কেউ খাবে ব্যাংক-শেয়ার বাজার আর কেউ ‘কচুরিপানার চচ্চড়ি’

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৭:১৫, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১৬, ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২০



রুমিন ফারহানাপরিকল্পনামন্ত্রী আছেন বিপাকে। সব গণমাধ্যম, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি কচুরিপানা নিয়ে তার এক বক্তব্য ব্যাপক ভাইরাল হয়েছে।
এই বক্তব্য নিয়ে ঘটনা এত দূর গড়ালো যে, সংসদের ‘বিরোধী দলীয় নেত্রী’ পর্যন্ত বললেন, দেশে কি এখন দুর্ভিক্ষ যে, কচুরিপানা খেতে হবে? ভাগ্যিস সেদিন সংসদে পরিকল্পনামন্ত্রী ছিলেন না, না হলে তাকে কচুরিপানা হয়তো বা খেতেই হতো, কারণ ‘বিরোধী দলীয় নেত্রী’ দাবি করছিলেন, তিনি সঙ্গে করে কচুরিপানা নিয়ে এসেছেন পরিকল্পনামন্ত্রীর জন্য।
পরিকল্পনামন্ত্রী বোধ করি খাদ্যরসিক, কারণ ঢাকা সিটি নির্বাচনে ভোটার কম আসার কারণ হিসেবেও তিনি খাওয়া-খাদ্যকেই দায়ী করেছেন। তার মতে, ভোটার উপস্থিতির হার কম হওয়ার একটি কারণ হলো সেদিন সবাই বাসায় বসে পোলাও রান্না করে খেয়েছে।
রাষ্ট্রে যারা পরিকল্পনামন্ত্রীর মতো নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে আছেন তারা সবার কথাই ভাববেন সেটাই স্বাভাবিক। পরিকল্পনামন্ত্রীর এই দুই বক্তব্য থেকে রাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থাটাই খুব স্পষ্টভাবে বেরিয়ে এসেছে। যে দেশে আড়াই লাখ কোটি টাকার ওপরে মন্দ ঋণ, বছরে পাচার হয় এক লাখ কোটি টাকা অথচ টাকা ফেরত আনার কোনও উদ্যোগ নেওয়া হয় না। শীর্ষ ঋণ খেলাপিদের ভিআইইপি, সিআইপি মর্যাদা দিয়ে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে, দলীয় বিবেচনায় ব্যাংক পরিচালক নিয়োগ দিয়ে, ব্যাংক ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে ধনীবান্ধব করা হয়েছে। শীর্ষ ঋণ খেলাপিদের দেওয়া হয়েছে বিশেষ সুবিধা। ব্যাংক লুটেরারা আছেন মহা আনন্দে। দু’টো ছোট উদাহরণ দিলেই বিষয়টা স্পষ্ট হবে। জনগণের আমানতের টাকায় তৈরি হওয়া বেসিক ব্যাংক, এবং পদ্মা ব্যাংক গপ করে গিলে খাবার পরেও পদত্যাগ ছাড়া ম খা আলমগীর বা আব্দুল হাই বাচ্চুর টিকিটিও ছোঁয়া যায়নি। বাচ্চু, যার সময়ে খেলাপি ঋণের হার ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে হয় ৬৮ শতাংশ, তার ব্যাপারে সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে (১৯ জানুয়ারি,২০২০) স্পষ্টই বলেছেন, ‘আব্দুল হাই বাচ্চুর মতো একজন লোকই ব্যাসিক ব্যাংক ধ্বংস করে দিলেন। আর আমরাও এতে পক্ষ (পার্টি) হয়ে গেলাম।’ তাকে যখন প্রশ্ন করা হয়, বাচ্চুর রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কী ছিল, তখন তিনি বলেন, ‘বাচ্চু ছিলেন অন্য ধরনের রাজনীতিবিদ। বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে তার সংযোগ ছিল এবং এগুলো তিনি ব্যবহার করেছেন।’ যে দেশে ব্যাংক ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রিত হয় প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ রাজনৈতিক শক্তির দ্বারা, সে দেশে সাধারণ আমানতকারীদের আমানত সুরক্ষিত থাকবে না, সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের জন্মের পরে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে অর্থমন্ত্রী থাকা এই ব্যক্তি আরও বলেন, ‘শেয়ার বাজার সব সময়ই ফটকা বাজার হিসেবে থেকে গেছে।’
বিশ্বের শ্রেষ্ঠ অর্থমন্ত্রী অর্থনীতির অবস্থা ভালো আছে বলার একদিন পরেই প্রথম আলোর রিপোর্ট দেখিয়ে দিলো এক রেমিটেন্স ছাড়া অর্থনীতির সব সূচকই নিম্নগামী। বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্র মতে রফতানির ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি—৫ দশমিক ২১ শতাংশ, আমদানি ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্র আমদানি ১২ দশমিক ৪৮ শতাংশ, শিল্পের কাঁচামাল ৬ দশমিক ৫২ শতাংশ, রাজস্ব আয় ঘাটতি ৩১ হাজার কোটি টাকা, ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকারের ঋণ বছরের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে সাত মাসেই ৫০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। আর বেসরকারি খাতে ঋণ ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। এসব দেখে বেশিরভাগ অর্থনীতিবিদ এখন প্রশ্ন তোলা শুরু করেছেন সরকারের দাবি করা এত প্রবৃদ্ধি তাহলে হলো কী করে?
অতএব অর্থ সংকুলানের জন্য ডাকো গৌরি সেনকে। দেশের এই দুর্দিনে সাধারণ মানুষ ছাড়া গৌরি সেন হবেটাই বা কে? আর তাই মধ্যবিত্ত নিম্ন মধ্যবিত্তের অতি কষ্টে জমানো সঞ্চয়ে চোখ পড়েছে সরকারের। ব্যাংক সুদের নয়-ছয়ের খপ্পরে পড়ে আমানতের সুদ হার এখন নেমে আসছে ছয় শতাংশে। ম্যান্ডেট বড় বালাই। ম্যান্ডেট থাকলে জবাবদিহিতার প্রশ্ন আসে। এই যে নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনগুলো একটির পর একটি ডুবছে তাতে সরকারের কী বা এলো গেলো?
‘আমানত সুরক্ষা আইন ২০২০’ এর খসড়ায় বলা হচ্ছে সাধারণ মানুষের বিনিয়োগ যাই থাকুক না কেন, কোনও ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হলে প্রত্যেক আমানতকারী ক্ষতিপূরণ পাবে মাত্র এক লাখ টাকা। ধরে নেই কোনও একজন সৎ উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা আজীবন সৎভাবে কষ্ট করে জীবনযাপন করে চাকরির পরে এক কোটি টাকা পেলেন। সেই টাকা ব্যাংকে রাখলেন সুদের আয় দিয়ে তার অবসরের দিনগুলোর ব্যয় নির্বাহের জন্য। এখন সেই ব্যাংক যদি অবসায়নে যায়, তাহলে এই মানুষটা পাবেন এক লাখ টাকা। এতে একদিকে যেমন মধ্যবিত্ত নিম্ন-মধ্যবিত্ত আমানতকারীরা বিপদে পড়বেন, তেমনি ব্যাংকগুলোতেও কমবে আমানতের প্রবাহ। আর আমানত কমা মানে ঋণ দেওয়ার ক্ষমতাও কমবে ব্যাংকের। আর ঋণ দিতে না পারলে বিনিয়োগ হবে না, যার সরাসরি বিরূপ প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে।
বাংলাদেশে ঋণ খেলাপি, শেয়ার বাজার লুটেরা, টাকা পাচারকারির সঙ্গে এখন যুক্ত হয়েছে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটেরাদের গল্প। ৩৭ লাখ টাকা মূল্যের পর্দা, এক লাখ ১২ হাজার টাকার স্টেথোস্কোপ, ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকার ভ্যাকিউম প্ল্যান্ট, ৫ হাজার ৯৫৭ টাকার বালিশ, ৫ হাজার ৩১৩ টাকার কেতলি, যা ভবনে তোলার খরচ ২ হাজার ৯৪৫ টাকা, ৮৫ হাজার ৫০০ টাকা মেডিক্যালের একটি বই (যায় বাজার মূল্য ৫ হাজার ৫০০ টাকা) এখন আর কোনও কল্পকথা নয়। কিন্তু কতজন মানুষ এই খাদকের দলে পড়ে?
প্রায় সব মানুষই খাদক দলের বাইরে। আর তাই নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিষের মূল্য বাড়লে পাই পাই হিসাব করে চলা মানুষগুলোর নাভিশ্বাস ওঠে। স্বজনতোষী পুঁজিবাদের আদর্শে বিশ্বাসী এই সরকার সমাজে মধ্যবিত্ত শ্রেণিটিকে সংকুচিত করে মোটাদাগে কেবল সরকারের সুবিধাভোগী এবং পৃষ্ঠপোষোকতা পাওয়া উচ্চবিত্ত আর মধ্যবিত্ত থেকে নানা চাপে নেমে আসা নিম্ন-মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মধ্যে অর্থনৈতিক শ্রেণিকে আটকে ফেলছে। আর তাই পরিকল্পনামন্ত্রীর ভোটের দিনে পোলাও নিয়ে ব্যস্ত থাকা শ্রেণির সঙ্গে সঙ্গে আর যে শ্রেণি প্রতিদিন বাড়ছে, তাদের ভাগ্যে ‘কচুরিপানার চচ্চড়ি’ ছাড়া আর কী ই বা থাকতে পারে?

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট। জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ