মোদির বিরুদ্ধে কংগ্রেসের অব্যাহত সংগ্রাম

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:৩৭, জানুয়ারি ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৯, জানুয়ারি ০২, ২০২০



বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীজনগণকে নববর্ষের শুভেচ্ছা জানিয়ে ভারতের প্রবীণ দল কংগ্রেস টুইটারে পোস্ট করেছে, ‘এই নববর্ষ আমাদের শান্তি, স্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধি বয়ে আনুক। নতুন বছরে একটিমাত্র রেজ্যুলেশন আমারা গ্রহণ করছি, এই সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনও মূল্যে আমাদের আওয়াজ অব্যাহত রাখাবো। আমরা সবাইকে শুভ নববর্ষের শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।’ মোদিবিরোধী আন্দোলন তীব্র শীতেও থেমে নেই। কংগ্রেস ‘ভারত বাচাঁও’ এবং ‘নতুন আজাদি’ আন্দোলনের আওয়াজ তুলেছে। এমনকি নববর্ষ উদযাপন অনুষ্ঠানেও নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন ও নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে স্লোগান দিয়েছে দিল্লির জনতা।
এদিকে, গত ২৮ ডিসেম্বর ২০১৯ ছিল ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের ১৩৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৮৮৫ সালে দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই উপমহাদেশে কংগ্রেস প্রাচীনতম রাজনৈতিক দল। রাজনৈতিক দল গঠন করে রাজনীতি করা সম্পর্কে ভারতীয়দের তেমন ধারণা ছিল না। ব্রিটিশরা রিটায়ার্ড ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সিভিল সার্ভিস অফিসার অ্যালান অক্টোভিয়ান হিউমকে দিয়ে কংগ্রেস গঠন করার ব্যাপারে ভারতীয়দের সাহায্য করেছিল। সম্ভবত ভারতীয়দের রাজনীতি যেন নিয়মতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হয়, সেই কথা চিন্তা করে কংগ্রেস গঠনে ব্রিটিশরা সাহায্য করেছিল।
ব্রিটিশরা পলাশী যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা দখল করেছিল। এখান থেকেই ব্রিটিশের ভারত দখল করে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষার্ধ থেকে শুরু করে ঊনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত শতাধিক বছরের মাঝে এই দেশে বহু বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। তারমধ্যে ১৭৬৩ থেকে ১৭৭৮ সাল পর্যন্ত ফকির বিদ্রোহ, যার নেতা ছিলেন ফকির মজনু শাহ, ফকির দুদ্দু শাহ; ত্রিপুরার শমসের গাজীর বিদ্রোহ (১৭২৭-১৭৩১), ফরাজি আন্দোলন (১৮৩১-১৮৫৭), সর্বশেষ সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭) অন্যতম।
এসব বিদ্রোহের অভিজ্ঞতা থেকে রাজনীতিকে নিয়মতান্ত্রিক সাংগঠনিক কাঠামোর মধ্যে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে ইংরেজদের সহায়তায় কংগ্রেসের জন্ম। পরে জন্ম হয় মুসলিম লীগের (১৯০৬)। এই দুই দলের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনে ভারত ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করে।
এখন কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিচ্ছে নেহরু পরিবার। সোনিয়া গান্ধী, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কাই এখন নেতা। ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ক্ষমতাচ্যুত হয়েছে। এখন ভারতীয় জনতা পার্টির নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রধানমন্ত্রী। এর আগে তিনি দুই দফা গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। অখ্যাত এক ফেরিওয়ালার সন্তান তিনি। বিএ পাস বলে দাবি করেন। ভালো বক্তা। বক্তৃতার জোরেই এখনও টিকে আছেন।
হিটলার বলতেন, ভালো বক্তা না হলে তার রাজনীতি করা উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজনীতির পাঠ নিয়েছেন আরএসএস-এর ক্যাডার হিসেবে। সুতরাং তাদের রাজ্য পাঠের সব ব্যবস্থাই সাম্প্রদায়িক। সম্প্রতি তারা উঠে-পড়ে লেগেছেন তাদের পাঁচটি এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে। এক. বাবরি মসজিদের স্থলে রাম মন্দির নির্মাণ; দুই. কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা ৩৭০ ধারা রহিতকরণ; তিন. নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন পাস করা এবং বাস্তবায়ন; চার. আসামের মতো সমগ্র দেশে নাগরিকপঞ্জি বাস্তবায়ন এবং ৫. নতুনভাবে জনগণনা করা, যাতে প্রতিটি নাগরিকের বিস্তারিত বিবরণ থাকবে।
গত তিন সপ্তাহ ধরে প্রায় সব বিরোধী দল ভারতব্যাপী বিজেপির এই পাঁচ এজেন্ডার বিরুদ্ধে গণসংগ্রাম করছে। কংগ্রেস আর বিজেপি সর্বভারতীয় দল। কংগ্রেস এখন সিদ্ধান্ত নিয়েছে যেসব রাজ্যে তারা ক্ষমতাসীন রয়েছে, সেসব রাজ্যে তারা আন্দোলন তীব্রতর করবে। রাহুল আর প্রিয়াংকা ব্যাপক গণসংযোগে বের হয়েছেন। ভারতে মুসলমানরা সংখ্যায় নগণ্য নয়, প্রায় ৩০ কোটি মুসলমান। বিশ্বের বৃহৎ মুসলিম জনগোষ্ঠীর আবাস হচ্ছে ভারত। যেসব আইন এর মধ্যে লোকসভায় পাস হয়েছে, তা নিয়ে আমেরিকা জাতিসংঘ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং ভারতের সব নাগরিকের সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলেছে, এনআরসি আর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন মুসলিম সংখ্যালঘুদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করবে, আর দেশটিতে মুসলমানদের টিকে থাকা কঠিন হবে।
যদিওবা মোদি রামলীলা ময়দানের জনসভায় মুসলমানেরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন, কিন্তু মুসলমানেরা তার কথায় আশ্বস্ত হতে পারছে না। মোদি সরকার ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে অন্যান্য বিরোধী দলের পরামর্শ উপেক্ষা করে সব কাজ করার চেষ্টা করছে। অথচ তারা নির্বাচনে মাত্র ৩১ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। আন্দোলন-বিক্ষোভে এ পর্যন্ত প্রায় ২৫ জন লোক প্রাণ হারিয়েছে। সর্বভারতীয় দল হিসেবে এখন সব আঞ্চলিক দলের সঙ্গে কংগ্রেসের উচিত সমন্বয় করে ভারতের প্রতিটি রাজ্যের আন্দোলন চাঙা করা। মুসলমানেরা এবার হয়তো টিকবে, না হয় বলির পাঁঠা হবে।
সুতরাং ৩০ কোটি মুসলমান আন্দোলনের ময়দানে থাকবেই। বিকল্প কোনও পথ মুসলমানদের নেই। এখন আন্দোলনের শরিক হওয়া সব দল এবং জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কংগ্রেসকে খুব কঠিনভাবে সবকিছু সমন্বয় করতে হবে। পশ্চিমবাংলায় আমরা দেখেছি তৃণমূলের পাশাপাশি কংগ্রেস এবং সিপিএম যৌথভাবে এনআরসি এবং সিএএ'র বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে। আন্দোলনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই ছোট ছোট দলের ঐক্য গড়ে উঠবে। বহুজন সমাজ পার্টির নেত্রী মায়াবতী তার এক বিধায়ককে বহিষ্কার করেছেন নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন সমর্থন করায়। সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বলেছেন, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে তিনি তার নিজের নাম লিপিবদ্ধ করবেন না।
মায়াবতী আর অখিলেশের ঐক্য যদি গড়ে ওঠে তবে উত্তরপ্রদেশে তীব্র আন্দোলন হবে। কারণ উত্তরপ্রদেশে মুসলমানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আলিগড়, সাহারানপুর, দেওবন্দ-এর অবস্থান। আমার জানা মতে, উত্তরপ্রদেশে আরও বহু মুসলিম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। ক’দিন আগে এনডিটিভিতে দেখলাম, বিজেপির এক নেতা বলছেন হুকুম ফেলে দুই ঘণ্টায় সব সাফ করে ফেলবে। ৩০ কোটি মুসলমানকে দুই ঘণ্টায় শেষ করার পরিকল্পনা অবাস্তব। কংগ্রেস সুষ্ঠু নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হলে তাদের নতুন বছরের সংকল্প বৃথা যাবে। আর মানবজাতিকে ভারতে বিরাট এক গণহত্যার দৃশ্য অবলোকন করতে হবে।
বাংলাদেশ ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশ। সুতরাং এমন যেকোনও পরিস্থিতির উদ্ভব হলে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বাঁধভাঙা স্রোতের মতো মানুষ বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীতে শিশু এবং নারী যেমন সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল এখানেও তাই হবে। পুরুষরা থেকে যাবেন। নারী এবং শিশুদের বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করা হবে।
আমরা ওআইসিভুক্ত দেশগুলোকে বৈঠক করে ভারতীয় মুসলমানদের অবস্থা নিয়ে পর্যালোচনা করার আহ্বান জানাব। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোগান, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদ এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি এই বিষয়টার প্রতি দৃষ্টি দিলে ভারতে ৩০ কোটি মুসলমান মজলুম হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক
[email protected]

/এমএমজে/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ