বণিকের মানদণ্ড দেখা দেবে রাজদণ্ডরূপে

Send
বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৭:২২, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৪, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২০

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরীব্যবসায়ীরা ধীরে ধীরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে গ্রাস করে ফেলছে। রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘এখন রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে নেই।’ মানুষ আগে মনে করতেন রাজনীতিবিদদের জন্য আওয়ামী লীগ নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান। কারণ, আওয়ামী লীগ রাজনীতিবিদদের মূল্যায়ন করে চলে। কিন্তু হতাশার কথা, এখন আওয়ামী লীগেও সেই অবস্থা নেই।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভায় ছিলেন সবাই তার সহকর্মী। ২৩ বছর তারা একসঙ্গে আওয়ামী লীগ সংগঠন করেছেন; একসঙ্গে পাকিস্তানি শোষণ রুখে দেওয়ার জন্য সংগ্রাম করেছেন; আবার প্রয়োজন দেখা দিলে সবাই একসঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধের অস্ত্র তুলে নিয়েছিলেন। রাজনৈতিক ঐকমত্য গড়ে উঠলে একে অপরের রক্তের সম্পর্কের ভাইয়ের মতো হয়ে যায়। বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ ছিল তেমন একটি সংগঠন। যে কারণে তারা সংঘবদ্ধভাবে অসাধ্য সাধন করেছিলেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ এখন পথ হারিয়েছে। ধীরে ধীরে দলটি ব্যবসায়ীদের সংগঠনে পরিণত হচ্ছে।

ঢাকায় ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের ছেড়ে দেওয়া সংসদীয় আসনে এখন মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে শফিউল ইসলাম মহিউদ্দিনকে। তিনি এফবিসিসিআই’র বিগত কমিটির সভাপতি ছিলেন। এর আগে তিনি বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগ করেছেন বলে কোথাও দেখিনি।

১৯৭০ সালের নির্বাচন ছিল খুবই কঠিন। সেই নির্বাচনেও বঙ্গবন্ধু দলের বাইরের লোককে ডেকে এনে মনোনয়ন প্রদান করেননি। যে অল্প কয়েকজনকে দিয়েছিলেন, দেখা গেছে তারা ২৫ শে মার্চের পরে যখন বিপদ শুরু হলো তখন সুবিধাবাদী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। ডা. মালেক মন্ত্রিসভা গঠন করার সময় যে দুইজন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য মন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের অধ্যাপক শামসুল হক আর ফেনীর সাংসদ প্রিন্সিপাল ওবায়দুল্লাহ মজুমদার, তারা আওয়ামী লীগের কর্মী ছিলেন না। চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ আজিজের অনুরোধে বঙ্গবন্ধু তাদের মনোনয়ন দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু এমএ আজিজকে খুবই স্নেহ করতেন। এমএ  আজিজ বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রভাব খাটাতে পারতেন। অধ্যাপক শামসুল হক আর চট্টগ্রামের পটিয়া কলেজের প্রিন্সিপাল ওবায়দুল্লাহ মজুমদার ছিলেন এমএ আজিজের ব্যক্তিগত বন্ধু। অথচ সাতকানিয়ার সাংসদ আবু সালেহ, হাটহাজারীর সাংসদ এমএ ওয়াহাব, রাঙ্গুনিয়ার সাংসদ আবুল কাশেম- দরিদ্র ত্যাগী কর্মী ছিলেন। কিন্তু দলের সঙ্গে মোনাফেকি করেননি।

স্বাধীনতার পর চট্টগ্রাম শহরেই সবচেয়ে বেশি অবাঙালির পরিত্যক্ত সম্পত্তি ছিল। আর গণপরিষদের সদস্য হিসেবে এরাই তার তদারকি করেছেন। অথচ আমরা দেখেছি, `৭৩ সালের সংসদ নির্বাচনের পরে আবু সালেহ ব্যাংকে চাকরি করে জীবিকা নির্বাহ করেছেন। আর এমএ ওয়াহাব ‘৭৩ সালের নির্বাচনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ১৯৫৬ সালের জেলা বোর্ডের নির্বাচনে ফজলুল কাদের চৌধুরীকে পরাজিত করে জেলা বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এমএ ওয়াহাব। কর্মীরা বক্স কালেকশন করে এসব নেতার নির্বাচনের ব্যয় মিটিয়েছিল।

এখন আওয়ামী লীগের জৌলুসের কাল। জৌলুসের মাঝে সবই হারিয়ে গেছে। ত্যাগী কর্মীরা এখন কোণঠাসা। ত্যাগী কর্মী না থাকলে সংগঠন টিকবে কীভাবে! পল্টনের আওয়ামী লীগ অফিসে মোমবাতি জ্বালিয়ে মরহুমা আমেনা বেগমের অফিস করার দৃশ্য আওয়ামী লীগের নেতারা ভুলে গেছেন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের ইডেন কাউন্সিলের পর আওয়ামী লীগের ওপর দুর্যোগ নেমে আসে। তখন বঙ্গবন্ধু ছিলেন আওয়ামী লীগের সভাপতি, তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন সাধারণ সম্পাদক। তারা উভয়ে যখন কারাগারে, তাদের অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলাম ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আর মিজানুর রহমান চৌধুরী ছিলেন সাধারণ সম্পাদক।

মিজানুর রহমান চৌধুরীকে জেলে নিয়ে গেলে মোল্লা জালাল উদ্দিন সাধারণ সম্পাদক, আর মোল্লা জালালকে জেলে নিয়ে গেলে মহিলা সম্পাদিকা আমেনা বেগম ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম ময়মনসিংহ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন। তিনি ঢাকায় তেমন আসতেন না। আমেনা বেগম হয়ে ওঠেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় অফিসের পাহারাদার।

পাকিস্তান সরকার অফিসের ইলেকট্রিক লাইন পর্যন্ত বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। আমেনা বেগম চারটি মোমবাতি নিয়ে আসতেন আর বাতি শেষ হলে তিনি তার মগবাজারের বাসায় চলে যেতেন। তিনি ছিলেন আওয়ামী লীগের দুর্দিনের কাণ্ডারি। ১৯৭৫ সালের পরও আওয়ামী লীগ বিপদে পড়েছিল। ১৫ আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যা, শেখ মনি হত্যা, সেরনিয়াবাত হত্যা, জেল হত্যা—সব মিলিয়ে আওয়ামী লীগ দুর্দশায় পড়েছিল। ত্যাগী কর্মীদের কঠোর পরিশ্রমে পুনরায় আওয়ামী লীগ ২১ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে এসেছে।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন মাঝে মধ্যে বলেন, বঙ্গবন্ধুর লাশ যখন সিঁড়িতে পড়েছিল তখন কে কী করেছেন? আমার মনে হয় প্রধানমন্ত্রী আবেগে এই কথাটা আর না বলাই উত্তম হবে। বঙ্গবন্ধুর মতো লোকের সপরিবারে নিহত হওয়ার পর সর্বস্তরে স্তব্ধ হয়ে যাওয়াটাই ছিল স্বাভাবিক। আর কোনও কিছু করতে গেলে আওয়ামী লীগের শক্তিক্ষয় হতো। কারণ, তখন হত্যাকারীরা নির্বিচারে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের হত্যা করতো। সাধারণ মানুষও এগিয়ে আসতো না।

১৯৭৩ সালে তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সব জিনিসের মূল্য বেড়ে যায়। বাংলাদেশে ৭ টাকার লুঙ্গি ৭০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চুয়াত্তর সালে একটা ছোটখাটো দুর্ভিক্ষ হয়। সাধারণ মানুষেরও আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি একটা অভিমান ছিল। পঙ্গপালের মতো আত্মাহুতি দিলে তো হবে না। কাজের কাজ কিছু তো করতে হবে। সেই সময় আওয়ামী লীগ রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলে সফল না হওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

তাছাড়া বাকশাল গঠনকে সাধারণ মানুষ ভালো মনে করেননি। ব্যাপক নেতিবাচক প্রচারণা ছিল বাকশালের বিরুদ্ধে। ১৯৩৫ সাল থেকে ভারত শাসন আইনের অধীনে এ দেশের মানুষ বহুদলীয় গণতন্ত্রের চর্চা দেখেছে। হঠাৎ করে একদলীয় ব্যবস্থাকে মানুষ মেনে নেয় কীভাবে! বঙ্গবন্ধু যদিও এই ব্যবস্থা প্রয়োজনের কারণে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু এটা তো বঙ্গবন্ধুর সারা জীবনের লালিত আদর্শেরও পরিপন্থী ছিল।

যাহোক, বলছিলাম বণিকের রাজনীতি নিয়ে। বণিকের শাসন কখনও ভালো শাসন হয় না। ১৭৫৭ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারত শাসন করেছিল। এই সময় ছিল সবচেয়ে খারাপ শাসন। মহারানি ভিক্টোরিয়া সেই কারণে ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের পর সরাসরি ভারতকে তার শাসনের অধীনে নিয়ে গিয়েছিলেন।

অধিক সংখ্যায় বণিকেরা সংগঠনে এলে ত্যাগী কর্মীরা কোণঠাসা হয়ে যাবে। তখন সংগঠনের সর্বনাশ হবে। ব্যবসায়ীরা গরিব ত্যাগী কর্মীদের প্রতি অসৌজন্যমূলক আচরণ করে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা একজন আমলা। তিনি বলেছেন, অনেক সময় দেখা যায় গুলিস্তান মহল্লায় হকারদের কাছ থেকে কেউ টাকা নেন। কিছু দিন পর হয়তো তাকে নেতা হতেও দেখা যায়। এই ব্যক্তি একদিন সাংসদও হতে পারেন। এই ‘ব্যাকগ্রাউন্ড’ নিয়ে ইসিকে কাজ করতে হয়।

পরিশেষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটা আবেদন রেখে লেখা শেষ করবো। প্রতিটি পদক্ষেপ নেওয়ার আগে নিজেকে হাজারবার জিজ্ঞাসা করে সেই বিষয়টির শেষ পরিণাম নির্ধারণ করুন। আর পদক্ষেপ নিন। জ্ঞানের উৎস জিজ্ঞাসা। জিজ্ঞাসা মানুষকে যেমন ঘটনাক্রমে নিয়ম আবিষ্কারের সহায়তা করেছে, তেমনি দিয়েছে অভ্রান্ত সম্ভাবনার সন্ধান।

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ