প্রতিহিংসার বদল দরকার

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১২:৫৩, সেপ্টেম্বর ০১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩২, সেপ্টেম্বর ০১, ২০১৮

শুভ কিবরিয়াকোরবানির ঈদ শেষ হলেই মেয়েটি প্রবেশ করতো জীবনের এক নতুন পর্বে। কিন্তু তা আর হলো না। তার জন্য যা অপেক্ষা করলো, তাকে ঠিক মানুষের আচরণ বলা যায় না। এক বর্বর পাশবিক আচরণের শিকার হতে হলো মেয়েটিকে। পশুর আচরণকে আমরা পাশবিক বলি, কিন্তু পশুরাও এতটা বর্বরতার পরিচয় অনেক সময় দেয় না। কিন্তু মুক্তি খাতুন নামের মেয়েটির জীবনে পশুর চেয়েও হিংস্র একদল মানুষের দেখা মিললো। বলা চলে, তার জীবনপ্রদীপ জোর করেই নিভিয়ে দিলো একদল মানুষরূপী পশু। এই মানষরূপী পশুরা তারই প্রতিবেশী। একগ্রামেই তাদের বসবাস। তার বাবা মোজাম্মেল হকের সঙ্গে প্রতিবেশী আবদুস সালামের বিরোধ গ্রামের এক উন্মুক্ত জলাশয়ের মালিকানা ও দখল নিয়ে। সেই দখলের লিপ্সাই কাল হলো। কেননা গ্রামবাসী আবদুস সালাম রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। গ্রামে আছে তার এক ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনী। তারাই মুক্তির বাবাকে শায়েস্তা করতে গত ২ আগস্ট তাদের বাড়িতে হানা দেয় একদল সশস্ত্র মানুষসহ। ভাঙচুর চলে, চলে লুটপাট। গ্রাম ছেড়ে মুক্তিদের গোটা পরিবার পালিয়ে অন্যত্র চলে যায়। পরে পুলিশ, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের মধ্যস্থতায় তারা আবার গ্রামে ফিরে আসে ঈদের কয়েকদিন আগে। কলেজ ছুটি হলে মুক্তিও ফেরে নিজের বাড়িতে।
পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজের দর্শন (সম্মান) দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মুক্তি খাতুন শুনেছিলেন ঈদের পরে প্রশাসনের মধ্যস্থতায় এই বিরোধের একটা সম্মানজনক মীমাংসা হবে। তারা নির্ভয়ে বসবাস করতে পারবে গ্রামে। পাবনা জেলার সাঁথিয়া থানার নাগডেমরা গ্রামের মোজাম্মেল হকের মেয়ে মুক্তি খাতুন প্রস্তুত হচ্ছিলেন তার নিজের বিয়ের জন্যও। কথা ছিল ২৭ আগস্ট তার আকদ হবে। অথচ ১৮ আগস্ট সকাল ১০টার দিকে ঘটলো বিভীষিকাময় সেই ঘটনা। ৩০-৪০ জনের এক সশস্ত্র দল আবদুস সালামের নেতৃত্বে তাদের বাড়ি আক্রমণ করে। বাড়িতে ওই সময় কোনও পুরুষ লোক ছিলেন না। প্রতিবেশী আবদুস সালাম ও তার সঙ্গীরা মুক্তি খাতুনকে ঘর থেকে টেনেহিঁচড়ে উঠানে নামিয়ে এনে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেয়। অগ্নিদগ্ধ মুক্তি খাতুনের শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে যায়। আশপাশের লোকজনের সহায়তায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ও পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ঠাঁই হয় মুক্তি খাতুনের। ১০ দিনের মৃত্যুযন্ত্রণা শেষে ২৭ আগস্ট তিনি মারা যান। বাবার শত্রুদের প্রতিহিংসার শিকার হয়েই এই জীবন থেকে মুক্তি ঘটে মুক্তি খাতুনের।


এই ঘটনা সংবাদপত্রে পড়ে ‘থ’ মেরে বসে থাকি অনেকক্ষণ। মানুষ কতটা প্রতিহিংসার বশবর্তী হলে এরকম বর্বরভাবে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে পারে ভেবে অবাক হই।
দিনের বেলায়, প্রকাশ্যে অনার্সপড়ুয়া একটি মেয়েকে ৩০-৪০ জনের একদল সশস্ত্র মানুষ গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে নির্বিকারভাবে তা দেখছে, উল্লাস করছে, প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করার স্বস্তি পাচ্ছে এই দৃশ্য ভাবতেই আঁতকে উঠছি।
আমি আবদুস সালামের প্রতিহিংসার পরিমাপ করার চেষ্টা করছি। একটা উন্মুক্ত জলাশয়ের দখল পাওয়ার বাধা সরাতে মানুষ কি এতটাই হিংস্র, এতটাই বর্বর, এতটাই বিনাশাকাঙ্ক্ষী হতে পারে?
মানুষের মধ্যে কি সামান্যতম বিবেচনাবোধ, সুশ্রিতা, নিজের প্রতিহিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করার ন্যূনতম শক্তি থাকবে না?

দুই.
এই ঘটনা জানার পর মানুষের অন্তর্লোকের জিঘাংসার কোনও খবর সংবাদপত্রে পেলেই তা খুঁটিয়ে পড়ছি। বোঝার চেষ্টা করছি, মানুষের ভেতরের মানবিক বোধ আসলে কতটা নিচে নেমে গেছে! কেন মানুষ এতটা হিংস্র ও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠছে? সেই কেন’র উত্তর খোঁজার আগেই আরেকটা ঘটনায় চোখ পড়লো। ঘটনাটি ঘটেছে নরসিংদী জেলায়। এই জেলার মাধবদী উপজেলার কাঠালিয়া ইউনিয়নের ডৌকাদি গ্রামের তোতা মিয়ার দুই ছেলে মুক্তার হোসেন ও আমানুল্লাহ। মুক্তার হোসেন (৪০) বয়সে বড়। দুই ভাইয়ের বাড়ির বিদ্যুতের একটা মিটার। যৌথ মিটারেই তারা দুই ভাই বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন। বিদ্যুতের বিল নিয়ে দুই ভাইয়ের বিরোধ বাধে। প্রথমে কথা কাটাকাটি পরে বচসা। একপর্যায়ে ছোট ভাই আমানুল্লাহ বড় ভাই মুক্তারের বুকে ছুরি চালিয়ে দেয়। আহত বড় ভাইকে দ্রুত স্থানীয় আড়াই হাজার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়। পথিমধ্যেই বড় ভাই মুক্তার হোসেন মারা যান। ২৮ আগস্ট ২০১৮ এই ঘটনা ঘটে।

চিন্তা করা যায়, সামান্য বিদ্যুৎ বিল নিয়ে আপন দুই ভাইযের উত্তেজনা কতটা ক্রোধে পরিণত হলে তা হত্যায় রূপ নিতে পারে?

ভাবনার বিষয় কেন মানুষ এ রকম ক্রোধান্ধ ও প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে আপনজনের জীবনপ্রদীপ নিভিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে?

তিন.
এই দুই ঘটনার স্থান ভিন্ন। ঘটনার বয়ানে তারতম্য আছে। তবে দুই ঘটনায় মিল এক জায়গায় যে, মানুষ প্রতিশোধ নিতে দ্বিধা করছে না। প্রতিশোধস্পৃহা মেটানোর পরের পরিস্থিতি সম্পর্কে বিবেচনা করছে না। মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। অর্থাৎ মানুষের মানবিক বিবেচনার যে স্থিতি আমাদের কাম্য ছিল, সেখানে ব্যাপকতর ফাটল দেখা দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, ব্যক্তিমানুষের এই প্রতিশোধস্পৃহা বা প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার আকাঙ্ক্ষার উদগীরণ হচ্ছে কেন? সমাজ বা রাষ্ট্র কি তাকে প্ররোচিত করছে কোনোভাবে? এই আলোচনাটাই সিরিয়াসলি এখন করা উচিত।

প্রথমত, আমাদের সমাজে মানবিকতা নাই হয়ে যাচ্ছে। সমাজ এখন নিষ্ঠুরভাবেই ‘আমি’ বা ‘আমরা’ কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। সমাজে যে ‘প্রত্যেকে আমরা পরের তরে’ সামাজিক চর্চার মাধ্যমে একটা মানবিক সমাজ তৈরির চেষ্টা ছিল সেই চেষ্টা হাওয়া হয়ে গেছে। সবাই ‘আমি’ ও ‘আমরা’–তেই থিতু হওয়ার চেষ্টা করছি। অনেকে বলেন রাষ্ট্রের পুঁজিবাদী আকাঙ্ক্ষা এই নষ্টের কারণ। সেটা হয়তো একটা কারণ কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রাচারে পুঁজিবাদী আকাঙ্ক্ষার বাইরেও তো সাংস্কৃতিক, ধর্মীয়, লোকায়ত অনেক আকাঙ্ক্ষা বিরাজ করে। মানুষ তো অনেক আড়ম্বরের সঙ্গেই সামাজিক, ধার্মিক আচার অনুষ্ঠান পালন করে চলেছে। তাহলে কীভাবে বলি শুধু পুঁজিবাদী আকাঙ্ক্ষাই মানুষকে এতটা বিভ্রান্ত করছে। এতটা অমানুষ করে তুলছে।

দ্বিতীয়ত, আমাদের রাজনীতি ও রাষ্ট্রাচার অনেক প্রতিশোধস্পৃহার কারণ তৈরি করেছে এই সত্য এখন আর অস্বীকার করার উপায় নেই। আমাদের রাজনীতিতে খুন, হামলা, নির্মূল চেষ্টা এতটাই প্রভাব ফেলেছে যে, তা আর স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক সমঝোতার পথ খোলা রাখে নাই। রাজনীতি ও রাষ্ট্রাচার এতটাই হিংসা উৎপাদন করেছে যে আমরা রাজনীতির প্রতিপক্ষকে নির্মূল করতে সব রকমের পথ তৈরিতে সহায়তা দিতে একপায়ে খাড়া আছি। রাষ্ট্র ও রাজনীতির এই বিপদ ব্যক্তি ও সমাজকেও প্রভাবিত করেছে।

চার.

লেখাটি শেষ করতে চাই একটা গল্প দিয়ে।

একবার এক নৃবিজ্ঞানী আফ্রিকার এক উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় গেলেন গবেষণার কাজে। একদম প্রত্যন্ত অঞ্চল, সভ্যতার ছোঁয়া সেভাবে লাগেনি। তিনি ঝুড়িভর্তি সুস্বাদু ফল নিয়ে হাঁটছেন, দু’চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, কী যেন খুঁজছেন গভীর মনোযোগে।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ থমকে দাঁড়ালেন, কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছে গেছেন। তার সামনে খোলা প্রান্তর, সেখানে উপজাতি শিশুরা খেলা করছে। তিনি আঞ্চলিক ভাষায় একটি হাঁক ছাড়লেন, বাচ্চারা খেলা থামিয়ে অবাক হয়ে তার দিকে তাকালো। বিজ্ঞানী ধীরপায়ে মাঠের একপাশে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া একটি গাছের গোড়ায় সেই ফলভর্তি ঝুড়িটি রাখলেন। তারপর ঘুরে বললেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে সবার আগে দৌড়ে এই ফলের ঝুড়ির কাছে পৌঁছাতে পারবে, সব ফলের মালিক সে-ই হয়ে যাবে।’
যেই কথা সেই কাজ, শুরু হয়ে গেলো দৌড়। কিন্তু একটি বিস্ময়কর ব্যাপার ঘটেছে–বাচ্চারা সবাই হাতে হাত ধরে একসঙ্গে দৌড়াচ্ছে!
দেখতে দেখতে তারা পৌঁছে গেলো গাছের তলায়। সবাই একটি করে ফল তুলে নিলো হাতে, সবাই যে সমানভাবে বিজয়ী! ফল হাতে একসঙ্গে গোল হয়ে বসে মনের খুশিতে খেতে শুরু করলো বাচ্চারা।
বিজ্ঞানী কৌতূহল ধরে রাখতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা সবাই দলবেঁধে কেন দৌড়ালে? প্রতিযোগিতা করে দৌড়ালে যে প্রথম হতো, সে তো সব ফল পেয়ে যেতো! একটা একটা করে খেতে হতো না।’

একটি শিশু উত্তর দিলো, ‘আমি একা কীভাবে খুশি হবো, যদি আমার বন্ধুদের সবার মন খারাপ হয়?’
বিজ্ঞানীর কাছে এ প্রশ্নের উত্তর ছিল না। তিনি চুপ করে রইলেন, কেবল ঠোঁটের কোণে খেলে গেলো একটুকরো হাসি, সত্যিকারের সুখী মানুষের সন্ধান যে তিনি পেয়ে গেছেন!

পুনশ্চ: আমাদের রাষ্ট্র ও রাজনীতিতেও এখন এইরকম ‘প্রতেকে আমরা পরের তরে’–সংস্কৃতির আবাদ বাড়াতে হবে। প্রতিহিংসার বদলে অন্যের কল্যাণের মধ্যে নিজের বিকাশ প্রতিষ্ঠার পথ আবিষ্কার করতে হবে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ