খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা কি শোভনীয় কাজ করেছেন?

Send
স্বদেশ রায়
প্রকাশিত : ১৭:১৬, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৭, ডিসেম্বর ০৫, ২০১৯

স্বদেশ রায়খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি। সারাদেশের মানুষ যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার, সবাই মনে করছেন, দেশের এক নম্বর সমস্যা দুর্নীতি—তারা প্রধানমন্ত্রীর দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে স্বাগত জানাচ্ছেন, এমন একটি সময়ে দুর্নীতির মামলার একজন আসামির জামিনের জন্যে দেশের সর্বোচ্চ আদালতে গিয়েছেন বিএনপির আইনজীবীরা। তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত, রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সচেতন। তারা যতই বিএনপির রাজনীতি করুন না কেন, তারা জানেন দেশের মানুষ দুর্নীতি পছন্দ করে না। তারা এও জানেন, খালেদা জিয়া ও তার ছেলে তারেক রহমান দুর্নীতির জন্যে দেশের মানুষের কাছে নিন্দিত। শুধু যে নিন্দিত তা নয়, তারা অনেকখানি ধিকৃত। যে কারণে খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় সাজা পাওয়ার পর, জেলে যাওয়ার পরে বিএনপি দেশের সাধারণ মানুষের কোনও সমর্থন পাননি। বিএনপি নেতারাও বিষয়টি বুঝতে পেরে, আজ অবধি খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্যে কোনও আন্দোলনের কর্মসূচি দেননি। কারণ তারা জানেন, এই কর্মসূচিতে দেশের সাধারণ মানুষের কোনও সমর্থন পাওয়া যাবে না। এমনকি নির্বাচনের আগে তারা যে নির্বাচনি জোট গড়েছিলেন, সেখানেও তাদের জোটের মূল নেতা ড. কামাল হোসেনের শতভাগ সমর্থন পাননি খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে। তিনি অনেকটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি ভাবের ভেতর দিয়ে খালেদা জিয়ার মুক্তির কথাটি বলেছিলেন। ৪ ডিসেম্বরও তিনি খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে যে কথা বলেছেন, তাও তেমনটি। তার কথার অর্থ এমন ছিল, যে কেউ জামিন পেতে পারেন। ড. কামালের এই অবস্থান দেখে বিএনপি তাকে খালেদা জিয়ার আইনজীবী হিসেবেও নেয় না।

এমত অবস্থায় বিএনপি যে আইনি লড়াই খালেদা জিয়ার জন্যে চালিয়ে যাচ্ছে এটা অনেকটা তাদের কর্মীদের মন রক্ষার জন্যে। কারণ, প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের কিছু অন্ধ ভক্ত কর্মী থাকে। এরাই মূলত একটি দলের প্রাণ। তাদের ধরে রাখা যেকোনও রাজনৈতিক দলের কর্তব্য। বিশেষ করে দুর্দিনে তারা ছাড়া কেউ থাকে না। বিএনপির এখন দুর্দিন। এখন তাদের কর্মী বলতে সারাদেশে হাতেগোনা কিছু মানুষ। জামায়াতে ইসলামীর যে কর্মীদের ওপর ভরসা করে তারা মিছিল মিটিং করে, তারা শেষ অবধি কোথায় যাবে তা নিয়ে বিএনপিরও সন্দেহ আছে। তাই তাদের অন্ধভক্ত কর্মীদের ধরে রাখার জন্য তাদের কোনও একটা কিছু করতে হচ্ছে। এর বাইরে বিএনপি কিন্তু গত নির্বাচনের পর থেকে তাদের রাজনীতির গতি প্রকৃতি বদলে ফেলেছে। তারা অনেক শান্ত মাথায় রাজনীতি করতে চাচ্ছে। যেমন তাদের সংসদ সদস্যরা সবাই সংসদে যোগ দিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যে বিভিন্ন সময়ে সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসাও করেছেন। তবে তারা খানিকটা মুশকিলে পড়ে গেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজ দলের অভ্যন্তরে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চালানো শুরু করার পরে। এই অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে তাদের এক নেতা গয়েশ্বর রায় বলেছিলেন, ‘আমরা যা পারিনি, শেখ হাসিনা সেটা করে দেখিয়েছেন।’ তবে তিনিও পরে মুখ বন্ধ করেছেন। অন্যদিকে প্রথমে বিএনপির দুই একজন এই অভিযানকে স্বাগত জানালেও এখন তাদের সকলের মুখ বন্ধ। কারণ, তারা এখন বুঝতে পারছেন, দেশের মানুষ যতই দুর্নীতির বিরুদ্ধে যাবে, ততই খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান নিন্দিত হবেন, ইমেজ বাড়বে শেখ হাসিনার। কারণ, শেখ হাসিনার কোনও দুর্নীতির কথা আজ অবধি তার অতি বড় শত্রুও বলতে পারে না। বরং তিনি তার পিতার মতোই এখানে শতভাগ স্বচ্ছ। দেশের মানুষও সেটা জানে। দেশের মানুষ জানে, আওয়ামী লীগের অনেকে দুর্নীতি করলেও  শেখ হাসিনা শতভাগ স্বচ্ছ বলেই তুলনামূলকভাবে বিএনপি আমলের চেয়ে আওয়ামী লীগ আমলে দুর্নীতি কম। এছাড়া বিএনপি আমলে দুর্নীতিকে সরকারিভাবে সহায়তা করা হয়, আওয়ামী লীগ আমলে ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু দুর্নীতি হয়।

ওপরে উল্লিখিত এ বাস্তবতা সম্পর্কে বিএনপির আইনজীবীরা মুখে না বললেও মনে মনে শতভাগ মানেন। এছাড়া তারা মুখে যা বলুন না কেন, বাস্তবে এটাও জানেন, আওয়ামী লীগ আমলে অনেক প্রতিষ্ঠানকে আগের চেয়ে বিশেষ করে বিএনপি আমলের চেয়ে বেশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানগুলো তার মধ্যে  পড়ে। এখানে এ সত্যও—স্বীকার করতে হবে, বিএনপির যে সিনিয়র আইনজীবীরা ৫ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মামলায় সুপ্রিম কোর্টের ভেতরে ছিলেন, তারা সবাই বিচার বিভাগের উচ্চমানের পক্ষে।  অনেক ক্ষেত্রে তারা অন্যমতের আইনজীবীদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বিচার বিভাগের স্বার্থে কাজ করেন। তাছাড়া তারা সবাই বিজ্ঞ আইনজীবী। তারা জানেন, ২ তারিখে একজন রোগীর মেডিক্যাল রিপোর্ট চাইলে পাঁচ তারিখ সকালে তার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট কোনও হাসপাতাল দিতে পারবে না। কারণ, ৭২ ঘণ্টা এমনকি কোনও কোনও টেস্টের রিপোর্ট পেতে সাতদিনও সময় লাগে। তাই ৫ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় যে সময় চেয়েছে, সেটা বাস্তবসম্মত। এখানে কোনও সেন্টিমেন্ট দেখানোর বা রাজনীতি করার সুযোগ নেই।

অথচ এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে, বিএনপির এই সিনিয়র আইনজীবীদের সামনে তাদের জুনিয়রা যে কাজ করলেন, সেটা তো তারা নিজ চোখেই দেখেছেন। যে কাজের ভেতর দিয়ে বিচারপতিরা তাদের আসন ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন, সে কাজ একটি দেশের বিচার বিভাগের সিনিয়র আইনজীবীদের চোখের সামনে কতটা শোভনীয়, তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে এই কাজের ভেতর দিয়ে দেশের মানুষ দুটো মেসেজ পেলো, বাস্তবে আইনের কথা বললেও,  আইনের প্রতি বিএনপির শ্রদ্ধা নেই। দুই, তারা জানেন, প্রকৃত বিচার হলে তারা খালেদা জিয়ার জামিন পাবেন না, তাই বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যে এ কাজ করেছে।

বিচারবিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যে বিএনপি গত এক সপ্তাহ ধরে পত্র-পত্রিকা ও রেডিও টেলিভিশনে তাদের বক্তব্যের মাধ্যমে নানান কথা বলে আসছেন। তারা এও বলেছেন, ৫ তারিখ তারা কোর্টের চারপাশে জনসমাবেশ করাবে। যদিও তারা সেটা করতে সমর্থ হয়নি, তারপরেও গত কয়েকদিন ধরে একটি অস্থিতিশীল অবস্থা তৈরির চেষ্টা তারা করেছে। এমনকি তারা গাড়ি ভাঙচুরের জায়গা হিসেবে বেছে নেয় সুপ্রিম কোর্টের সামনের রাস্তাটি। এটাও মূলত বিচারপতিদের ওপর এক ধরনের মানসিক চাপ সৃষ্টির চেষ্টা। তাই বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীদের উপস্থিতিতে তাদের জুনিয়রা ৫ তারিখ সুপ্রিম কোর্টের অভ্যন্তরে যে কাজ করেছে সেটা এই ধারাবাহিক কাজেরই চূড়ান্ত প্রকাশ। তবে, এখানে একটি সত্য সবাইকে মানতে হবে, রাস্তা আর সুপ্রিম কোর্টের অভ্যন্তর এক নয়। তাছাড়া সাধারণ পাবলিক আর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীরা এক নয়। তাই বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা তাদের এই আইনজীবীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন, সেটা তাদের বিষয় তবে বিচারবিভাগ যদি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাহলে সেটা বিচার বিভাগের শৃঙ্খলার পক্ষেই যাবে।  সেটার প্রয়োজনও আছে। আর শেষ বিচারে ওই কাজের দায় বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরাও এড়াতে পারেন না। কারণ, তাদের উপস্থিতিতে, তাদের জুনিয়ররা এ কাজ করেছেন। তারা কোনও বাধা তাদের দেননি। 

লেখক: রাষ্ট্রীয় পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ