ক্ষুধার মহামারি!

Send
আসিফ সালেহ
প্রকাশিত : ২১:৪৯, এপ্রিল ০২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৪, মে ০১, ২০২০

আসিফ সালেহঢাকার রাস্তায় এখন একরকমের গা ছমছমে নীরবতা। সরকারি ‘ছুটি’ শুরু হওয়ার আগেই এ শহরের এক কোটি রিকশাওয়ালা, দিনমজুর, কারখানা শ্রমিক, গৃহকর্মী আর খেটে খাওয়া মানুষ বাড়ি চলে যাওয়ার পর শহরটা এখন অস্বাভাবিক নীরব।
মানুষের কথায়, উত্তেজনায়, অর্থনীতির চাকা ঘোরার শব্দে অন্য স্বাভাবিক সময়ে ঢাকা এক গমগমে শহর। লোকে সেখানে আয় করে, জীবনযুদ্ধে টিকে থাকে।
ওই মানুষগুলো এখন কোথায়? তারা এখন কী খাচ্ছেন? সুমির মতো একজন রিকশাচালক (নাকি চালিকা বলবো?) রিকশা মালিককে সাড়ে ৩শ’ টাকা জমা দেওয়ার পর দিনশেষে যা বাকি থাকে, ততটুকুর ওপরে যার পাঁচ জনের পরিবার চলে, তারা কতদিন টিকে যেতে পারবেন?

বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশের জনসংখ্যার মাত্র ১৫ শতাংশ প্রতিদিন ৫০০ টাকা রোজগার করেন। এরা প্রতিদিনের খরচ মিটিয়ে সন্তানদের স্কুলেও পাঠাতে পারেন আর আশা করতে থাকেন, জরুরি স্বাস্থ্য সংকট পার হওয়ার মতো যথেষ্ট অর্থ সঞ্চয় করতে পারবেন। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষ নির্ভর করেন শহর বা বিদেশ থেকে পাঠানো টাকার ওপর। এবারের সংকটটা যেহেতু বৈশ্বিক, সর্বত্রই মানুষ কাজ হারিয়েছেন। আয় -রোজগার সব বন্ধ। 

এখন প্রশ্ন হলো, এরা কতদিন টিকে যেতে পারবেন?

মার্কিন সরকার এখন এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত শারীরিক দূরত্ব বহাল রাখতে উৎসাহ দিচ্ছে। সেদেশের ৭৫ শতাংশ কর্মীর সবেতন অসুস্থতাজনিত ছুটি পাওয়ার সুযোগ আছে, আর প্রায় ৯০ শতাংশের আছে স্বাস্থ্য বিমা।

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় এক তৃতীয়াংশ মানুষ বাড়ি থেকেই কার্যকরীভাবে অফিস করতে পারেন। অথচ, এত সুযোগ-সুবিধা আর সামাজিক নিরাপত্তার পরেও আমরা দেখছি, খোদ মার্কিন মুলুকেও কোভিড-১৯ মোকাবিলায় গৃহীত নীতির প্রতিক্রিয়ায় অনেক মানুষ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছেন।

আর বাংলাদেশে ৯০ শতাংশ কর্মজীবী মানুষ কাজ করেন অনানুষ্ঠানিক খাতে, স্বাস্থ্য বিমা এখানে বিলাসিতা এবং বেশিরভাগ বাড়িই এখনও ইন্টারনেট সংযোগের আওতার বাইরে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করার রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে? দিনে ৫০০ টাকা রোজগার করতেন যারা, তাদের কতজন বাড়ি বসে সেই কাজ অর্থাৎ ‘ওয়ার্ক ফ্রম হোম’ করতে পারছেন?

কাজেই চলুন স্বীকার করে নেই, বাংলাদেশের বাস্তবতায় কোভিড-১৯ একটা মানবিক সংকট, যে সংকটের একটা জনস্বাস্থ্যগত ঝুঁকির দিক আছে। যদি আরও দীর্ঘসময় শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখার দরকার হয়, তাহলে তাতে সৃষ্ট অর্থনৈতিক স্থবিরতা এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে আর কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যে খাদ্য অনিরাপত্তার ঝুঁকিতে ফেলবে, তা মোকাবিলার উপায় আমাদের খুঁজে বের করতেই হবে। দিন এনে দিন খায় শহরের যে দরিদ্র মানুষ তাদের পেটে টান পড়বে।

এমন উপায় খুঁজে বের করতে হবে যাতে মানুষ নিরাপদ থাকে, আবার তাদের জীবিকাও রক্ষা পায়। তাদের যদি একদম বাড়ি বসে থাকতেই হয়, তাহলে আমাদের খাদ্য অথবা জরুরি নগদ সহায়তা দিতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলো এখনও সারাদেশে তাদের এজেন্টদের সক্রিয় রাখতে পেরেছে। তার মানে, আমাদের এমন একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি আছে, যা একেবারে প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গেছে এবং প্রায় প্রতিটি বাড়িতে নগদ সহায়তা নিয়ে যেতে পারে।

চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালির মতো যেই দেশগুলো ব্যাপকভাবে কোভিড-১৯ মোকাবিলা করছে, তাদের কাছ থেকে আমরা একদিকে যেমন জরুরি অনেক কিছু শিখতে পারি, তেমনি ওইসব দেশের নেওয়া ব্যবস্থাগুলোর কয়টি বাংলাদেশে আমদানি করা সম্ভব, সে প্রশ্নও আমাদের করা দরকার। চীনে জনপ্রতি স্বাস্থ্যখাতে খরচ বাংলাদেশের ১০ গুণ, আর ইতালি জনপ্রতি খরচ করে চীনের চেয়েও আট গুণ বেশি। 

শুধু কী তাই? ওসব দেশে বাড়িতে থাকা মানুষ স্মার্টফোনে পুরো দুনিয়ার সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারছেন। তারা অনলাইনে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনছেন, প্রিয়জনকে টাকা পাঠাচ্ছেন, মানসিকভাবে চাঙ্গা থাকতে বন্ধুদের সঙ্গে ভিডিও চ্যাট করছেন। হাতে হাতে থাকা স্মার্টফোনের ডাটা, বিশেষত এর অবস্থান সম্পর্কিত তথ্য, ওসব দেশে করোনা আক্রান্ত একজন ব্যক্তি কোথায় কোথায় গেছেন আর কাকে কাকে সংক্রমিত করে থাকতে পারেন, তা বের করতে বিরাট ভূমিকা রেখেছে।  

দক্ষিণ কোরিয়া, এমন এক ওয়েবসাইট তৈরি করেছে যেখানে নতুন সংক্রমণ শনাক্ত করা মাত্র সেই ব্যক্তি কোথায় কোথায় গিয়েছিলেন তা বিস্তারিত তুলে দেওয়া হয়, আর যে কেউ ওই সাইটে ঢুকে দেখতে পারেন তিনি যেসব মল বা সিনেমা হলে গিয়েছিলেন সেখানে সংক্রমণের শিকার কেউ গিয়েছিলেন কিনা, এবং তা জেনে নিজেও টেস্ট করতে চাইতে পারেন। চীনে, প্রতি মুহূর্তের কোভিড পরিস্থিতির খোঁজ রেখে প্রত্যেকের ফোনে লাল, সবুজ অথবা হলুদ মেসেজ পাঠিয়ে দেওয়া হয়, যা দেখে লোকে জানতে পারে সে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে কাজে যেতে পারবে কিনা। এর বিপরীতে বাংলাদেশের কথা ভাবুন! আমাদের দেশে এখনও অনেক মানুষ এসএমএস পড়তে পারেন না, আর সম্প্রতি ফোন ভিত্তিক এক কোভিড জরিপ ব্যাপক বিভ্রান্তির জন্ম দেয়।

কাজেই বিদেশের নানা পদক্ষেপ থেকে অনুপ্রেরণা নিলেও স্বীকার করতে হবে যে, তাদের নেওয়া মোকাবিলার অনেক পদ্ধতি হয়তো আমাদের সাধ্যের বাইরে। আমাদের এটাও মাথা পেতে মেনে নিতে হবে যে, আমাদের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এমনিতেই ভীষণভাবে ভারাক্রান্ত, আর সেই পরিস্থিতি এখন পাল্টে ফেলা যাবে না।  

সারাদেশ মিলিয়ে হাসপাতালে শয্যার সংখ্যা ১ লাখ ২৭ হাজারটি। ১৭ কোটির দেশে সরকারি হাসপাতালে বেড আছে ৯১ হাজারটি। আরও ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে, সরকারি ব্যবস্থায় সারাদেশে আইসিইউ বেড আছে ৪৩২টি, যার মধ্যে রাজধানীর বাইরে আছে মাত্র ১১০টি। বেসরকারি খাতের সক্ষমতা যোগ করলে আছে আরও ৭৩৭টি আইসিইউ।

১৭ কোটি মানুষের জন্য এটুকুই ব্যবস্থা। ইতালিতে প্রতি এক হাজার জন মানুষের জন্য ডাক্তার আছেন ৪ দশমিক ১ জন। বাংলাদেশে খাতাপত্রের হিসাব বলছে, ১ হাজার জনে শূন্য দশমিক ৫ জন ডাক্তার আছেন এদেশে, কিন্তু প্রকৃত চিত্র হলো এদের মধ্যেও একটা বিরাট অংশ বিদেশে আছেন অথবা ডাক্তারি করেন না। দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে প্রতি মাসে ৫ শতাধিক রোগী জরুরি চিকিৎসা সেবা নিতে আসেন, সক্ষমতার অভাবে এদের মধ্যে ৪শ’ জনকেই ফিরিয়ে দিতে হয়। 

বাংলাদেশের মতো জন ঘনত্বপূর্ণ একটা দেশ, যেখানে বেশিরভাগ পরিবার দিন আনে দিন খায়, আর অনানুষ্ঠানিক খাত ৮৭ শতাংশ কর্মসংস্থান করে, সেখানে তাহলে কোভিড-১৯ মোকাবিলার উপযুক্ত পদ্ধতি বের করতে আমাদের কী আরও ভাবতে হবে? 

বাংলাদেশের একটা বাড়িতে গড়ে পাঁচ জন সদস্য আর সাধারণভাবে এতে তিন প্রজন্মের মানুষ থাকেন। একটি পরিবারের একটাই ল্যাট্রিন। আর বস্তিগুলোতে ছয় অথবা তারও বেশি সংখ্যক পরিবারের জন্য একটি পানির কল।

তার মানে আমাদের বাড়িগুলোতে শিশু থেকে বৃদ্ধকে আলাদা করার অথবা কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যারা বয়সের কারণে কঠিন অসুখ অথবা মৃত্যুর ঝুঁকির মধ্যে আছেন তাদের আলাদা করার কোনও উপায় নেই। পশ্চিমের বেশিরভাগ দেশ সংক্রমণ ঠেকাতে যেধরনের সামাজিক দূরত্ব নীতির ওপর নির্ভর করছে বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে তার পালন অসম্ভব। আপনার ক্ষমতাই যখন মাত্র কয়েকদিনের খাবার কিনতে পারার, তখন আপনি ৩০ দিনের খাবার একবারে কিনে জমিয়ে রাখবেন কীভাবে? আপনার আয় যদি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে এরপর খাবার কিনবেন কীভাবে?

আমি একদিকে যেমন দুশ্চিন্তাগ্রস্ত, তেমনি সংকট উত্তরণে বাংলাদেশের সক্ষমতার ওপরেও আমার সীমাহীন ভরসা। এমনকি যখন বিদেশিরা বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বলেছে, তখনও আমরা এগিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে নিতে পেরেছি। বিশ্বের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, বাঙালি মায়েরা বাসায় ওরাল স্যালাইন বানাতে পারবেন না, কাজেই আমাদের বিদেশ থেকে তৈরি প্যাকেটজাত স্যালাইন কিনে আনাই ভালো। কিন্তু, সেসব প্যাকেট সেই ’৮০-এর দশকের যোগাযোগ অবকাঠামোতে গ্রামে পাঠানো খুব কঠিন ছিল। আমরা বরং পরিবারগুলোকে লবণ গুড়ের শরবত বানানো শিখিয়ে ফেললাম আর শিশু মৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেল।   

গ্রামের মানুষ যখন যক্ষ্মায় মারা যাচ্ছিল, হাসপাতাল ছিল অনেক দূরে, তখন আমরা গ্রামে গ্রামে যক্ষ্মা শনাক্ত এবং নিরাময়ের ব্যবস্থা নিয়ে যাওয়ার উপায় খুঁজে বের করেছিলাম। 

কোভিড-১৯ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কারণেই নতুন এবং আলাদা। কিন্তু, আমাদের আছে শীর্ষস্থানীয় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠান। আমাদের আছে, মাঠপর্যায়ে বিশ্বের অন্যতম সেরা স্বাস্থ্যকর্মীর নেটওয়ার্ক, সংকটকালে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের সমৃদ্ধ ঐতিহ্য এবং টিকে থাকার অবিশ্বাস্য ক্ষমতাসম্পন্ন সাধারণ মানুষ। 

আমরা ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ আরও অনেক কিছু সামাল দিয়েছি। এই সংকট মোকাবিলার উপায় সন্ধানে তাই আমাদের নিজেদের যোগ্যতা, আমাদের সবচেয়ে বড় গুণগুলোকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আমরা যেন এই সংকটে টিকে থাকতে একে অপরকে সহায়তা করি। 

লেখক: নির্বাহী পরিচালক, ব্র্যাক

 

/এসএএস/এমএমজ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ