‘এ টেল অব টু সিটিজ’

Send
রেজা সেলিম
প্রকাশিত : ১৭:৫৩, জানুয়ারি ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২১:১৩, জানুয়ারি ২৮, ২০২০

রেজা সেলিমএকটি শহর যত পুরনো হয় ততই তার মূল্য বাড়তে থাকে—এই আপ্তবাক্য ভুল প্রমাণ করেছে পুরনো ঢাকার মূল্যমান! যেখান থেকে এই শহরের সূত্রপাত, সেখান থেকে উত্তরের দিকে তা বাড়তে বাড়তে বিরাট এক শহর হয়েছে, কিন্তু ফেলে আসা মূল শহর হয়ে গেছে ‘পুরনো’, ‘আবর্জনাময়’, ‘ঘিঞ্জি’ ও ‘সেকেলে’! ঢাকা ভাগ হয়েছে উত্তরে দক্ষিণে, ধনী আর গরিব দেশগুলোর মতো। দক্ষিণ পুরনো আর উত্তর নতুন ঢাকা!
ঢাকা শহর গোড়াপত্তনের চারশ’ বছরে ঢাকাকে কেউ কখনও ‘সেকেলে’ বলেনি। যদিও নতুনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বা দিতে গিয়ে দক্ষিণের ঢাকা হিমশিম খেয়ে উন্নত থাকার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছে, এখন সে হয়েছে ‘ঐতিহ্যের’ ঢাকা, আর উত্তর হয়েছে ‘তিলোত্তমা’ ঢাকা। সেদিন কাগজে দেখলাম উত্তরের মেয়র প্রার্থী বলেছেন—‘ঢাকা হবে সিঙ্গাপুর আর দুবাইয়ের মতো’, আর দক্ষিণের প্রার্থী বলেছেন—ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর পাড় ঘেঁষে ‘ঘোড়ার গাড়ি’ চালানোর ব্যবস্থা করা হবে।

প্রশ্ন হলো ঢাকাকে আমরা কেমন দেখতে চাই, সে মীমাংসা আমাদের মনের মধ্যেই নেই। ১৬১০ সালে বিহারের রাজমহল থেকে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তরের পরেও বেশ কয়েকবার ঢাকার রাজধানী মর্যাদা অপসারণ করার চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু বাংলার ‘রাজরানী’ হিসেবে ঢাকার সম্মান অক্ষুণ্ন থেকেছে বিশেষ করে যখন ১৯০৫ সালে এক কোপে বাংলা দুই ভাগ করে দেওয়া হলো, তখন ঢাকার সম্মান রাখার আন্দোলন ভারতবর্ষের ইতিহাস সৃষ্টির এক অনন্য নজির হিসেবে এখনও গণ্য করা হয়। কিন্তু কালের বিবর্তনে ঢাকা সত্যিই তার মর্যাদা হারিয়েছে হয়তো, এমন বিবেচনা থেকেই এখন একে ‘তিলোত্তমা’ আর ‘দুবাই’-এর মতো গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, ঐতিহাসিক জ্ঞান বিবেচনা আর তখন সম্ভাব্য নগরপিতাদের স্বপ্ন চিন্তায় থাকে না।

দুই ঢাকার মেয়র নির্বাচন সমাগত। উত্তর-দক্ষিণের ঢাকা এক দুঃখজনক বৈষম্যের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ ‘নগরপাল’ নির্বাচিত করতে যাচ্ছে। দুনিয়ার প্রায় সব দেশেই ‘মেয়র’ পদটিকে কোনও মহানগরের (একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমানাভুক্ত) জনগোষ্ঠীর নাগরিক সেবায় নিয়োজিত স্থানীয় পর্যায়ের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত পরিষেবা প্রধানের মর্যাদা দিয়ে থাকে। আমাদের দেশেও সেরকম রীতি চালু রেখে মেয়রকে আইন অধ্যক্ষের (ম্যাজিস্ট্রেসি) ক্ষমতা প্রয়োগেরও প্রধান করা হয়েছে। ফলে দুই ঢাকার নগরপাল বা মেয়রের কার্যক্ষমতা অনুযায়ী সেসব সুশাসনের যথাযথ প্রয়োগ বাস্তব রূপ নিলে ঢাকা ভিন দেশের অনুকরণ না করে ‘অনুকরণীয় নগর’ হিসেবেই তার মর্যাদা সমুন্নত রাখার শহর হিসেবে মূল্যমান বজায় রাখতে পারে। এক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা বোঝার ঘাটতি আছে বলে মনে হচ্ছে। আমাদের তো এটা মনে রাখতে হবে যে মন্ত্রীর মর্যাদাপ্রাপ্ত মেয়রের পতাকাবাহী গাড়িকে পথ ছেড়ে দিতে নাগরিকের ধূলিমাখা কোণঠাসা জীবন নিশ্চয় মর্যাদার নয়। ঢাকার মর্যাদা ধনী-গরিব নির্বিশেষে উত্তর দক্ষিণের সব নাগরিকের আত্মসম্মানের সঙ্গে বসবাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। এ-ও আমাদের মনে রাখতে হবে—এই দুই ঢাকায় শুধু পরিবহন নৈরাজ্যের কারণে আমরা আমাদের সৃজনশীল কর্মক্ষমতার অর্ধেকেরও বেশি সময় জ্যামের কারণে রাস্তায় অপচয় করছি, যা কখনও নাগরিকের জন্য, এমনকি কোনও দেশের জন্য সম্মানজনক নয়।

দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক বিবেচনা বাদ দিলেও ঢাকাকে নিশ্চয়ই আমরা বাজার ও বিপণন বৈষম্যের নগর হিসেবে দেখতে চাই না। যদি আমরা উদাহরণ হিসেবেও বেছে নেই তথ্য-প্রযুক্তি, তাহলেও দেখবো উত্তর আর দক্ষিণের ঢাকায় ব্যাপক ফারাক! এমন নিশ্চয়ই হওয়ার কথা ছিল না। যখন থ্রি-জি আর ফোর-জি চালু হলো, দেখা গেলো সবই শুরু হয়েছে উত্তর থেকে। যত বড় বড় মেগা মল, শপিং সেন্টার আর নামিদামি রেস্টুরেন্ট, সব উত্তর ঘিরে। আমরা জানি ঢাকা শহরে উঠতি মধ্যবিত্ত জনসংখ্যা বাড়ছে, পাশাপাশি আধুনিক ভোক্তা এবং বিলাস পণ্যের বাজার বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু তার জন্য আমাদের আনন্দ হবে কেন? এতে তো দুর্ভাবনাই বাড়ার কথা! ঢাকা ঘিরে বা ঢাকাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে নিশ্চয়ই আমরা কোনও জাতীয় বৈষম্য দেখতে চাই না (কারণ ঈদের বা বিয়ের বাজার করতে এখনও মানুষ ঢাকায় ছুটে আসে)। অপরদিকে দক্ষিণের কাজ শুধু তার ঐতিহ্য বজায় রাখা? সদ্য ঘোষিত নির্বাচনি ইশতেহারে উত্তরে যত বেশি অবকাঠামো উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেখা গেলো, সে তুলনায় মানুষের ভেতর কাঠামোর (বা সংস্কৃতির) কোনও উন্নয়নের চিন্তা প্রকাশ পেলো না!

তৃতীয়ত, প্রতিদিন ঢাকার লোকসংখ্যা বাড়ছে। মোট ১৬ থেকে ১৮টি অন্তর্মুখী পথ বেয়ে কর্মসন্ধানী মানুষ ঢাকায় এসে বেঁচে থাকার সুযোগ খুঁজছে। কিন্তু তাদের জন্য কর্ম-সৃজনের কোনও চিন্তা আমাদের নেই। ঢাকা কি কেবল বসবাসের শহর? এই শহরের ভবিষ্যৎ কী? বর্তমান জনসংখ্যার বৃদ্ধির হার বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞদের ধারণা, রাজধানীতে প্রতিদিন যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে, তাতে ২০২৫ সালে এই দেড় হাজার বর্গকিলোমিটারের ঢাকায় লোকসংখ্যা দাঁড়াবে ৩ কোটিরও বেশি। গবেষকদের মতে, জীবন-জীবিকার জন্য রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় দুই-আড়াই হাজার মানুষ আসছে। সে হিসাবে বছরের শেষে যুক্ত হওয়া নতুন মানুষের সংখ্যা দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৮ লাখ। সেখানে উদ্ভাবন আর সৃষ্টির কৌশল ব্যবহারের চিন্তা কোথায়? নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত নাগরিকের যে বিশাল কর্মীবাহিনী ঢাকার সবচেয়ে বড় সৃজনশীল জগৎ পোশাক শিল্পের ভিত্তি ধরে আছে, তাদের বসতি আর স্বাস্থ্যসেবায় আমাদের করণীয় কী?

গণমাধ্যমে দেখলাম উত্তরের একজন প্রার্থী ঢাকা উন্নয়নে ‘ইন্টেলিজেন্স’ ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দক্ষিণের জন্য কী বুদ্ধি আমরা প্রয়োগ করবো? আমার ধারণা ও সুপারিশ, ইতিহাসের বুদ্ধিই সবচেয়ে সেরা হবে।

দুই ঢাকা ভাগ হয়ে আমাদের স্বপ্নও ধনী-দরিদ্রের মতো দুই ভাগ হয়ে গেলো!

লেখক: পরিচালক, আমাদের গ্রাম গবেষণা প্রকল্প

ই-মেইল: [email protected]

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ