আমরা আপস করিনি

Send
জুলফিকার রাসেল
প্রকাশিত : ০০:০২, মে ১৩, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৪, মে ১৩, ২০১৯

জুলফিকার রাসেলসংবাদমাধ্যমকে প্রতিদিনই পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। প্রতিদিনই চেহারা বদলাতে হয়। আর পাঠকের সামনে প্রতিদিন নতুন খবর নিয়ে হাজির হতে হয়। এটা আসলে এখন একটি সেকেলে কথা। সেই মুদ্রিত সংবাদপত্রের বাণী। সাংবাদিকতার শিক্ষকরা এককালে এটাই পড়াতেন। এখনও পড়ান কিনা জানি না।
কিন্তু এখন আর মুদ্রিত সংবাদপত্রের হিসাবে চলে না। আগে যে রকম সাপ্তাহিক পত্রিকা সাতদিনে একবার বের হলেও তার আকর্ষণ থাকতো, এখন সকালের সংবাদপত্রের প্রিন্ট এডিশনও কোনোভাবে সেই আকর্ষণ ধরে রাখতে পারছে না। কারণ, সংবাদ তৈরি হচ্ছে যেমন মুহূর্তেই, তেমনি তা প্রকাশও হয়ে যাচ্ছে মুহূর্তেই।
তাই সকালের প্রকাশিত পত্রিকা প্রকাশের আগেই বাসি হয়ে যায়। পত্রিকা ছাপা হওয়ার আগেই পাঠকরা সেই খবর জেনে যান। তারপরও পাঠকরা মুদ্রিত সংবাদপত্র পড়ছেন কেন? আমি বলবো, এটা প্রধানত অভ্যাসের কারণে। আরও দু-একটি কারণ আছে। তারমধ্যে কিছু এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদন আর তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তি সবার হাতে না থাকা উল্লেখযোগ্য। শেষের কারণটি সময়ের ব্যাপার মাত্র। রাষ্ট্র এখন আর তার নাগরিকদের ইন্টারনেটের বাইরে রাখতে পারে না। এটা আমি মনে করি জল হাওয়ার মতোই তার পাওনা। এটা তাকে দিতেই হবে। আর এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনগুলো প্রিন্ট মিডিয়ার জন্য কোরামিনের মতো। কিন্তু কোরামিন দেয়া তো কোনও সমাধান নয়। যে প্রতিবেদন আমি এখন দিতে পারি তা ১২ ঘণ্টা বা ২৪ ঘণ্টা আটকে রেখে ছাপা কাগজ বিক্রির এই কৌশল কতদিন টিকবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে।

আগে কতক্ষণ মানুষ সংবাদের মধ্যে থাকতেন? ধরুন, সকালে খবরের কাগজ পড়তেন আর রাতে বাসায় গিয়ে ঘণ্টাখানেক টিভি দেখতেন। আর এভাবে খবরের সংস্পর্শে থাকা মানুষ মোট জনসংখ্যার কতভাগ ছিলেন? কিন্তু এখন ২৪ ঘণ্টাই মানুষ খবরের মধ্যে আছেন। তাকে কখনও বিচ্ছিন্ন থাকতে হয় না। তাকে সকালে পত্রিকার জন্য অপেক্ষা করতে হয় না। অথবা বাসায় গিয়ে রাতে টিভির রিমোট চাপতে হয় না। তিনি যেখানে আছেন সেখানেই খবর। এক মোবাইল ফোন তাকে সবকিছু এক জায়গায় এনে দিয়েছে। তিনি যেভাবে চান সেভাবেই ওই মোবাইল ফোনে খবর জানতে পারেন। টেক্সট পড়তে পারেন। ছবি দেখতে পারেন। দেখতে পারেন ভিডিও। শুধু তা-ই নয়, চাইলে নতুন খবর এলেই তাকে অ্যালার্ট করে দেবে। তার একটা পছন্দ না হলে আরেকটা খবর অফার করবে। যদি বলি খবর একটা খাবার, তাহলে এই খাবার গ্রহণ অনেকগুণ বেড়ে গেছে। এমনকি ঘুমের মধ্যেও সে এই খবরের মধ্যেই আছে।

তাই আমরা ভেবেচিন্তে অনলাইনই শুরু করেছিলাম। পাঁচ বছর আগে ভাবতে এতটুকু বেগ পেতে হয়নি যে আমাদের অনলাইনেই যেতে হবে। সামনের দুনিয়াটা অনলাইনের। ভার্চুয়াল জগৎই প্রধান্য বিস্তার করবে। তাই কেউ কেউ যখন বলেছেন, এটা ছাপা হয় না? তোমরা প্রিন্ট ভার্সন বের করো না কেন? অনলাইন আর কতদিন? এসব প্রশ্নে আমরা বিচলিত হইনি। আমরা লক্ষ্যচ্যুত হইনি। আমরা জানতাম একদিন এসব প্রশ্ন থেমে যাবে।

শুধু তা-ই নয়। আমাদের বুদ্ধিজীবী এবং সাংবাদিক মহলের কারও কারও আবার একটা ভাব আছে। তারা তাচ্ছিল্য করে বলতেন, অনলাইন! কেউ কেউ তো আবার অনলাইন সাংবাদিকদের সাংবাদিক হিসেবেই গুনতে চাইতেন না। আমার সহকর্মীরা ভালো প্রতিবেদন করলেও তা নানা প্রতিযোগিতায় জমা দিতে পারতেন না। অনলাইন নাকি ক্যাটাগরিতে পড়তো না। এমনকি অনলাইন সম্পাদকদের তারা তাদের মতো সম্পাদক হিসেবেও গ্রহণ করতে চাইতেন না। কিন্তু সময়ে সবকিছু বদলে যাচ্ছে। আসলে যারা এটা ভাবতেন তারাই এখন বদলাচ্ছেন। সময়ের ট্রেনে উঠতে চাচ্ছেন। তাই প্রিন্ট পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে বিনিয়োগ বাড়ছে। সম্প্রচারমাধ্যম ব্যবসায় ধস দেখে জোর দিচ্ছেন অনলাইনে। সবাই বুঝতে পারছেন, অনলাইন আসলে সব মাধ্যমকে একসঙ্গে ধারণ করে। সবার ওপরে এর অবস্থান।

তাই প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। অনলাইন আসছে শত শত। ব্রেকিং নিউজের প্রতিযোগিতা। কে আগে তাজা খবরটি দিতে পারেন। আবার কেউ কেউ একটি ল্যাপটপ আর একটি চেয়ার টেবিল নিয়েও অনলাইন দৌড় শুরু করেছেন। ব্রেকিং নিউজ দিতে গিয়ে জীবিত ব্যক্তিকে মেরে ফেলছেন। কোথাও একটি খবর ছাপা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কপি হয়ে যাচ্ছে। কেউ ভুল খবর দিলে সেই ভুল খবরই কপি হয়ে শত শত অনলাইনে প্রকাশ হচ্ছে। এমনকি বানান ভুলসহ। ফলে যা হওয়ার তা-ই হচ্ছে। শুরু হয়েছে অনলাইন অপ-সাংবাদিকতা। কপি পেস্ট সাংবাদিকতা। তারা মনে করছেন, এভাবে টুকটাক করেই অনলাইন চালানো যায়। এই ভুল ভাঙবে। তারা একসময় বুঝতে পারবেন অনলাইনই আসলে বড় বিনিয়োগের জায়গা।

শুরু থেকেই আমরা ওই দৌড়ে নেই। আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের খবর যদি সঠিক ও নির্ভরযোগ্য হয়, তাহলে দেরিতে হলেও পাঠক আমাদের খুঁজে নেবেন। আমরা জানি, ভুল খবর দেওয়ার চেয়ে না দেওয়া উত্তম। খবরের যে মূল সূত্র তা হাওয়া হয়ে যেতে পারে না। মাধ্যম বদলাতে পারে। আর সেটাই আমরা শুরু থেকে অনুসরণ করে আসছি। সংবাদের মান এবং সঠিকতার সঙ্গে আমরা কখনও আপস করিনি। আমরা তাড়াহুড়া করি না। সঠিক তথ্যের অপেক্ষায় থাকি। আমরা আমাদের লক্ষ্যে অবিচল।

আর বাংলা ট্রিবিউনের পাঁচ বছরে দাঁড়িয়ে আপনাদের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, ভবিষ্যতেও আমরা কখনও আমাদের নীতির সঙ্গে আপস করবো না। মানের সঙ্গে কোনও আপস হবে না। আপনাদের সঠিক সংবাদ দিতে আমরা জেগে থাকবো সব সময়। আপনাদের ২৪ ঘণ্টা অপেক্ষায় রাখবো না। যখন খবর হবে তখনই আপনাদের তা পৌঁছে দেবো।

লেখক: সম্পাদক, বাংলা ট্রিবিউন

 

/এমএনএইচ/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ