আমাদের ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৮:৫৬, আগস্ট ২৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:৩৬, আগস্ট ২৫, ২০১৮





মো. সামসুল ইসলামআমরা জাতি হিসেবে দিনে দিনে চরম অসহিষ্ণু হয়ে উঠছি। এ অসহিষ্ণুতা শুধু রাজনৈতিক পর্যায়ে নয়; সামাজিক, ব্যক্তিগত এমনকি পারিবারিক পর্যায়েও মনে হয়, কেউ কাউকে সহ্য করতে পারছি না। যতই আমরা নিজেদের বাকস্বাধীনতার ধারক-বাহক মনে করি না কেন, তা যেন শুধু নিজের মতকে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। ভিন্নমত হলেই আমরা ছুড়তে থাকি সমালোচনার তীর—তা সামনাসামনি হোক বা মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমেই হোক।
বেশ কিছুদিন আগে আমি উন্নয়ন সাংবাদিকতা বিষয়ক একটি লেখায় পড়েছিলাম, ঔপনিবেশিকতার কবল থেকে সদ্য স্বাধীনতাপ্রাপ্ত দেশগুলোর সাংবাদিকতার একটি সমস্যা হলো, তারা তাদের লেখায় উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের লিগেসি ভুলতে পারেন না। স্বাধীনতা অর্জনের পরও তারা নিজের দেশের লোকদের বিরুদ্ধে একই ভাষা প্রয়োগ করতে থাকেন। তবে আমি বলবো, এটা শুধু সাংবাদিকতায় নয়, বিভিন্ন সামাজিক দল বা গোত্রগত পর্যায়েও এটি দেখা যায়।
যেমন এই উপমহাদেশের বিভিন্ন দেশে আমরা দেখেছি, কীভাবে ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে বাঙালি খেদাও, হিন্দু খেদাও বা মুসলমান খেদাও ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়েছে বা হচ্ছে। সবাই একইসঙ্গে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করলেও পরবর্তী সময়ে সে আন্দোলনের কৌশল ও ভাষা সবাই এখন একে অন্যের বিরুদ্ধে ব্যবহার করছে।
প্রায়শই আমি পত্রিকায়, টিভিতে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় এ ধরনের আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার লক্ষ করি। এখন শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নন, তার পরিবারের সদস্যসহ তার পূর্বপুরুষের ঠিকুজি বের করে তাদের আক্রমণ করা হয়। কেউ যদি সত্যিকারের অপরাধী হন, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু মিডিয়া ট্রায়ালতো মেনে নেওয়া যায় না।
যেমন টেলিভিশনের অনেক টকশোয় এ প্রবণতা দেখা যায়। আমি নিজে কয়েকটি টকশোয় যাওয়ার পর ভয়ে আর যেতে আগ্রহী হইনি। কারণ বেশ কয়েকবারই আমি দেখেছি, এটি পারস্পরিক তীব্র আক্রমণ এমনকি হাতাহাতিতে পর্যবসিত হয়েছে। সাংবাদিক বন্ধুদের কাছে শুনেছি দর্শকরাও নাকি এধরনের আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ বেশ পছন্দ করেন। আমরা এমনই এক জাতি, যারা সমঝোতায় পৌঁছানোর পরিবর্তে কলহ টিকিয়ে রাখতেই বেশি আগ্রহী!
সমাজে যারা অসহিষ্ণু, তাদের অন্যতম হাতিয়ার হচ্ছে নেতিবাচক প্রোপাগান্ডা। আর কারও বিরুদ্ধে প্রোপাগান্ডার একটি অন্যতম কৌশল হচ্ছে name-calling বা খারাপ নামে ডাকা বা তাকে তকমা দিয়ে দেওয়া। কাউকে সামাজিকভাবে একঘরে করতে বা তাকে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করার এর চেয়ে ভালো উপায় আর হয় না। যারা এগুলো করেন, তারা ভালো করেই জানেন, কোন সরকারের আমলে, কোন বিশ্বপরিস্থিতে কাকে কী তকমা দিতে হবে। আস্তিক, নাস্তিক, কম্যুনিস্ট, মৌলবাদী এগুলোতো অনেকদিন থেকেই আমাদের দেশে সুপরিচিত বিতর্কের ভাষা। এসবের মাধ্যমে অনেক সময় পুরোপুরি অযৌক্তিকভাবে অন্যকে ঘায়েল করা হয়।
ব্যক্তিগতভাবে আমি ফেসবুকে খুব বেশিদিন ধরে সক্রিয় না। তবে ফেসবুকে সিরিয়াস লেখার চেয়ে একটু স্যাটায়ারধর্মী লেখা বা ফান করাই বেশি পছন্দ করি। কিন্তু এখানেও অনেকে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করেন। সংক্ষেপে আমার একটা ঘটনা বলি। আমি একবার ফেসবুকে মজা করে বলি, ‘আমার হাল্কা কথাবার্তা নিয়ে আমার এক বন্ধুর সমালোচনায় অতিষ্ঠ হয়ে মরালিটির থিয়োরি নিয়ে আমি একটি জটিল পোস্ট দিয়েছিলাম, কিন্ত কেউ পড়ে না, লাইকও দেয় না। এখন মনে হয় বন্ধুটিকে পেটাই।’
মূল কথা এটুকুই। পোস্টে অতিরিক্ত শুধু থিয়োরিটির নাম আর এর প্রবক্তার নাম ছিল। কিন্তু এরপরে যা প্রতিক্রিয়া দেখলাম তা ভয়াবহ। একজন শিক্ষিত ভদ্রলোক বিশাল ইংরেজিতে লিখেছেন আমার মতো একজন শিক্ষক, লেখক কীভাবে পেটানোর কথা বলেন। এটা মাস্তানদের ভাষা ইত্যাদি ইত্যাদি। তিনি আমাকে কোন লাইনে নিয়ে যাচ্ছেন, এটা ভেবে আতঙ্কিত হলাম। তাড়াতাড়ি তার মন্তব্য ডিলিট করে দিলাম এবং তাকে ফেসবুকে আনফ্রেন্ড করলাম। এরকম আরও কয়েকবার হওয়ায় আমি পোস্ট কমিয়ে দিয়েছি, ফেসবুক ব্যবহার সংকুচিত করছি।
ফেসবুকসহ সোশ্যাল মিডিয়ার অনেক ইতিবাচক দিক আছে, যেমন অবাধ মতপ্রকাশের সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে। তেমনি এর রয়েছে ব্যাপক নেতিবাচক দিক। এটি এখন হয়েছে গুজব, প্রোপাগান্ডা আর ইনফরমেশন ওয়ারফেয়ারের অন্যতম মাধ্যম। আমাদের দেশে ফেসবুক কোনও যোগ্যতা ছাড়াই অনেক সেলিব্রিটি, পাবলিক ইন্টেকলচুয়াল আর দার্শনিকের জন্ম দিচ্ছে। অন্য কোথাও লেখেন না, কিছুই করেন না, এ রকম অনেক ব্যক্তিও ফেসবুক সেলিব্রিটি হয়ে যাচ্ছেন।
কিছুদিন আগে শিল্পী ফাহমিদা নবী বাংলা ট্রিবিউনে ‘কোটি ভিউ হলেই সেলিব্রিটি হওয়া যায় না’ শীর্ষক এ সংক্রান্ত একটি চমৎকার লেখা লিখেছেন। লাখ ভিউ, ভাইরাল বা ফেসবুক সেলিব্রিটিদের তাৎক্ষণিক রমরমা হঠাৎ পাওয়া দামের সমালোচনা করে তিনি বলেছেন প্রকৃত শিল্পী দুদিনের জন্য নয় চিরদিনের জন্য সাধনা করেন। লেখাটি থেকে শিক্ষণীয় অনেক কিছুই আছে। আমি নিজেও বুঝতে পারছি যে চটকদার লেখা লিখে বা কাউকে আক্রমণ করে সাময়িক বিখ্যাত হওয়ার চেয়ে সমাজে শুভবুদ্ধির উন্মেষ ঘটানো একজন লেখকের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। এবং এধরণের লেখকরাই বা লেখাই দীর্ঘস্থায়িত্ব পাবে।
সমাজে দুর্নীতির বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের এই পারস্পরিক অসম্মানের একটি যোগসূত্র আছে। অন্যকে ব্যক্তিগতভাবে বা তার সৃজনশীলতাকে হেয় করে আমরা চরম বিকৃত আনন্দ পাই। অথচ আমরা কিন্তু সহজেই একে অন্যকে সম্মান করতে পারি।
এক্ষেত্রে আমরা পশ্চিমাদের কাছ থেকে বোধহয় কিছু শিখতে পারি। আমি প্রায়ই ফেসবুকে বিদেশি লেখকদের বিভিন্ন ক্লোজড গ্রুপে লেখকদের লেখা পড়ি। দুই একটি গ্রুপে গিয়ে তাদের ভদ্রতার মাত্রা দেখে আমি অবাক হয়েছি। একে অন্যের লেখা নিয়ে আলোচনা করছেন অথচ কোনও আক্রমণ নেই। কয়েকদিন আগে আমি এক গ্রুপে স্রেফ কৌতূহলবশত লেখকদের লেখার মোটিভেশন নিয়ে জানতে চাইলাম। অর্থাৎ কে কী জন্য লেখেন। গ্রুপ অ্যাডমিন আমার পোস্টটা রাখলেও আমাকে স্মরণ করিয়ে দিলেন এ ধরনের পোস্ট না দেওয়াই ভালো। বুঝলাম গোপনীয়তা লঙ্ঘিত হতে পারে, এ কারণে তিনি এ ধরনের বিতর্কে যেতে চান না। অথচ আমরা নাম ধরে ধরে একে অন্যকে করছি চরম হেনস্থা। চিন্তাও করি না তার পরিবারের কথা বা তার পরিবারের শিশুদের কথা।
পারস্পরিক সম্মানবোধের ব্যাপার যেমন আছে, তেমনি যারা রাজনৈতিক, সামাজিক নেতৃত্বে আছেন, বা যেকোনও ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিতে চাইছেন, তাদের সমালোচনা সহ্য করার মানসিকতা থাকতে হবে। তাদের সহিষ্ণুতা বাড়াতে হবে। আপনি যদি রাজনৈতিক নেতা হয়ে দুর্নীতি করেন, চিকিৎসক হয়ে মানুষের ভুল চিকিৎসা করেন, শিক্ষক হয়ে গবেষণা বা শিক্ষকতায় সময় না দিয়ে অন্যকিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, ব্যবসায়ী হয়ে পণ্যে ভেজাল দেন, তাহলে তো আপনাকে সমালোচনা শুনতেই হবে। আপনি সমাজের নেতৃত্ব দিতে চাইবেন আর আপনার সমালোচনা সহ্য করার সহিষ্ণুতা থাকবে না, এটা তো গণতান্ত্রিক চিন্তা-চেতনার মধ্যেই পড়ে না।
গণতন্ত্র নিয়ে যেটি প্রায়শই বলা হয়, তা হলো গণতন্ত্র কিন্তু টপ-ডাউন অ্যাপ্রোচ নয়, বরং এটি বটমআপ অ্যাপ্রোচ। সহিষ্ণুতা বা বাকস্বাধীনতার ধারণা আসতে হবে সমাজের নিচ থেকে, আপনার-আমার কাছ থেকে। সমাজে, পরিবারে, প্রতিষ্ঠানে পারস্পরিক সম্মানবোধ ও সহিষ্ণুতা নিশ্চিত হলেই রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এর প্রতিফলন দেখা যাবে।

লেখক: গবেষক ও কলামিস্ট
ইমেইল: [email protected]

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ