‘হাকিমও নড়ে হুকুমও নড়ে’

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৫:৩৮, মার্চ ০৬, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৩, মার্চ ০৬, ২০২০

মো. জাকির হোসেনবুঝ-জ্ঞান হওয়ার পর থেকে বিচারিক প্রবাদ শুনে এসেছি ‘হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়ে না’। মর্মার্থ হলো হুকুম বা আদেশ দিয়ে বিচারক অন্যত্র চলে গেলেও তার হুকুমের পরিবর্তন অসম্ভব, তা পালন করতেই হবে। গত ৩ মার্চ  পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক এমপি আব্দুল আউয়াল ও তার স্ত্রী পিরোজপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লায়লা পারভীন ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের দায়েরকৃত মামলায় পিরোজপুর জেলা ও দায়রা জজ আদালতে হাজির হয়ে জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক মো. আবদুল মান্নান জামিন নামঞ্জুর কারে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। কারাগারে পাঠানোর আদেশের পর আউয়াল ও লায়লার আইনজীবী আদালতে তাদের চিকিৎসা প্রতিবেদন তুলে ধরে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা ও ডিভিশন দেওয়ার আবেদন করেন। বিচারক ডিভিশনসহ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এর কিছুক্ষণ পর জেলা ও দায়রা জজ মো. আবদুল মান্নানকে তাৎক্ষণিক বদলি করে যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ নাহিদ নাসরিনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের চিঠি পাঠায় আইন বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। বিকেলে আউয়াল ও লায়লা পারভীনের আইনজীবীরা ভারপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ নাহিদ নাসরিনের কাছে পুনরায় জামিনের আবেদন করেন। শুনানি শেষে বিচারক আসামিদের জামিনের আবেদন মঞ্জুর করেন। আউয়াল ও তাঁর স্ত্রী জিতে গেলো কিন্তু ন্যায়বিচার হেরে গেলো। কেন বিচারককে তাৎক্ষণিক বদলি করা হলো এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে আইনমন্ত্রী বলেছেন, ‘পিরোজপুরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. আবদুল মান্নান অত্যন্ত রূঢ় ও অশালীন আচরণ করেছেন। তাই তাকে প্রত্যাহার (স্ট্যান্ড রিলিজ) করা হয়েছে। পাশাপাশি উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য একেএমএ আউয়াল এবং তার স্ত্রী লায়লা পারভীনকে জামিন দেওয়া হয়েছে।’  

আইনমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘ওই ঘটনায় বারের সবাই আদালত বর্জন করার সিদ্ধান্ত নেন। এই পরিস্থিতিতে গণ্ডগোল চলছিল। রাস্তায় লোকজন বেরিয়ে পড়েছিল। সেটাকে কন্ট্রোল করার জন্য বিচারককে স্ট্যান্ড রিলিজ করে আদেশ দেওয়া হয় আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে। জামিন দেওয়া না দেওয়া সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। কিন্তু আদালত যদি এমন ব্যবহার করে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন, যেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনের শাসন রক্ষা প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তখন একটা ব্যবস্থা নিতে হয়। সেই অবস্থার আলোকে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।’ অত্যন্ত বৈরী ও বিরূপ পরিস্থিতিতেও আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হক বুক চিতিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় লড়েছেন ও জিতেছেন। সেই থেকে আমি আইনমন্ত্রীর গুণমুগ্ধ। অমায়িক ভদ্রলোক, ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ দেশের শীর্ষস্থানীয় একজন আইনজীবী আইনমন্ত্রী। আমার মতো আইনের শিক্ষকদের বাকি জীবন ফৌজদারি আইনের তালিম দিলেও তাঁর জ্ঞানের বহরের এতটুকু খোমতি হবে না। কিন্তু পিরোজপুরের বিচারকের তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারে  মন্ত্রী মহোদয়ের যুক্তি তাঁর স্বভাবসুলভ আচরণ ও জ্ঞানের সঙ্গে অসামঞ্জস্য বিধায় মানতে পারছি ন। কোথাও একটা গরমিল আছে, যা আমাদের মতো আমজনতার পক্ষে হয়তো কোনও দিনও জানা সম্ভব হবে না। বিচারক মো. আবদুল মান্নানের তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারে মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের যুক্তি ও সংশ্লিষ্ট কিছু ঘটনা নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে–

এক. রূঢ় ও অশালীন আচরণ এক নয়। অশালীন আচরণ দণ্ডবিধি আইনের ৩৫৪ ধারা অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। যুক্তি হিসাবে অশালীন আচরণের উল্লেখ নিতান্তই মুখ ফসকে বেরিয়ে গিয়েছে বোঝা যাচ্ছে। দুর্নীতির মামলায় জামিন নামঞ্জুর করা কি কোনোভাবেই রূঢ় আচরণ? কারাগারে পাঠানোর আদেশের পর আউয়াল ও লায়লার আইনজীবী আদালতে তাদের চিকিৎসা প্রতিবেদন তুলে ধরে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা ও ডিভিশন দেওয়ার আবেদন করলে বিচারক ডিভিশনসহ হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করার জন্য কারা কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এটা কি রূঢ় আচরণ?

দুই. রূঢ় আচরণে আইনজীবীরা অসন্তুষ্ট হলে জামিন নামঞ্জুর আদেশ মেনে নিয়ে আসামিদের হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা ও ডিভিশন দেওয়ার আবেদন কেন করলেন? আবার আবেদন গৃহীত হওয়ার পর পিরোজপুর বারের সব আইনজীবী কেন আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নেবেন? বিচারকের ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে আইনজীবীদের আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত এটিই প্রথম নয়। এর আগে এমন ঘটনায় দিনের পর দিন অচলাবস্থা চলেছে। ঘটনার তদন্ত হয়েছে। আইনজীবীদের সঙ্গে উচ্চ আদালতের বিচারকদের বৈঠক হয়েছে। তারপর প্রয়োজনবোধে বিচারককে বদলি করা হয়েছে কিংবা হয়নি। কিন্তু এবার সে ঘটনার ভয়ানক ব্যতিক্রম হলো। কেন? আসামিরা উচ্চ আদালতে জামিন না পাওয়া পর্যন্ত হাসপাতালে ডিভিশনের সুযোগ নিয়ে অবস্থান করলে কী এমন আইনের শাসন লঙ্ঘিত হতো।

বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তো মিথ্যা মামলায় কতবার জেলে ছিলেন।

তিন. মন্ত্রী মহোদয় বলেছেন রাস্তায় লোকজন বেরিয়ে পড়েছিল। সেটাকে কন্ট্রোল করার জন্য বিচারককে স্ট্যান্ডরিলিজ করে আদেশ দেওয়া হয় আইন মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবে। বিচারকের রায়, আদেশ নির্দেশ নিয়ে বহুবার ক্ষোভ-বিক্ষোভ হয়েছে,হরতাল হয়েছে, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ হয়েছে। তখন কি এরূপ তাৎক্ষণিক বিচারক প্রত্যাহার হয়েছে? সরকারি দলের না হয়ে অন্য দলের কারও জামিন যদি নামঞ্জুর হতো, বিচারক যদি আইনজীবীদের সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করতেন, রাস্তায় যদি নামঞ্জুরের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হতো, বিচারককে কী এভাবে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হতো? উত্তর, অবশ্যই না। সরকারদলীয় সাবেক সাংসদ হওয়ায় বিশেষ সুযোগ আইনের শাসনের পরিপন্থী ও সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আইনের দৃষ্টিতে সমতা নীতির লঙ্ঘন।

প্রাচীন রোমে প্রতিটি নাগরিকের পদমর্যাদা অনুযায়ী আইন ভিন্ন হতো। তাছাড়া রোমে সামাজিক পদমর্যাদা অনুযায়ী সাজার পরিমাণও ভিন্ন হতো। প্রাচীন রোমের আইন ও সাজার ক্ষেত্রে ভিন্নতা প্রচণ্ড আন্দোলনের মুখে শাসকগণ পরিবর্তন করতে বাধ্য হন। প্রয়াত বিচারপতি কায়ানি তার আত্মকথায় লিখেছেন, ‘কোনও কোনও মামলায় সেটা রাজনৈতিক আর অরাজনৈতিক হোক, রায়দানের আগে আইনমন্ত্রী বা আইন সচিবের কাছ থেকে একটা গোপন চিরকুট পেতাম। তাতে নির্দেশ থাকতো কোন পক্ষকে জয়ী করতে হবে। প্রধান বিচারপতি হওয়ার পরও এই চিরকুট পাওয়া বন্ধ হয়নি।’

এটা শুধু বিচারপতি কায়ানির অভিজ্ঞতা নয়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহবুব মোরশেদ এই চিরকুটের নির্দেশ মানতে না চাওয়ায় তাকে সরকার নানাভাবে নাস্তানাবুদ করেছিল। তাকে দুর্নীতির মামলায় জড়ানোরও ভয় দেখানো হয়েছিল। পাকিস্তানের বিচার বিভাগকে সামরিক সরকারগুলো নানাভাবে ব্যবহার করেছে। পাকিস্তানের এ নিন্দনীয় বিচারিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধেই তো স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি। স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের সেনা শাসকদের কায়দায় বাংলাদেশি সেনা শাসকরাও বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণ করে। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার বিচার বাধাগ্রস্ত করতে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার কী করেছে তা জাতি ভোলেনি। এত বছর পর এমন কাজ কেন করবো যে, বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠবে?

চার. দুর্নীতির মামলায় জামিন নামঞ্জুর কোনোভাবেই আইনের ব্যত্যয় নয়। মন্ত্রী মহোদয়ও বলেছেন, জামিন দেওয়া না দেওয়া সম্পূর্ণ আদালতের এখতিয়ার। তারপরও জামিন বিষয়কে কেন্দ্র করে বিচারকের তাৎক্ষণিক প্রত্যাহারে বিচার ব্যবস্থার স্বাধীনতা প্রশ্নের মুখে পড়ে বটে। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৬(ক) অনুচ্ছেদে বর্ণিত হয়েছে, ‘সংবিধানের বিধানাবলি সাপেক্ষে বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিগণ ও ম্যাজিস্ট্রেটগণ বিচারকার্য পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীন থাকবেন’। বিচারকর্ম বিভাগে নিযুক্ত ব্যক্তিদের বিচারকার্যে নিয়োজিতকালীন স্বাধীনতার বিষয়টি সংবিধান প্রণয়নকালীন সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত ছিল না। বঙ্গবন্ধু এটি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করেন।

পাঁচ. বিচারকের বদলির জন্য বিধিবিধান রয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃতে আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতিদের সমন্বয়ে জিএ (জেনারেল এডমিনিস্ট্রেশন) কমিটি রয়েছে। তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার আদেশে ‘সুপ্রিম কোর্টের সাথে পরামর্শক্রমে’ উল্লেখ আছে। তার মানে জিএ কমিটির সিদ্ধান্তেই প্রত্যাহার হয়েছে। প্রশ্ন হলো, জিএ কমিটি কী এত স্বল্প সময়ে বিষয়টি যথাযথ বিবেচনার (Application of Mind) যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছেন। ভারত ও বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট অসংখ্য মামলায় ‘Non-application of Mind’-এর ভিত্তিতে বহু প্রশাসনিক ও বিচারিক সিদ্ধান্তকে বাতিল করে দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০১০ সালে Prasanta Kumar Sarkar v. Ashis Chatterjee & Anr. মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বলেছেন, ‘It is manifest that if the High Court does not advert to these relevant considerations and mechanically grants bail, the said order would suffer from the vice of non-application of ...principles laid down in a plethora of decisions of this Court on the point’. ২০০৭ সালে G. Kalaiselvi v. State of T.N. মামলায় সুপ্রিম কোর্ট অভিমত ব্যক্ত করেন, ‘if the Detaining Authority proceeded on the wrong factual premise, this was nothing but a classic example of non-application of mind.”

ছয়. বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বর্ণিত আছে, ‘আইনের আশ্রয়লাভ এবং আইনানুযায়ী ও কেবল আইনানুযায়ী ব্যবহার লাভ যেকোনও স্থানে অবস্থানরত প্রত্যেক নাগরিকের এবং সাময়িকভাবে বাংলাদেশে অবস্থানরত অপরাপর ব্যক্তির অবিচ্ছেদ্য অধিকার এবং বিশেষতঃ আইনানুযায়ী ব্যতীত এমন কোনও ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে না, যাহাতে কোনও ব্যক্তির জীবন, স্বাধীনতা, দেহ, সুনাম বা সম্পত্তির হানি ঘটে।’

ন্যায়বিচারের নীতি হলো কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে তাকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে। আত্মপক্ষ সমর্থনের ক্ষেত্রে আবশ্যিক নিয়ম হলো তাকে যথাযথ নোটিশ দিতে হবে, যথেষ্ট সময় দিতে হবে, সুস্পষ্ট ভাষায় নোটিশ দিতে হবে, আনীত অভিযোগ ও অভিযোগের সমর্থনে সাক্ষ্য-প্রমাণাদি জানার ও দেখার সুযোগ থাকতে হবে, লিখিত ও মৌখিকভাবে তার বক্তব্য উপস্থাপনের সুযোগ থাকতে হবে। বিচারক মো. আবদুল মান্নান এরূপ সুযোগ পেয়েছেন বলে প্রতীয়মান হয় না। তার মানে বিচারক নিজেই ন্যায়বিচারের নীতিমালায় বর্ণিত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

সাত. বিচারক রূঢ় আচরণ করেছেন ও আইনজীবীগণ আদালত বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে বিচারককে তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার করা হয়েছে বুঝলাম। কিন্তু তার আদেশ কেন তাৎক্ষণিকভাবে পরিবর্তন করা হলো? অধস্তন বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদ হলো জেলা জজ। জেনারেল ক্লজেজ অ্যাক্টে জেলা জজের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, জেলা জজ আদি অধিক্ষেত্রের মুখ্য দেওয়ানি বিচারক। একজন জেলা জজকে দায়রা জজের ক্ষমতা অর্পণ করা হলে তিনি জেলা ও দায়রা জজ নামে অভিহিত হন। জেলা জজের অব্যবহিত নিচের পদটি হলো অতিরিক্ত জেলা জজ। জেলা জজ ও অতিরিক্ত জেলা জজের বিচারিক এখতিয়ার সমান হলেও জেলার দায়িত্বে নিয়োজিত জেলা জজের ওপর প্রশাসনিক দায়িত্ব ন্যস্ত থাকে। এ প্রশাসনিক দায়িত্বের মধ্যে জেলায় জেলা জজের নিম্নতর পদে কর্মরতদের ওপর তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত। কয়েক ঘণ্টা আগেও যিনি বিচারক মো. আবদুল মান্নানের তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে ছিলেন তাকে তড়িঘড়ি জেলা জজের বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে তাঁর চেয়ে সিনিয়র ও নিয়মিত জেলা ও দায়রা জজের রায় পাল্টানো বিচারিক রীতি-প্রথার সঙ্গে সামঞ্জ্যস্যপূর্ণ হলো কি?

তারচেয়েও গুরুতর আইনের প্রশ্ন হলো যুগ্ম জেলা জজ দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ হিসাবে দুর্নীতির মামলার শুনানি করতে পারেন কিনা, জামিন দেওয়া দূরে থাক। কারন এ বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত বিচারক হিসাবে তাঁর বিচারিক এখতিয়ার প্রশ্নাতীত নয়।

আট. দুদক মামলা করার আগে দীর্ঘ সময় নিয়ে অনুসন্ধান চালায়। তারপর অভিযোগপত্র দাখিল করে। তদুপরি আবদুল আউয়াল একজন মুক্তিযোদ্ধা। দুবার সাংসদ ছিলেন। স্ত্রী পিরোজপুর জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। তাঁর মেজ ভাই পৌর মেয়র, সেজ ভাই সদর উপজেলা চেয়ারম্যান। ছোট ভাই জেলা চেম্বার্স সভাপতি, এক ভাগনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান। এমন ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা দায়ের করাকে দুদক নিঃসন্দেহে সতর্কতার সঙ্গে সবকিছু যাচাই-বাছাই করেই মামলা করেছে। তারপরও জামিন নামঞ্জুর আদেশে আসামিরা অসন্তুষ্ট হলে প্রতিকার হলো উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়া। আইনজীবীদের প্রতি রূঢ় আচরণ হয়ে থাকলে প্রধান বিচারপতির কাছে প্রতিকার প্রার্থনা করা উচিত ছিল। তা না করে জামিন পেতে আইনজীবীদের আদালত বর্জন এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিচারকের তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার খুবই বিপজ্জনক নজির। দুর্নীতির মামলায় জামিন নামঞ্জুরকে কেন্দ্র করে বিচারকের তাৎক্ষণিক প্রত্যাহার সরকারঘোষিত দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির পরিপন্থী। এভাবে বিচারক নাজেহাল হওয়ায় অন্য বিচারকদের কাছে ভয়ের বার্তা পৌঁছে গেলো।
গত বছর সেপ্টেম্বরে রাজধানীতে শুরু হওয়া ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক ব্যক্তি তালিকাভুক্ত হয়েছেন। দুদকের দায়ের করা ২৯ মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন যুবলীগের বহিষ্কৃত নেতা সম্রাট, খালেদ, জি কে শামীমসহ অন্তত ৬১ জন। অন্যদিকে চাঁদাবাজি, মানিলন্ডারিং, দখল, টেন্ডারবাজিসহ নানা অপরাধে ক্যাসিনো তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে সিআইডির পক্ষ থেকেও প্রায় ৫০টি মামলা করা হয়েছে। অনেক মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিটও দেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে বিচার বিভাগের একটি বড় ভূমিকা আছে মনে রাখতে হবে। দুর্নীতিবাজরা লাই পেলে দুর্নীতি প্রতিরোধ হবে কীভাবে? আবদুল আউয়াল জামিন পাওয়ার পর তার সমর্থকরা মিছিল করেছেন দুর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।

যাহোক, একটি ঘটনা দিয়ে আমি পুরো বিচার বিভাগীয় কর্মকাণ্ডকে বিচার করতে রাজি নই। যা হয়েছে তদন্ত করে তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে। আত্মসমালোচনা করে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে হবে যেকোনও মূল্যে। প্রয়োজনে বিধিবিধান তৈরি করতে হবে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধে। বিচার বিভাগ সর্বশেষ আশ্রয়স্থল। এ জায়গাটা ধ্বংস করবেন না। হাকিম ও হুকুম দুটোই যদি নড়ে তাহলে রাষ্ট্র ও সমাজের ভিতটাই নড়বড়ে হয়ে যাবে।

লেখক:  অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ