মৃত্যুদূত হয়তো আপনার পাশেই আছে

Send
আবদুল মান্নান
প্রকাশিত : ১৬:২১, মার্চ ২৫, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২২, মার্চ ২৫, ২০২০

আবদুল মান্নানকরোনাভাইরাস জনিত একটি রোগ সারা বিশ্বকে ওলট-পালট করে দিচ্ছে। যার শুরুটা হয়েছিল চীনের উহান প্রদেশে, এখন এই ভাইরাসের বিশ্বায়ন ঘটেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে আজ পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ১৯৫টি দেশ। চীনের পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক হয়ে এসেছে বলে তারা দাবি করছে। এই পর্যন্ত তামাম বিশ্বের প্রতিটি মহাদেশে তা আঘাত করেছে এবং বিশ্বের প্রায় সকল দেশের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির করে দিয়েছে। সকল দেশের বিমানবন্দর কার্যত বন্ধ, অনেক শহরে কারফিউ জারি করা হয়েছে অথবা সাধারণ মানুষকে রাস্তায় বের না হতে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিনা কারণে পরামর্শ অমান্য করলে মিলছে অর্থদণ্ড, বেত্রাঘাত ও জেল। এক দেশ থেকে অন্য দেশ, এক শহর থেকে অন্য শহর, এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কয়েকদিন আগে ইতালিতে নয়জন বাংলাদেশিকে বাড়ির বাইরে যাওয়ার অপরাধে প্রতিজনকে তিনশ’ ইউরো করে জরিমানা করা হয়েছে। কুয়েতের কোনও কোনও শহরে যারা চলাচলের নিষেধাজ্ঞা মানতে চাইছে না, তাদের দশ ঘা বেত্রদণ্ড দিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে, অন্যথায় মিলছে কারাদণ্ড। মধ্যপ্রাচ্যের অনেক মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়া বন্ধ করা হয়েছে। পবিত্র কাবাগৃহ তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ করা হয়েছে বেশ কয়েকদিন আগে। গত শুক্রবার পবিত্র মক্কা নগরীর কাবাগৃহে ও মসজিদে নববিতে আজান হয়েছে, কিন্তু সাধারণের জন্য জুমার নামাজ হয়নি। অন্যান্য মসজিদেও একই অবস্থা। এটি অনেকটা অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। আরব ভূমির অনেক দেশে ১০ মিনিটের মধ্যে ফরজ নামাজ শেষ করে মসজিদ ত্যাগ করতে হচ্ছে। সরকারি হুকুম। ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে আগেই মসজিদে জুমার নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। খ্রিস্টানদের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস ভ্যাটিকানে বারান্দা হতে আর প্রতিদিন জমায়েত হওয়া হাজার হাজার খ্রিস্টধর্মের অনুসারীদের ঈশ্বরের বাণী শোনান না, কারণ সেখানে মানুষ জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। থাইল্যান্ডের বড় বড় বৌদ্ধ মন্দিরে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ভারতের অনেক প্রাচীন মন্দিরসহ দর্শনীয় স্থানগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেক দেশে হোটেল রেস্তোরাঁ খদ্দরের অভাবে বন্ধ রয়েছে। কোনও কোনোটিকে আবার আপৎকালীন হাসপাতালে রূপান্তর করা হয়েছে। এই ঘাতক ভাইরাস ছাড়ছে না রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, সেনাপ্রধান, মন্ত্রী, খেলোয়াড় বা বড় বড় ধনকুবেরকে। সারা বিশ্বে একমাত্র বন্ধ হয়নি একটি মাত্র প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল আর চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িতরাই নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সকল মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তারাই এখন সারা বিশ্বের প্রকৃত নায়ক। বিশ্বের বড় বড় বিমান সংস্থা দেউলিয়া হওয়ার পথে। আর এসব ঘটছে একটি আপাত শান্তিপূর্ণ বিশ্বে।

এই রোগটির কোনও প্রতিষেধক বা চিকিৎসা এখন পর্যন্ত উদ্ভাবন হয়নি। বিকল্প ব্যবস্থা ভারতে গোমূত্র ও গরুর গোবর খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে কোনও কোনও অঞ্চলে। হ্যান্ড স্যানিটাইজার হিসেবে কোথাও আবার গোমূত্র বিক্রিও হচ্ছে। কলকাতায় গোমূত্রের সঙ্গে খাসির মূত্রের ভেজাল ছিল বলে একজনকে আবার গণধোলাই দিয়েছে জনগণ। যেহেতু রোগটি সংক্রামক বলে চিহ্নিত, সেহেতু এই রোগ হতে বাঁচার অন্যতম উপায় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন নিজে সতর্ক হওয়া আর অন্যের সঙ্গে সংস্পর্শ এড়িয়ে চলা। বাংলাদেশে সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বাড়ি থেকে অনেকে অফিস করছেন। ২৬ মার্চ থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত দেশের সকল সরকারি অফিসে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। খোলা থাকবে শুধু জরুরি সেবা সংস্থা, ব্যাংক, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দোকান। যারা ছুটি পেয়েছেন তারা এই ছুটিকে ঈদের ছুটি জ্ঞান করে বাড়ির দিকে ছুটেছেন। এর একটা মারাত্মক বিপর্যয়কর ফল হতে পারে এই ভয়াবহ রোগের বিকেন্দ্রীকরণ। আক্রান্ত হতে পারেন গ্রামে বসবাসরত পরিবারের সদস্যরা। সরকারের উচিত ছিল আগে সকল ধরনের গণযোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ করে তারপর ছুটি ঘোষণা করা।

যদিও এই ভাইরাসজনিত রোগটির উৎপত্তি চীন দেশে, এই রোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইতালি আর ইরান। সারা বিশ্বে ২৪ মার্চ রাত পর্যন্ত ১৮ হাজার দুই শত মানুষের মৃত্যু হয়েছে এই ভাইরাসে, যার মধ্যে ইতালিতে সংখ্যা ছিল ছয় হাজারের ওপর। বিশ্বে আক্রান্ত হয়েছে চার লাখ। সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এক লাখ পাঁচ হাজার। মৃত্যুর যাত্রা শুরু হয়েছিল ২২ জানুয়ারি। ইরানে প্রতি দশ মিনিটে একজনের মৃত্যু হচ্ছে। মনে করা হচ্ছে, এই রোগের সাধারণ শিকার অপেক্ষাকৃত বেশি বয়সীরা যার কারণে ইতালি, যুক্তরাজ্য সহ ইউরোপের বেশিরভাগ হাসপাতালগুলো সত্তরোর্ধ্ব বয়সের রোগীদের চিকিৎসা দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। ছয় কোটি মানুষের দেশ ইতালির মোট জনসংখ্যার ২৩ ভাগ মানুষের বয়স ৭০ বছরের ঊর্ধ্বে। সমগ্র ইউরোপে ইতালির মতো এত বয়স্ক মানুষ আর কোনও দেশে নেই। ইতালিতে কয়েক লাখ বাঙালির বসবাস, যার একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অবৈধ উপায়ে ইতালিতে পৌঁছেছেন। ইতালিতে যখন পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করা শুরু হয়েছে, তখন ইতালি হতে কয়েক শত বাংলাদেশি দেশে ফেরেন। সরকার আগে হতেই ঘোষণা দিয়েছিল দেশে ফেরার পর পরীক্ষা করার জন্য বিদেশ ফেরতদের আশকোনা হজ ক্যাম্পে সাময়িকভাবে রাখা হবে। কথামতো তাদের সেখানে নেওয়া হলে শুরু হয় যত বিপত্তি। বুঝতে হবে বাংলাদেশের জন্য এটি একটি নতুন অভিজ্ঞতা। ব্যবস্থাপনায় ভুল-ভ্রান্তি হতেই পারে। প্রবাসীরা সম্ভবত হজ ক্যাম্পে তারকাখচিত সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাশা করেছিল। তা না পেয়ে তারা সেখানে হৈ চৈ ফেলে দেয়, পুলিশের সঙ্গে চরম অসদাচরণ করে এমনকি একজন তরুণ বাংলাদেশকে অত্যন্ত খারাপভাবে গালাগাল করে যা অনেকটা রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। বাংলাদেশ যদি তাদের গ্রহণ না করতো বা দেশে ফিরতে না দিতো, তাহলে তাদের এতদিনে ইতালিতে চরম দুর্ভোগের মধ্যে বাস করতে হতো। এই মুহূর্তে ইতালিতে কমপক্ষে দুই লাখ বাংলাদেশি আছে যাদের কোনও বৈধ কাগজপত্র নেই। ইতালি সরকার তাদের দেশের নাগরিকদের কিছু আর্থিক ও অন্যান্য সহায়তা দিচ্ছে, যা এই বাংলাদেশিরা বা অন্যান্য দেশের অবৈধ অভিবাসীরা পাবেন না। গত শনিবার নব্বই জন ভারতীয় নাগরিক নেদারল্যান্ডস থেকে বিমানযোগে দিল্লি পৌঁছালে তাদের দিল্লিতে নামতে না দিয়ে পুনরায় নেদারল্যান্ডসে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। সপ্তাহখানেক আগে কাতার এয়ারওয়েজের একটি বিমান সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বাংলাদেশি ভর্তি যাত্রী নিয়ে দোহা হতে ঢাকা পৌঁছালে তাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ঢাকা নামতে দেওয়া হয়। এই পর্যন্ত গত তিন মাসে প্রায় সাত লাখ বাংলাদেশি দেশে ফিরেছেন। পাকিস্তান সরকার তাদের কোনও নাগরিককে অন্য দেশ থেকে ফিরিয়ে আনার কোনও উদ্যোগ নেয়নি। এই তিন মাসে যারা বিদেশ থেকে ফিরেছেন তারা প্রত্যেকজন হতে পারেন এক একটি ভয়াবহ টাইম বোমা। তাদের ও সাধারণ মানুষের অসতর্কতার কারণে বাংলাদেশে ঘটে যেতে পারে যে কোনও ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়, যার ফলে হাজার হাজার মানুষ বিপদগ্রস্ত হয়ে উঠতে পারে, যেমনটি ঘটেছে ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার ক্ষেত্রে।

করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি নিয়েছিল ইতালি। তবে একটি ভুলের কারণে আজ ইতালিতে মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। প্রথম দিকে করোনাজনিত সমস্যা মোকাবিলায় পারদর্শিতা দেখিয়ে ইতালি সারা ইউরোপে প্রশংসিত হয়েছিল। সে সময় এই ভাইরাসে যারাই আক্রান্ত হয়েছে তারা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। কিন্তু দেশটির মিলান শহর হতে ষাট কিলোমিটার দূরের কডোনা শহরে করোনা সংক্রমিত এক বাসিন্দা হাসপাতালে ভর্তির আগে কোনও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেননি। উপসর্গ সম্পর্কে তিনি বা তার পরিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সঠিকভাবে অবহিত করেননি। এর ফলে করোনাভাইরাসবাহী ওই রোগীর কারণে হাসপাতালটির অন্যান্য রোগী ও কর্মীদের মাঝে তা দ্রুত ছড়িয়ে পরে। তারপরের ইতিহাস তো একটি সমগ্র দেশের মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠার ইতিহাস। আমাদের বাংলাদেশি ভাইয়েরা যারা ইতালি বা অন্যান্য দেশ থেকে দেশে ফিরে বাংলাদেশের মা-বাপ তুলে গালাগাল করেন তারা কি এসব তথ্য জানেন? জেনেও না জানার ভান করে তারা শুধু নিজেদের পরিবার বা এলাকার মানুষকে বিপদগ্রস্ত করে তুলছেনই না, তারা সারা দেশের ১৭ কোটি মানুষকে বিপদগ্রস্ত করে তুলছেন।

দক্ষিণ কোরিয়ার ঘটনাও অনেকটা একই রকম। তাদের প্রথম করোনা ভাইরাস রোগী শনাক্ত করা হয় ২০ জানুয়ারি। তিনি একজন ৩৫ বছর বয়সী নারী। তিনি চীনের উহান প্রদেশ থেকে সিউল বিমানবন্দরে অবতরণ করেন ওই দিন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে সেলফ কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়। এর পরের একমাসে মাত্র ত্রিশজন করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত করা হয়। সবাই হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে ভালো হয়ে বাড়ি ফেরেন। দক্ষিণ কোরিয়ার এহেন তাক লাগানো সফলতা দেখে সবাই বেশ খুশি। ফেব্রুয়ারির ৬ তারিখ একজন মাঝবয়সী নারী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নেন নিকটস্থ ডায়গু শহরের হাসপাতালে। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৯ ও ১৬ ফেব্রুয়ারি তিনি একটি গির্জায় যান প্রার্থনা করতে। এর মাঝে ১৫ তারিখ তার জ্বর ধরা পরে। ডাক্তাররা তাকে করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করতে পরমর্শ দেন এবং তাকে একই সঙ্গে সেলফ আইসোলেশনে (কারও সঙ্গে দেখা করবেন না, কথা বলবেন না, অন্য কাউকে স্পর্শ করবেন না) থাকার নির্দেশ দেন। এসব পরামর্শ উপেক্ষা করে তিনি ১৬ তারিখ তার এক বন্ধুর সঙ্গে একটি রেস্তোরাঁয় যান দুপুরের খাবার খেতে। ১৭ তারিখ ওই নারীর অবস্থার অবনতি হলে তিনি করোনা ভাইরাসের জন্য পরীক্ষা করান। ১৮ তারিখ ফলাফল আসলে দেখা যায় পরীক্ষায় পজিটিভ অর্থাৎ তিনি এই ভাইরাসে আক্রান্ত। তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার রোগী নম্বর একত্রিশ। এর কয়েকদিনের মধ্যেই সমগ্র দক্ষিণ কোরিয়ায় এই ভাইরাস জ্যামিতিক হারে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম ধাক্কায় দেখা যায় ওই নারী যে গির্জায় প্রার্থনা করতে গিয়েছিলেন সেখানে দুই দফায় ৯ হাজার ৩০০ জন মানুষ উপস্থিত ছিল, যাদের ১ হাজার ২০০ জন এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন। রেস্তোরাঁয় কতজন উপস্থিত ছিল তার সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ায় মোট এক লাখ একুশ হাজার এই রোগে আক্রান্ত হয়েছে, যার মধ্যে মৃত্যুবরণ করেছে ৪ হাজার ৩০০ জনের মতো। মনে রাখতে হবে দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যা পাঁচ কোটির সামান্য বেশি।  

বাংলাদেশের জনসংখ্যা বর্তমানে ১৭ কোটির বেশি। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ অঞ্চল। গত তিন মাসে বিদেশ থেকে যারা দেশে ফিরেছেন তাদের একটি বড় অংশ ইতালি ও ইউরোপের অন্যান্য একাধিক দেশ থেকে এসেছেন। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যতক্ষণ পর্যন্ত নিশ্চিত হওয়া না যাচ্ছে ধরে নিতে হবে তারা প্রতিজনই করোনার মতো একটি ভয়াবহ রোগের ফেরিওয়ালা। সরকার তাদের বাড়িতে দুই সপ্তাহের মতো বন্দি জীবনযাপন করতে বলেছেন। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই সরকারের এই নির্দেশ মানছে বলে মনে হয় না। কেউ গিয়ে বসছেন বিয়ের পিঁড়িতে, কেউ বউ বাচ্চা নিয়ে হাওয়া খেতে হয় কক্সবাজার যাচ্ছেন, আর কেউ কেউ ক’দিন জামাই আদরে থাকার জন্য পরিবারসহ যাচ্ছেন শ্বশুরবাড়ি। কোনও কোনও এলাকায় প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের এসব কাজে বাধা দিতে গেলে হচ্ছেন অপদস্থ। এই অবস্থায় এগিয়ে আসতে হবে এলাকার মানুষকে। নির্মম শোনালেও সত্য এদের প্রত্যেককে চিহ্নিত করতে হবে তাদের পরিবারের একাধিক ব্যক্তির সম্ভাব্য ঘাতক হিসেবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা এসব মানুষকে নিবৃত্ত করতে এলে তাদের সহায়তা করা ছাড়া আর কোনও বিকল্প তাদের কাছে নেই। তারা এই মুহূর্তে তাদের পরিবারের নীরব ঘাতক হয়ে উঠতে পারেন। বিপদের কারণ হতে পারেন এলাকাবাসীর এবং সর্বশেষ দেশের। আর সরকারকেও আরও কঠোর হতে হবে। সরকারের সস্তা জনপ্রিয়তার প্রয়োজন নেই। কিছুদিনের জন্য রাতে ও দিনের একটা সময়ের জন্য কারফিউ জারি করে দেখা যাক না। জনগণ বেশি বেয়াড়া হলে তাদের শান্ত করার অনেক ওষুধ সরকারের ঝুলিতে আছে। ইতোমধ্যে সরকার বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করার জন্য সেনাবাহিনীকে মাঠে নামিয়েছে। ধরে নিতে হবে অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও একটি চরম অস্বাভাবিক পরিস্থিতি চলছে। এই পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য সরকারের কঠোর হওয়া ছাড়া অন্য কোনও উপায় আপাতত দেখা যাচ্ছে না।  

সব শেষে কাছের দেশ মালয়েশিয়ার কথা বলে শেষ করি। ওই দেশে এই পর্যন্ত ১ হাজার ৬২৪ জনের মতো মানুষ করোনা রোগে আক্রান্ত হয়েছেন, যার অর্ধেকই কিছুদিন আগে তাবলিগ জামাতের ইজতেমায় যোগ দিয়েছিলেন। এই পর্যন্ত সেই দেশে ১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। তাবলিগ জামাত এই কাজটি ইন্দোনেশিয়া এবং ব্রুনাইতেও করেছেন। সেই সব দেশেও একই অবস্থা। বাংলাদেশেও এক শ্রেণির ধর্মান্ধ মানুষের চিন্তাভাবনা এদের মতোই। অথচ হাদিসে পরিষ্কার বর্ণিত আছে, এমন পরিস্থিতি এড়িয়ে চলতে। ঈমানের চর্চা ঘরে বসেও করা যায়। সৃষ্টিকর্তা সব স্থানে বিরাজ করেন।

শুরু হতেই দেশের এক শ্রেণির মানুষ সরকারকে নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়া শুরু করলো। এদের বেশিরভাগই বিশ্বের বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয় ‘ফেসবুক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র’। বিশ্বের এমন কিছু নেই যেই বিষয়ে তারা মন্তব্য করতে পারেন না। কেউ কেউ মন্তব্য করলেন বাংলাদেশের উচিত ছিল আকাশ পথ বন্ধ করে দিয়ে বিদেশ থেকে যাতে কেউ দেশে ফিরতে না পারে, তার ব্যবস্থা করা যা পাকিস্তান করছে। তা করলে চারিদিকে মাতম উঠতো ‘এ কেমন নির্দয়, সরকার নিজ দেশের মানুষকে বিপদের মুখে রেখে বিমান চলাচল বন্ধ করে দিলো’। একদল সবকিছুর মধ্যে সেনাবাহিনীকে টেনে আনতে চায়। বলে ‘এই সময় সেনাবাহিনীকে মাঠে নামানো উচিত কারণ বাঙালি ডান্ডা ছাড়া কিছু বুঝে না’। একটি গণতান্ত্রিক দেশে যখন তখন সেনাবাহিনী নামানো যায় না। আর সবকিছুতেই যদি সেনাবাহিনী নামাতে হয় তাহলে সিভিল প্রশাসন আছে কেন? ‘বুঝলেন না ভাই মুজিববর্ষ পালন করতেই তো চারশত কোটি টাকা শেষ করে দিয়েছে। হাসপাতালের প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনবে কোথা হতে’। মুজিববর্ষ পালন করার জন্য চারশত কোটি টাকা বাজেট হয়তো করা হয়েছিল। বাজেট করা আর খরচ করার মধ্যে পার্থক্য বোঝার মতো সামর্থ্য এই নাদানদের মধ্যে নেই। আর এক দল বাচ্চাদের স্কুল কেন বন্ধ হচ্ছে না এই বলে হুলুস্থুল বাধিয়ে দিলো। অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের নিয়ে চিন্তিত থাকবেন তা স্বাভাবিক। কিন্তু যে না স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করা হলো সবাই এটাকে করোনা ভেকেশন ভেবে ছুটলেন কক্সবাজার, রাঙামাটি আর সিলেটে। সরকার বললেন ‘বিদেশ থেকে এসেছেন দু’সপ্তাহ বাড়ি হতে বের হবেন না’। জবাব, ‘আমার বাড়ি হতে বের হবো তাতে সরকারের বলার কী আছে? আর এতদিন পর এসেছি একটু আত্মীয় স্বজনদের খবরতো নিতেই হয়’। সরকার হতে বলা হলো কোনও অবস্থাতেই গণজমায়েত করা যাবে না। প্রয়োজনে সব নামাজ বাড়িতে পরবেন। জবাব এলো ‘ইহুদি নাসারাদের কথা শুনে সরকার এখন আল্লাহর বান্দাদের মসজিদে যেতে নিষেধ করছে’। যখন বলা হলো পবিত্র কাবা ও মসজিদে নববিসহ আরব ভূমির সকল মসজিদে নামাজ বন্ধ করা হয়েছে। জবাব একটাই, ‘ইহুদি নাসারাদের কথা অনুযায়ী এসব দেশের হুকুমত চলছে’।

একবারও ভেবে দেখছে না এসব ‘ইহুদি নাসারাই’ গবেষণা করছে এই রোগের ওষুধ বের করার। কোনও কাটমোল্লা নয়। জামায়াতের একজন নেতা গবেষণা করে বের করলেন, শেখ হাসিনা ভারতের নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বন্ধুত্ব করার কারণে বাংলাদেশে এই করোনা ভাইরাস আক্রমণ করেছে। তিনি বললেন না, এই ভাইরাস কেন সৌদি আরবসহ বিশ্বের প্রায় সব মুসলিম দেশে আক্রমণ করেছে। একজন পণ্ডিত আক্ষেপ করে বললেন, বাংলাদেশ নাকি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারী দেশ। তা যদি সত্য হয় তাহলে কেন তারা পারছে না মাস্ক বা অনুরূপ জিনিস বানাতে। তিনি হয়তো একটি পোশাক তৈরির কারখানাকে পাড়ার দর্জির দোকান মনে করেছেন। তিনি হয়তো জানেন না একটি গাড়ি প্রস্তুতকারী কারখানা সহজে একটা স্ক্রু ড্রাইভার বানাতে পারে না। বাস্তবতা হচ্ছে দেশে যা কিছু ঘটে তার জন্য সরকারকে দোষ দিতেই হবে। নিজেরা কোনও দায়িত্ব নিতে নারাজ। তবে এটা স্বীকার না করলে অন্যায় হবে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ব্যবস্থাপনা ছিল বেশ দুর্বল আর পুরো ব্যবস্থাপনাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল কিছু আনাড়ি মানুষের হাতে। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সবকিছু একা সামাল দেওয়া সম্ভব নয়, আর তার পক্ষে সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাও সব সময় জানাও সম্ভব নয়। সাধারণ মানুষ কিছু মন্ত্রীর অতিকথন বা অপ্রয়োজনীয় বক্তব্যে অসম্ভব বিরক্ত হন। অনেকে মনে করেন, এই মুহূর্তে যারা মন্ত্রিসভায় আছেন, তাদের চেয়ে অনেক যোগ্য বিকল্প ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর সামনে আছেন। ১৭ কোটি মানুষের দেশে প্রধানমন্ত্রীর টিমের যদি যোগ্য মানুষের অভাব থাকে তাহলে সেই টিম বদলে ফেলা ভালো।

সবাই সুস্থ থাকুন, পরিবারের সদস্যদের নিরাপদে রাখুন, অন্যকে নিরাপদে থাকতে সাহায্য করুন। এমন মৃত্যু আলিঙ্গন করবেন না যেখানে আপনার জানাজায় নিজ পরিবারের সদস্যরাও অংশ নিতে পারবেন না।

লেখক: বিশ্লেষক ও গবেষক



/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ