‘সুলতানি’ গেলেও ‘সালতানাত’ যায় না

Send
মোস্তফা কামাল
প্রকাশিত : ১৯:০৫, মার্চ ১৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৪, মার্চ ১৮, ২০২০

মোস্তফা কামালগভীর রাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত চালিয়ে সাংবাদিককে নির্যাতন ও কারাদণ্ড দেওয়ার দোষে কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন, সিনিয়র সহকারী কমিশনার-আরডিসি নাজিম উদ্দীনসহ চার জন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার কোন মানের শাস্তি? প্রত্যাহার হওয়া বাকি দু’জন হলেন সহকারী কমিশনার রিন্টু বিকাশ চাকমা ও এসএম রাহাতুল ইসলাম। চার জনকেই কুড়িগ্রাম থেকে প্রত্যাহার করে পরবর্তী পদায়নের লক্ষ্যে মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। এ ধরনের প্রত্যাহার পরবর্তী ধাপ সচরাচর নতুন পোস্টিং।
প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকায় বা আরেক জেলায় গিয়ে কি অন্য কাজ করবেন তারা? এভাবেই পেটাবেন সাংবাদিক বা অন্য কাউকে। ক্ষমতার অপব্যবহারই করবেন।
এই নাজিম উদ্দিন এর আগে বাগেরহাট ও কক্সবাজারে থাকাকালে কথায় কথায় মোবাইল কোর্ট বসিয়ে মানুষের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে বলে গণমাধ্যমে প্রকাশ হচ্ছে। বাগেরহাটে থাকাকালীন সেখানেও কথায় কথায় ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে মানুষকে হয়রানিসহ ত্রাস সৃষ্টি করেছেন। এজন্য ওই দুই জেলার মানুষ তাকে ‘মোবাইল ম্যাজিস্ট্রেট’ নামে চেনেন। কক্সবাজারে তার নাম ঘুরেছে মানুষের মুখে মুখে। কক্সবাজার সদরের এসিল্যান্ড থাকাকালে ২০১৮ সালে মে মাসে রোজাদার এক বৃদ্ধকে লাথি মেরে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলেন তিনি। মাটিতে পড়ে থাকা বৃদ্ধের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে গায়ের ওপর বসে তিনি কিল ঘুষিও মেরেছিলেন। প্রকাশ অযোগ্য অশ্রাব্য গালিগালাজ তো ছিলই। এই ঘটনার ভিডিও প্রকাশ হয়েছিল সেই সময়। ‘স্যার’ না ডাকায় এক সংবাদকর্মীকে লাঞ্ছিতও করেন তিনি।

আরেক বৃদ্ধকে কান টেনে শার্টের কলার ধরে তিনি টেনেহিঁচড়ে ধরে নিয়ে যান। নিজ অফিসে দরজা বন্ধ করে খালি স্ট্যাম্পে দস্তখত নেন তার। এরপর মিথ্যা জবানবন্দি আদায় করেন। উৎপাতের মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় সেখান থেকে নাজিম উদ্দিনের ‘সুলতানি’ বদল হয়। কিন্তু  ‘সালতানাত’ যায়নি। কুড়িগ্রামে ‘সালতানি’ পেয়ে তরক্কি আরও বেড়ে যায় ডিসি সুলতানা পারভীনের আশীর্বাদে। মধ্যরাতে আদালত বসিয়ে কুড়িগ্রামের সাংবাদিক আরিফকে পিটিয়ে আধমরা করে কারাদণ্ড দেওয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট হয়েছে। আমার কথা হলো, জনসমাজে মোবাইল কোর্টের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে আরও আগেই। নাজিম উদ্দিনের মতো ভ্রাম্যমাণ বিচারের দণ্ডমুণ্ডের ক্ষমতাবানরা বিভিন্ন জায়গায় এর যথেচ্ছ অপপ্রয়োগ করেছেন। ছোট-বড় ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন মহলকে বিষিয়ে তুলেছেন।

প্রতিবছর সারাদেশের ডিসিদের নিয়ে সম্মেলন হয়। সেই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীসহ মন্ত্রী পরিষদের সদস্যরা অংশ নেন। সেখানে ডিসিরা নানা আইন ও বিধান পরিবর্তন করে নিজেদের ক্ষমতায়িত করতে চান। বিচারিক ক্ষমতাও তারা দাবি করেন। কুড়িগ্রামের ডিসির কর্মকাণ্ডকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার উপায় নেই। কুড়িগ্রাম বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। সুলতানা, নাজিমরাও দেশ এবং প্রশাসন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং অবিচ্ছেদ্য। এরপরও একেবারে সমবৈশিষ্ট্যের যেমন ডিসি সুলতানা, তেমন আরডিসি নাজিম কুড়িগ্রামে গিয়ে জুটলেন কীভাবে? ছোট হলেও প্রশ্ন কিন্তু গুরুতর। এমসিকিউতে একবাক্য বা শব্দে এ প্রশ্নের জবাব মিলবে না। কেউ কেউ বলতে চান, অবারিত ক্ষমতা তাদের নেতিবাচকভাবে মহারথী-মহামহিম করে তোলে। কাউকে কাউকে দানবও করে তোলে। সুলতানা-নাজিম ক্যামেস্ট্রি একত্র হওয়ায় কুড়িগ্রামে অ্যাকশন-বিস্ফোরণটা একটু বেশি হয়েছে। এই সফ্টওয়্যারের অস্তিত্ব প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়েই রয়েছে। এর জোসেই তাদের কেউ পুকুর কাটেন। কেউ রাষ্ট্রীয় টাকায় পুকুর কাটা-ভরাট দুটোই শেখার অভিজ্ঞতার নামে বিদেশে ‘প্লেজার ট্যু’র দেন। এই সুলতান-সুলতানারা একই গোত্রের।

বেদম মারধরের পর মাদকবিরোধী অভিযানে মধ্যরাতে আটক। মধ্যরাতেই নগদ বিচার। অধূমপায়ী আরিফের কাছ থেকে মদ-গাঁজা রাখার স্বীকারোক্তি আদায় করে ছাড়া হয়েছে। এরপর এক বছরের কারাদণ্ড। ভাবা যায় কোনও রকমফেরে এসে ঠেকেছে সাংবাদিক নিপীড়ন? স্ত্রী মোস্তারিমা সরদার নিতুর বর্ণনায় উঠে এসেছে সংবাদকর্মী আরিফের ওপর মধ্যরাতে চলা নির্যাতন ও ম্যাজিস্ট্রেটসহ সংশ্লিষ্টদের ‘হেডম’ দেখানোর বীভৎস্যতা। গভীর রাতে বাড়ির দরজা ভেঙে দস্যুতার মতো ঘরে ঢোকে দুটি ছোট্ট শিশু আর স্ত্রীর সামনে চোখ বেঁধে তাকে লাথি-থাপ্পড়, ঘুষি মারতে থাকে তারা। জলে থেকে কুমিরের সঙ্গে লড়স, অনেক জ্বালাচ্ছিস− বলে মারতে মারতে নিয়ে যায় আরিফকে। এরপর তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে এনকাউন্টার দিতে চান। এ সময় আরডিসি নাজিম বারবার বলেন, তুই কলেমা পড়ে ফেল, তোকে এনকাউন্টার দেওয়া হবে।

ওই সময় আরিফ যা‌তে কারও সাহায্য না পায় সেজন্য তার বাসার বাইরে ও আশপা‌শের বাসাগু‌লোর সাম‌নে পাহারায় ছিল আরও ১০-১৫ জন। নির্যাতন চলে ডিসি অফিসে নিয়েও। সেখানে চোখ বেঁধে উলঙ্গ করে পেটানো হয়েছে। সেই দৃশ্য আবার ভিডিও করা হয়েছে।

সাংবাদিক আরিফুল ইসলাম এর আগে কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীনের বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি সংবাদ করেছিলেন। এ নিয়ে কিছু দিন ধরে তাকে নতুন আর কোনও নিউজ না করতে শাসানো হয়েছিল। এরমধ্যে একটি হচ্ছে কাবিখার টাকায় শহরের একটি সরকারি পুকুর সংস্কারের পর জেলা প্রশাসক সুলতানা পারভীন নিজের নামানুসারে ‘সুলতানা সরোবর’ নামকরণের চেষ্টা। তবে শেষ পর্যন্ত সেই নামকরণ করা হয়নি। এছাড়া কুড়িগ্রামের মোবাইল কোর্টকে ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহার করা নিয়েও তিনি নিউজ করেছিলেন। আরেকটি খবরের বিষয়ে তিনি খোঁজ-খবর নিচ্ছিলেন। বুঝতে কারোরই বাকি থাকে না কোন পাপে আরিফের এ শাস্তি। ক্ষমতার অপপ্রয়োগেরও একটি ছোট নমুনা। এরপরও এক অর্থে তার ভাগ্য ভালো। আরিফকে মারধর করেছে কিন্তু মেরে ফেলেনি।

কর্মটি স্বেচ্ছাচারী হলেও ‘সুলতানা সরোবর’ নাম বাছাইর মধ্য দিয়ে তার বেশ কাব্যিক মানসিকতার পরিচয় মেলে। এমন সৌন্দর্য পিয়াসী নারীর কীভাবে মধ্যরাতে একজন সাংবাদিককে তার অফিসে নিয়ে এসে উলঙ্গ করে নির্যাতনের নির্দেশ দেওয়ার বিকৃত খেয়াল চাপলো?

আরিফের জামিন নিয়েও ‘ক্যারিকেচা’র কম করেননি তারা। শনিবার রাতে কারাগারে ওকালতনামা পাঠিয়ে আরিফকে তার পরিবার জামিনের আবেদন করেছে জানিয়ে এতে স্বাক্ষর দিতে বলে। পরদিন রবিবার দুপুরে মুক্তি পেয়ে আরিফ বেরিয়ে এসে জানতে পারেন তার পরিবার জামিনের আবেদন করেনি। স্থানীয় সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, সারাদেশে সাংবাদিকদের প্রতিবাদ এবং প্রশাসনের ওপর মহলের চাপে কিছুটা কাবু হয়ে পাল্টা চাতুরি করেছেন সুলতানা-নাজিমরা। তারাই একান্তভাবে আরিফের জামিনের বন্দোবস্ত করেছেন।

আধাবোতল মদ দিয়ে ধরার সময় এটাকে জব্দ দেখিয়ে মাদক আইনে মামলা করে দেওয়ার নির্দেশ পালনে অতি উৎসাহের কারণে ঘটনা প্যাঁচ খেয়ে যায়। উল্টাপাল্টা হয়ে যায় পরিস্থিতি। সেটা সামলাতে গিয়ে মোবাইল কোর্ট, রায়, জেল-হাজত- সব রাতেই করতে হয়।

সুলতানার অর্থ হলো সালতানাতের মালিক, রানি, শাসক, ক্ষমতাবান ইত্যাদি। ক্ষমতার দম্ভে সরোবর তৈরির স্বপ্ন দেখা ডিসি সুলতানা পারভীন, ‘ড্যাশিং হিরো’ আরডিসি নাজিম উদ্দিনরা একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ সেপিঠ। প্রজাতন্ত্রের ‘সুলতান’ তারা। কপালের ফেরে বেসরকারি সালতালাত চালান পাপিয়া, সম্রাট, খালেদরা। ক্ষমতা, দম্ভ এবং হাঁকডাকে অভিন্ন তারা। উৎসও কাছাকাছি। তাদের সুলতানি গেলেও সালতানাত যায় না। একের পর সালতানাতে অভিষেক হয় আরেকজনের। প্রত্যাহার মোটেই আইনি শাস্তি নয়। ওএসডি-ও নয়। বিভাগীয় মামুলি পদক্ষেপ মাত্র।

প্রত্যাহার বা ক্লোজের নামে সরকারি কর্মকর্তারা নতুন পোস্টিংয়ের ফিকির করেন। কিন্তু, কুড়িগ্রামের ঘটনা যেনতেন অপরাধ নয়। ফৌজদারি অপরাধের চেয়েও ভয়াবহ।

লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট; বার্তা সম্পাদক, বাংলাভিশন

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ