরখ ও যাচাই করে দেখবেন এবং সর্বোপরি বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রণয়নে উৎসাহী হবেন। বিজ্ঞানের বিষয়-আসয় বোঝা, জানা ও প্রচার-প্রসারে নিয়োজিত থাকাও বিজ্ঞান সাক্ষরতার অংশ। এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি।

মনে রাখতে হবে, বিজ্ঞান সাক্ষরতা, বিজ্ঞান মনস্কতা, বৈজ্ঞানিক কাণ্ডজ্ঞান ও বিজ্ঞান গবেষণা আলাদা বিষয়। বিজ্ঞানমনস্কতা হলো বিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে সবকিছু ভাবা ও করা। বিজ্ঞানমনস্ক হতে হলে বিজ্ঞানী হতে হবে, এমন নয়, যেকোনও সচেতন মানুষ বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারেন। বৈজ্ঞানিক কাণ্ডজ্ঞান হলো বিজ্ঞান সাক্ষরতার প্রাথমিক ধাপ, দৈনন্দিন বিষয়ে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত নেওয়া। যেমন প্যারাসিটামল ওষুধ দুই বেলা খাওয়ার কথা কেউ বললে সেটা বিনাতর্কে মানতে চাওয়া যাবে না। ওষুধের মাত্রা ঠিকভাবে জানাও একটা স্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক কাণ্ডজ্ঞান। আর বিজ্ঞান গবেষণা হলো পুরোদস্তুর বিজ্ঞানীদের কর্মকাণ্ড, সেখানে পেশাদার বিজ্ঞানীরা দলগতভাবে বা একাকী গবেষণার কাজ করেন কোনও বিশ্ববিদ্যালয়, ইনস্টিটিউট বা গবেষণা কেন্দ্রের অধীনে। মোটা দাগে এই বিষয়গুলো মনে রাখা ভালো।

সূত্র:১/Science and Engineering Indicators: 2018, National Science Board.

2/ National Science Education Standards, National Academy of Sciences, 1996.3/ PISA 2015 Assessment and Analytical Framework, OECD Publishing, Paris, 2015.

[উত্তর সংকেত: ১/ সত্য, ২/ সত্য, ৩ক/ সূর্যের চারদিকে, ৩খ/ এক বছর, ৪/ মিথ্যা, ৫/ সত্য, ৬/ মিথ্যা, ৭/ সত্য।]

 

লেখক: অধ্যাপক, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ