সামাজিকমাধ্যম এবং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংকট

Send
মো. সামসুল ইসলাম
প্রকাশিত : ১৬:৩৬, জানুয়ারি ১৭, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৮, জানুয়ারি ১৭, ২০২০

মো. সামসুল ইসলামযুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক ইরানি জেনারেল কাশেম সোলাইমানির হত্যা ও এর প্রতিশোধ নিতে ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের মিসাইল হামলার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্বব্যাপী নেটিজেনরা সামাজিকমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনায় লিপ্ত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে আমাদের দেশ অবধি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই সাম্প্রতিক সংকট ঘিরে সামজিকমাধ্যমে ভুয়া বা ফেক নিউজ, ছবি, বিশ্লেষণ ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়েছে, যা একদিকে যেমন হাস্যকর এবং আকর্ষণীয়, অপরদিকে আতংকজনকও বটে! আবার উত্তেজনা প্রশমনে বা সংকট নিরসনে সামাজিকমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে।
ইউএসএ টুডে জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে তরুণরা বিশেষত সামাজিকমাধ্যম টিকটক ও টুইটার ব্যবহার করে হ্যাশট্যাগ #WWWIII এর মাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও ভুয়া তথ্য শেয়ার করা শুরু করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সেদেশে বাধ্যতামূলক সেনাবাহিনীতে যোগদান সম্পর্কিত আইনটি (মিলিটারি ড্রাফট নামে পরিচিত) আবার চালু হতে যাচ্ছে বা হয়েছে এই ভয়াবহ গুজব। এমনিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১৮ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত সব পুরুষ নাগরিকের সিলেক্টিভ সার্ভিস সিস্টেমে নাম রেজিস্ট্রার বাধ্যতামূলক। জাতীয় কোনও জরুরি অবস্থার কথা বিবেচনায় রেখে এটি করা হয়েছে। পূর্বের ন্যায় সেনাবাহিনীতে যোগদানের ক্ষেত্রে এখন বাধ্যবাধকতা না থাকলেও কংগ্রেস ইচ্ছা করলে যে কোনও সময়ে এই ড্রাফট পুনরায় চালু করতে পারে। এজন্যই নাম রেজিস্ট্রার করে রাখা হয়।

মজার ব্যাপার হলো জেনারেল সোলাইমানি হত্যাকাণ্ডের পর আমেরিকার তরুণদের মধ্যে এই আইন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়িয়ে পড়ে। এই আইনে কী থাকবে বা থাকবে না, সেটা নিয়ে বিভিন্ন ধরনের ভুয়া তথ্য সামাজিকমাধ্যমে চালাচালি হতে থাকে। পুরুষদের নেওয়া হলেও সমকামীরা বাদ পড়বেন এরকম গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। সবাই এই বিষয়ে বিস্তারিত জানতে যুক্তরাষ্ট্রের সিলেক্টিভ সার্ভিস সিস্টেমের ওয়েবসাইটে এমনভাবে হুমড়ি খেয়ে পড়ে যে একপর্যায়ে এই সংস্থার ওয়েবসাইট ক্র্যাশ করে। তাদের টুইট করে জানাতে হয় এরকম ড্রাফট চালু করতে গেলে কংগ্রেস ও প্রেসিডেন্টের অনুমোদন দরকার। এখনও এরকম কিছু হয়নি!

গত ৮ জানুয়ারি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এক টুইটের জবাবে একজন টুইটার ব্যবহারকারী আইন আল-আসাদ বিমানঘাঁটি আক্রমণের এক ভুয়া ছবি পোস্ট করে, যা ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। পরে জানা গেলো ছবিটি মূলত ছিল গত নভেম্বরে ইসরায়েল বর্ডার সংলগ্ন গাজা ভূখণ্ডের একটি ঘটনার ছবি।   

আবার ইরানের ফার্স নিউজ এজেন্সি ইরাকে মিসাইল হামলার ক্ষেত্রে তাদের একটি পুরনো ছবি ব্যবহার করে। মিসাইলটি ঠিকই ইরান থেকেই ছোড়া হয়েছিল তবে তা এবারের ইরাকে হামলার ক্ষেত্রে নয়। সেটি ছিল ২০১৭ সালে ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে ইরান থেকে সিরিয়ায় নিক্ষেপ করা মিসাইলের ছবি। 

এই সংকটে শুধু সাধারণ জনগণ যে ভুয়া ছবি ছড়িয়েছে ব্যাপারটি তা নয়। ইরান মিসাইল হামলা শুরুর আগেই যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভের সদস্য রিপাবলিকান পার্টির পল গসার টুইটারে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ওবামা ও ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির হাসিমুখে করমর্দনের ছবি শেয়ার করে হইচই ফেলে দেন। তার টুইটের শিরোনামও ছিল বেশ আক্রমণাত্মক ‘The world is a better place without these guys in power’। 

প্রচুর লাইক পড়লেও পরে জানা গেলো এটি আসলে একটি ভুয়া ছবি,বিকৃত করা হয়েছে। আসল ছবিটি হচ্ছে ২০১১ সালের প্রেসিডেন্ট ওবামা ও তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের করমর্দনের ছবি। এক্ষেত্রে মনমোহন সিংয়ের জায়গায় হাসান রুহানির ছবি বসিয়ে দিয়ে একইসঙ্গে জনগণকে বিভ্রান্ত ও ওবামার ইরান নীতির বিরোধিতার চেষ্টা করা হয়েছে।  

সবাই এটা বলতে পারেন যে যখন মূলধারার গণমাধ্যমই ভীতি বা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে তখন সামাজিকমাধ্যমকে কতটুকু দোষারোপ করা যায়। গালফ নিউজের একটি প্রতিবেদনে দেখলাম, বিরক্তি প্রকাশ করা হয়েছে কীভাবে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো তাদের দেশের নাগরিকদের দুবাই ছাড়তে প্ররোচিত করছে। পত্রিকাটি কয়েকটি ব্রিটিশ পত্রিকার হেডলাইন ছেপেছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে—“Brits warned ‘leave Dubai and surrounding areas immediately’ amid WW3 tensions”। যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমেও ইরানের মিসাইল আক্রমণে ৩০ জন আমেরিকানের মৃত্যুর খবর প্রকাশিত হয়। আবার দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ শুরু না হতেই খ্যাতনামা অনেক পত্রিকাই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়ে দিয়েছে। বিশিষ্ট গণমাধ্যম পেশাজীবীরাই যখন এরকম লিখেছেন, তখন সাধারণ জনগণ আর কী জানবে বা লিখবে!

তবে সোশ্যাল মিডিয়া অনেক বিভ্রান্তি ছড়ালেও ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনা প্রশমনে এর ইতিবাচক ভূমিকাও দেখছেন অনেকে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি কোনও যোগাযোগ নেই। তাদের দেশে পারস্পরিক দূতাবাসও নেই। তবে উত্তেজনা প্রশমনে ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জভেদ জারিফ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের টুইটের গুরুত্বের কথা অনস্বীকার্য। অনেকে এটাকে ‘টুইটার ডিপ্লোম্যাসি’ বলছেন। 

ইরাকে মিসাইল আক্রমণের পর জাভেদ জাফরির টুইটের প্রথম কয়েকটি শব্দ ছিল এরকম—‘Iran took & concluded proportionate measures in self-defense…’। এখানেই পরিষ্কার ইঙ্গিত ছিল—ইরান আর উত্তেজনা বাড়াতে আগ্রহী নয়। এর পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টুইট, যা শুরু হয়েছিল, ‘All is well’ এই কয়েক শব্দ দিয়ে, যা মোটামুটি ইতিবাচকই ছিল। এই দুই টুইট এ অঞ্চলে আপাতত যুদ্ধের সম্ভাবনা কমিয়ে দেয়। 

বিশেষজ্ঞরা তাই এক্ষেত্রে সামাজিকমাধ্যম টুইটারকে অনেকাংশে কৃতিত্ব দিতে চান। তারা বলছেন কোনও কূটনীতিবিদ বা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই টুইটার এখানে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনগণের মধ্যে পাবলিক হটলাইন হিসেবে কাজ করেছে।   

সামাজিকমাধ্যমের বিভিন্ন বক্তব্য বিশ্লেষণ করলে জেনারেল সোলাইমানির মৃত্যু ও ইরানি মিসাইল আক্রমণের ব্যাপারে এমনকি আরব দেশগুলোতেও মতের বিভক্তি দেখা যায়। আমাদের দেশেও ফেসবুকে বা ইউটিউবে জেনারেল সোলাইমানির হত্যার ব্যাপারে বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা দেখেছি। অনেকেই এই হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করেছেন, আবার শিয়া-সুন্নির বিভক্তি দিয়েও এই ঘটনাকে কেউ কেউ দেখার চেষ্টা করেছেন। 

যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফরেন পলিসি ম্যাগাজিনের গত ৯ জানুয়ারির সংখ্যায় পশ্চিমা গণমাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে কভারেজের জটিলতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ইরাক, সিরিয়া বা লেবাননে জেনারেল সোলাইমানির বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সেখানকার স্থানীয় নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া পশ্চিমা গণমাধ্যমে ঠিক প্রতিফলিত হয় না বলে সেই নিবন্ধে দাবি করা হয়েছে। সে অঞ্চলের বিরোধকে শুধু শিয়া-সুন্নি বিরোধ দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায় না, যেমন বিতর্ক হচ্ছে সুন্নি হত্যাকাণ্ডে সোলাইমানির ভূমিকা নিয়ে। সিরিয়ার বাশার আল আসাদের সরকারের অনেকেই সুন্নি এবং তারা সোলাইমানির সাহায্য নিয়েছেন। আবার ইরাক বা ইরানের অনেক প্রতিবাদী কণ্ঠই শিয়া যারা সোলাইমানির টার্গেট হয়েছেন। 

মধ্যপ্রাচ্যের এই অঞ্চলের ক্ষমতা কাঠামো বা গোষ্ঠীগত জটিলতা ইত্যাদি নিয়ে পশ্চিমের খ্যাতনামা মিডিয়াও অবগত নয়। ইরান,যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সংকটে আমরা এটি দেখেছি। যেখানে মূলধারার গণমাধ্যমই এই অঞ্চলের বর্তমান জটিলতা নিয়ে অনবহিত, সেখানে বিভিন্ন দেশে সোশ্যাল মিডিয়ায় বিভিন্ন ভুয়া বা ভুল তথ্য আদানপ্রদান হবে এটাই বোধহয় স্বাভাবিক।

লেখক: কলামিস্ট

[email protected]       

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ