মাদ্রিদ জলবায়ু সম্মেলন: পৃথিবীকে রক্ষা করবে কারা

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৮:৩৫, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:২৯, ডিসেম্বর ০৬, ২০১৯

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীপৃথিবীর আবহাওয়া বদলে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে অস্বাভাবিক মাত্রায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে এই গ্রহ। বৈজ্ঞানিক বিচারে পৃথিবীর এই বদল এক অতি ভয়াবহ ঘটনা। পৃথিবী নষ্ট হয়ে বাস অনুপোযোগী হয়ে গেলে মানুষ থাকবে কোথায়! আবহাওয়াবিদদের এই নিয়ে চিন্তার শেষ নেই। হলিউড এই নিয়ে একটা ছবি তৈরি করেছিল ২০০৪ সালে। ছবির নাম ছিল ‘ডে আফটার টুমরো’। সেখানে দেখানো হয়েছিল বরফ যুগ গ্রাস করছে আমেরিকাকে।
একটুখানি রোদের আশায় লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে মেক্সিকোর দিকে। নিউইয়র্ক জনশূন্য। যেখানে ঘুরে বেড়াচ্ছে নেকড়ের দল। ওদিকে ঘূর্ণিঝড় ক্যালিফোর্নিয়ায়। শিলাবৃষ্টি টোকিওতে। আর দাবানল বহু জায়গায়। ফক্স-এর আগে আর কেউ এমন ভয়াবহ ছবি তৈরি করেছে কিনা, জানি না। তবে, ছবিটিতে মানুষকে আবহাওয়া বিপর্যয় সম্পর্কে সতর্কতার বার্তা দিয়েছে খুবই কড়াভাবে।
তবু, মানুষের চৈতন্য হচ্ছে না। সাধারণ মানুষের কথা কী বলব, যেদিন ২০০৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি থেকে কিয়োটো প্রটোকল পুরোপুরি আইনে বলবৎ হওয়ার কথা ছিল, সেদিন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিলেন, আমি কিয়োটো প্রটোকল মানি না। আর এখন আমেরিকার আরেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি থেকে আমেরিকার নাম প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। উভয় প্রেসিডেন্টের যুক্তি হলো—মানুষের তৈরি পরিস্থিতির কারণে আবহাওয়ার পরিবর্তন হতে পারে, তারা তা বিশ্বাস করেন না।

পৃথিবীর ভাগ্যবিপর্যয় আছে কিনা জানি না। না হয় পৃথিবীর একটা সুপার পাওয়ারের ক্ষমতা অনুরূপ অনভিজ্ঞ মানুষের হাতে পড়ে কীভাবে! অথচ গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ে আমেরিকার কন্ট্রিবিউশন শীর্ষ অবস্থানে। অবশ্য পৃথিবীর মানুষের ভাগ্য ভালো কারণ প্রেসিডেন্টের অজ্ঞতার বিষয়ে উপলব্ধি করে এখন আমেরিকার রাজ্যগুলো গ্লোবাল ওয়ার্মিং প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিচ্ছে। আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, অবস্থা উন্নতি করতে না পারলে নিউইয়র্ক, লন্ডন, মুম্বাই ডুবে যাবে। কারণ এখন সুমেরু, কুমেরু, আইসল্যান্ডের বরফ গলছে। এটি যদি বন্ধ করা না যায়, তবে সমুদ্রের পানি উচ্চ হয়ে এসব শহরকে তলিয়ে দেবে।

সম্মেলনে যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তাতে অঙ্গীকার ছিল স্বাক্ষরকারী রাষ্ট্রগুলো কার্বন-ডাই-অক্সাইড বা মিথেনের মতো কিছু গ্যাসের উৎপাদন কমাবে। এগুলোকে বলে গ্রিন হাউজ গ্যাস। কারণ, এসব গ্যাস পৃথিবীর আবহাওয়ায় তৈরি করে একটা আস্তরণ। ফলে পৃথিবীর তাপ বিকিরণ হতে পারে না দূর আকাশে। আর ওইসব গ্যাসের পরিমাণ বায়ুমণ্ডলে যত বাড়ে পৃথিবীর উত্তাপও তত বেড়ে যায়। তবে সুমেরু, কুমেরু, আইসল্যান্ড—সর্বত্র বরফ গলতে শুরু করে এখন সমুদ্রের পানির স্তর যেখানে আছে তার থেকে তিন মিটার উঁচু হয়ে যাবে। তাতে করে সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা ডুবে যাবে। শুধু বাংলাদেশে ৫-৬ কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হয়ে যাবে।

কার্বন ডাই অক্সাইড তৈরি করছে শিল্প উন্নত দেশগুলো। কয়লা, ডিজেল, গ্যাস অর্থাৎ জীবাশ্ম জ্বালানি যত ব্যবহার করা হচ্ছে, ততই মিথেন তৈরির পরিমাণ বাড়ছে। সুতরাং কার্বন-ডাই-অক্সাইড প্রতিরোধের জন্য এবং আবহাওয়া বিপর্যয় ঠেকানোর জন্য গরিব দেশগুলোকে সাহায্য করার জন্য একটা তহবিল তৈরির কথা হয়েছিল। ধনী দেশগুলো এই ফান্ডে অনুদান হিসেবে টাকা দেওয়ার কথা ছিল। অনুদান যে দিচ্ছে না তা নয়, কিন্তু পরিমাণ হতাশাব্যঞ্জক।

এখন মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতিসংঘের ২৫তম জলবায়ু পরিবর্তন সম্মেলন ২০১৯ (Climate Change Conference), যাকে সিওপি-২৫ (COP25) বলা হচ্ছে সংক্ষেপে। ২ ডিসেম্বর শুরু হয়ে ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯ শেষ হবে এই সম্মেলন। সম্মেলনটি চিলিতে অনুষ্ঠানের কথা ছিল কিন্তু চিলিতে এখন গণআন্দোলন চলছে তাই জাতিসংঘ ওই সম্মেলন মাদ্রিদে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাদ্রিদের সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যোগ দিয়েছিলেন। প্রত্যেক দেশের অন্তত পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রী ওই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমান বিশ্বে কার্বন নিঃসরণ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। আবার বিগত চার বছর পরপর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে। কোনোটাই কমানো সম্ভব হচ্ছে না। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বর্তমান মাদ্রিদ পরিবেশ সম্মেলনের আলোকে ও অভিজ্ঞতায় বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা যেন রাজনীতি বাদ দিয়ে আগামী ২০২০ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলনে পরিবেশ বাঁচানোর লক্ষ্যে এবং বিশ্বকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করার প্রয়োজনে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। আগামী ২০৪৫ সালের মধ্যে বিপর্যয় শুরু হবে। আশার বিষয় সমগ্র বিশ্বে আবহাওয়া নিয়ে জনসচেতনতা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছাত্রজনতার আন্দোলন ক্রমেই বাড়ছে। রাজনৈতিক দলগুলোও পরিবেশবান্ধব কর্মসূচি গ্রহণ এগিয়ে আসছে।

ব্রিটেনে নির্বাচনে লেবার পার্টির কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। জেরেমি করবিন বলেছেন, তারা ক্ষমতায় আসলে তিন কোটি বৃক্ষরোপণ করবেন যেন ২০৫০ সালের মধ্যে তাপমাত্রা জিরো সেন্টিগ্রেডে নেমে আসে। আমেরিকার রাজ্যগুলো সৌরবিদ্যুৎ সংগ্রহে উঠে পড়ে লেগেছে। দানাদার খাদ্য থেকে তারা জ্বালানি তেল বাড়ানোর এক কর্মসূচি নিয়েছে। এই তেল পরিবেশবান্ধব। অবশ্য এই তেল বেশি পরিমাণ তৈরি হলে বিশ্বে খাদ্য দ্রব্যের মূল্য বেড়ে যাবে। খাদ্য ঘাটতিও হতে পারে।

বাংলাদেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করছে যা কখনও পরিবেশবান্ধব প্রকল্প নয়। এখনই তা বন্ধ করতে হবে। বৈজ্ঞানিকেরা প্রচেষ্টা চালালে খরস্রোতা নদীর পরিবর্তে সমুদ্র থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উপায় উদ্ভাবন করতে পারে। বাংলাদেশের উপকূলে সুন্দরবন আগে বরিশাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এখন সেই বন নানা অত্যাচারে সংকুচিত হয়ে আসছে। দেশ বাঁচাতে হলে উপকূলে নিবিড় বন সৃষ্টি করতে হবে। অতি শিগগিরই বৃহত্তর চট্টগ্রাম, বৃহত্তর নোয়াখালী, বৃহত্তর বরিশাল, বৃহত্তর খুলনার উপকূলে নিবিড় বন সৃষ্টির মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করে অগ্রসর হতে হবে। না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে উপকূল থেকে ৫ থেকে ৬ কোটি লোক বাস্তুত্যাগী হবে।

এ বিষয়ে সচেতন না হলে ও এখন থেকে পরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর না হলে ২০৫০ সালের মধ্যে বন সৃষ্টি করা সম্ভব হবে না। আর বাংলাদেশের ছাত্র-জনতাকে আহ্বান জানাব, তারাও যেন পরিবেশের পাহারাদার হয়।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ