বিদেশি দূতাবাসগুলো নির্বাচনে পর্যবেক্ষক হতে পারে?

Send
ড. সেলিম মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৭:২৯, জানুয়ারি ৩০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩০, জানুয়ারি ৩০, ২০২০

ড. সেলিম মাহমুদঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য বাংলাদেশে অবস্থিত কিছু বিদেশি দূতাবাস আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে আবেদন করেছে। জানা গেছে,  ৮টি দূতাবাস (যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, সুইজারল্যান্ড, জাপান, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও নরওয়ে) নির্বাচন কমিশনের জারি করা  Guidelines for Election Observation (For International Observers)-২০১৮-এর আওতায় এই আবেদন করে।
এটিই বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক/ বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সম্পর্কিত আইন। এই গাইডলাইনস-এর আওতায় একটি অঙ্গীকারনামা (PLEDGE FORM) এবং একটি আবেদনের ফর্ম পূরণ করতে হয়।
আমরা জানতে পেরেছি, দূতাবাসগুলোর আবেদন ফর্মে (ANNEX II) তাদের আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের জারি করা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য গাইডলাইনস-এর বিধান মেনে চলার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে। অঙ্গীকারনামায় (PLEDGE FORM/ ANNEX I) দূতাবাসগুলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Code of Conduct for International Election Observer-এর বিধানাবলি প্রতিপালনের অঙ্গীকার করে। এই অঙ্গীকারনামা (Pledge Form/ ANNEX I) অনুযায়ী এই নির্বাচনে উল্লিখিত বিদেশি দূতাবাসগুলো Code of Conduct for International Election Observer-এর বিধানের আওতায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য আবেদন করেছে। ওই Code of Conduct-এর বিধান অনুযায়ী কেবল  আন্তঃরাষ্ট্রীয় কোনও সংগঠন ও আন্তর্জাতিক কোনও বেসরকারি সংস্থা নির্বাচন  পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। ওই Code of Conduct-এ কোনও দূতাবাসকে  নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেওয়া হয়নি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এর নজির নেই।

উল্লিখিত  Code of Conduct-এর প্রথম অনুচ্ছেদেই  এটি পরিষ্কারভাবে উল্লেখ করা হয়—International election observation is widely accepted around the world. It is conducted by intergovernmental and international nongovernmental organizations and associations in order to provide an impartial and accurate assessment of the nature of election processes for the benefit of the population of the country where the election is held and for the benefit of the international community.

ওই Code of Conduct-এ সর্বোচ্চ নিখুঁতভাবে, সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। Code of Conduct-এর ৮ম অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়  Observers must ensure that all of their observations are accurate... Observers’ judgments must be based on the highest standards for accuracy of information and impartiality of analysis, distinguishing subjective factors from objective evidence... এই বিধানের অর্থ এই যে, পর্যবেক্ষককে সম্পূর্ণ দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণের কাজটি সম্পন্ন করতে হবে।

এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করা কেবল বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের পক্ষেই সম্ভব। উল্লিখিত Code of Conduct-এ যে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে, সেটির প্রতিপালন আবশ্যকীয়। কোনও দূতাবাসের পক্ষে এ ধরনের বিশেষায়িত ও পেশাদারিত্বমূলক কাজ Code of Conduct-এ উল্লিখিত শর্ত প্রতিপালন করে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলোর কর্মকর্তারা যে অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছেন, তাতে তারা সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য আচরণবিধি (Code of Conduct for International Election Observer) মেনে চলবেন। অর্থাৎ এই আচরণ-বিধির প্রতিটি বিধান প্রতিপালন করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

এই অঙ্গীকারনামার প্রথম অনুচ্ছেদে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, I have no conflicts of interest, political, economic nor other, that will interfere with my ability to be an impartial election observer and to follow the Code of Conduct.’ এই অঙ্গীকারের অর্থ এই যে, পর্যবেক্ষকের রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক বা অন্য কোনও ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকবে না, যা একজন নিরপেক্ষ নির্বাচন পর্যবেক্ষক  হওয়ার ক্ষেত্রে তার সক্ষমতাকে বাধাগ্রস্ত করে এবং এই Code of Conduct মানার ক্ষেত্রেও তাকে বাধাগ্রস্ত করে। এই বিধান প্রতিপ্রালন করে কোনও বিদেশি দূতাবাসের পক্ষে নিরপেক্ষ নির্বাচন পর্যবেক্ষক হওয়ার সুযোগ নেই। কারণ প্রতিটি দেশে অবস্থিত বিদেশি দূতাবাসগুলো নিজ নিজ দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা আর্থিক এজেন্ডা বাস্তবায়নসহ নানা ধরনের স্বার্থ রক্ষা করে চলে। অর্থাৎ এখানে তাদের স্বার্থের দ্বন্দ্বের (Conflict of Interest) বিষয় থাকে। উল্লিখিত দেশগুলোর দূতাবাসের বাংলাদেশে নানা ধরনের স্বার্থের দ্বন্দ্ব (Conflict of Interest) রয়েছে। ফলে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে যে কয়টি দূতাবাস তাদের নিজস্ব নির্বাচন পর্যবেক্ষক দল পাঠিয়েছে, তারা নির্বাচন কমিশনের জারি করা Guidelines for Election Observation (For International Observers)-২০১৮সহ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত Code of Conduct for International Election Observer এবং তাদের স্বাক্ষরিত অঙ্গীকারনামা ভঙ্গ করেছে। সে কারণে, পর্যবেক্ষক হিসেবে বিদেশি দূতাবাসগুলোর অনুমোদন সম্পূর্ণ বে-আইনি ও অবৈধ।

এছাড়া, দূতাবাসগুলোর কর্মকর্তাদের স্বাক্ষরিত অঙ্গীকারনামায় (Pledge Form)  উল্লেখ রয়েছে যে, তারা রাষ্ট্রীয় আইন ও নির্বাচন কর্মকর্তাদের কর্তৃত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। নির্বাচন পরিচালনা কর্তৃপক্ষ ও অন্যান্য জাতীয় কর্তৃপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। অঙ্গীকারনামার তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করা হয়,  I will respect national laws and the authority of election officials and will maintain a respectful attitude toward electoral and other national authorities.

উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশে দেশি-বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষণের মূল আইনি বিধান গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ (আরপিও) এর অনুচ্ছেন ৯১-সি’তে উল্লেখ রয়েছে। অনুচ্ছেদ ৯১ সি’তে বলা হয়েছে, নির্বাচন কমিশন সেই সব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তিকে নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে লিখিতভাবে অনুমতি দেবে, যারা বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এবং যারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের কোনও রাজনৈতিক দল বা কোনও প্রার্থীর আদর্শ, কর্মসূচি, লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের প্রতি কোনও ধরনের সহানুভূতি প্রকাশ করেনি। অর্থাৎ, আরপিও-এর অনুচ্ছেন ৯১-সি অনুযায়ী বাংলাদেশে অবস্থিত অনেক দূতাবাস নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। কারণ,বাংলাদেশে অবস্থিত অনেক পশ্চিমা দূতাবাস বিভিন্ন সময়ে কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের সমালোচনা করেছে, অন্যদিকে কিছু কিছু রাজনৈতিক দলের পক্ষেও ভূমিকা রেখেছে।  আরপিও’র এই বিধান অনুযায়ী এই সকল দূতাবাস নিরপেক্ষ নির্বাচন পর্যবেক্ষক হওয়ার অনুমতি পেতে পারে না। আরপিও’র এই বিধান ঘোষণামূলক (Directory) নয়; এটি বাধ্যতামূলক (Mandatory)।

এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে চাই। উল্লিখিত দূতাবাসগুলো  তাদের কিছু স্থানীয় কর্মকর্তাকে বিদেশি পর্যবেক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছে। ওই দূতাবাসগুলো তাদের কর্মকর্তাদের নামের তালিকা কমিশনে পাঠিয়েছে। সেখানে দেখা যায় যে, কয়েকটি দূতাবাসের কর্মকর্তাদের নামের তালিকায় বাংলাদেশি কিছু নাগরিকের নাম রয়েছে, যারা ওই সব দূতবাসের স্থানীয় কর্মকর্তা/কর্মচারী হিসেবে কর্মরত। নির্বাচন কমিশনের জারি করা যে অঙ্গীকারনামা (Pledge Form) রয়েছে, তাতে বলা হয়েছে এটি কেবল বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য। এছাড়া উক্ত অঙ্গীকারনামায়   Code of Conduct for International Election Observer -এর বিধান প্রতিপালনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এই Code of Conduct এবং নির্বাচন কমিশনের জারি করা অঙ্গীকারনামায় শুধু বিদেশি পর্যবেক্ষকদের জন্য প্রযোজ্য বিধান রাখা হয়েছে। কোনও স্থানীয় ব্যক্তিবর্গ এই ক্যাটাগরিতে অর্থাৎ বিদেশি পর্যবেক্ষক হিসেবে কোনও স্থানীয় নাগরিকের অর্থাৎ বাংলাদেশি নাগরিকের তালিকাভুক্ত হওয়ার বিধান নেই। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক যে, পশ্চিমা বিশ্বের কয়েকটি দেশ তাদের দূতাবাসে কর্মরত কিছু বাংলাদেশি নাগরিকের নাম বিদেশি পর্যবেক্ষক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছে। পরবর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশন বিষয়টির আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে ওই সব দূতাবাসের বাংলাদেশি কর্মকর্তাদেরও  বিদেশি পর্যবেক্ষক হিসেবে অনুমোদন দেয়। এটি সম্পূর্ণভাবে আইনের লঙ্ঘন।

উল্লেখ্য,বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের জন্য নির্বাচন কমিশনের জারি করা একটি নীতিমালা রয়েছে, যা ‘নির্বাচন পর্যবেক্ষক নীতিমালা ২০১৭’ নামে পরিচিত। এই নীতিমালা-ই বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে স্থানীয় পর্যবেক্ষকদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে, নির্বাচন পর্যবেক্ষক স্থানীয় হোক বা বিদেশি হোক, তাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ-১৯৭২’-এর ৯১-সি বিধান প্রযোজ্য।

আমরা মনে করি, বাংলাদেশে অবস্থিত কিছু বিদেশি দূতাবাস জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে যেভাবে নিজেদের  আন্তর্জাতিক নির্বাচন পর্যবেক্ষক হিসেবে উপস্থাপন করেছে, সেটি শুধু বেআইনিই নয়, সেটি অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। আমরা নির্বাচন কমিশনসহ সংশিষ্ট সবাইকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।

দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে চাই, আমরা আন্তর্জাতিক বা বিদেশি পর্যবেক্ষকদের বিপক্ষে নই। বিদেশি রাষ্ট্রগুলো আমাদের পরীক্ষিত বন্ধু, কেউ কেউ আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। তাদের অবদান আমরা সব সময় কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি। উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আমাদের নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্র সুসংহত হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে উন্নয়ন সহযোগীদের অবদান রয়েছে। তবে, সংবিধান, রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইন এবং বিধি-বিধান প্রতিপালনের বিষয়ে আপস করার সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গত, পৃথিবীর কোনও সার্বভৌম রাষ্ট্র অথবা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী বন্ধু-রাষ্ট্রগুলো  নিজ নিজ দেশে তাদের সংবিধান, রাষ্ট্রীয় আইন ও আন্তর্জাতিক আইনের কোনও ব্যত্যয় ঘটান না। আমরা আন্তর্জাতিক সব আইন ও বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও অনুগত।  

আমরা বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের আখরে রচিত আমাদের জাতীয় সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় আইনের কোনও ধরনের ব্যত্যয় বাঙালি জাতি মেনে নিতে পারে না।

লেখক: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ
X