ভোট বোঝো, উৎসব বোঝো না?

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৮:৪১, জানুয়ারি ১৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪২, জানুয়ারি ১৬, ২০২০

শান্তনু চৌধুরীসরস্বতী পূজার দিন (৩০ জানুয়ারি) ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠানের তারিখ নির্ধারণ করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। স্বরস্বতী পূজার দিনে এই নির্বাচন হলেও ‘পবিত্র’ ভোটগ্রহণ বেশ উৎসবের সঙ্গেই হবে বলে দাবি করেছেন ইসি সচিব। অবশ্য কেমন উৎসব হয়, গেলো কয়েকবছরে বিভিন্ন ভোটের সময় সবাই দেখেছেন। ভোট দিতে যাওয়ার মতো আগ্রহ এখন আর মানুষের নেই বললেই চলে। অনেকে হয়তো ঠিক কোথাকার ভোটার সেটাই ভুলে গেছেন। কাজেই ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো’ সেই সুন্দর স্লোগানটাও এখন মানুষ ভুলতে বসেছে।
প্রথমে সবাই ভেবেছিল হয়তো অসাবধানতাবশত ৩০ জানুয়ারি সরস্বতী পূজার দিন ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। পরে সেটি ঠিক করে দেওয়া হবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন যেভাবে অনড় অবস্থান প্রকাশ করেছে, তা বোঝা গেলো ‘ভদ্রলোকের এককথা’। তাতে এটা বুঝতে হবে একটি সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে অপমানিত করতেই ভোটের এই দিনটি বেছে নেওয়া হয়েছে। নইলে ক্যালেন্ডারে আরও দিন ছিল। আদালতও সেই প্রশ্ন তুলেছেন তার পর্যবেক্ষণে। কেন পঞ্জিকা দেখে ভোটের তারিখ ঠিক করা হলো না। অবশ্য পরে আদালতই আদেশ দিয়েছেন ৩০ তারিখেই ভোট হবে। এই প্রসঙ্গে ‘হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ’-এর নেতা, আইনজীবী রানা দাশগুপ্ত বলেছেন, ‘রিটের শুনানিতে হাইকোর্ট তিথির প্রসঙ্গ তুলেছেন। আগামী ৩০ জানুয়ারি তিথিলগ্ন, এ লগ্নতে পূজার সময় আমরা সরস্বতী পূজা করে থাকি। আগামী ৩০ জানুয়ারি পূজার যে লগ্ন রয়েছে, সেদিন সূর্যোদয়ের পর থেকে ৯টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত সরস্বতী পূজার দিন। আমরা এটি বারবার উপস্থাপন করেছি। কিন্তু দুঃখজনকভাবে হলেও সত্য, হাইকোর্ট আগামী ২৯ জানুয়ারি কোন কারণে ছুটি দেওয়া হলো এবং কোন কারণে ১ ফেব্রুয়ারি স্কুল-কলেজগুলোতে পরীক্ষা হচ্ছে, এ বিষয়টিকে নিয়ে আমাদের রিট আবেদন খারিজ করেছেন।’ এরপরই শাহবাগে আন্দোলন হয়েছে রায়ের প্রতিক্রিয়ায়।

প্রশ্ন হচ্ছে, রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ নিজেদের দাবি করে ধর্মনিরপেক্ষ দল হিসেবে। অথচ তারাই এমন সব বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে যেটি অন্য ধর্মের মানুষকে হেয় করে, অপমানিত করে, ক্ষুব্ধ করে। একইসঙ্গে তাদের সাংবিধানিক অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে। এই সিদ্ধান্তটি যদি বিএনপি আমলে কোনও নির্বাচন কমিশন নিতো, তাহলে দেখা যেতো বিশাল আন্দোলন হচ্ছে, পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হচ্ছে। কিন্তু এই সরকার বুঝে গেছে কোনও কিছুই তোয়াক্কা না করলেই চলে। এই যে জনগণ কিছুটা কথা বলতে পারছে সেটাই তো বেশি। এতে সাধারণ মানুষের ভাবনা নেই বললেই চলে। শুনতে একটু খারাপ লাগলেও বলা যায়, অন্য কোনও ধর্মের উৎসবের দিন যদি ভোট দেওয়া হতো, তাতে কি কেউ মেনে নিতো? বিশেষ করে যাদের আমরা এদেশে সংখ্যাগুরু ভাবি!

সবচেয়ে হাস্যকর লেগেছে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব মো. আলমগীরের বক্তব্য। তিনি বলেছেন, ‘নির্বাচন ও পূজা পবিত্র কাজ। সুতরাং কোনও সমস্যা হবে না। পূজার জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়েই নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হবে। নির্বাচন মানেই এমন নয় যে মারামারি হবে, তাই পূজা করা যাবে না।’

বোঝাই যাচ্ছে, বর্তমান সময়ের নির্বাচন সম্পর্কে তার ধারণা থাকলেও পূজা বা উৎসব বিশেষ করে সরস্বতী পূজা সম্পর্কে তার কোনও ধারণাই নেই। এখন যেকোনও উৎসব যারা সত্যিকারভাবে অসাম্প্রদায়িক (যদিও সাম্প্রদায়িকতা বাড়ছে, আপনার আশেপাশেই মুখোশ পরে আছে সাম্প্রদায়িক মানুষ) তারা ধর্মীয় যেকোনও আয়োজনকে নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সেটি ছড়িয়ে পড়েছে সবার মাঝে। বিশেষ করে সরস্বতী পূজা তো আরও সর্বজনীন। কারণ সেই ছেলেবেলা থেকে দেখে এসেছি এবং এখনও স্কুল-কলেজে সব ধর্মের শিক্ষার্থীরা পুজোর উৎসবে শামিল হয়। আর যেহেতু পূজার সময়টাতে পুরো বিদ্যালয় প্রাঙ্গণকে উৎসবের আমেজে সাজানো হয়, সেখানে অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে ভোটের উৎসব কি একসঙ্গে চলতে পারে? কারণ লাইন ধরে ভোট দিতে যাওয়া যায়, নীরবে পূজা হয় না। তাছাড়া ইসি সচিবের কথামতো একপাশে ভোট, একপাশে পূজা, সেটা অন্তত আমাদের দেশে সম্ভব নয়। কারণ সরস্বতী পূজা বিষয়টা কিন্তু এমন নয় যে, পূজারি এসে পূজা করে গেলেন আর কাজ শেষ। বরং এটি একটি দিনব্যাপী চলমান উৎসব। এছাড়া পূজার কয়েকদিন আগে থেকেই চলে সাজসজ্জা। আবার ভোটের সরঞ্জাম আনা নেওয়ার কাজও চলে আগে থেকেই। তবে, দুষ্টু লোকেরা যে বলে থাকে, ‘রাতে ভোট নেওয়া’ সেটি হলে অন্য কথা!

প্রকৃতপক্ষে যে দেশে রাষ্ট্রযন্ত্র নাগরিকের অধিকার সংরক্ষণ করতে পারে না, সেদেশে অন্তরাত্মার কান্না ছাড়া একজন সাধারণ নাগরিক আর কীইবা করতে পারে। এই যে সুন্দর একটি পরিবেশ নষ্ট হতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশনের ভুল বা ইচ্ছাকৃত সিদ্ধান্তের কারণে। এর জন্য কোনও জবাবদিহিতা আছে? সম্ভবত নেই। জবাবদিহিতা শুধু সাধারণ মানুষের। পান থেকে চুন খসলেই আইনের নানা ধারা-উপধারা টেনে এনে তাকে জেলে পুরে রাখো। তাই ওয়াজ মাহফিলে প্রতিদিন সাম্প্রদায়িকতা ছড়ালেও কারও অপরাধ হয় না। আর একজন বাউলের গানেই ক্ষুব্ধ হয়ে নেমে আসে আইনের খড়্গ। একটা সময় রাষ্ট্রের নানা সংকট মুহূর্তে নানা বিষয়ে বুদ্ধিজীবীরা, জ্ঞানী-গুণীরা কথা বলতেন, এখন তারাও চুপ। হয় তাদের বুদ্ধিবিনাশ হয়েছে অথবা কোনও সংকটকে সংকট মনে না করে রাষ্ট্রবন্দনায় মেতেছেন। অথচ আমাদের কোনও কোনও ক্ষেত্রে অনুভূতি অনেক প্রবল। যা অন্যের সর্বনাশও ডেকে আনে। একটি রাষ্ট্র থেকে যখন ধীরে ধীরে উৎসব আনন্দ হারিয়ে যেতে থাকে, তখন সেখানে অপরাধ জেঁকে বসে। অপরাধী হয়ে ওঠার উপাদান তৈরি হয়। এখন রাষ্ট্র কী চায়, সেটা তাকেই ঠিক করতে হবে!

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X