মৃত্যুর ভয়ও হার মানে আবেগের কাছে

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৭:৫৭, এপ্রিল ২৩, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:৫৯, এপ্রিল ২৩, ২০২০

মোস্তফা হোসেইনব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাওলানা জোবায়ের আহমদ আনসারীর জানাজায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম হয় জেলাব্যাপী লকডাউন ঘোষণার মধ্যেই। অত্যন্ত স্বাভাবিকভাবে গোটা জেলা এখন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়লো। সরাইলে অনুষ্ঠিত জানাজার বিশাল জমায়েতের স্থান থেকে সামান্য দূরেই নাছিরনগরে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে। এবং সেখানে একজনের মৃত্যু সংবাদও প্রকাশ হয়েছে সংবাদমাধ্যমে। তাই আশঙ্কা করা যায় আগতদের মধ্যে অজানা সংখ্যক মানুষ ভাইরাসে আক্রান্ত থাকতে পারে। জেলার সিভিল সার্জন স্পষ্টই বলেছেন, জেলায় সামাজিক সংক্রমণের আশঙ্কা তীব্রতর হলো এই জমায়েতের পর থেকে।
১৭ এপ্রিল বিকালে মাওলানা জোবায়ের আহমেদ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ইন্তেকাল করেন। এলাকার প্রখ্যাত মানুষ হওয়ায় তার মৃত্যু সংবাদ অতি দ্রুত জানাজানি হয়ে যায়। প্রশাসনও জানতে পারে। তারা জানতো তার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসাগুলোতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। প্রাক্তন শিক্ষার্থীও হাজার হাজার। এই সুবাদে তার জানাজায় অতিরিক্ত লোকসমাগম হবে এটাই স্বাভাবিক। বাস্তবতা হচ্ছে সেই অনুযায়ী প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছিল তা কার্যকর হয়নি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযোদ্ধা আল মামুন সরকারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, স্থানীয় প্রশাসন শুক্রবারই মাওলানা জোবায়ের আনসারী সাহেবের পরিবার ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জনসমাগম না করার অনুরোধ জানায়। সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে মৃত্যু সংবাদ ও জানাজা বিষয়ে মাইকিং না করার কথাও প্রশাসনকে নিশ্চিত করেন তারা। সেই অনুযায়ী মাইকিং করা থেকেও বিরত থাকে মাওলানা জোবায়েরের পরিবার এবং সংশ্লিষ্টগণের পক্ষ।

অনুমান করা হয়, কয়েক হাজার মোবাইল ফোনের মাধ্যমে মৃত্যু সংবাদ ও জানাজার সময় ও স্থান সম্পর্কে ভক্ত ও মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হয়। যার ফলে শুধু ঢাকা থেকেই শতাধিক ট্রাকে করে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের নিয়ে হাজির হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

প্রশাসন মহাসড়কে ব্যারিকেড দিয়ে রেখেছিল, যাতে গাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রবেশ করতে না পারে। কিন্তু মানুষজন ব্যারিকেড মানেনি। হেঁটেই হাজার হাজার মানুষ অংশ নেয় জানাজার নামাজে।

প্রথমত জানাজার অনুষ্ঠান একটি ধর্মীয় আয়োজন। দ্বিতীয়ত হাজার হাজার মানুষ সমবেত হওয়ার কারণে সেখানে পুলিশ প্রশাসন কোনও পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ভক্তরা বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠার আশঙ্কা ছিল। যে কারণে প্রশাসন নীরব ভূমিকা পালন করতে বাধ্য হয়।

পরিস্থিতি দেখে স্পষ্ট মনে হয়, মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের উৎসাহ এবং উদ্যোগের কারণেই এই সমাগমটি হয়েছে। অথচ ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলাতেও করোনা আক্রান্ত রোগী রয়েছে।

মরহুম মাওলানা জোবায়ের আনসারীর নিজ এলাকাই করোনা আক্রান্ত। স্বাভাবিকভাবে মনে করতে হবে, তার এলাকার হাজার হাজার মানুষ যখন অংশ নিয়েছে, তখন তাদের সঙ্গে থাকা দশ-বিশজন যে আক্রান্ত ছিলেন না, তা বলার সুযোগ নেই। এই দশ-বিশজন হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে আসার পর জীবাণু যে কয়েক হাজার মানুষকে সংক্রমিত করেনি, তা বলা যায় না। এই কয়েক হাজার মানুষ যেহেতু লকডাউনে যায়নি, তাই সহজেই মনে করা যায়, তারাও হাজার হাজার মানুষের মধ্যে জীবাণু ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি করে ফেলেছেন।

সরকার গোটা দেশকে জরুরি অবস্থার আদলে ঝুঁকিপূর্ণ বলে ঘোষণা দিয়েছে। মাসাধিককাল ধরে সবকটি প্রচার মাধ্যম করোনার ভয়াবহতা প্রচারসহ সামাজিক দূরত্ব মেনে চলার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছে। অত্যন্ত স্পষ্ট যে, এই আহ্বান কোনও রাজনৈতিক আবেদন নয়। সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তার প্রয়োজনেই এই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

প্রশাসনের পাশাপাশি ধর্মীয় নেতারাও এগিয়ে এসেছেন মানুষকে সচেতন করার জন্য। বায়তুল মোকাররমের পেশ ইমাম বিভিন্ন গণমাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অনুরোধ জানিয়েছেন, জনসমাগম এড়িয়ে চলার সুবিধার্থে কেউ যেন মসজিদে না যান। এমনকি জুমার নামাজ পড়তেও যেন কেউ না যান। ঘরে বসে নামাজ পড়লে সুন্নত বলেও মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হুসাইনুল বান্না। তাদের দু’জনের বক্তব্যই টেলিভিশনে ব্যাপক প্রচার হয়েছে জনসচেতনতা সৃষ্টির জন্য। এমনও বলা হয়েছে, কারও মসজিদে উপস্থিতি যদি সংক্রমণের কারণ ঘটায়, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন। হেফাজতে ইসলামীর নেতা হাটহাজারীর মাওলানা আহমেদ শফিও লকডাউন কর্মসূচি ও মসজিদে সীমিতভাবে শুধু ইমাম সাহেব মুয়াজ্জিনদের নিয়ে জামাত আদায়ের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। বিবৃতির মাধ্যমে তিনি বলেছেন, মহামারিকালে এটা করাই যৌক্তিক।

জুমার নামাজ, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় ফরজে আইন। জানাজা পড়া ফরজে কেফায়া। সমাজের পক্ষে কয়েকজনও যদি অংশ নেন, তাহলেই ফরজ আদায় হয়ে যাবে। মাওলানা জোবায়ের আনসারীর জানাজায় যারা অংশ নিয়েছেন, তাদের প্রায় সবাই অন্তত এটুকু জানেন। তারা সবাই ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিতও। তারপরও এভাবে উৎসবের মতো দল বেঁধে কেন অংশ নিয়েছে এত মানুষ?

বলতে দ্বিধা নেই, পুরোটাই হয়েছে আবেগের কারণে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী মাওলানা জোবায়ের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় পড়ছে কিংবা পড়া শেষ করে গিয়েছে। তিনি একটা রাজনৈতিক দল করতেন, সেই সুবাদে তার দলেরও হাজার হাজার সমর্থক রয়েছে। এই মানুষগুলোর প্রিয় মানুষের মৃত্যুর পর আবেগপ্রবণ হওয়াটা স্বাভাবিক।

প্রশ্ন হচ্ছে তরুণ ভক্তদের নিবৃত করার চেষ্টা করা হয়েছিল কি? বাস্তবতা প্রমাণ করে, এমন চেষ্টা সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে করা হয়নি বলেই মনে হয়।

সাধারণত মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের নির্দেশ মেনে চলেন। আর এমন বিষয়টি নিয়ে তারা শিক্ষক ও মুরুব্বিদের সঙ্গে নিশ্চয়ই পরামর্শ করেছিলেন। দেশের ক্রান্তিকালে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মুরুব্বিদের সঙ্গে পরামর্শ না করে এত বড় কাজে অংশ নেননি এটা মনে করা যায়। তাই মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এর দায়মুক্ত হতে পারে না। যদি তারা পরামর্শ নাও করে থাকে, কিন্তু এটা তো ঠিক তারা নিজেরাসহ শিক্ষার্থীরা এই সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। তারা কি জানতেন না, এই সমাবেশ কত বড় ঝুঁকিকে স্বাগত জানাতে পারে?

তারা সবাই জানতেন। কিন্তু তারপরও তারা দল বেঁধে জানাজায় অংশ নিয়েছেন, শুধু আবেগের কারণে। আর এই আবেগটা মনে হয় বাঙালিরই একটু বেশি মাত্রায়।

আমার গ্রামের বাড়ির মসজিদের ইমাম সাহেবকে ফোন করেছিলাম শুক্রবার সকালে। আগের শুক্রবারের জুমার নামাজের উপস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারলাম, মানুষ মানা না শুনে দল বেঁধে চলে আসতে থাকে। ইমাম সাহেব মনে করলেন, নির্ধারিত সময়ের আগে নামাজ পড়ে নিলে হয়তো মানুষ আর আসবে না। তাই করলেন তিনি। কিন্তু নামাজ শেষ করে দেখেন বহু মানুষ হাজির। শুধু তাই নয়, তারা বাড়ি না ফিরে দ্বিতীয় জামাতে জুমার নামাজ আদায় করেন। অথচ প্রশাসনের পক্ষ থেকে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ওয়াক্তিয়া নামাজের জামাতে পাঁচ জন এবং জুমার নামাজে যেন ১০ জনের বেশি মানুষ না হয়। ইমাম সাহেবও আগেই জানিয়েছেন জামাতে যেন মুসুল্লিরা না আসেন। কিন্তু মানুষ ইমাম সাহেবের নির্দেশনা কিংবা প্রশাসনের কথা কোনোটাই শুনছে না। সবটাই কিন্তু আবেগের কারণে।

ইমাম সাহেব ও প্রশাসনের নির্দেশ অমান্য করে জামাতে অংশ নেওয়াই শুধু নয়, জামাতে অংশ নেওয়া নিয়ে খুনোখুনির মতো ঘটনাও ঘটে এই দেশে। গেলো সপ্তাহে গোপালগঞ্জে এক মসজিদের মুসল্লিদের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা থেকে শুরু করে মারামারির ঘটনায় একজনকে প্রাণ হারাতে হয়েছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাওলনা জোবায়ের আনসারীর জানাজায় হাজার হাজার মানুষের অংশ নেওয়ার বিষয়টিও আসলে তাই হয়েছে।

যে কারণেই হোক, এর কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হবে এখন এটাই বড় কথা। সেই উদ্যোগটি নিতে হবে প্রশাসনকেই। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার সত্যতা স্বীকার করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচনা সমালোচনার ঝড় বইছে। কিন্তু আশঙ্কাকে কমিয়ে আনতে হলে প্রশাসনকে কঠোরতর পদক্ষেপ নিতে হবে। আমি মনে করি পুরো ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় সপ্তাহে পাঁচ দিন সান্ধ্য আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। দুই দিন কিছু সময়ের জন্য শিথিল করে মানুষকে প্রয়োজনীয় কেনাকাটার ব্যবস্থার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। একইসঙ্গে সশস্ত্রবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর মনিটরিংয়ের দায়িত্ব নেওয়া জরুরি। মানুষ যাতে স্বেচ্ছা অন্তরীনে থাকে, সেই কারণে দরিদ্র মানুষদের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে প্রশাসনকে। শুধু ব্রাহ্মণবাড়িয়াই নয়, সারা দেশকেই মহাবিপদে ফেলতে পারে এই সমাবেশ। তাই আইন প্রয়োগে শিথিলতা ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি করতে পারে।

লকডাউন শতভাগ কার্যকর করার জন্য বলপ্রয়োগের সময় এসে গেছে। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থের কথা চিন্তা করে পদক্ষেপ নিতেই হবে।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

 

 

/এসএএস/এমএমজে/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ