বিজেপির বাংলাদেশবিরোধী রাজনীতি

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৫:৫৬, জানুয়ারি ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৫৭, জানুয়ারি ২১, ২০২০

আনিস আলমগীরপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরের সময় গালফ নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন নিয়ে ভারতের উদ্দেশ্য কী, তা বুঝতে পারছি না। কেন ভারত সরকার এটা করলো, এটার প্রয়োজন ছিল না।’ ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে আমাদের প্রধানমন্ত্রী এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে পারেন না। তা কূটনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত হয়ে যায়।
ভারতের লোকসভায় পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন গত ১০ জানুয়ারি ২০২০ থেকে কার্যকর হয়েছে। এই আইন সম্পর্কে জাপানের মিডিয়া ‘নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ’ মন্তব্য করেছে এটি আরেক রোহিঙ্গা সংকট। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বহুদিন পর এই নিয়ে মুখ খুলেছেন। তবে এটা যে শেষপর্যন্ত মারাত্মকভাবে বাংলাদেশকে আঘাত করবে, তার ইঙ্গিত জাপানি মিডিয়া দিয়েছে।
বহুদিন বাংলাদেশে ভারত বিরোধিতার রাজনীতি হতো। অনেকে মনে করতেন এর কোনও বাস্তব ভিত্তি না থাকলেও ভোটের বাক্সে একটা প্রভাব পড়তো। কারণ ভারত বিরোধিতার নামে সূক্ষ্মভাবে হিন্দু বিদ্বেষকে উসকে দিয়ে মুসলমান ভোট পকেটে নেওয়াই ছিল প্রধান লক্ষ্য। তবে গত এক দশক ধরে সেটা আর দেখা যাচ্ছে না। বলা যায় ভারত বিরোধিতার অস্ত্র ভোঁতা হয়ে গেছে এখানে। বরং সুধীজনরা বলছেন গতক’বছর ধরে বাংলদেশের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ভারতপ্রীতির প্রতিযোগিতা চলছে। ক্ষমতায় এলে কোন দল ভারতকে কতটা সহযোগিতা করবে, সেই প্রতিযোগিতা তীব্র এখানে। নির্বাচনের আগে সেই রকম বার্তা নিয়ে নেতারা দিল্লি যান।

অন্যদিকে উল্টো ঘটনা ঘটছে ভারতে। ক্ষমতা থেকে কংগ্রেস চলে যাওয়ার পর বিজেপি সরকার রাষ্ট্রীয়ভাবে তার বাংলাদেশ নীতির ধারাবাহিকতায় কোনও পরিবর্তন না আনলেও মাঠে বাংলাদেশবিরোধী বক্তৃতা দিয়ে মুসলিমবিদ্বেষী হিন্দুত্ববাদীদের ভোট টানতে চাইছেন বিজেপি নেতারা। বিশেষ করে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোতে বিজেপির এই নীতি স্পষ্ট এবং ক্ষেত্র বিশেষ কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এখানে পাকিস্তান বিরোধিতার কার্ড খেললে হিন্দুত্ববাদীরা সম্ভবত প্রক্সিমিটি বা নৈকট্য পান না, তাই পার্শ্ববর্তী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশকে টার্গেট করার নীতি নিয়েছে বিজেপি। এই উসকানিতে শরিক হয়েছেন স্বয়ং বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ।

ভারতের তিনটি রাজ্যে মুসলিম জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় রয়েছে। পশ্চিমবাংলা, উত্তর প্রদেশ এবং বিহারে রাজ্য সরকার গঠনে মুসলিমদের ভোটের ভূমিকা রয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনে বিজেপি যাতে রাজ্য সরকার গঠন করতে পারে, তাই আপাতত পশ্চিমবাংলার ৩০ শতাংশ মুসলমান জনগোষ্ঠীকে বিধ্বস্ত করে দিতে হবে—মনে হচ্ছে বিজেপি এই পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। পশ্চিমবাংলায় প্রায় আড়াই কোটি মুসলমানের বাস, যেখানে হিন্দু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি। সেই প্রয়োজনে অমিত শাহ এখন বাংলা শেখার চর্চাও করছেন।

পশ্চিমবাংলা এতো প্রয়োজন হলো কেন বিজেপির? কারণ বাংলাদেশকে বিজেপির নেতারা মনেপ্রাণে মেনে নেননি। ভারতের পাশে তারা বাংলাদেশকে আরেকটি পাকিস্তান মনে করেন, কারণ ধর্মের বাইরে এরা কোনও কিছু বিবেচনা করার ক্ষমতা রাখেন না। বাংলাদেশকে বিপন্ন এবং পদে পদে বিপর্যস্ত করতে হলে পশ্চিমবাংলায় তাদের নিজস্ব সরকার দরকার।

পশ্চিমবাংলা বিজেপির সভাপতি দিলীপ ঘোষ বলেছেন, রাজ্যটিতে ‘অবৈধভাবে’ বাস করা এক কোটি বাংলাদেশি মুসলিমকে ফেরত পাঠানো হবে। ১৯ জানুয়ারি চব্বিশ পরগনার এক সমাবেশে দেওয়া ভাষণে তিনি একথা বলেছেন। ভাষণে দিলীপ ঘোষ বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনের (সিএএ) প্রতিবাদকারীদের বাঙালিবিরোধী ও ভারতের ধারণার বিরোধী বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী এক কোটি অবৈধ মুসলিম সরকারের দুই রুপির ভর্তুকির চাল খেয়ে বেঁচে আছে। আমরা তাদের ফেরত পাঠাবো।

লক্ষ করুন, দিলীপ ঘোষ পশ্চিমবাংলার আড়াই কোটি মুসলমানের ১ কোটিকে বাংলাদেশি বানিয়ে ফেরত পাঠানোর খায়েশ প্রকাশ করছেন। কারণ দিলীপ ভালো করে বুঝেছেন মুসলমান ভোট বিজেপি পাবে না। তিনি আরও ভালো করে জানেন, পশ্চিম বাংলায় কোনও বাংলাদেশি ‍মুসলমান নেই, থাকলে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে যাওয়া হিন্দুরা রয়েছে।

ভারতে এখন মুসলমানদের প্রতি রাষ্ট্রীয় ঘৃণা চরমে। উত্তর প্রদেশের রাজ্য সরকার বিজেপির। চূড়ান্ত সাম্প্রদায়িক যোগী আদিত্যনাথ এখন উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল এবং নাগরিকপঞ্জির বিরুদ্ধে যখন দিল্লির জামিয়া মিলিয়া এবং আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রামে মাঠে নেমেছিল, তখন রাজ্য সরকার অত্যাচারের এমন স্টিমরোলার চালিয়েছেন যে বহু ছাত্র শারীরিকভাবে পঙ্গু হয়ে গেছে। এই আন্দোলনে এ পর্যন্ত সারাদেশে ২৭ ব্যক্তি মারা গেছে, যার সিংহভাগই মুসলমান।

ভারতের প্রখ্যাত আইএএস অফিসার, মানবাধিকার সংগঠক, লেখক এবং খ্যাতনামা অধ্যাপক হর্ষ মান্দার তার এক লেখায় লিখেছেন, ‘উত্তর প্রদেশ এমন এক চরম যন্ত্রণাদায়ক অভিজ্ঞতা অর্জন করছে, যা মানবতাবিরোধী দণ্ডনীয় অপরাধের সমতুল্য। এটা বলা অত্যুক্তি হবে না যে মুখ্যমন্ত্রী তারপরও দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। এজন্য তাদের ওপর বেআইনি ও বর্বরোচিত সন্ত্রাসের রাজত্ব চাপিয়ে দিতে পুলিশ বাহিনীকে উসকানি জুগিয়েছেন তিনি।’ হর্ষ মান্দার আরও বলেছেন, উত্তরপ্রদেশে এখন যা হচ্ছে তা ১৯৮৪ সালে ভারতে শিখবিরোধী হত্যা, সহিংস কর্মকাণ্ড থেকে ভয়াবহ।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ কিছু কেন্দ্রীয় নেতা এবং পশ্চিমবাংলার বিজেপির রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষের কথাবার্তায় মনে হয় তারা যেন ২০ কোটি ভারতীয় মুসলমানকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চান। এটা অবশ্য সুখের বিষয় যে, ভারতের প্রধান বিরোধী দলগুলো বিজেপির রাষ্ট্রীয় ঘৃণা থেকে দেশকে বাঁচানোর জন্য খুবই তৎপর হয়েছে। সব জায়গায় ঐক্যবদ্ধভাবে না হলেও তারা এর বিরুদ্ধে প্রায় প্রতিটি রাজ্যে মিছিল-মিটিং করছেন। ভারতের প্রগতিশীল লাখ লাখ মানুষ বিজেপির এমন সাম্প্রদায়িক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তবে আমরা ভয় করি ভারতে মুসলিম নিধনের কারণে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় কিনা।

বাংলাদেশে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক আছে। নানা প্রতিকূলতা আছে সত্য, কিন্তু তারা উল্লেখযোগ্য কোনও অসুবিধার সম্মুখীন হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় ঘৃণার শিকার নয়। আমরা বাংলাদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের অনুরোধ করবো বাংলাদেশ এখন এক ভয়াবহ দুর্যোগের সম্মুখীন। প্রতিনিয়ত ভারতের মোদি সরকার এখানে গোলযোগের উসকানি দিচ্ছে। বাংলাদেশকে ধর্মীয়ভাবে অস্থিতিশীল করে তাদের এনসিএ, সিসিএ বাস্তবায়নের যৌক্তিকতা প্রমাণে অগ্রসর হচ্ছে তারা। তাই এখানে ছুতোনাতা অজুহাত তালাশে ব্যস্ত। আমরা যেন অসাবধানতাবশত এমন কোনও অজুহাত তাদের হাতে তুলে না দেই।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) ভারতের একটি ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী, আধাসামরিক ও বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন। এটি একটি প্রাচীন সংগঠন। তার মুখ্য উদ্দেশ্য হিন্দুত্ববাদের জাগরণ। প্রতিটি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের একটি প্রতিপক্ষ থাকে। আরএসএসের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে প্রতিপক্ষ হচ্ছে মুসলমান। আরএসএস নিজেরা প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি করে না, তবে বকলমে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি করার জন্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বিজেপি গঠন করেছে। রাজনীতিতে আরএসএসের বকলমের সব কাজ বিজেপি-ই করে।

ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওরলাল নেহেরু পরিপূর্ণভাবে একজন ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিবিদ ছিলেন। তারপরে যারা প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন তারা ধর্মানুরাগী হলেও কখনও রাজনীতিতে ধর্মকে টেনে আনেননি। তারা স্থপতিদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভারতকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যের নীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু দীর্ঘদিন কাজ করার পর এখন হিন্দুত্ববাদীরাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায়। সুদীর্ঘ সময়ের ধর্মনিরপেক্ষতা চর্চার ফলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যে সহনশীলতা সৃষ্টি হয়েছে, তাকে তারা ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন করে এখন রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘৃণা ছড়ানোর কাজে উঠেপড়ে লেগেছে। এমনকি শাসনতন্ত্র পর্যন্ত সংশোধন করেছে।

বিজেপি দীর্ঘ ছয় বছর ক্ষমতায়। ভারত দরিদ্র দেশ। বহু প্রতিশ্রুতি দিয়ে নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালের নির্বাচনে জিতেছেন এবং ২০১৯ সালের নির্বাচনেও দ্বিতীয়বার জিতে সরকার গঠন করেছেন। মনে রাখতে হবে ২০০২ সালে নরেন্দ্র মোদি গুজরাট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। তখন তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন অমিত শাহ। ২০১৯ সালের নির্বাচনে নরেন্দ্র মোদি ৩০৩ আসন পেয়ে জিতেছেন। এখনও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছেন অমিত শাহ। সুতরাং গুজরাট রাজ্যে ২০০২ সালে যে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ হয়েছিল, তা এখন ভারতব্যাপী হবে বলে অনেকে আশঙ্কা করছেন। সেই কারণেই তারা নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করছেন এবং নাগরিকপঞ্জির পথে হাঁটছেন।

ভারতের প্রকৃত কোনও সমস্যাই নরেন্দ্র মোদি সমাধান দিতে পারেননি। এমনকি ২০১৪ সালে জাতীয় প্রবৃদ্ধি যেখানে ছিল ৮ শতাংশ, তা এখন নেমে অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বকে মহামন্দা ঘিরে ফেলেছে। সুতরাং এখন ভুয়া সমস্যাগুলোকে বড় করে তুলে ধরা ছাড়া নরেন্দ্র মোদির গদি রক্ষার আর কোনও বিকল্প নেই। মানুষ হত্যায় একবার যদি কোনও সমাজকে লাগিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে সেই সমাজের দুঃস্বপ্নগুলো লোকে আর মনে রাখে না। তাতে নরেন্দ্র মোদির দুই লাভ। প্রতিপক্ষ ঘায়েল হলো আর রাজনৈতিক উত্তেজনাও রইল না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

[email protected]

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ