করোনা এবং তারপর…

Send
রুমিন ফারহানা
প্রকাশিত : ১৫:২১, এপ্রিল ০৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৩০, এপ্রিল ০৪, ২০২০

রুমিন ফারহানাঅনেক কিছুই দেখালো করোনা। দেখলাম অদৃশ্য শত্রু কত ভয়ানক হতে পারে, মানুষ কত অসহায় হতে পারে, মৃত্যু কত সহজ হতে পারে। রোগাক্রান্ত পিতাকে হাসপাতালে রেখে পালাচ্ছে ছেলে, সাধারণ ঠান্ডা কাশিতে আক্রান্ত তরুণীর জন্য শ্বশুরবাড়ি, বাবার বাড়ি আজ অচেনা, ঠাঁই মিলছে না কোথাও, করোনা ভেবে কেউ এগিয়ে আসছে না, এমনকি কবরস্থানের দরজা পর্যন্ত বন্ধ। যেভাবেই হোক বাঁচতে হবে। কেউ চিনতে চাইছে না কাউকে। দূরত্বই এখন বাঁচার একমাত্র পথ। অনিশ্চয়তায় দিশেহারা মানুষ। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা মজুত করছেন পাহাড় প্রমাণ। যার প্রয়োজন ১০ কেজি চাল, সে কিনছে ৫০ কেজি। তেল, ডাল, চিনি, লবণ, আটা, সাবান, ডেটল, স্যানিটাইজার কিনছে যে যেমন পারছে। বিশ্ব কাঁপছে অচেনা আতঙ্কে। প্রতিদিনই লাফিয়ে বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। উন্নত দেশগুলোর অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। প্রতিদিনকার খবরে যেসব বিশ্বনেতাকে দাম্ভিক চলা আর কথায় মনে হতো তারাই বুঝি এই মহাবিশ্বের হর্তা-কর্তা-বিধাতা, আজ তাদের দিশেহারা চেহারা মানুষকে আতঙ্কিত করছে আরও বেশি। মানুষ ভালো নেই, একদম ভালো নেই।

একদিকে যেমন দেখছি নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের গুদাম বানানো মানুষের আত্মকেন্দ্রিকতার ভয়াবহ রূপ, দেখছি মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের ১০ টাকার জিনিস ১০০ টাকায় বেচা, অন্যদিকে আবার এই করোনাই আমাদের শুনিয়ে যাচ্ছে বিদ্যানন্দ বা সময় ফাউন্ডেশনের গল্প। দরিদ্র, হতদরিদ্র মানুষের মাঝে খাদ্য আর নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে দিবারাত্রী কাজ করে যাওয়া মানুষগুলো আজও মনে করিয়ে দিচ্ছে করোনা অসংখ্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে বটে, কিন্তু মানবতা অবিনশ্বর, তাকে পরাজিত করে এমন সাধ্য কার?

স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার করোনা পরীক্ষার ওপর বারবার জোর দেওয়ার পরও অত্যাবশ্যকীয় কিটের স্বল্পতা, হাসপাতালগুলোর অপ্রস্তুত অবস্থা, পিপিই সংকট, প্রয়োজনের সময় সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার মতো অসংখ্য সমস্যার সঙ্গে যখন যুক্ত হলো শ্রমজীবী মানুষের অবর্ণনীয় দুর্ভোগ; গার্মেন্টকর্মী, রিকশাচালক, সবজি বিক্রেতা, দিনমজুরসহ অসংখ্য দিন আনি দিন খাই মানুষের এই নির্মম শহরে বেঁচে থাকাটাই যখন হয়ে উঠলো বড় একটি চ্যালেঞ্জ, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখলাম বেশ কিছু মানুষ তাদের সীমিত সাধ্যের মাঝেও যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন এই অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর। জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, মধ্যম আয়ের দেশ, উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ যে কিছু মানুষের ভাগ্যের রাতারাতি পরিবর্তন আনেনি, তেমনটি দাবি করলে ভুল হবে। কিন্তু তীব্র বৈষম্যের এই দেশে দুই কোটি হতদরিদ্র, চার কোটি দরিদ্র আর ৪ কোটি ৮২ লাখ বেকারের ভাগ্যের সঙ্গে যে সেই উন্নয়ন যুক্ত হতে পারেনি, সে কথা তো আজ প্রমাণিত। তাই আজ যখন পুরো বিশ্ব হুমকির মুখে, তখন দিশেহারা এই মানুষগুলোর পাশে উন্নয়নের মহাসড়ক গড়া সরকার বাহাদুরকে যতটা না পাওয়া গেছে, তার চেয়ে অনেক দ্রুত এগিয়ে এসেছেন আমাদেরই চারপাশে থাকা সাধারণ কিছু মানুষ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই দেখলাম তাদের একেকজনকে ঘিরে অসংখ্য মানুষের ভিড়। তাদের ভাষায় করোনায় যদি নাও মরি, না খেয়েই আমাদের মরতে হবে। এই মানুষগুলো তবু বলতে পারছেন, চাইতে পারছেন, লাইনে দাঁড়িয়ে কিছু সাহায্যও হয়তো জুটছে তাদের ভাগ্যে। কিন্তু সমাজের বিত্তবান আর দরিদ্র এই দুই শ্রেণির মাঝে আর একটি শ্রেণি আছেন, যারা প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন টিকে থাকার। তাদের কোটি টাকা ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, নেই ঢাকা শহরে নিজের বাড়ি, মাস শেষে বেতনের টাকায় চলে পুরো সংসার। অভাব নেই, নেই প্রাচুর্যও। তারা আছেন সত্যিকারের বিপদে। অথচ দেশের অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে বড় ভূমিকা রাখে এরাই। বাজেট ঘোষণার পর কিংবা অন্য কোনও কারণে পণ্য বা সেবার দাম বাড়লে বলা হয় ‘চাপে পড়বে মধ্যবিত্ত’।

এদের শিক্ষা আছে, আছে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সচেতনতা, সামাজিক অবস্থান। বিআইডিএসের গবেষণা বলছে, দেশে এখন মধ্যবিত্তের হার মোট জনগোষ্ঠীর ২০ শতাংশ। দেশের মোট জনসংখ্যা ১৬ কোটি ধরলে এর মধ্যে ২০ শতাংশ বা ৪ কোটি মানুষ মধ্যবিত্তের কাতারে। বিপুল সংখ্যক এই জনগোষ্ঠী হঠাৎ আসা বিপর্যয় মোকাবিলায় একেবারেই অপ্রস্তুত। তাদের সীমিত আয়, যা দিয়ে কেবল মৌলিক চাহিদাগুলোই পূরণ সম্ভব। তাদের কোনও জৌলুস নেই। বেতন যা পায় তা দিয়েই চলে। বেতনের বাইরে বিকল্প আর কোনও আয়ের সুযোগও তাদের নেই। এমনকি হঠাৎ করে সন্তানের স্কুলের খরচ বেড়ে গেলে, পরিবারের কেউ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে গেলে সমস্যায় পড়ে এই মানুষগুলো। তাদের অধিকাংশেরই সীমিত আয়ের বাইরে বাড়তি কোনও আয় নেই, তাই হঠাৎ আসা দুর্বিপাকে এরাই বিপর্যস্ত হয় সবচেয়ে বেশি।

করোনা জীবনের ঝুঁকি আনার সঙ্গে সঙ্গে আরেকটি বড় ঝুঁকি নিয়ে এসেছে এই মানুষগুলোর জীবনে। মাস গেলে বাড়িভাড়া, সন্তানের পড়ার খরচ, গ্যাস পানি বিদ্যুৎ বিল, যাতায়াত ভাড়া, মাসের বাজার, গ্রামে বৃদ্ধ মা-বাবার খরচ মেটানোর পর হাতে যা থাকে, সেটা দিয়ে নিজের চলাই যখন দুষ্কর, সেখানে হঠাৎ আসা এই দুর্যোগে তারা দিশেহারা হবে সেটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি যদি কল্যাণ রাষ্ট্রের ন্যূনতম স্পৃহা ধারণ করতো, যেখানে সে তার নাগরিকদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কল্যাণ রক্ষা ও প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, পারতো সমতার ভিত্তিতে নাগরিকদের কল্যাণে অধিকতর দায়িত্ব নিতে, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, সামাজিক সুরক্ষা বা সোশ্যাল সেফটি নেটের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর প্রতি আর একটু যত্নশীল হতো, তাহলে এই মহা দুর্যোগে মানুষগুলো এতটা দিশেহারা হতো না। কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাদের, তেমন রাষ্ট্র আমরা গড়তে পারিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমরা দেখছি অনেকেই বাড়িভাড়া মওকুফের কথা বলছেন। ভালো প্রস্তাব সন্দেহ নেই। কিন্তু কয়জন বাড়িওয়ালার পক্ষে এই মওকুফ করা সম্ভব, সেটাও একটা বড় প্রশ্ন। অনেক প্রবীণ ব্যক্তি আছেন যাদের আয়ের একমাত্র উৎস এই বাড়িভাড়া। তাছাড়া আছে নানা রকম খাজনা, হোল্ডিং ট্যাক্স, বাড়ি মেরামতের খরচ, যা দিনের শেষে বাড়িওয়ালাকেই পরিশোধ করতে হয়। তাই সামর্থ্যবান কোনও বাড়িওয়ালা চাইলে নিজে থেকে ভাড়া মওকুফ করতে পারেন, কিন্তু জবরদস্তি করে এই মওকুফ করানো জুলুম হবে অনেক বাড়িওয়ালার জন্যই। এত বড় মহাবিপর্যয় পাড়ি দিতে সরকার যদি সম্মিলিতভাবে সর্বশক্তি নিয়োগ না করে, তাহলে ব্যক্তিবিশেষের  ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র প্রচেষ্টায় তা কোনোভাবেই মোকাবিলা করা সম্ভব হবে না। বাড়িভাড়া মওকুফের দাবি তোলার চেয়ে অনেক বেশি যৌক্তিক হবে সরকারের প্রতি দাবি রাখা, যেন অন্তত আগামী জুন মাস পর্যন্ত গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানির বিল মওকুফ করা হয়। উচিত হবে অন্তত এই আপৎকালীন সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের ওপর থেকে ভ্যাট তুলে দেওয়া। বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং কোনও পণ্য একসঙ্গে এক ব্যক্তি কতটুকু পরিমাণে কিনতে পারবেন, তা নির্দিষ্ট করে দেওয়া। উচিত হবে প্রণোদনা ঘোষণা করা।

মার্কিন সরকার ইতোমধ্যে ২.২ ট্রিলিয়্ন প্রণোদনা ঘোষণা করেছে, যা মহামারির কবলে পড়া স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মার্কিন সাধারণ জনগণকে সহায়তা করতে বিশেষ সহায়ক হবে। করোনা বিপর্যস্ত এলাকার জনগণকে এই অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত জার্মান কোম্পানি ও কর্মীদের আর্থিক সহায়তা দিতে ইতোমধ্যে কমপক্ষে ৫৫ হাজার কোটি ইউরোর আর্থিক প্যাকেজ ঘোষণা দিয়েছে জার্মান সরকার। আর দেশের দরিদ্র মানুষের জন্য এই বিশেষ সময় নগদ ও খাদ্যে ভর্তুকি বাবদ ১ লাখ ৭০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে ভারত সরকার। বিশেষ করে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে করোনা পরিস্থিতিতে যারা কাজ করছেন, তাদের জন্য জনপ্রতি ৫০ লাখ টাকার মেডিক্যাল বিমা কভারেজ থাকছে এই প্যাকেজে। বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছে কেবল পোশাক খাতের জন্য।

বিশ্বব্যাপী করোনা তৈরি করেছে এক বিশাল অর্থনৈতিক ঝুঁকি। আশঙ্কা করা হচ্ছে বিশ্বজুড়ে করোনার কারণে দেখা দিতে পারে মহামন্দা। ব্যবসা বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রে এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়া শুরু হয়েছে। কাজ হারাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। বাংলাদেশের অবস্থা তো আরও সঙ্গিন। করোনা আসার কিছুদিন আগেই আমাদের অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেছিলেন, দেশের অর্থনীতির অবস্থা ভালো না। একমাত্র প্রবাসী আয় ছাড়া অর্থনীতির আর সব সূচক নিম্নমুখী। আমদানি, রফতানি, রাজস্ব আদায়, শেয়ারবাজার, বিনিয়োগ, ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বিমা সব ক্ষেত্রেই হতাশার চিত্র। বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে কর্মসংস্থানহীন প্রবৃদ্ধি। দেশের সবচেয়ে বড় রফতানিমুখী শিল্পখাত, তৈরি পোশাকশিল্প, এখন চ্যালেঞ্জের মুখে। প্রতিদিনই বাতিল হচ্ছে কোটি টাকার ক্রয়াদেশ। সুতরাং অর্থনীতিবিদরা বিশ্বজুড়ে মহামন্দার যে পূর্বাভাস দিচ্ছেন, তার কঠিন এক আঘাত আসতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ওপরও। কী করে এ আঘাত মোকাবিলা করা যায়, সে ব্যাপারে কোনও পরিকল্পনা আছে কি সরকারের?

লেখক: আইনজীবী, সুপ্রিম কোর্ট।  জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে বিএনপির দলীয় সংসদ সদস্য

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ