করোনাকালের ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা

Send
মো. জাকির হোসেন
প্রকাশিত : ১৩:৫৮, এপ্রিল ২৪, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২২:১০, এপ্রিল ২৪, ২০২০

মো. জাকির হোসেনআবেগ, ভালোবাসা, প্রেম, মানবিকতা, মনুষ্যত্ব ও এর কুপ্রতিবেশী নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা, অমানবিকতা, মনুষ্যত্বহীনতা ইত্যাদির বসতবাড়ি মানবদেহের ঠিক কোন জায়গায় এ নিয়ে বেশ বিতর্ক রয়েছে। সাধারণভাবে মানুষ মনে করে মানবদেহের মন বা অন্তরে এদের বসতি। তবে মনের সঠিক অবস্থানটি কোথায় হৃৎপিণ্ডে না মস্তিষ্কে তা নিয়ে রয়েছে মতান্তর। মন বা অন্তর বলতে সাধারণভাবে মানুষ হৃৎপিন্ডকেই বুঝিয়ে থাকে। একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির হৃৎপিন্ডের দৈর্ঘ্য ১২ সে.মি., প্রস্থ ৯ সে.মি. আর ওজন প্রায় ৩০০ গ্রাম। মন বা অন্তর খ্যাত এ ছোট্ট হৃদয়ে মা-বাবার প্রতিও কী ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতা লুকিয়ে থাকে করোনা তা প্রকাশ করে দিলো। সুনামগঞ্জে অন্য জেলা থেকে আসা গার্মেন্টকর্মীর বাড়িতে যাওয়ায় করোনা হয়েছে সন্দেহ করে বৃদ্ধা মাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন সন্তানরা। অমত্য বালা দাস (৯০) দুই ছেলের জন্মের পর স্বামীকে হারান। কষ্ট করে ছেলেদের মানুষ করেন। দুই ছেলে কৃষি কাজ করলেও তারা আবস্থাপন্ন। ছেলেদের দাবি, করোনার মহামারির মধ্যে অন্য জেলা থেকে আসা মানুষের বাড়িতে যাওয়ার শাস্তিস্বরূপ তাকে বাড়ি থেকে করে দেওয়া হয়েছে। টাঙ্গাইলের সখীপুরে করোনা সন্দেহে এক নারীকে জঙ্গলে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে তার স্বামী-সন্তানেরা। পঞ্চাশোর্ধ্ব মা সংসারের বোঝা ছিলেন না। ছেলে, দুই মেয়ে, মেয়েদের জামাই, নাতি-নাতনিদের রান্না করে খাওয়াতেন। বাচ্চাদের দেখাশোনাও করতেন। কারণ সবাই চাকরি করতো। সেই মায়ের জ্বর-স্বর্দি-কাশি হওয়ায় হাসপাতালে নিয়ে পরীক্ষা করারও প্রয়োজনবোধ করলেন না সন্তানেরা। নিজের পেটে ধারণ করা সন্তানরা সন্ধ্যার সময় মা-কে নিয়ে বনের মধ্যে ফেলে আসলেন। রাতে হয়তো অসুস্থ এই মাকে শেয়াল-কুকুরেই টেনেহিঁচড়ে খেয়ে ফেলতো। সন্তানদের ফেলে যাওয়া মা-কে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য পাঠান প্রশাসনের কর্মকর্তারা। পরীক্ষায় মেলে ফেলে যাওয়া মা-র করোনা নেগেটিভ। পাবনার বেড়া উপজেলার দুর্গম চর চরসাফুল্যা গ্রামে করোনাভাইরাসের উপসর্গ থাকায় কে বা কারা মানসিক ভারসাম্যহীন এক বৃদ্ধকে (৬৫) ফেলে রেখে যায়। বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আইসোলেশনে ভর্তি করেন। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত সন্দেহে সাভারে এক বৃদ্ধা মাকে ফেলে পালিয়েছে তার সন্তানরা। সমাজের কাছে হেয় হবেন এই ভয়ে সন্তানদের পরিচয়ও প্রকাশ করছেন না এই মা। এমন পরিস্থিতিতে অসহায় ওই বৃদ্ধার দায়িত্ব নিয়েছেন সাভার সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

গত ২১ এপ্রিল করোনা আক্রান্ত সন্দেহে নারায়ণগঞ্জ থেকে এনে মাথার চুল কেটে সাভারে এক বৃদ্ধাকে ফেলে পালিয়েছে তার সন্তানরা। সাভার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওই নারীকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেছেন। এদিকে কুর্মিটোলা হাসপাতালে পিতাকে ফেলে পালিয়েছে সন্তানরা। সন্তানরা বাবার লাশ নিতেও অস্বীকৃতি জানিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখেছি অসুস্থ পিতাকে মাঠের মাঝখানে রেখে যাওয়ার ঘটনা। পরে সেখানেই তার মৃত্যু হয়েছে। টঙ্গীতে এক নারী অসুস্থ হয়ে রাস্তায় মারা গেলেও করোনা সন্দেহে তার মরদেহ ধরেনি সন্তানসহ এলাকাবাসী। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা সড়কেই পড়েছিল ওই নারীর লাশ। মায়ের মারা যাওয়ার খবর পেয়ে ছেলেমেয়ে এবং তার স্বজনরা মরদেহ নিতে এগিয়ে আসেনি। আরও বেশ কিছু ঘটনায় মৃত স্বজনের লাশ রেখে চলে গেছে আত্মীয়রা। পরিবার খবর নেয়নি। দাফন কাফনে এগিয়ে আসেনি। পুলিশ লাশ তুলে নিয়ে দাফন করেছে। সন্তানেরা ধারে কাছে না আসায় অনাত্মীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানাজা পরিয়ে লাশ দাফন করছেন, ইতোমধ্যে এমন নজিরও স্থাপিত হয়েছে।

একজন মা সন্তান জন্ম দিতে, তাদের আগলে রাখতে বছরের পর বছর কত কষ্টই না করেন। গর্ভে একজন মানব সন্তানকে মাসের পর মাস মা যখন বহন করেন কি নিদারুণ সে যন্ত্রণা! ঠিকমতো খেতে পারেন না, ঘুমুতে পারেন না, স্থির হয়ে বসতে পারেন না শরীরের অসহ্য যন্ত্রণার কারণে। গর্ভে মায়ের গ্রহণ করা খাদ্যের নির্যাস চুষে সন্তান বড় হয়। মাতৃগর্ভে সন্তান যখন বড় হতে থাকে তখন কখন কখনও হাত-পা ছুড়তে গিয়ে মায়ের গর্ভে সজোরে আঘাত করে। বড় ব্যথা পেয়ে চোখের জলে কষ্ট লুকিয়ে থাকেন মা। কাউকে নালিশ করেননি। বরং আরও সতর্ক হয়েছেন, অস্থির হয়েছেন এ ভেবে যে, গর্ভের সন্তানের কোনও কষ্ট হচ্ছে না তো? এত নড়া-চড়া করছে কেন? প্রসব যন্ত্রণা বড় বেশি কষ্টের। Lydia Aziato, Angela Kwartemaa Acheampong & Kitimdow Lazarus Umoar প্রসব যন্ত্রণার ওপর Labour Pain Experiences and Perceptions: A Qualitative Study among Post-partum Women in Ghana শীর্ষক গবেষণায় ঘানার কয়েকজন মায়ের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। একজন মা বলেছেন, “ I felt a sharp pain and when it increases, it is like you are being torn apart. That point when you feel like you are being broken into pieces.” মায়ের কষ্টের কথা আল্লাহ পবিত্র কোরআনেও উল্লেখ করেছেন, “আর আমরা মানুষকে তাঁর পিতা-মাতার প্রতি সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে কষ্টের পর কষ্ট বরণ করে গর্ভে ধারণ করে, আর তার স্তন্যপান ছাড়ানো হয় দু’বছরে। কাজেই আমার প্রতি ও তোমার পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। আমারই নিকট (সবার) প্রত্যাবর্তন।” (সুরা লুকমান: আয়াত ১৪) পবিত্র কোরআনে মায়ের কষ্টের কথা আবারও উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন, “আর আমরা মানুষকে তার মাতা-পিতার প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছি। তার মা তাকে গর্ভে ধারণ করে কষ্টের সাথে এবং প্রসব করে কষ্টের সাথে, তাকে গৰ্ভে ধারণ করতে ও তার স্তন্য ছাড়াতে লাগে ত্রিশ মাস………।” (সুরা আহকাফ: আয়াত ১৫)

মা-বাবা কষ্টের পর কষ্ট করে সন্তানকে বড় করতে পারেন। কিন্তু সন্তানদের অনেকেই একজন মা কিংবা বাবাকে আগলে রাখতে পারেন না। করোনার ভয়ে মা-কে, বাবা-কে সন্তানরা এভাবে ফেলে রেখে যাবে কল্পনা করা যায়। সন্তানের এমন অনাদর, উপেক্ষা মা-বাবার জন্য যে কত কষ্টের তা বুঝানোর ভাষা আমার সাধ্যের অতীত। সন্তানের নিষ্ঠুরতায় মায়ের কষ্ট কেমন হয় তা বুঝাতে একজন কষ্টার্ত মায়ের আবেগময় চিঠি উল্লেখ করছি। চিঠিটি সত্যি, না কল্পিত সে তথ্য যাচাই করতে পারিনি। তবে পড়ে অঝোরে কেঁদেছি। মা লিখেছেন, ‘খোকা এই চিঠি যখন তোর হাতে পড়বে তখন আমি তোর থেকে অনেক দূরে চলে যাব, যেখান থেকে কেউ কোনোদিন ফিরে আসে না। খোকা, তোর অনেক কথা মনে নেই। তাই এই চিঠিতে লিখে গেলাম তোর মনে না থাকা সেই কথাগুলো। তুই যখন ছোট ছিলি, একবার তোর জ্বর এসেছিলো, আমি তিন রাত ঘুমাতে পারিনি তোকে বুকে নিয়ে বসেছিলাম। কারণ, তোকে বিছানায় শোয়ালেই তুই কেঁদে উঠতি। তোর বাবা আমাকে বলেছিলো তোকে শুইয়ে রাখতে, কিন্তু আমি পারিনি তোর বাবার কথা রাখতে, সেজন্য আমাকে অনেক গালাগাল দিয়েছিল তোর বাবা। তোকে যখন রাতে বিছানায় শোয়াতাম তুই প্রশ্রাব করে বিছানা ভিজিয়ে ফেলতি, তখন আমি তোকে শুকনো জায়গায় শোয়াতাম। আর আমি তোর প্রশ্রাবে ভিজানো সেই জায়গায় শুয়ে থাকতাম। তোর বাবা যখন মারা গেলো, তখন অনেক কষ্টে আমাকে সংসারটা চালাতে হয়েছিল একটা ডিম ভেজে দুই টুকরা করে তোকে দু’বেলায় দিতাম। এমন দিন গেছে শুধু লবণ দিয়ে খেয়ে উঠেছি তোকে বুঝতেও দেইনি আমি। একদিন রান্না করার মতো কোনও চাল ছিল না আমার কাছে, তখন কোনও উপায় না পেয়ে একবাড়িতে কাজ করে কিছু চাল এনে ভাত রান্না করে খাইয়েছিলাম তোকে। হয়তো তুই ভুলে গেছিস, যখন তোর এসএসসি পরীক্ষার ফি দিতে পারছিলাম না, তখন তোর বাবার দেওয়া শেষ স্মৃতি নাকফুলটা বিক্রি করে দিয়েছিলাম। ভাবছিস এত কথা তোকে কেন লিখে গেলাম খোকা। তুই যখন বড় হলি, একটা ভালো চাকরি পেলি, কিছুদিন পরে বিয়ে করলি, আমি তোদের নিয়ে ভালোই ছিলাম। একদিন ঘর থেকে কিছু টাকা চুরি হলো, সেদিন তুই আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলি আমি তোর টাকার ব্যাপারে কিছু জানি কিনা। তুই আমাকে সরাসরি কিছু না বললেও আমি বুঝতে পেরেছিলাম তুই আমাকে চোর ভেবেছিলি। কিছু দিন পর তুই আমাকে অন্য একটি ঘরে রেখে দিলি। খোকা আমার সেই ঘরটিতে থাকতে অনেক ভয় করতো। কারণ, ঘরটি তোর থেকে অনেক দূরে ছিল। খোকা তোকে একদিন বলেছিলাম আমার একা একা থাকতে ভয় লাগে। তুই বলেছিলি মরণ আসলে যেকোনও জায়গায় আসবে। তোরা ভালো থাকিস।’ আমি এমন বাবাকে দেখেছি কোনও একটা শার্ট পছন্দ হয়েছে বারবার হাত দিয়ে দেখেছেন, রাস্তায় কোনও পছন্দের খাবারের দিকে তাকিয়ে থেকেছেন, কিন্তু টাকা খরচ করেননি এজন্য যে, সন্তানের পড়াশোনার জন্য লাগবে। নিজের চাওয়াগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে বিসর্জন দিয়েছেন কেবল সন্তানের মঙ্গল চিন্তা করে।

করোনার ভয়ে সন্তান যখন মা-বাবাকে রাস্তায়-মাঠে-চরে ফেলে যাচ্ছে, মৃতদেহ গ্রহণ করতে, দাফন করতে অস্বীকার করছে তখন মা-বাবার স্নেহের কাছে করোনা পরাজিত হয়েছে। চট্টগ্রামের পটিয়ায় করোনা আক্রান্ত ছয় বছর বয়সী শিশু চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। হাসপাতাল থেকে তার লাশ নিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সে মৃত সন্তানের শিয়রে বসে থাকা মা আনমনে মৃত সন্তানকে আদর করছিলেন। মাথায়, কপালে হাত বুলাচ্ছিলেন। সন্তানের এভাবে চলে যাওয়া মা-কে যেন জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান ভুলিয়ে দিয়েছে। চরম ঝুঁকির মাঝেও সন্তানকে ছেড়ে না গিয়ে আদর করার এই দৃশ্য অনেকের চোখ ভিজিয়ে দিয়েছে। মৃত শিশুটির হতভাগ্য বাবাও সন্তানটিকে ছেড়ে যেতে পারেননি। দাফন করার সময় বুকে আগলে লাশ নিয়ে যান কবরে। অথচ আদরের সন্তানের লাশের ভেতরে ঘাতক করোনা লুকিয়ে আছে। কোনও সুরক্ষা ছাড়াই শেষবারের মতো সন্তানকে বুকে আগলে ধরেছিলেন বাবা।

ঢাকা মেডিক্যালে করোনা শনাক্ত হওয়ায় এক শিশুকে নিতে হবে কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে। কিন্তু করোনা আক্রান্ত ওই শিশুকে অ্যাম্বলেন্সের তোলার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। শেষ পর্যন্ত শিশুর বাবা তার সন্তানকে কোলে তুলে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে উঠেন। করোনাভাইরাসের প্রকোপে গোটা ভারত যখন লকডাউনে তখন প্রশাসনের অনুমতি নিয়ে অন্ধ্র প্রদেশ আটকে পড়া ছেলেকে থেকে ফেরাতে স্কুটি চড়ে প্রায় ১৪০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ছেলেকে ফিরিয়ে আনেন তেলঙ্গানা রাজ্যের এক মা রাজিয়া সুলতানা। ভারতের কেরালার আরেক মা অসুস্থ ছেলেকে দেখতে নিজেই গাড়ি চালিয়ে ২ হাজার ৭০০ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যোধপুর গেলেন পঞ্চাশ বছর বয়সী মা সিলাম্মা ভাসান। ছেলের গুরুতর অসুস্থতার কথা জানার পর মা কেরালা থেকে তামিলনাড়ু, কর্নাটক, মহারাষ্ট্র ও গুজরাট রাজ্য ঘুরে তিন দিন ধরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে রাজস্থানে অসুস্থ ছেলের কাছে পৌঁছান।

করোনা আতঙ্কে কাঁপছে গোটা বিশ্ব। বিশ্বজুড়ে প্রতিদিনই চলছে মৃত্যুর মিছিল। এরই মাঝে গত ২১ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, প্রাণঘাতী করোনার ভয়ানক পরিস্থিতি দেখা এখনও বাকি আছে। ইউরোপ-আমেরিকার তুলনায় বাংলাদেশে করোনা এখনও মহামারি রূপ নেয়নি। এরই মাঝে সন্তানরা মা-বাবাকে রাস্তাঘাটে ফেলে যাচ্ছে, লাশ নিতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। আল্লাহ না করুন মহামারি আকার নিলে তখন মা-বাবাদের কী হবে? যারা মা-বাবাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছেন, লাশ গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং যাদের মা-বাবাকে রাস্তায় ফেলে আসার সম্ভাবনা আছে তাদের উদ্দেশ্যে বলছি, পৃথিবীর ৭৮০ কোটি মানুষের মধ্যে ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত ২৭ লাখ ৩২ হাজার ৭০১ জন বা .০৩ শতাংশ আক্রান্ত হয়েছেন। ৭ লাখ ৫০ হাজার ৮৬৪ সুস্থ হয়েছেন আর ১ লাখ ৯১ হাজার ১৫০ জন মারা গেছেন। কেউ ঘরে বসে করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে, আবার কেউ বাইরে গিয়ে কিংবা করোনায় আক্রান্তের সেবা-শুশ্রুষা করেও দিব্যি ভালো আছেন। কেউ আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করছেন, কেউ সুস্থ হয়ে ওঠছেন। সবার জন্য মৃত্যু অবধারিত এবং নিশ্চিত। কেউ ইচ্ছা পোষন করুক বা না করুক নির্ধারিত সময়ে মৃত্যু হবেই। সুরা আল ইমরান ও সুরা আম্বিয়ায় বর্ণিত হয়েছে, “প্রত্যেকে প্রাণীকে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতেই হবে”। মৃত্যু কোনও ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী, তার সুবিধামতো সময় এবং পছন্দনীয় স্থানে আসবে না। বরং তা আসবে আল্লাহর ইচ্ছানুযায়ী, তাঁরই নির্ধারিত সময় ও স্থানে। আল্লাহ বলেন, “তোমরা যেখানেই থাক না কেন; মৃত্যু তোমাদের পাকড়াও করবেই। যদি তোমরা সুদৃঢ় দূর্গের ভেতরেও অবস্থান কর, তবুও।” (সুরা নিসা, আয়াত ৭৮)। অন্য এক আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে নবী! ওদের বলুন, যে মৃত্যু থেকে তোমরা পালাতে চাচ্ছ, তোমাদের সে মৃত্যুর মুখোমুখি হতেই হবে। শেষ পর্যন্ত তোমাদের হাজির করা হবে দৃশ্য ও অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা আল্লাহর কাছে। জীবদ্দশায় যা করেছ, তা তোমরা তখন পুরোপুরি জানতে ও উপলব্ধি করতে পারবে।” (সুরা জুমআ: আয়াত ৮)। ১৬ মার্চের ঘটনা। দিনাজপুরের ফাসিলাডাঙ্গায় সোলায়মান আলী নামের এক ব্যক্তি মারা যান। তাঁর মরদেহ দাফনের জন্য স্বজন ও গ্রামবাসী কবরস্থানে সমবেত হয়েছিলেন। কবরস্থানের পাশে গাছের ডালে একটি মৌচাক ছিল। এ সময় দূর থেকে উড়ে আসা একটি ঘুড়ি মৌচাকে আঘাত করে। এতে গাছের নিচে থাকা উপস্থিত লোকজনকে আক্রমণ করে মৌমাছির ঝাঁক। মৌমাছির আক্রমণে আবদুর রৌফসহ ১৬ জন আহত হন। আহত লোকজনকে দিনাজপুর এম আবদুর রহিম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে আবদুর রৌফের মৃত্যু হয়। বাংলাদেশসহ সমগ্র পৃথিবী করোনায় সন্ত্রস্ত। আবদুর রৌফের মনেও হয়তো করোনা ভীতি উঁকি দিয়েছিল। অথচ মৃত্যুরূপে করোনা নয়, এলো মৌচাকে ঘুড়ির আঘাত ক্রুদ্ধ মৌমাছির আক্রমণ। ঘুড়ি মৌচাকে আঘাত করবে, তারপর মৌমাছির আক্রমণে আবদুর রৌফের মৃত্যু হবে, এমন মৃত্যু সমবেত কারও কল্পনাতেও কী ছিল সেদিন? গত ১৫ এপ্রিল স্বামী মৃণাল কান্তির মোটরসাইকেলে কর্মস্থল পার্বতীপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে যাচ্ছিলেন নার্স ইতি রানী। পথিমধ্যে প্রচণ্ড ঝড়ে তাদের ওপর একটি গাছের মোটা ডাল ভেঙে পড়ে। এতে ইতি রানী রায় নিহত হন, আর স্বামী মৃণাল কান্তি আহত হন। এক মোটরসাইকেলে ভ্রমণ করে একজন নিহত, একজন আহত। করোনা তাণ্ডবের মাঝেই বেশ কয়েকজন বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। গাড়ি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে কয়েকজন। করোনা ছাড়া অন্য অসুখে মারা গিয়েছেন অনেকেই। তারপরও কেবলই করোনার ভয়ে মা-বাবার প্রতি কেন এমন নিষ্ঠুর, নির্মম আচরণ?

কোরআনে আল্লাহ তা’আলা বলেন: “তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন তিনি ব্যতীত অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে। তাদের একজন অথবা উভয়ে তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাদের উফ্ (বিরক্তিসূচক ও অবজ্ঞামূলক কথা) বলবে না এবং তাদের ধমক দেবে না; তাদের সঙ্গে সম্মানের সঙ্গে কথা বলবে। মমতাবশে তাদের প্রতি নম্রতার ডানা প্রসারিত করো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাদের প্রতি দয়া করো যেভাবে শৈশবে তারা আমাকে প্রতিপালন করেছে।” (সুরা বনি ইসরাইল: আয়াত ২৩)। কোরআনের এ আয়াতকে অমান্য করে মা-বাবার প্রতি অবিচার করলে বিচার দিবসে স্রষ্টার কাছে কী জবাব দেবেন?

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

ই-মেইল: [email protected]

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব।

লাইভ

টপ