জানা, দেখা, শেখা: চীন থেকে কেরালা

Send
মনজুরুল আহসান বুলবুল
প্রকাশিত : ১৫:২৩, এপ্রিল ২১, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৫৩, এপ্রিল ২১, ২০২০

মনজুরুল আহসান বুলবুলষাটের দশকে দেশের রাজনীতিতে যখন মস্কোপন্থী আর চীনপন্থীদের প্রবল উপস্থিতি, তখন প্রায়ই এমন হালকা আলোচনা হতো—‘আরে, ওরা তো মস্কোপন্থী। মস্কোতে বৃষ্টি হলে ওরা ঢাকায় ছাতা ধরে।’ মস্কোপন্থীদের জবাব—‘কথা ঠিক, আমরা তো অন্তত বুঝতে পারি পৃথিবীর কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে, তোমরা তো তাও বুঝতে পারো না।’
আধুনিক যোগাযোগ বিজ্ঞানের পুরোধা পুরুষ হার্বার্ট মার্শাল ম্যাকলুহান বললেন, আধুনিক যোগাযোগ প্রযুক্তি এখন গোটা পৃথিবীকে ‘এক বিশ্ব গ্রাম’ বানিয়ে ফেলেছে। এরপর দুনিয়া অনেক পাল্টে গেছে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যোগাযোগ এখন চোখের পলকের ব্যাপার মাত্র। এতদিন সবশেষ প্রযুক্তির মুঠোফোন হাতের তালুতে ধরে মনে করা হতো, বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। কিন্তু করোনাভাইরাস সব প্রযুক্তিকে পেছনে ফেলে সব পাল্টে দিয়েছে। এই ভাইরাস এখন গোটা দুনিয়াকে এক কাতারে নিয়ে এসেছে। করোনা আক্রান্ত পৃথিবীর দেশগুলো এখন আর গ্রাম নয়, পাড়া-প্রতিবেশীতে রূপান্তরিত হয়েছে। এটি আঘাত হানছে একসঙ্গে উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমে। প্রযুক্তির তো তবুও ডিজিটাল সংযোগ লাগে, করোনার কিছুই লাগে না। নো ব্যান্ডউইথ, নো নেটওয়ার্ক, নো ওয়াইফাই, নো জি, নো পাসপোর্ট, নো ভিসা, নো ফ্লাইট, নো ইমিগ্রেশন, নো কাস্টমস।

করোনা কী? এটা কত ভয়ঙ্কর, কীভাবে কাজ করে, এর সঙ্গে কীভাবে লড়াই করতে হবে—এসব বিষয়ে এখন সবাই ‘মোটামুটি বিশেষজ্ঞ’। তা এ আলোচনার লক্ষ্য নয়। এই যুদ্ধে যেহেতু আমাদের আরও কিছু দিন থাকতেই হবে, সেজন্য আমাদের অনেক কিছুই শুনে শুনে জানতে হবে এবং দেখে দেখেই শিখতে হবে।

আজ যারা এসব নিয়ে অনেক উঁচু গলায় কথা বলেন, প্রকৃত সত্যি হচ্ছে ছয় মাস আগে তারাও এসবের কিছুই জানতেন না। আজ যে বলেন, কারণ কিছুটা শুনে শুনে জেনেছেন, কিছুটা দেখে দেখেই শিখেছেন। আক্রান্ত ব্যক্তি, সুস্থ হয়ে ওঠা ব্যক্তি, আইসোলেশন বা কোয়ারেন্টিনে যাওয়া ব্যক্তি, লকডাউনে থাকা সবাই, আবার যিনি মারা গেলেন বা যারা চিকিৎসা দিচ্ছেন অথবা যারা না দিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন, সবার জন্যই এটি নতুন এক অভিজ্ঞতা। রাষ্ট্র পরিচালনা যারা করেন তাদের জন্যও। মজার ব্যাপার, এই জানা, দেখা বা শেখা কোনোটিই এখনও চূড়ান্ত নয়। কারণ প্রতিদিন অবস্থা পাল্টাচ্ছে করোনাভাইরাসের চরিত্রের মতোই।

কাজেই এই সময়ে শুনে শুনে জানাটা যেমন জরুরি, অন্যেরা কীভাবে কী করছেন দেখে দেখে শেখাটাও জরুরি। বারবার হাত ধোয়া আর ঘরে থাকা এই দুটো বিষয়েই কেবল সবাই একমত। বাকি বিষয়গুলোতে প্রতিনিয়ত জানা ও শেখা এবং নিজের বাস্তবতা অনুযায়ী প্রয়োগ করাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। জাতিসংঘ মহাসচিবও তাই বলেছেন, এই সময়ে গুজব, অপ-তথ্য, কুসংস্কার বা অপবিজ্ঞানের ওপর নয়, বরং নির্ভর করতে হবে বিজ্ঞান ও নিজের বিবেক বুদ্ধির প্রতিই। তবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কার কাছ থেকে শুনবো, জানবো ও শিখবো। নিশ্চয়ই যারা কিছুটা সফল তাদের কাছ থেকেই।
করোনা উৎস অনুসন্ধান নিয়ে এন্তার বাগ্‌যুদ্ধ চলছে, আরও অনেক দিন চলতেই থাকবে। চলুক। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যে চীনে করোনাভাইরাসের শুরু, তারা কিন্তু সেটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। করোনা যুদ্ধে চীন কীভাবে জয়ী হলো ‘চায়না ডেইলি’ বিষয়টি মাত্র কয়েকটি বুলেট পয়েন্টে নিয়ে এসেছে।

বলা হচ্ছে, এই যুদ্ধে চীন যে জয়ী হলো তার বড় কারণ, নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে চীনের শক্তিশালী কমান্ড সিস্টেম। এই কমান্ড সিস্টেম, নীতি গ্রহণে এবং দেশজুড়ে তা বাস্তবায়নে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। বিষয়টিকে আমাদের বা অন্য অনেক রাষ্ট্র পরিচালনা পদ্ধতির সঙ্গে অবশ্যই তুলনা করা যাবে না। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্রপরিচালনা পদ্ধতি যাই হোক, জাতীয় দুর্যোগের সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সকল পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ও সমন্বিত কমান্ডের কোনও বিকল্প নেই। এই কমান্ড থাকতে হবে রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতেই।

উহানে লকডাউন শুরু হয় ২৩ জানুয়ারি, চলে টানা ৭৬ দিন। নিরীক্ষা বলছে, এই কার্যকর লকডাউন চীনকে মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। গোটা দেশে করোনা ছড়িয়ে পড়তে পারেনি। আমাদের সামাজিক সংস্কৃতি পুরো লকডাউনে অভ্যস্ত নয়। সাধারণ ছুটি দিয়ে শুরুই ছিল আমাদের প্রথম পদক্ষেপ।

ব্যাপক সংখ্যক মানুষকে পরীক্ষার আওতায় আনা সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে চীনকে। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে উহানে প্রতিদিন ২৪ হাজার মানুষকে পরীক্ষার সক্ষমতা অর্জন করে চীন। যেহেতু বিপুল পরিমাণ মানুষকে পরীক্ষা করা হয়েছিল, সেহেতু চীন পরিস্থিতির ভয়াবহতাও বুঝতে পেরেছিল দ্রুতই। সেজন্য আক্রান্তদের দ্রুত ও পর্যাপ্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পেরেছে তারা। যে হাসপাতালগুলো ছিল সেগুলোর ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনার পাশাপাশি নতুন গড়ে তোলা, অস্থায়ী হাসপাতালগুলোতে দ্রুত রোগীদের নিয়ে আসা হয়। সময় অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়, যাতে তারা সংক্রমণ ছড়াতে না পারে।

কঠোর কমান্ড সিস্টেমের কারণে চীনে কোয়ারেন্টিনের নীতিটি পালন করা হয় কঠোরভাবে। একদিকে সেরে ওঠা রোগী, অন্যদিকে সন্দেহজনক ব্যক্তি এবং যারা তাদের সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের বাধ্যতামূলক ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিন করা হয় কোনও ধরনের শিথিলতা ছাড়াই। আমাদের তো কোয়ারেন্টিন বুঝতে সময় লাগলো এক মাস। তারপর বিদেশ থেকে এলেন যারা, তাদের নিয়ন্ত্রণ করা ছিল কঠিন এক বিষয়।

চীন প্রথম পর্বে বুঝে গিয়েছিল এই যুদ্ধে জয় সহজ নয়। সেজন্য সারা দেশ থেকে ৪২ হাজার চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়ে আসা হয় হুবেই প্রদেশে। নিশ্চিত করা হয় প্রয়োজনীয় ও পর্যাপ্ত রসদের। চীন এ কথাটিও অনুধাবন করতে পেরেছিল, সামাজিক শক্তির সমাবেশ না ঘটাতে পারলে শুধু স্বাস্থ্যকর্মী ও আমলাদের দিয়ে হবে না। নামানো হয় ৪০ লাখ কমিউনিটি কর্মী। যারা কাজ করেছেন চিকিৎসকদের পাশাপাশি। তারা গণভাবে সব মানুষের তাপমাত্রা যেমন মেপেছেন, তেমনি কোয়ারেন্টিনে থাকা মানুষের জন্য ওষুধ ও খাবার সরবরাহ নিশ্চিত করেছেন। চীনে কমিউনিটি কর্মী বলতে যাদের বুঝি, তারা কোনও না কোনোভাবে কমিউনিস্ট পার্টিরও কর্মী। আমাদের এখানে হয়তো সেটি সম্ভব না, কিন্তু সংকটের শুরুর দিক থেকে ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন বা ছাত্রলীগ যেভাবে মাঠে নেমেছিল, এই শক্তিকে নিয়ে আমরা কি নতুন করে ভাবতে পারি? অনেক নেতিবাচক আশঙ্কা হয়তো আছে, কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগী সংগঠনগুলোকে নিয়ে কি ভিন্নভাবে চিন্তা করা যায় না? তবে আশার কথা, শেষ পর্যন্ত দলের নেতৃত্বে স্থানীয় পর্যায়ে কমিটি করার কথা বলা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এই নির্দেশনাও দিয়েছেন ত্রাণ বিতরণের যে তালিকা হবে তাতে যেন প্রকৃত বিপদগ্রস্তরাই ঠাঁই পায়, ‘আমার দল’ বা ‘আমার ভোটার’ এমন পছন্দ যাতে অগ্রাধিকার না পায়। দেখা যাক এই কমান্ড কতটা কাজ করে। চীনে এই দুর্যোগের সময়ে জনগণ সব নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করেছেন, বাড়িতে থেকেছেন, দূরত্ব বজায় রেখেছেন, মাস্ক পরেছেন, নিয়মিত হাত ধুয়েছেন।

করোনা মোকাবিলায় চীন মডেলের পর যে দুটো দেশকে এখন পর্যন্ত সফল হিসেবে ধরা হয়, তার একটি হচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়া, অরেকটি সিঙ্গাপুর। দক্ষিণ কোরিয়ার বড় সাফল্য পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ। দেশটি প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে পরীক্ষার আওতায় আনতে সমর্থ হয়েছে। এই দুর্যোগের মধ্যেও তারা দেশটিতে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত করতে পেরেছে। ভোটাররা দূরত্ব বজায় রেখে ভোটকেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন। আর সিঙ্গাপুরের সাফল্য অনেকটাই চীনা মডেল।

এদিকে করোনা মোকাবিলায় আমাদের ঘরের পাশের দেশ ভারতের কেরালা’র সাফল্য এখন সর্বব্যাপী স্বীকৃত। ভারতের প্রথমে করোনা আক্রান্ত এই রাজ্য। কেরালার জনসংখ্যা কমবেশি ৩ কোটি ৩৬ লাখ। যেখানে বয়স্ক মানুষ শতকরা ১২.৬ ভাগ। প্রতি বছরই যাদের বয়স ৭০ থেকে ৮০ বছরের মধ্যে, তাদের সংখ্যা ২.৩ শতাংশ হারে বাড়ে। এই বয়স্কদের বেশিরভাগ বসবাস করেন যৌথ পরিবারে। কেরালায় বছরে প্রায় ১০ লাখেরও বিদেশি পর্যটক ঘুরতে যায়। রাজ্যের জনসংখ্যার ছয় ভাগের এক ভাগ প্রবাসী। সেখানকার কয়েক হাজার শিক্ষার্থী চীনে পড়াশোনা করেন।

১৫ এপ্রিল পর্যন্ত হিসাব—১০০ দিনে কেরালায় আক্রান্ত ৩৮৭, চিকিৎসাধীন ১৬৭, মারা গেছে ২ জন, বাকিরা সুস্থ হয়ে বাড়ি গেছেন। ১৫ এপ্রিল আক্রান্ত শূন্য।

কেরালা সরকারের এক মুখপাত্রের কথায়, করোনা রুখতে আমাদের মূল হাতিয়ার তিনটি। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, স্পষ্ট নির্দেশের সঙ্গে তথ্যের স্বচ্ছতা এবং দ্রুত পদক্ষেপ। ৩ ফেব্রুয়ারি কেরালায় প্রথম আক্রান্তের সন্ধান পাওয়া যায়। গোটা ভারতেও সেটিই প্রথম। তার আগে থেকেই করোনা রোখার জন্য একটি আঁটোসাঁটো পরিকল্পনা তৈরি করা হয়, যা সময়ের প্রয়োজন অনুযায়ী রদবদল করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার সংস্থাগুলোকে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত করা হয়েছে রাজ্য সরকারের উদ্যোগের সঙ্গে। রাজ্যবাসীর জন্য স্পষ্ট নির্দেশ যেমন দেওয়া হয়েছে, তেমনি প্রয়োজনীয়, পর্যাপ্ত, সময়ানুগ, সঠিক ও স্বচ্ছ তথ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা হয়েছে। করোনা রুখতে কী কী করতে হবে, তার স্পষ্ট নির্দেশিকা তৈরি করে গ্রাম পঞ্চায়েত স্তর পর্যন্ত পাঠিয়ে তা কার্যকর করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ‘সিঙ্গল উইন্ডো’ পদ্ধতিতে করোনা সংক্রান্ত সব তথ্য দৈনিক বুলেটিনের আকারে সবার আওতার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। শুরু থেকেই জনসচেতনতায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে ৬৬টি প্রশিক্ষণ ভিডিও। সোশ্যাল মিডিয়ায় তার প্রচারও করা হচ্ছে। ব্যানার, পোস্টার, হ্যান্ডবিল এবং অডিও’র মাধ্যমে প্রচার চালানো হয়েছে। ১৪৩ জন মনোবিদকে নিয়োগ করা হয়েছে, কাজ করেছে পাঁচ হাজারের বেশি টেলি কাউন্সিলর। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় চালু করা হয়েছে নতুন পদ্ধতি। দ্রুত শনাক্তকরণ কিট সংগ্রহ করে ভাইরাসের হটস্পটগুলোতে নিয়মিত পরীক্ষা চালায় কেরালা কর্তৃপক্ষ। চালু করা হয় ওয়াক-ইন-টেস্টিং ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম গায়ে জড়িয়ে নমুনা সংগ্রহ করার প্রয়োজন পড়ে না। স্বচ্ছ কাচের তৈরি বুথের ভেতর থেকে স্বাস্থ্যকর্মীরা বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা রোগীর কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। প্রথম পর্যায়েই রাজ্যের নৌবন্দর, স্থলবন্দর, বিমানবন্দর থেকে শুরু করে সীমান্তে সর্বত্র থার্মাল স্ক্রিনিং করা রয়েছে।

পাশাপাশি সন্দেহজনক সবাইকে প্রাথমিকভাবে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে। এক, যাদের মধ্যে জ্বর, সর্দি, কাশি শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ আছে। দুই, যাদের উপসর্গ নেই। উপসর্গ আছে এমন সন্দেহভাজনদের আবার তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। প্রথম ভাগে, যাদের হালকা জ্বর, অল্প গলা ব্যথা, কাশি এবং ডায়রিয়া হয়েছে। দ্বিতীয় ভাগে যাদের বেশি জ্বর এবং গলা ব্যথা এবং কাশি রয়েছে। এই তালিকায় রাখা হয়েছে যাদের বয়স ৬০ বছরের বেশি এবং যারা দীর্ঘদিনের কিডনি, ফুসফুসের রোগ, ক্যানসার বা এইচআইভি পজিটিভ বা অন্তঃসত্ত্বা। তৃতীয় শ্রেণিতে রয়েছে শিশু (যাদের ইনফ্লুয়েঞ্জার উপসর্গ রয়েছে) এবং বড়দের, যাদের হঠাৎ রক্তচাপ কমে গিয়েছে বা যে রোগে তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন, হঠাৎ সেই পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

এই বিভাজন থেকেই ভাগ করে দেওয়া হয়েছে কাদের কোভিড-১৯ টেস্ট প্রয়োজন, আর কাদের প্রয়োজন নেই। বিভাজন করা হয় একদম প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র পর্যায় থেকে। তারাই সিদ্ধান্ত দিয়েছে কার পরীক্ষা করা হবে আর কার করা হবে না। ফলে পরীক্ষাকেন্দ্র বা হাসপাতালে অহেতুক ভিড় হয়নি। যাদের হাসপাতালে ভর্তি না করে বাড়িতেই আইসোলেশনে রাখা হয়েছে, তাদের প্রতিদিন স্থানীয় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে ফোন করে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন চিকিৎসকরা। ফলে স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়ানোর ভয় কমছে। একেকজন স্বাস্থ্যকর্মী প্রতিদিন হোম কোয়ারেন্টিনে থাকা একেকজনের তথ্য সংগ্রহ করেন। স্বাস্থ্য তথ্যের পাশাপাশি বাসায় পর্যাপ্ত খাবার আছে কিনা, এসব তথ্য সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন তারা।

অন্যদিকে, স্থানীয় সরকারের নিম্নতম অর্থাৎ পঞ্চায়েত পাড়ায় পাড়ায় তালিকা করছেন তার এলাকায় সংক্রমণ ঘটেছে এমন দেশ থেকে কারা কবে এসেছেন, ফিরে তারা স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেছেন কিনা, তারা কাদের সংস্পর্শে এসেছেন, সেই তালিকাও করা হয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাড়িতে আইসোলেশনসহ সামাজিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। ফলে স্কুল বন্ধ রাখা, সামাজিক জমায়েত বা সিনেমা হল বন্ধ রাখা সহজ হয়েছে। মানুষ উপসর্গ লুকানোর বদলে নিজে থেকে এগিয়ে আসছেন জানাতে।

বিশেষজ্ঞ মত হচ্ছে—সংক্রামক রোগের মহামারি ঠেকানোর উপায় হচ্ছে ব্যাপক হারে পরীক্ষা, আইসোলেশন, সংস্পর্শে আসাদের শনাক্তকরণ ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা। সবকটিতেই কেরালা দুর্দান্ত সাফল্য দেখিয়েছে। একদিকে কঠোর পদক্ষেপ, অন্যদিকে মানবিকতাও—এই দুইয়ে মিলে তাদের সাফল্য অনন্য।

কেন্দ্রীয় সরকার লকডাউন ঘোষণার পর বিভিন্ন রাজ্য হতচকিত হয়ে পড়লেও আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল কেরালা। মহামারি ঠেকাতে ২৬ কোটি ডলারের একটি প্যাকেজ ঘোষণা করে রাজ্য সরকার। দুই মাসের অগ্রিম পেনশনের টাকা পরিশোধ, স্কুল শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ ও শক্তিশালী ইন্টারনেট নেটওয়ার্কের জন্য পরিষেবা প্রদানকারীদের সহায়তাসহ নেওয়া হয় নানা পদক্ষেপ।

কেরালার স্বাস্থ্য ও কল্যাণমন্ত্রী শৈলজা বলেন, আমরা নিখুঁত ব্যবস্থাটির জন্য যেমন আশাবাদী ছিলাম, পাশাপাশি সবচেয়ে খারাপের জন্যও প্রস্তুত ছিলাম। প্রায় ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে রাজ্যটিতে কমিউনিস্ট শাসন চলছে। কেরালায় সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা হয় শিক্ষাখাত ও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবায়। ভারতের মধ্যে সবচেয়ে ভালো জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা আছে কেরালা রাজ্যেই। সাক্ষরতার হারও সবচেয়ে বেশি। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শৈলজা জানান, অনেকেই কেরালার কাছে পরামর্শ চেয়েছে। কিন্তু রাতারাতি কেরালার মতো ব্যবস্থাপনা অন্য রাজ্যে গড়ে তোলা কঠিন।

নিখুঁত ব্যবস্থাটির জন্য আশাবাদী থাকা, পাশাপাশি সবচেয়ে খারাপের জন্যও প্রস্তুত থাকা হঠাৎ হয়ে ওঠার বিষয় নয়। রাষ্ট্র পরিচালনা নীতির মধ্যে এটিকে নিয়ে আসতে হয় নিরন্তর চর্চার মধ্য দিয়ে। এটার মূল চালিকাশক্তি হচ্ছে রাজনীতি। মৌসুমি রাজনীতিক আর শুধু রুটিন চাকরি রক্ষার আমলাদের নেতৃত্বে এটি সম্ভব নয়। চীন ও কেরালার অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য জেনে, শুনে, দেখে, শেখার সেই জায়গাটিই উন্মুক্ত করে।

লেখক: এডিটর ইন চিফ, টিভি টুডে

/এসএএস/এমএমজে/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ