মনের করোনা

Send
সৈয়দ ইশতিয়াক রেজা
প্রকাশিত : ১৫:৩৫, এপ্রিল ২২, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:৩৭, এপ্রিল ২২, ২০২০

সৈয়দ ইশতিয়াক রেজাছুটি, লকডাউন শেষ হবে কবে জানা নেই। ঘরে থেকে থেকে আমাদের অনেকেরই বাড়ছে মানসিক চাপ আর উদ্বেগ। অনেকেই ভুগছে একাকিত্বে, বাড়ছে অবসাদের প্রকোপ। অনেকেই করোনাভাইরাসের জন্য বেঁধে দেওয়া ঘরে থাকার নিয়ম মানছেন না, অতি অবহেলা করছেন। আবার অনেকেই অতি আতঙ্কে অমানবিকতা প্রদর্শন করছেন।
করোনায় মারা যাওয়া মানুষকে নিজেদের এলাকায় কবর দিতে দেবো না, করোনা চিকিৎসার জন্য হাসপাতাল বানাতে দেবো না, সন্তান নিজের মা’কে জঙ্গলে ফেলে আসবে, করোনা চিকিৎসায় থাকা চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বাড়ি ছাড়া করতে তৎপর বাড়িওয়ালা। এমনকি করোনা রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলে তাকেও বাড়িওয়ালা ও পাড়া-প্রতিবেশীরা আন্দোলন করছে তাদের এলাকা ছাড়া করতে। এসব খবর আমাদের জানিয়ে দিচ্ছে আমাদের মনের করোনাভাইরাস কত ভয়ঙ্কর। আমরা নিজেদেরই চিনতে পরিনি, আমরা জানতাম না যে আমরা আসলে মানুষকে কতটা অবিশ্বাস করি, কতটা সন্দিগ্ধ চোখে দেখি, আমরা কতটা অমানবিক হয়ে এই সমাজে আছি।

করোনা খুবই ছোঁয়াছে রোগ। তাই সতর্ক থাকাটা অবশ্যই জরুরি। রোগে আক্রান্ত হওয়া থেকে বাঁচতে করণীয় যেসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা দরকার, সেটা করা প্রয়োজন। কিন্তু গুজব, মনগড়া ধারণা ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে আমরা এমন আচরণ কেন করছি? মানুষের প্রতি ভালোবাসা, মানবিক মূল্যবোধ আর সুকোমল মনোবৃত্তিকে ভেঙে ভেঙে খান খান করে ফেলছি। জীবন বাজি রেখে করোনা যুদ্ধে সামনের কাতারে কাজ করছেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা, নিরলস পরিশ্রম করে তথ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন গণমাধ্যমকর্মীরা, আর আমরা তাদের বাড়িতে, পাড়ায় ঢুকতে বাধা দিচ্ছি। পরিবার-পরিজন ফেলে রোদে বৃষ্টিতে কাজ করছেন সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা, প্রশাসনের লোকজন, আমরা তাদের নিষেধ শুনছি না।  

বিপদে পড়া আপনজনের পাশে দাঁড়াতে ভরসা হারালেও, বাজারে গিয়ে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে জিনিস কিনছি, জানাজায় চলে যাচ্ছি। একটা জীবাণু যেন অনেক প্রাণ শুধু নয়, কেড়ে নিলো আমাদের মনুষ্যত্বও। বিপদে পড়া আপনজন, প্রতিবেশীর পাশে যদি নাই-বা দাঁড়াতে পরলাম, তাহলে আর কোনও সাফল্য থাকল আমাদের?

একটা বিষয় হয়তো তারা ভাবছেন না, বাড়িওয়ালা হোক বা পড়শি হোক, আপনার সমস্যা হলে এই চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরাই ভরসা। করোনায় মারা গেলে মৃতদেহ থেকে জীবাণু ছড়ায় না, এটা বুঝতেও বিলম্ব করছে অতি আতঙ্কিত এই নাগরিক সমাজ।

এমন কেন আমরা? কেন এতটা রূঢ় আচরণ করছি? বোঝা গেলো বিষয়টার মূল কারণ আতঙ্ক। করোনাভাইরাসের ভয়ে একটা চাপা ভয় গ্রাস করে ফেলেছে আমাদের। রোগ থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে বাড়িতে অবস্থানের পরামর্শ বিশ্বজুড়ে। কিন্তু কোথাও বলা হয়নি মনের ভেতর এমন বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন করতে হবে। আমাদের কেউ বলেনি তোমরা ফিরে যাও আদিম সভ্যতার আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপরতার যুগে। আমরা সভ্যতার অহংকার করি। কিন্তু সভ্যতার নমুনা নিশ্চয় এমন আচরণ নয়। 

গুজব-কুসংস্কার এসবের ওপর ভিত্তি করে যদি মানুষ এমন আচরণ করতে থাকে তাহলে করোনার চেয়েও বড় অসুখ ছড়াবে এই সমাজে। সেই সামাজিক ব্যাধির আসলে কোনও চিকিৎসা নেই।

আমরা যখন সভ্যতার কথা বলবো, উন্নয়নের কথা বলবো, তখন আমাদের মনে রাখতে হবে, সভ্যতার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মানবিকতা, উদারতা, জীব প্রেম। শিক্ষা-দীক্ষায় অগ্রগতি মানেই মানুষের আরও সভ্য হয়ে ওঠা। কিন্তু করোনাকালে এসে সত্যি বড় ধাক্কা খেলাম আমরা। আকাশের দিকে ধাবিত উন্নয়ন, অগ্রগতি, আমাদের চারপাশের চকচকে জীবনের আড়ালে যে এমন ভয়ঙ্কর অমানবিক এক সংস্কৃতি ভেতর লুকিয়ে ছিল, তা স্পষ্ট করে দেখিয়ে দিলো করোনাকাল। আসলে আমাদের এগিয়ে যাওয়া, আমাদের শিক্ষিত হওয়া, আমাদের নাগরিক আচরণ সবই কৃত্রিম তথা এক ধরনের মুখোশ।

একদিন করোনাভাইরাস চলে যাবে। কিন্তু রেখে যাচ্ছে কত যে প্রশ্ন। লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, সামাজিক দূরত্ব শব্দগুলোও চলে যাবে। মানুষ আবার কাছে আসবে, হাত মেলাবে, একে অন্যকে আলিঙ্গন করবে। কিন্তু শরীরের ব্যবধান দূর হলেও মনের ব্যবধানের যে চিত্র দেখা গেলো, তা দূর হবে কিনা জানি না।

আমরা সবাই আরেকবার ভাবি আমরা সভ্যতা নিয়ে অহংকার করবো, নাকি এমন সংকুচিত থাকব? আমরা সভ্য—এমন যদি ভাবি তাহলে সভ্যতার শপথও নিতে হবে। আর সেই শপথ হলো যেকোনও বিপদে, বিপর্যয়ে অবস্থা যতই খারাপ হোক না কেন, মনুষ্যত্ব হারিয়ে না ফেলা। ভাইরাস ঠেকাতে যে মুখোশ আমরা মুখে পরেছি, সেটা অন্তরে যেন না পরে ফেলি। তাহলে আমরা আমাদের আগামী প্রজন্মকে অসভ্যতায় নিক্ষেপ করে যাবো। বর্বরের পঙ্‌ক্তিতে জীবন এগিয়ে নিলে আমাদের সন্তানেরা সভ্যতার উচ্ছিষ্ট হিসেবে এই পৃথিবীতে দিন কাটাবে।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ