একজন মুশফিক এবং দোদুল্যমান বিসিবি

Send
পবিত্র কুন্ডু
প্রকাশিত : ১৪:০৭, জানুয়ারি ১০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৮, জানুয়ারি ১৬, ২০২০

পবিত্র কুন্ডুবঙ্গবন্ধু বিপিএলের দল খুলনা টাইগার্সে দক্ষিণ আফ্রিকান সতীর্থ রবি ফ্রাইলিঙ্ক মুশফিকুর রহিমের মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন দুর্দান্ত এক অধিনায়ককে। যিনি কখনও চাপের মুখে ভেঙে পড়েন না। সঙ্কটে দলের নেতৃত্ব দেন সামনে থেকে। ভীষণভাবেই উদ্বুদ্ধ করেন সহখেলোয়াড়দের। এবং ভাবাবেগ যাকে ছুঁতে পারে না ।

এ তো ১৮০ ডিগ্রি বদলে যাওয়া মুশফিক! নিজের চরিত্রকে বিপরীত মেরুতে নিয়ে যাওয়া এক ক্রিকেটার। যে মুশফিককে এর আগে বাংলাদেশ চিনতো, তিনি ২২ গজে বোলারদের সন্ত্রস্ত করেন ব্যাট হাতে, কিন্তু মাঠের বাইরে খুবই কোমল স্বভাবের । জয়টা খুব কাছে এসে দূরে সরে গেছে, এমন টেস্ট ম্যাচে হারের দায় নিয়ে যিনি অশ্রুসিক্ত চোখে আর বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিতে চান । কঠিন পরিস্থিতিতে দলের জয়কে ৩ বলে ২ রানের নাগালে এনে আগাম জয়োৎসব সেরে নেন এবং শেষে সেই ম্যাচে ‘অসম্ভব’ হারের কারণ হন দায়িত্বজ্ঞানহীন শট খেলে। পরে জ্বলে মরেন অন্তর্জ্বালায়।

না, সেই আবেগময় মুশফিক আর নেই। ফ্রাইলিঙ্ক ঠিক ধরেছেন। নতুন মুশফিক দৃঢ়চেতা । সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধায় দোলেন না । যা বলেন সরাসরি বলেন, নিজের অবস্থান থেকে একচুল নড়েন না। গত বুধবার নতুন মুশফিককে অবাক চোখে দেখল বাংলাদেশের ক্রিকেট। আগেও বলেছেন, নিরাপত্তার ঝুঁকি নিয়ে পাকিস্তান সফরে যাবেন না। ক্রিকেট বোর্ড চূড়ান্ত মত জানতে চাইলে বলে দিলেন, পাকিস্তানে যাবেন না। ‍দুটি টেস্ট খেলতে বাংলাদেশ দলের পাকিস্তানে যাওয়ার কথা এই জানুয়ারিতেই। ক্রিকেট বোর্ড আগেই খেলোয়াড়দের বলে দিয়েছে, এই সফরের ব্যাপারে খেলোয়াড়েরা স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। মন চাইলে কেউ যেতে পারেন, নাও যেতে পারেন। কারো ওপর জোর করা হবে না। কিন্তু বোর্ডের ‘হট সিটে’ বসে সব খেলোয়াড়ের পক্ষে স্বাধীনভাবে মত দেওয়া সম্ভব হয় না। মুশফিক স্বাধীন মত দিলেন।

বুধবার বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে পাকিস্তান সফর নিয়ে যা বলেছেন, তাতে ইঙ্গিত পরিষ্কার, বিসিবি আগের অনড় অবস্থানে নেই। আগে যেখানে স্পষ্ট বলা হচ্ছিল বাংলাদেশ পাকিস্তানে গিয়ে শুধু তিনটি টে-টোয়েন্টি ম্যাচ খেলে আসবে, দুটি টেস্ট খেলার কথা ভাববে পরে। কিন্তু প্রথম থেকেই এটি মানতে না চাওয়া পিসিবি আবারও মনস্তাত্ত্বিক চাপ প্রয়োগ করে দিয়েছে নতুন প্রস্তাব- টি-টোয়েন্টি সিরিজ বাদ দিয়ে খেলতে হবে দুটি টেস্ট। এই দুই টেস্টের গুরুত্ব বোঝাতে বারবার তারা টেনে আনছে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ প্রসঙ্গ । যদিও গত নভেম্বরে নয় দলের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ মাঠে নামিয়ে আইসিসি এমনটা বলেনি, কোনও দল না খেললে তাদের গর্দান যাবে। তবু পিসিবির কূটকৌশল বিসিবির মনোবলকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দিচ্ছে । কোচিং স্টাফের প্রায় পুরোটাই পাকিস্তানে যেতে গররাজি, অনেক ক্রিকেটারের মনে দ্বিধা। তবু বিসিবি পাকিস্তানের মাঠে টেস্ট খেলার ব্যাপারে ভাবছে এবং ভাবছে।

এখানেই ব্যতিক্রম মুশফিক। তার মধ্যে কোনও দ্বিধা নেই। পাকিস্তান ভ্রমণ তিনি এখনও অনিরাপদ মনে করেন বলে সরাসরি না করে দিয়েছেন। বেলাশেষে ক্রিকেট তো শুধুই একটা খেলা। ক্রিকেটের চেয়ে জীবন বড়।

বাংলাদেশ পাকিস্তান সফরে যাচ্ছে, টিভি এবং অনলাইনের খবরে এমন ইঙ্গিত পেয়ে গভীররাতে পৃথিবীর অন্য গোলার্ধ থেকে ক্রিকেটামোদী এক বন্ধু চরম উদ্বেগ প্রকাশ করলেন, ‘ বিসিবি তো ক্রিকেটারদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। ক্রিকেট কি এতই গুরুত্বপূর্ণ যে পাকিস্তানের মতো ভয়ংকর নিরাপত্তাহীন এক দেশে খেলতে যেতে হবে?’ বন্ধুর চোখে মুশফিক সত্যিকারের ‘মেরুদণ্ডবিশিষ্ট’ ক্রিকেটার, যিনি পাকিস্তান সফরে যাচ্ছেন না।

এই সফর নিয়ে গত দেড়মাস ধরে চলছে সোপ অপেরা। পাকিস্তান চাপ দেয় তো বিসিবি প্রকাশ করে ফেলে নিজেদের দোদুল্যমান চরিত্র। পিসিবির প্রধান নির্বাহী হুমকি দেন বিসিবিকে । পিসিবি প্রধান চোখ রাঙিয়ে বলেন, বাংলাদেশ না এলে আইসিসিকে ব্যবস্থা নিতে বলবেন । পাকিস্তানের কোচ ও অধিনায়ক বাংলাদেশকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেন, তীর্যক কথার হুল ফোটান । দেশটির সাবেক খেলোয়াড়দের কেউ কেউ বাংলাদেশের অনীহার পেছনে খুঁজে পান ভারতের ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব।

বিসিবির ঘনিষ্ঠ সূত্রমতে পাকিস্তানে নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে এসে নিরাপত্তা দল বলেছে, সেখানে এখন সুইজারল্যান্ডের মতো শান্তি বিরাজমান। আশ্চর্য পর্যবেক্ষণ! যে দেশের মানুষ নিজেরাই নিজেদের নিরাপদ ভাবে না, সেই দেশ কিনা সুইজারল্যান্ডের মতো নিরাপদ!

নিজেদের এই পর্যবেক্ষণ দ্বিধার জন্ম দেয়। আবার বিসিবির পূর্ববর্তী এক সভাপতি আইসিসির প্রেসিডেন্ট হতে গিয়ে পাকিস্তানে ক্রিকেট দলের সফরের প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে পিসিবির সেই যে অনুগ্রহভাজন হয়েছিলেন, সেটির জেরও টানতে হচ্ছে। তবে বাংলাদেশকে প্রকৃতপক্ষে ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থায় ফেলেছে শ্রীলঙ্কা। যে শ্রীলঙ্কা দলের ওপর ২০০৯ সালে জঙ্গি হামলার কারণে ১০ বছর টেস্ট থেকে নিজভূমেই নির্বাসিত ছিল পাকিস্তান, সেই তারাই পাকিস্তানে সেটা ফিরিয়ে এনেছে। গত ডিসেম্বরে পাকিস্তানে দুটি টেস্ট খেলে আসা শ্রীলঙ্কার প্রত্যয়ন পেয়েই পিসিবি উচ্চকণ্ঠ। চিৎকার করে বলতে পারছে পাকিস্তান নিজেদের ঘরের মাঠের টেস্ট ম্যাচ কোনও নিরপেক্ষ ভেন্যুতে আর খেলবে না। সুতরাং বাংলাদেশকে অবশ্যই যেতে হবে পাকিস্তানে। পাকিস্তান ক্রিকেটের জন্য এখন এমনই এক নিরাপদ দেশ, ভারতও যা নয়।

কিন্তু শ্রীলঙ্কার কাছে পাকিস্তান যেমন নিরাপদ , বাংলাদেশের কাছে তা না হওয়ার আশঙ্কাই বেশি। এখানে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতি একটি বিষয় । শ্রীলঙ্কা পাকিস্তানের পরম মিত্র, কিন্তু বাংলাদেশের জন্মবৃত্তান্তই পাকিস্তানের সঙ্গে তার সম্পর্ককে কখনও উষ্ণতায় নিতে দেয় না । পাকিস্তান হয়তো বলবে, বলছেও, বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৭ যুবদল এবং নারী দল এখানে খেলে গেছে, কই নিরাপত্তা নিয়ে কোনও প্রশ্ন তো ওঠেনি। তাহলে পুরুষ দলের আসতে আপত্তি কেন? হ্যাঁ, যুবদল ও নারী দলও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে খেলে এসেছে। তবে তারা খেলেছে গ্যারিসনের মধ্যে, খুবই নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। ‍মুমিনুলের দলের সঙ্গে যার তুলনা চলে না।

পিসিবি বলছে, পাকিস্তান যদি এতই অনিরাপদ তাহলে বাংলাদেশের ২৩ জন ক্রিকেটার কেন পাকিস্তানে অনুষ্ঠেয় পাকিস্তান সুপার লিগে (পিএসএল) নাম নিবন্ধন করলেন। এর উত্তর, প্রথমত তারা যখন নাম পাঠিয়েছেন, এটা ঠিক হয়নি যে পুরো পিএসএল এবার পাকিস্তানের মাটিতেই হবে। দ্বিতীয়ত, নাম চাওয়া হয়েছে বলেই আগ্রহীরা নাম লিখিয়েছেন। এমন তো নয় যে বিসিবির অনাপত্তিপত্র পাওয়ার পর তারা এ কাজ করেছেন! আর বাংলাদেশের কোনও ক্রিকেটারই পিএসএলে নির্বাচিত হননি।

বাংলাদেশ কখনও বলেনি পাকিস্তানের সঙ্গে ক্রিকেট খেলবে না। পাকিস্তানের মতো শক্তিশালী দলের সঙ্গে নিয়মিত ক্রিকেট খেললে বাংলাদেশেরই লাভ। আপত্তি শুধু পাকিস্তানে গিয়ে খেলতে। কারণ ক্রিকেটাররা মনে করেন পাকিস্তানে এখনও নিরাপত্তা ঝুঁকি আছে । বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রতিটি অংশীজনের ধারণা, এখনও সেখানে নির্বিঘ্নে খোলামনে খেলার পরিবেশ ফিরে আসেনি। পাকিস্তানের কাঁধ থেকে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের ভূত এখনও নামেনি। পাকিস্তান বাংলাদেশের সঙ্গে খেলুক না নিরপেক্ষ কোনও ভেন্যুতে। যেমন এর আগে খেলেছে শ্রীলঙ্কার সঙ্গে, এখনও খেলছে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে। পাকিস্তানে গিয়ে অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড বা নিউজিল্যান্ড খেলে আসুক একবার, তাদের দেখানো পথে বাংলাদেশ একবার নয়, বারবার গিয়ে খেলবে।

পাকিস্তানে নিরাপত্তা নিয়ে এই যে সংশয়ের বাতাবরণ, সেটি বাংলাদেশ সৃষ্টি করেনি। পাকিস্তান নিজেই তা করেছে। ভেবে দেখুন ২০০৯, ৩ মার্চের সেই কালো সকালটির কথা। লাহোর টেস্টের তৃতীয় দিনের খেলার জন্য শ্রীলঙ্কা দল রওনা হলো গাদ্দাফি স্টেডিয়ামের দিকে, লিবার্টি স্কয়্যার থেকে জঙ্গিরা হামলা চালালো রকেট, গ্রেনেড আর একে-৪৭ রাইফেল নিয়ে। একটি বৈদ্যুতিক খাম্বায় প্রতিহত হলো রকেট, ছোড়া গ্রেনেড বাসের নিচে পড়ে অবিস্ফোরিত থেকে গেল। তারপর একে-৪৭ রাইফেল থেকে বৃষ্টির মতো গুলিবর্ষণ। ছয়জন নিরাপত্তারক্ষী আর দুজন বেসামরিক ব্যক্তির জীবনের বিনিময়ে সেদিন সৃষ্টিকর্তা ছাড়া আর কে বাঁচিয়েছে শ্রীলঙ্কান ক্রিকেটারদের? সেই হামলার সামান্য ‘স্মৃতিচিহ্ন’ এখনও কিন্তু বয়ে বেড়ান থিলান সামারাবীরা, থারাঙ্গা পারানাভিতানা এবং অজন্তা মেন্ডিস।

শ্রীলঙ্কান টিম বাসের পেছনেই থাকা ম্যাচ অফিসিয়ালদের গাড়িতে গুলি-বৃষ্টি ছিল আরও প্রবল । রিজার্ভ আম্পায়ার আহসান রাজার‍ বুকের রক্তস্রোত সেদিন বলেছিল পাকিস্তান নামের দেশটি কী ভয়ংকর জঙ্গিবাদের চারণভূমি।

ম্যাচ রেফারি ক্রিস ব্রড পাকিস্তানের নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমালোচনা করেছিলেন। তার সঙ্গে সুর মিলিয়েছিলেন আম্পায়ার সাইমন টফেল এবং স্টিভ ডেভিস। জাভেদ মিয়াঁদাদসহ সাবেক পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের উল্টো সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন তারা। পিসিবি তো ক্রিস ব্রডের বিরুদ্ধে অভিযোগই করেছিল আইসিসির কাছে। কিন্তু যেটি তারা করতে পারেনি সেটি হলো সন্ত্রাসবাদ নির্মূল। তাই আজও পাকিস্তান সফরকে ঝুঁকিপূর্ণ মনে করেন বাকি পৃথিবীর ক্রিকেটাররা। মুমিনুলদের দিকে আততায়ীর রাইফেল যে তাক করা নেই, সেই গ্যারান্টি পিসিবি দিতে পারে না। সে যতই তারা বাগাড়ম্বর করুক কিংবা আশ্রয় নিক কূটকৌশলের।

এ অবস্থায় পাকিস্তান সফর নিয়ে বিসিবির সিদ্ধান্ত নেওয়াটা ছিল খুব সহজ। এটা বলে চুপচাপ অনড় বসে থাকলেই হতো যে আমরা তোমাদের সঙ্গে খেলার বিরুদ্ধে কখনও নই, শুধু অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডের মতো আমাদের সঙ্গেও খেলো নিরপেক্ষ ভেন্যুতে ।

কিন্তু বিসিবি নিজেদের দ্বিধাজড়িত অবস্থানই অবিরাম তুলে ধরছে পিসিবির কাছে। আর এখানেই দ্বিধাহীন মুশফিক পাকিস্তান সফরকে সরাসরি না বলে ঢাক-ঢাক গুড়-গুড় করতে থাকা বিসিবিকে দিয়েছেন এক প্রবল বার্তা।

লেখক: স্পোর্টস এডিটর, বাংলা ট্রিবিউন

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ