‘মিস্টার টেন পার্সেন্ট’ চাই না

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:০৬, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৮, ফেব্রুয়ারি ০৬, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষ না হতেই নির্বাচনে কেন কম ভোট পড়েছে তার বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। কেউ দুষছেন সরকারি দলকে, কেউ বিরোধী দলকে।  অনেক ভোট-পণ্ডিত মন্তব্য করেছেন, বিএনপি মুসলিম লীগ হয়ে যাচ্ছে। আমার মনে হয় এই সন্দেহ অমূলক। বিএনপির নিজের অস্তিত্ব নিয়ে টিকে থাকার মতো অবস্থানে রয়েছে, সেটি এই নির্বাচনেও প্রমাণিত হয়েছে।
ঢাকার দুই সিটিতে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন উত্তর সিটিতে আতিকুল ইসলাম আর দক্ষিণ সিটিতে শেখ ফজলে নূর তাপস। তারা দু’জন আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন উত্তরে তাবিথ আউয়াল আর দক্ষিণে ইশরাক হোসেন। তারা ছিলেন বিএনপির প্রার্থী। হেরে গেছেন, তবে তারা সম্মানজনক সংখ্যক ভোট পেয়েছেন। কম সংখ্যক ভোট পেলেও ইসলামী আন্দোলনের দুই প্রার্থী তৃতীয় হয়েছেন আর সবাই গো-হারা হেরেছেন, বিএনপি-আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনও প্রার্থীর জামানত ছিল না।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি কম থাকার বিষয়ে ভোট বিশেষজ্ঞরা রকমারি যেসব বিশ্লেষণ দিচ্ছেন তাতে একজন বিশেষজ্ঞ বলেছেন, উপযুক্ত প্রার্থী ছিল না। আমার তো মনে হয় যে চারজনের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, বয়সে নবীন হলেও তারা সবাই শিক্ষায় চমৎকার ছিলেন। সম্ভবত চারজনের মধ্যে ইশরাকের বয়স সবচেয়ে কম। এদের মধ্যে ব্যারিস্টার তাপস তো এই বয়সে তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী নেভিল চেম্বারলিন যুব বয়সে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী হলে এই চারজনের দুইজন মেয়র নির্বাচিত হতে আপত্তি কী!

রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, যুব বয়সের ইবাদত বেশি কবুল হয়। যেখানে আল্লাহ যুব বয়সের মানুষকে পছন্দ করছেন, সেখানে আমরা এই বয়সের নিন্দা করবো কেন! আমার তো মনে হয় এই বয়সের মানুষরাই কঠিন দায়িত্ব পালনে সক্ষম।

আরেক ভোট-বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ভোট দেওয়ার ব্যাপারে ভোটারদের অনীহা এসেছে। ভোটারদের ভোটকেন্দ্রবিমুখ অবস্থা থেকে উত্তরণ কঠিন। আমি বলি, কোনও সমস্যা উত্তরণ করা কঠিন নয়, এসব অহেতুক কথা বলে জাতিকে হতাশ করার চেষ্টা।

দেখুন টানা তিন দিন একটানা ছুটি। চাকরিওয়ালারা ছুটি পেলেই গ্রামের বাড়িতে দৌড়ায়। আবার স্থানীয়রা দুই-চার দিনের ছুটি একসঙ্গে পেলে ঢাকার বাইরে বেড়াতে যায়। সুতরাং এই এক কারণই তো ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার জন্য যথেষ্ট। আরেক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, জালভোট না পড়ায় মনে হয় উপস্থিতি কম। ভোট আরম্ভ হওয়ার আগে জাল ভোট হবে না সত্যিকারের ভোট হবে—এ খবর ভোটারের কাছে পৌঁছাল কীভাবে! বিশেষজ্ঞদের মনের সুখে কথা বলা উচিত নয়। ভেবেচিন্তে কথা বলাই উত্তম।

আমি ভোট বিশেষজ্ঞ নই, তবে প্রচারণার ২০ দিনব্যাপী লক্ষ করেছি, আওয়ামী লীগ ছাড়া সব দল একটা কথা প্রচার করেছে খুবই উল্লাসের সঙ্গে। তা হচ্ছে ‘ভোট পেলেও আওয়ামী লীগ, না পেলেও আওয়ামী লীগ পাস’। ইভিএম নিয়ে বিএনপির নেতিবাচক প্রচারণার সঙ্গে এমন একটি হতাশাব্যঞ্জক কথা শোনার পর  ভোটাররা তো ভোট প্রদানে উৎসাহ হারাবেই।

অথচ আমি ধানমন্ডির একটি কেন্দ্রে ভোট দিতে গিয়ে দেখলাম সুষ্ঠুভাবে ভোট হচ্ছে। শুধু আমার কেন্দ্র নয়, আরও কয়েকটা কেন্দ্র ঘুরে দেখলাম। ওইসব কেন্দ্রে সুষ্ঠু ভোট হয়েছে। আর যানবাহন বন্ধ থাকায় যারা ঘরবাড়ি বদলে অন্য এলাকায় বাসা নিয়ে চলে গেছেন, তারা অনেকে ভোট দিতে পারেননি। রিকশায় সবাই ২০০-৩০০ টাকা ব্যয় করে ভোট দিতে আসার কথা নয়। নারী ভোটারও কম ছিল।

নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার কর্মীদের বলেছিলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, তোমরা ঘরে ঘরে গিয়ে মানুষের কাছে ভোট ভিক্ষা করো। আওয়ামী লীগের কর্মীরা তাদের নেতা-নেত্রীর কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে এবং এলাকার প্রতিটি ঘরে দলবদ্ধভাবে গিয়ে ভোট প্রার্থনা করেছে। আমার ঘরে তারা দলবদ্ধভাবে দুইবার এসেছে। ভোটার স্লিপ দিয়ে গেছে। ভোট দিতে আমার কোনও অসুবিধা হয়নি।

বিএনপির দুই প্রার্থী তাবিথ আর ইশরাকও প্রচারণায় পিছিয়ে ছিলেন না। কিন্তু তাদের কর্মীরা সবখানে ঘরে ঘরে যায়নি। ঘরে যাওয়া, ভোটার স্লিপ দেওয়া, ক্যাম্প করা—এই সবে ভোটাররা উৎসাহ বোধ করে। ইশরাক প্রচারণার সময় বলেছিলেন, প্রয়োজনে তাদের কর্মীরা ভোটকেন্দ্র ঘেরাও করবে। কিন্তু কেন্দ্র ঘেরাও তো দূরের কথা, ভোট চাওয়ার কর্মীও ছিল না। রাজনৈতিক দলের দুধ খাওয়ার কর্মী থাকলে চলে না, কিছু রক্ত দেওয়ার কর্মীও থাকতে হয়। দুর্ভাগ্য, বিএনপিতে দুধ খাওয়ার কর্মী বেশি।

ইশরাককে বক্তৃতা-বিবৃতিতে সাহসী বলে মনে হয়েছে। আশা করি তিনি তার রাজনীতি অব্যাহত রেখে তৎপর হবেন এবং বিএনপিতে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার চেষ্টা করবেন। ভোট পাওয়ার হিসাব মেলালে বিএনপি নিশ্চিহ্ন হওয়ার দল বলে কেউ মনে করবে না। বিএনপির নেতৃত্ব পর্যায়ে ভোটের কৌশল নির্ধারণে দুর্বলতা ছিল।

আতিকুল ইসলাম এবং শেখ ফজলে নূর তাপস নির্বাচিত হয়েছেন। তাদের অভিনন্দন জানাই। নির্বাচনি প্রচারণায় কোনও ফাঁকিজুকি ছিল না। উভয়ে প্রচারণা চালাতে গিয়ে মাথার ঘাম পায়ে ফেলেছেন। নির্বাচনি প্রচারণায় উভয়ের যে নিষ্ঠা দেখেছি, আশা করি মেয়র হিসেবে উভয় সিটির কাজকর্ম অনুরূপ নিষ্ঠার সঙ্গে সম্পন্ন করবেন। উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। শেখ ফজলে নূর তাপস শেখ মণির ছেলে, শেখ পরিবারের লোক। সুতরাং তাদের কাছে অনুরোধ তারা কেউ যেন ‘মিস্টার টেন পার্সেন্ট’ না হয়। এখন লোক সৎ নেতৃত্বের প্রত্যাশায় অধীরভাবে আগ্রহী। ওপরে সৎ থাকলে নিচের দিকে অসততা করতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ভয় পায়। সিটি করপোরেশন কিন্তু দুর্নীতির আখড়া।

আতিক-তাপসও যদি তাদের সততাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কোনও সুযোগ দেন তবে এ শহরটা মরুপথে গতিহারা নদীর মতো হয়ে যাবে। শহরটার পরিবেশ সম্পূর্ণ নষ্টের পথে। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে এনে বাসযোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। সেটাই প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব, দুই মেয়রের।

বৃহত্তম আকার ধারণ করেছে বলে সিটি গভর্নমেন্টে না গিয়ে শহরটাকে দ্বিধাবিভক্ত করে দুই মেয়রের অধীনে ন্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু শহরটাকে পরিপূর্ণভাবে উন্নত করতে চাইলে উভয় মেয়রের কাজের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। সমন্বয়, সমঝোতায় যেন পার্সোনালিটির ক্ল্যাশ না হয়। উভয় মেয়র উন্নয়নে নিশ্চয়ই মনোযোগ দেবেন। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে রাখি, উন্নয়ন তখনই দৃষ্টিনন্দন হয় যখন তা সার্বিক হয়। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা নদীটি মরে যাওয়ার উপক্রম। তাকে যেন বাঁচিয়ে রাখার সব প্রচেষ্টা চালানো হয়। সততা-নিষ্ঠা আন্তরিকতাকে মূলধন করে আপনারা উভয়ে পথচলা আরম্ভ করুন। ইনশাল্লাহ সফল হবেনই।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ