শ্রীলঙ্কা: নতুন ক্ষেত্র, পুরনো ক্ষত

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৭:৪৫, এপ্রিল ২৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:০৪, এপ্রিল ২৩, ২০১৯

আনিস আলমগীরনিউজিল্যান্ডের পর শ্রীলঙ্কায় ঘটলো। উপাসনালয়ে প্রার্থনারত মানুষকে নির্বিচারে হত্যার ঘটনা। পাত্র-পাত্রীর রক্তের রঙ একই, কিন্তু ধর্ম ও বর্ণ আলাদা। কেন ঘটছে এমন ঘটনা বারবার, নানা দেশে? প্রধানত একটাই কারণ- তাদের ধর্ম আর বর্ণ। মানুষে মানুষে হিংসা আর বিদ্বেষ। আর তার পেছনে বিশ্ব মোড়লদের ক্ষমতার খেলা। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য এরা ধর্মের নামে, গোষ্ঠীর নামে, বর্ণের নামে মানুষের বিরুদ্ধে মানুষকে অমানবিক লড়াইয়ে নামিয়ে দিয়েছে। হিংসা ছড়িয়ে দূরত্ব তৈরি করছে। সেই দূরত্বের সুযোগে ভোটে জিতে আসছে।
২১ এপ্রিল ২০১৯। ইস্টার সানডের মতো খ্রিস্টানদের পবিত্র একটি উৎসবের দিনে শ্রীলঙ্কাজুড়ে গীর্জা ও বিলাসবহুল হোটেলের আটটি স্পটে বিস্ফোরণ ঝড় বয়ে গেছে। আর তাতে শেষ পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে তিন শতাধিক দাঁড়িয়েছে। আহত প্রায় ৫০০। মৃতের তালিকায় রয়েছে বাংলাদেশি শিশু জায়ান চৌধুরীও। আওয়ামী লীগ সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিমের নাতি আট বছরের জায়ান চৌধুরী পরিবারের সঙ্গে শ্রীলঙ্কায় বেড়াতে গিয়ে হোটেলে বোমা হামলার শিকার হয়। ওই ঘটনায় শিশুটির বাবা মশিউল হক চৌধুরী প্রিন্সও আহত হয়েছেন। শেখ সেলিম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ফুপাতো ভাই।
শ্রীলঙ্কা এই হামলার সঙ্গে অপরিচিত নয়। তাদের দীর্ঘ ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান হয়েছে ১০ বছর আগে, ২০০৯ সালে। শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী সুলেমান বন্দরনায়েককে গোঁড়া বৌদ্ধরা হত্যা করেছিল। তার কন্যা এবং সাবেক রাষ্ট্রপতি চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গাকেও সন্ত্রাসী হামলা চালিয়ে আহত করা করেছিল। প্রেসিডেন্ট রানাসিংহে প্রেমাদাসাকেও বোমা হামলায় হত্যা করা হয়েছিল। তার পরিণতিতে লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম বা এলটিটিই প্রধান ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণকে যেভাবে সহযোদ্ধাদের সঙ্গে শ্রীলঙ্কান সৈন্যরা হত্যা করেছিল, যেভাবে নিঃশেষ করা হয়েছে তার দলকে- সে রক্তাক্ত অধ্যায়ও দেখেছে দেশটির মানুষ।

তবে গত বছরের মার্চে বৌদ্ধ সংখ্যাগুরু জনগোষ্ঠী সংখ্যালঘু মুসলমানদের মসজিদ, বাড়ি এবং সম্পত্তিতে হামলা চালানোর ঘটনা ছাড়া বেশ কয়েক বছর ধরে শ্রীলঙ্কা শান্তই ছিল বলা চলে। অবশ্য অভ্যন্তরীণ রাজনীতি শান্ত ছিল না। এমনকি এই হামলার সময় দেশটির রাষ্ট্রপতি মৈত্রীপাল সিরিসেনা আর প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহের বিরোধ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ১০ দিন আগে এই হামলার গোয়েন্দা তথ্য পেয়েও রাষ্ট্রপতিপক্ষ প্রধানমন্ত্রীকে ঘটনা জানাননি। হামলার পর তিনি স্পষ্ট করে বলছেন, তাকে গোয়েন্দা তথ্য না দিয়ে অন্ধকারে রাখা হয়েছিল।

রাষ্ট্রের ওপর স্তরে সমন্বয় না থাকলে যা হওয়ার তাই হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। এই হামলা ঠিক এ কারণেই হতে পেরেছে। কারণ হামলার বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ ১০ দিন আগে আমেরিকার এবং ভারতীয় গোয়েন্দাদের থেকে অবহিত হয়েছিল। এমনকি কারা কারা হামলা করতে পারে তাদের নাম পর্যন্ত পুলিশের হাতে এসেছিল। এরপরও এতো বড় সন্ত্রাসী ঘটনা সংঘটিত হওয়া পুরোপুরি সরকারি ব্যর্থতা বলা চলে। অন্য দেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশেও এখন আর এমন হামলা সম্ভব নয়। যদিও এই হামলা আমাদেরকে আবারও বার্তা দিচ্ছে- প্রতিনিয়ত সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে। অবশ্য, বাংলাদেশের পুলিশ বলেছে, সন্ত্রাসী হামলার সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য না থাকলেও শ্রীলঙ্কায় হামলার ঘটনার পর ঢাকাসহ অন্যান্য কিছু জায়গায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।

আগেই বলেছি শ্রীলঙ্কার প্রধানমন্ত্রী নাকি এই সতর্কবার্তা সম্পর্কে জানতেন না। শ্রীলঙ্কার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রাষ্ট্রপতির হাতে। শ্রীলঙ্কার স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার মুখপাত্র রজিথা সেনারত্ন বলেছেন, এটা দুনিয়ার একমাত্র দেশ যেখানে নিরাপত্তা বাহিনী প্রধানমন্ত্রীর ডাকে সাড়া দেয় না।

খুব প্রাচীন জনপদ শ্রীলঙ্কা। প্রায় দুই কোটি ২০ লাখ জনসংখ্যার এই জনপদটি ভারত মহাসাগরে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র। পাক প্রণালী দ্বারা ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপরাষ্ট্রটির সঙ্গে বাণিজ্যপথে অবস্থানের কারণে বিশ্বের বহু দেশের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ছিল প্রাচীনকাল থেকে। এখানে অ্যাডাম পিক বা আদম চূড়া রয়েছে। হজরত আদম (আ.) নাকি দুনিয়ায় অবতরণ করেছিলেন এই আদম পর্বতে। এখানে মনুষ্য জাতির আবাস গড়ে উঠেছিল হাজার হাজার বছর আগে।

দেশটির ৭১ শতাংশ লোক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, ১১ শতাংশ হিন্দু, ১০ শতাংশ মুসলমান আর ৮ শতাংশ লোক খ্রিস্টান। মৌর্য সম্রাট অশোক বর্তমান উড়িষ্যার কলিঙ্গ নামক স্থানে সংঘটিত এক যুদ্ধে রক্তস্রোত দেখে হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে অহিংস বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি তার বোনকে বৌদ্ধধর্ম প্রচারের জন্য শ্রীলঙ্কায় পাঠিয়েছিলেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছিল অশোকের প্রেরিত মিশনারিগুলো। অষ্টম শতাব্দীর শংকরাচার্য ভারতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের নির্মূল করার সময় শ্রীলঙ্কায় বহু বৌদ্ধ পালিয়ে গিয়েছিল। শংকরাচার্য ৩৩ বছর বয়সে মারা যান, যে কারণে তার শ্রীলঙ্কা যাওয়া হয়নি। সুতরাং বৌদ্ধরা শ্রীলঙ্কায় অক্ষত ও নিরাপদ ছিল।

দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে গৃহযুদ্ধে শ্রীলঙ্কার ক্ষত-বিক্ষত অবস্থা। ১৯৭৬ সালে প্রভাকরণের নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম’। ইলম তামিল শব্দ। এর অর্থ হচ্ছে রাষ্ট্র। তারা জাফনায় একটি তামিল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল। ১৯৯৩ সালের ১ মে প্রেসিডেন্ট প্রেমাদাসার বোমা হামলায় মৃত্যু হলে টাইগারদের ওপর নিরবচ্ছিন্ন হামলা চালায় শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী। তখন প্রভাকরণসহ বহু নেতার মৃত্যু হয়েছিল। তামিল টাইগাররা এখন স্তব্ধ। গৃহযুদ্ধও এখন আর নেই। তাই বলা চলে গত ১০ বছরের মধ্যে এটিই বড় ধরনের হামলার ঘটনা।

আমরা লক্ষ করেছি, শান্তির ধর্ম বৌদ্ধধর্মকেও অশান্ত করে দিচ্ছে কিছু বৌদ্ধ সন্ন্যাসী। এরা খুবই হিংসাপরায়ণ। মিয়ানমারের সম্প্রীতি বিনষ্টের মূল হোতাই হলো বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা। এদের এক নেতাকে ডাকা হয় বৌদ্ধ লাদেন। ২০১৮ সালে মার্চের সহিংসতা হয়েছিল সিংহলি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সন্ন্যাসীদের নেতৃত্বে। শ্রীলঙ্কার মুসলমানদের মসজিদ, বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করে তখন প্রচুর ক্ষতি সাধন করেছিল তারা। তখনও শ্রীলঙ্কা জরুরি অবস্থা জারি করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেছিল।

এই হামলা মোটেও সেই হামলার প্রতিশোধ গ্রহণমূলক হামলা নয়। কারণ এটি হয়েছে খ্রিস্টানদের গির্জায়। ২০১৮ সালের হামলায় খ্রিস্টানরাও বৌদ্ধদের পক্ষাবলম্বন করেনি। মুসলমানরা শ্রীলঙ্কার অনুগত নাগরিক। বেশিরভাগই ব্যবসায় জড়িত। দীর্ঘ ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধের সময় তারা দৃঢ়ভাবে সরকারের পক্ষে ছিল, যে কারণে এখনও তারা তামিলদের আক্রমণের শিকার হয়। শ্রীলঙ্কার মুসলমানরা এই হামলায় স্তম্ভিত ও লজ্জিত। এখন তাদের উপাসনালয়ে সরকার পাহারার ব্যবস্থা করেছে এবং তারাও ব্যানার নিয়ে হামলার নিন্দা করছে, আর খ্রিস্টানদের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করছে। সেই সঙ্গে অনেকেই তাদের ভাবমূর্তি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। ইসলামকে শান্তির ধর্ম বলে বিশ্বাস করা হলেও কিছু সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ড অন্য ধর্মের লোকদের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছাচ্ছে।

বলা হচ্ছে ন্যাশনাল তৌহিদ জামাত (এনটিজে) নামের একটি ক্ষুদ্র জঙ্গিগোষ্ঠী এই হামলা চালিয়েছে এবং তারা নাকি দায়ও স্বীকার করেছে। তাদের ২৪ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে মন্ত্রী রজিথা সেনারত্ন বলেছেন, ক্ষুদ্র এই গোষ্ঠীটির সঙ্গে আন্তর্জাতিক যোগসূত্র রয়েছে কারণ এত ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর পক্ষে একা হামলা করা সম্ভব নয়। এরা আগে থেকে সরকারের নজরদারিতেও ছিল।

যদি ইসলামপন্থি গ্রুপটি এই হামলা পরিচালনা করে থাকে তবে তারা বৈশ্বিক সন্ত্রাসীদের দ্বারা অনুপ্রাণিত এবং সাহায্যপ্রাপ্ত। কারণ কেউ কেউ হামলায় আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। যেটা আইএস বা অন্য সন্ত্রাসী গোষ্ঠী করে আসছে। আত্মহনন খুবই কঠিন বিষয়। বিশ্বাসের প্রতি অন্ধ আনুগত্য এবং ধর্মে উগ্রবাদী না হলে কেউ আত্মহনন করতে পারে না। তামিলরাও আত্মহননে দ্বিধা করতো না।

শ্রীলঙ্কা এখন বৃহৎ শক্তির লীলাক্ষেত্র হয়েছে। চীন একটা বন্দরের ৭৫ শতাংশ লিজ নিয়ে বন্দরটির ভালোভাবে উন্নয়ন করেছে। এই বন্দরটি প্রায় পরিত্যক্ত ছিল। এখন ভারত বলছে তাদেরকে আরেক বন্দর ত্রিণকোমালি দিতে হবে। অথচ ত্রিণকোমালি শ্রীলঙ্কার একটি সক্রিয় বন্দর। এই ঘটনার পেছনে কী উদ্দেশ্য কাজ করেছে তা বিশ্লেষণ করতে গিয়ে নিউজিল্যান্ডের প্রতিশোধ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, মুসলমান জঙ্গিদের উপস্থিতি জানান দেওয়াসহ যেসব মত উঠে এসেছে তাতে শ্রীলঙ্কায় প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টাকেও হিসাবে নেওয়া হচ্ছে।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট একপক্ষে থাকলে প্রধানমন্ত্রী আরেক পক্ষে থাকেন। আগেই বলেছি প্রশাসনের উপর স্তরের দুর্বলতায় এই সফল হামলা হয়েছে। দশ দিন আগে কারা হামলাকারী হতে যাচ্ছে জানার পরও হামলা সফল হয় কীভাবে! সরকারের মধ্যকার অনৈক্য আর সমন্বয়হীনতার বিষয়টি বোমা হামলার পর আরও প্রকটভাবে প্রকাশিত। নিরাপত্তাবিষয়ক আগাম তথ্য সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমাসিংহে অবহিত ছিলেন না মূলত প্রেসিডেন্ট সিরিসেনার সঙ্গে তার গত বছরের বিরোধের জের ধরেই। রনিল বিক্রমাসিংহেকে বরখাস্ত করে সিরিসেনা নতুন প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিয়েছিলেন, যার জের ধরে তীব্র সাংবিধানিক সংকট তৈরি হয়েছিলো। পরে বিক্রমাসিংহেকে সুপ্রিম কোর্টের চাপের মুখে পুনর্বহাল করতে বাধ্য হয়েছিলেন তিনি।

মন্ত্রী সেনারত্নে বলেছেন, নিরাপত্তা সংস্থাগুলো গত ৪ এপ্রিল থেকেই সতর্কবার্তা ইস্যু করতে শুরু করে। এর আগেই প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সতর্কবার্তার বিস্তারিত পুলিশ প্রধানের কাছে পাঠিয়েছিলো। ১১ এপ্রিল নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিভাগের প্রধানদের কাছে একটি বার্তা পাঠানো হয়। তিনি বলেন সম্ভাব্য হামলার বিষয়ে হামলাকারী গোষ্ঠী ও তাদের সদস্যদের নামও বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে পাওয়ার পর তা পুলিশকে দেওয়া হয়েছিলো।

সর্বশেষ বলা যায়, শ্রীলঙ্কায় এখন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীদের হামলার সূত্রপাত হলো। রাষ্ট্রীয় ঐক্য মজবুত না হলে হয়তো আরও দুর্ভোগ পোহাতে হতে পারে শ্রীলঙ্কাকে।

 

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ